মানুষের তৈরি শিল্প এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা / তারেক নূরুল হাসান
সৃজনশীল কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে তর্কে বিতর্কে দুনিয়া সয়লাব। এসব দেখে শুনে প্রোফেসর শঙ্কুর কথা মনে পড়ে। নানা আবিষ্কার ও অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে বিজ্ঞানীমশাই ব্যস্ত দিন কাটান, বেঁচে থাকতে হলে দৈনন্দিন অন্য যেসব কাজ করতে হয়, সেসবে ব্যয় করার মত সময় তাঁর হাতে খুবই কম। এ কারনে তিনি আবিষ্কার করেছেন নানা ধরনের বটিকা। যেমন, তৃষ্ণা কমাতে তৃষ্ণাশক বটিকা। আবার মাছ খেতে ফিশ পিল, এতে করে মাছ রান্নার ঝামেলা ছাড়াই পিল খেয়ে নিয়ে মাছের স্বাদ পাওয়া হয়ে যায়। কফির জন্যে কফি পিল। আবার খুব গরম বা ঠাণ্ডায় আরাম দেওয়ার জন্য আছে এয়ারকন্ডিশন পিল।
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেন অনেকটা প্রোফেসর শঙ্কুর বটিকার মতই কোনো ব্যাপার। ইচ্ছে হলো, তো এক ক্লিকে একটা ছবি তৈরি করে ফেলা যায়, অন্য ক্লিকে কবিতা। খুব বেশি সময় লাগে না, ভাবতে হয় না বেশি, পরিশ্রমও নেই।
অথচ এধরনের কাজগুলো এতদিন ধরে শিল্পীরা করে এসেছেন। ছবি আঁকা অথবা সাহিত্য সৃষ্টি করা, এসব আর্টের জন্যে সৃজনশীলতার দরকার হয়। সৃজনশীল মানুষেরা দীর্ঘদিন অনুশীলনের মাধ্যমে শিল্পসৃষ্টিতে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। এই অনুশীলন, অধ্যবসায় এবং শিল্পসৃষ্টি, এইসবকিছুই চট করে হয়ে যায় না, এসবের পেছনে দীর্ঘ সময়ের প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এইখানটাতেই নিজেকে উন্নততর বলে দাবি করার চেষ্টা করছে। এধরনের কাজের জন্যে তারা সময় অনেক কমিয়ে আনছে। তাদের বিক্রেতারা বলার চেষ্টা করছে যে এখন চাইলে যে-কেউ শিল্প তৈরি করতে পারবে। কিছুদিন পরে এ-আই আমাদেরকে মোনালিসার মত মাস্টারপিস এঁকে দেবে, মার্কেজের মত তৈরি করে দেবে মাকোন্দো নামের অপার্থিব কোনো গ্রাম।
প্রম্পট লেখার একটা ব্যাপার অবশ্য আছে, তবে তা বেতনভোগী কর্মচারীকে দেয়া আদেশের মত কিছুটা। আমাকে সকাল বেলার রোদ নিয়ে একটা কবিতা লিখে দাও হে। অথবা, দুই চাকায় দাঁড়িয়ে আছে হাসিমুখের একটা গাড়ি, এরকম একটা ছবি বানিয়ে দাও। এরকম আদেশের কয়েক সেকেন্ড পরেই এ-আই হাজির করে দেয় একটা কবিতা বা ছবি।
তাহলে সৃজনশীল মানুষদের এখন কী হবে? তাঁরা কি আর্ট সৃষ্টি থামিয়ে দেবেন?
আমার ধারণা, সৃজনশীল মানুষেরা হয়ত নতুন কিছু প্রতিযোগিতার সামনে পড়বেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে, কিন্তু তাদের উপযোগিতা শেষ হয়ে যাবে না। শিল্প ব্যাপারটাকে যদি আমরা একটা পণ্য হিসেবে দেখি, ধরা যাক একটা ছবি, বা একটা বই, তাহলে এর সাথে দুই ধরনের মানুষ জড়িত। এক পক্ষ হচ্ছে ভোক্তা, যারা শিল্পদ্রব্যটাকে উপভোগ করেন, আর অন্যপক্ষ হচ্ছে আর্টিস্ট বা শিল্পী, যারা সেটি সৃষ্টি করেন। আর্ট কী, এই প্রশ্নের উত্তরে ভোক্তারা বলবে, এই পেইন্টিং বা বইটাই হলো আর্ট। কিন্তু শিল্পীরা কি তেমনটা ভাবেন? আমার ধারণা শিল্পীদের উত্তর হবে অনেকটা এরকম: এই যে আমি ছবিটা আঁকছি, বা বইটা লিখছি, এই আঁকার বা লেখার প্রক্রিয়াটা হচ্ছে শিল্প। অর্থাৎ ফাইনাল প্রোডাক্ট নয়, বরং প্রসেসটাই হলো আর্ট।
তো যারা সত্যিকারের শিল্পী, তারা কিন্তু এই প্রসেসটার মধ্য দিয়ে গিয়েই আর্ট সৃষ্টি করেন। সাময়িক প্রয়োজনে শিল্পের ভোক্তারা হয়ত নিজেদের ইচ্ছেমত 'কুইক ফিক্স' হিসেবে এ-আই দিয়ে আর্ট তৈরি করে নেবেন। কিন্তু শিল্পসৃষ্টির যে চাহিদা আর্টিস্টদের তাড়িয়ে বেড়ায়, তার তো কোনো উপশম হবে না। শিল্পীরা তাই নিজের আনন্দেই, অথবা যাতনায়, সৃষ্টি করে যাবেন শিল্প।
অবশ্য এ কথা স্বীকার না করে উপায় নেই, শিল্পের বাজার যেটা, যার সাথে অনেকাংশে অর্থ জড়িত, সেখানে বেশ কিছুটা নড়নচড়ন হবে। সস্তা হওয়ায় অনেকেই কৃত্রিম শিল্পের দিকে ঝুঁকে পড়বে, কম দামে আর কম খরচে কাজ চালিয়ে নেবে এ-আই দিয়ে। তবে আশা করছি, সেটা হয়ত সাময়িক। শিল্প মানুষের মনে দাগ কেটে যায় কেন? সেটার সাথে মানুষের ছোঁয়া থাকে বলেই। মানুষের স্মৃতি, ইতিহাস আর গল্পই শিল্পকে অনন্য করে তোলে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিনে দিনে অ্যালগরিদমের গুণে তার যান্ত্রিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে হয়ত, কিন্তু তবু তা কৃত্রিমই থাকবে। এর পেছনে কোনো ইতিহাস থাকবে না, গল্প থাকবে না। সচেতন মানুষ সেগুলোর জন্য নিজের আবেগ খরচ করতে চাইবে না বেশি দিন। তাই আপাতত বাজার এসব কৃত্রিম শিল্পে ভরে গেলেও, আবেদনের দিক দিয়ে মানুষের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন কমবে বলে মনে হয়। এ-আই এর ব্যবহারও দিনে দিনে কেবল একটা সাহায্যকারী 'টুল' হিসেবে সীমিত হয়ে যাবে।
খুব শিঘ্রী মানুষ আবার খুঁজতে থাকবে মানুষের তৈরি শিল্প, যন্ত্রের নয়।
(মানুষের তৈরি শিল্প এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা / তারেক নূরুল হাসান / মেলবোর্নের বাংলা সাহিত্য সংসদের পত্রিকা 'দখিনা প্রয়াস'-এ প্রকাশিত/ নভেম্বর ২০২৫)
