Posts

রেহানা মরিয়ম নূর

মুগ্ধ হলাম দেখে। ভালো মানের গল্প-উপন্যাসে এরকম চরিত্র ‘পড়ে’ অভ্যাস আছে আমাদের। এত স্পষ্ট, শক্তিশালী, মানবিক দোষ-গুন সম্পন্ন একজন পরিপূর্ণ মানুষ। কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রে এরকম পরিপূর্ণ চরিত্র ‘দেখার’ অভিজ্ঞতা খুব বেশি নেই। রেহানা আর বাঁধন মিলেমিশে একাকার। আর তাঁর মেয়ের চরিত্রে জাইমা। অসাধারণ অভিনয় এই দু’জনেরই। পরিচালক আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ-কে টুপি খোলা অভিনন্দন জানাই। এরকম একটা গল্প যার মাথা থেকে আসে, গল্পের ভেতরের ট্যুইস্ট, এরকম একটা চরিত্র। আর সেটাকে পর্দায় এভাবে তুলে নিয়ে আসা, একদম শেষ দৃশ্য পর্যন্ত, যেন আমাদের চারপাশের সময় কেউ থামিয়ে দিয়েছিল।

জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা- শহীদুল জহির

  জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা- শহীদুল জহির একচল্লিশ পৃষ্ঠার এই এক প্যারাগ্রাফের বিরতিহীন উপন্যাসিকায় ফর্ম নিয়ে চমৎকার সব কারুকার্য চোখে পড়ে। খুব অবলীলায় অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যতে আসা-যাওয়া আছে, চরিত্রের পয়েন্ট অব ভিউ এর বদল হয়েছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু সেটা পাঠককে বাড়তি কোনও যন্ত্রণা না দিয়েই। ভাল গায়কেরা নাকি এক নি:শ্বাসে গাওয়া লাইনের মাঝে চোরা শ্বাস নিতে পারেন, শ্রোতারা সেটা বুঝতেও পারে না। সে কথাই মনে পড়লো আবার এটা পড়তে গিয়ে। কিন্তু গল্পের ফর্ম নিয়ে পরীক্ষা নীরিক্ষার আসল সাফল্য, আমার মতে, সব কিছুর পরেও পাঠকের মনে থেকে যাবে গল্প, আর গল্পের চরিত্ররা। ফর্ম শেষমেশ কেবলই একটা উপায় বা মাধ্যম, কিন্তু সেটাই সব নয়। মানে, সবার উপরে গল্প সত্য, তাহার উপরে নাই। জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা পড়া শেষ হলে তাই এই এক প্যারাগ্রাফের বদলে মাথায় রয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ, আর সেই মহল্লার মানুষেরা। বদু মওলানা, আজিজ পাঠান, মোমেনা আর আব্দুল মজিদসহ আরও অনেকে। আর সম্ভবত আড়ালে কোথাও প্রায় না-দেখার মতই দাঁড়িয়ে থাকেন শহীদুল জহির।

জীবন আমার বোন | মাহমুদুল হক

পড়া বই পুনর্পাঠের একটা আনন্দ আছে। চেনা দোকানে ঢুকে চা খাওয়ার মত আনন্দ। দোকানীর হাতের চায়ের স্বাদ আপনার জানা, তাই আয়েশ করে চায়ের কাপে চুমুক দিতে পারবেন, এই নিশ্চয়তা জেনেই আপনি সেখানে যাবেন। পড়া বই হাতে তুলে নেয়ার অনুভূতিটাও এরকমই। মাথায় কোনো কারণে জট পাকিয়ে গেলেও পড়া বইয়ের দ্বারস্থ হওয়া ভাল, বহুদিনের অভিজ্ঞতা আমাকে তা-ই শিখিয়েছে। এই সমস্ত বিবিধ কারণে আবার অনেক দিন বাদে পড়লাম মাহমুদুল হকের 'জীবন আমার বোন'। মনে আছে, এই বইটা পড়ার পরে জানতে পেরেছিলাম Boris Pasternak এর My Sister, Life নামের কবিতার বইটার কথা। তখন ভেবেছিলাম, এই দুই বইয়ের কোনও যোগসূত্র আছে কি? তার বেশ কিছুদিন পরে মাহমুদুল হকের এক সাক্ষাৎকারে জানতে পারলাম, তাঁর বইয়ের নামের পেছনে অবদান আছে সেই বইটার। মাহমুদুল হকের ভাষাকে ঠিক আটপৌরে বা সাবলীল বলা যায় না, তবে আমার ভাল লাগে। এই বইটা মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগের কয়েকটা দিনের গল্প মূলত। কয়েকজন তরুণ তরুণী, এক বা কয়েকটি পরিবার। আর একটা বোন। সব তরুণের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস ছিল না, সবার যুদ্ধে যাবার পেছনের কারণও এক ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পড়া অন্য উপন্যাসগুলো যে ধাঁচের, এটা ঠিক সের

"হোয়াট উই টক অ্যাবাউট হোয়েন উই টক অ্যাবাউট লাভ-"

Image
রেমন্ড কার্ভারের গল্পের চরিত্ররা সবাই এত বেশি সাধারণ, এত বেশি প্রতিদিনকার যে মাঝে মাঝে আয়না দেখার মত করে চমকে যেতে হয়। পৃথিবীতে কোনো একজন লেখক এইরকম মানুষদের গল্পে নিয়ে এসেছেন, ভাবতে খুব ভাল লাগে। ওঁর মিনিমালিস্ট লেখার স্টাইলটা দারুণ। যদিও সেটার জন্যে এখন তাঁর এডিটরকে ক্রেডিট দেয়া হয় বেশি, সেটা অর্ধেক মেনে নিয়েও আমি যখন ওঁর চরিত্রগুলার কথা ভাবি, তখন মনে হয়, স্টাইল যেমনই হোক, কিন্তু এই চরিত্রদের নিয়ে লিখবার কথা তো তাঁর মাথা থেকেই এসেছে। সালমান রুশদী একবার বলেছিলেন, অনেকেই লোভে পড়ে ওভাবে লিখতে চেয়েছিল। ওরকম একটা ঘরে বসে থাকা দুইজন মানুষের গল্প, অথবা ওয়ার্কিং ক্লাস বা ব্রাত্য মানুষদের গল্প, কিন্তু কেউই তো আর কার্ভার হয়ে উঠতে পারেনি। এ কথা সত্যি। কার্ভারের লেখা পড়ে মনে হয়, এ আর এমনকি। এরকম তো সবাই লিখতে পারে। কিন্তু বাস্তবে, এই ছোট ছোট বাক্যগুলো পরপর বসিয়ে দিয়ে এর ভেতরে কার্ভার যে প্রাণ আর শক্তি পুরে দেন, সেটা নকল করা সহজ কাজ নয়। সবচেয়ে আশ্চর্য লাগে, ওঁর গল্পের নামগুলোও যেন নিজেরাই একেকটা গল্প। হোয়্যার আ'ম কলিং ফ্রম, সো মাচ ওয়াটার সো ক্লোজ টু হোম, নোবডি সেইড এনিথিং, দে আর নট ইওর হাজবে

শর্ট ফিল্ম: মশারি

Image
দিনের আলো স্ক্রিনের ওপরে পড়ে ঝাপসা দেখায়, তাই জানালার ব্লাইন্ড নামিয়ে দরজা আটকে তারপরে দেখা শুরু করেছিলাম। কিন্তু কিছুদূর যেতেই পজ বাটনে চাপ দিয়ে দরজা-জানালা খুলে দিয়ে আবার বসতে হল। অন্ধকারে ভালোই ভয় পেয়েছি! মেলবোর্ন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের কল্যাণে দেখতে পারলাম নুহাশ হুমায়ুনের নির্মিত শর্ট ফিল্ম ‘মশারি’। এক শব্দে বলতে হয়, চমৎকার! একদম প্রথম দৃশ্য থেকেই আটকে রাখে স্ক্রিনে। মনে হচ্ছিল ডিস্টোপিয়ান কোনও জগতের গল্প। সুনেহরা বিনতে কামাল আর নাইরা অনরা সাইফ, অনবদ্য অভিনয় করেছেন দুজনেই। কী চমৎকার ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দুজনের ভেতরের সম্পর্কটুকু! প্রতিটি দৃশ্য একেবারে সঠিক মাপ দিয়ে কাটা যেন, কোথাও কোনও বাহুল্য নেই। একদম শুরুতে দেখানো মৃত গরুর শিঙটিও শেষমেশ ‘চেখভের বন্দুক’ প্রমাণিত হয়েছে। পুরোটা সময় স্নায়ুর উপরে ভালোই চাপ পড়েছে। অক্টাভিয়া বাটলারের স্পিচ সাউন্ডস গল্পটা পড়ার সময় মনের ভেতর সারাক্ষণ একটা অস্বস্তি গুনগুন করছিল, সেরকম একটা অস্বস্তি যেন ফিরে এলো ‘মশারি’ দেখতে দেখতে। সবচেয়ে দারুণ খবর, এবারের ফেস্টিভ্যালে বেস্ট ফিকশান শর্ট ফিল্মের পুরস্কারও জিতে নিয়েছে এই ছবি। ফিল্মের দৈর্ঘ্য মাত্র

অনীক দত্তের অপরাজিত (দি আনডিফিটেড)

Image
অনীক দত্তের অপরাজিত (দি আনডিফিটেড) দেখলাম গত সপ্তাহে। বেশ ভালো লাগল।  (স্পয়লার রয়েছে। মুভি দেখা না থাকলে আর না পড়াই ভালো।)  . . . . . . . সিনেমা দেখার আগে ট্রেলার বা অন্যান্য খবর খুব বেশি দেখিনি বলে, সিনেমায় বসে যখন প্রথম টের পেলাম, এটা সত্যজিতের ওপরে নয়, বরং পথের পাঁচালীর ওপরে বানানো সিনেমা, বেশ মজা পেলাম।  সবার অভিনয় দারুণ একেবারে। চরিত্র অনুযায়ী কাস্টিং একেবারে ফুলমার্কস পেয়ে যাবে, মেকআপও দুর্দান্ত।  শুধু সব কিছুর নাম বদলে দেয়াটা ভালো লাগেনি। পরিচালকের নিশ্চয়ই কোনও ব্যাখ্যা আছে এ নিয়ে, আমার এখনও চোখে পড়েনি যদিও, কিন্তু সিনেমা দেখার সময় দর্শক হিসেবে বেশ বিরক্ত হচ্ছিলাম এটা নিয়ে। এক শুধু সত্যজিতের অপরাজিত রায় হওয়াটাই মানতে সমস্যা হয়নি, কিন্তু পাঁচালীর ‘পদাবলী’, বিন্দুকে ‘বৃন্দা’, কৃষ্ণকান্তের উইলের ‘উকিল’ অথবা রবিশংকরের সূর্যবাবু হয়ে যাওয়া কেমন স্যাটায়ার হয়ে যাচ্ছিল বারে বারে। আর এই নাম বদলের ফর্মূলাই বা কী ছিল? বাইসাকেল থিভস ঠিক কীভাবে বাইসাইকেল ‘রাইড’ হয়? একেকটা নতুন চরিত্র আসছিল পর্দায়, আর আমার কুইজ খেলার মত করে ‘সেটা আসলে কে’ এই গেমে জড়িয়ে পড়তে ভালো লাগছিল না।  আমার কাছে মনে হয়েছে

The Collected Short Stories by Satyajit Ray

Image
সত্যজিৎ রায়ের ছোটগল্পের আমি সাঙ্ঘাতিক ভক্ত। তাঁর ‘গল্প ১০১’ বইটার বেশিরভাগ গল্পই প্রায় মুখস্ত হয়ে গেছে পড়তে পড়তে। সেগুলো থেকে বাছাই করা ঊনপঞ্চাশটি গল্পের ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে এই বই- ‘The Collected Short Stories by Satyajit Ray.’  অনুবাদ অনেকটা পাজ্‌ল এর মত ব্যাপার বলে মনে হয় আমার কাছে। সেখানে শুধু শব্দের অর্থ বসিয়ে গেলেই চলে না, বরং উদ্দিষ্ট পাঠকের মন বুঝে বাক্য সাজানো লাগে। ধাঁধাঁর চেয়ে কম নয় তা কোনও অংশে! সত্যজিতের লেখা এত পছন্দের গল্পগুলির ইংরেজি চেহারা কেমন হল, সেই আগ্রহ থেকেই বইটি সংগ্রহ করা।  কেনার সময় জানতাম গল্পগুলো অনুবাদ করেছেন গোপা মজুমদার । এখনও সব গল্প পড়ে উঠতে পারিনি, প্রথম দিকের কয়েকটা কেবল। কিন্তু তাতেই অনুবাদের মান নিয়ে খুব ভালো বোধ করছি। খুবই মসৃণ, কোথাও হোঁচট না-খাওয়া অনুবাদ। সত্যজিতের বাংলা-র ঝরঝরে ভাবটা এই অনুবাদগুলোয় খুঁজে পেতে সমস্যা হয় না। এটা একটা বিরাট সাফল্য বলে মনে করি।  তবে বইটি হাতে পেয়ে যে সারপ্রাইজটা পেলাম তা হল, কিছু গল্প দেখলাম সত্যজিতের নিজেরই অনুবাদ করা! এটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত পাওনা। এক লাফে খুব প্রিয় গল্প ‘ খগম ’ খুলে বসলাম। সাপের ভাষা সাপের বিষ, ফি

হোমমেইড মিম ১: বিশ্ব বই ও কপিরাইট দিবস

Image
 

অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া-

Image
গানেরা কেমন করে ফিরে ফিরে আসে!   তখন কুমিল্লা জিলা স্কুলে পড়ি। ফাইভ অথবা সিক্সে। স্কুলের সামনের ছোট মার্কেটের সিঁড়ি ঘরটাকেই কায়দা করে বদলে নিয়ে একটা ‘ক্যাসেটের দোকান’ চালু হল। গান মানেই তখন ‘ক্যাসেট’- আমাদের কাছে। দোকানের নামটাও একেবারে সেইই- জিপসী! আমাদের কিশোর মনে একটা নতুন ধুমদাড়াক্কা কিছুর  ডুগডুগি বাজিয়ে দিলো দোকানটা। ঈদ উপলক্ষে তখন প্রচুর এলবাম বের হতো। এখন কী হয় জানি না। তো কোনও এক ঈদের আগে আগে আমি আর ছোটমামা সম্ভবত ৩৫ টাকা পকেটে নিয়ে গেলাম সদ্য বের হওয়া একটা এলবাম কিনতে। শক্তি, নাকি স্টারজ, নাকি স্রোত- ভুলে গেছি। কিন্তু এরকম কোনও নাম নিশ্চিত।  সেই ছোট্ট দোকানে ঢুকে আমরা নানা রকম ক্যাসেট দেখছি। বাইরে বিশাল সাউন্ডবক্সে দারুণ কোনও ব্যান্ডের গান বাজছে।  সেই সময় দরজা ঠেলে এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক ঢুকলেন দোকানে। দেখলাম বাইরে যে রিকশা থেকে তিনি মাত্র নামলেন, সেখানে আরেকজন স্নিগ্ধ চেহারার ভদ্রমহিলা বসে আছেন।  তিনি ঢুকে দোকানের ঝকমারি দেখে একটু থমকে গেলেন। তারপরে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাদের কাছে কি অমল ধবল পালে ক্যাসেটটা আছে?’  দোকানী বুঝলেন না, আবার জিজ্ঞেস করলেন ক্যাসেটের নাম। ভদ্রলোক

মাসুদ রানা-র কপিরাইট এবং চুক্তিপত্রের গুরুত্ব

খবরে দেখলাম, প্রয়াত লেখক শেখ আব্দুল হাকিম-কে মাসুদ রানা সিরিজের ২৬০টি এবং কুয়াশা সিরিজের ৫০টি বইয়ের স্বত্বাধিকারী বলে ঘোষণা করেছে দেশের কপিরাইট কর্তৃপক্ষ।  মাসুদ রানা, কাজী আনোয়ার হোসেন এবং শেখ আব্দুল হাকিম, এই সবগুলো নামই বাংলাদেশী পাঠকদের আবেগের সাথে এমনভাবে জড়িত যে, এই মামলা, অভিযোগ এবং তা থেকে আসা সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক রকমের মতামত দেখা যাচ্ছে। কেউ বলছেন শেখ আব্দুল হাকিম-ই বইগুলোর ন্যায্য দাবীদার, আবার কেউ বলছেন কাজী আনোয়ার হোসেন এগুলোর প্রকৃত স্বত্বাধিকারী।  স্বল্পজ্ঞানে যতটুকু বুঝি, কপিরাইট কর্তৃপক্ষের ঘোষণায় কোনও ভুল নেই;  আইন অনুযায়ী এগুলোর স্বত্বাধিকারী শেখ আব্দুল হাকিম। আবার একই সাথে আমি মনে করি, এই বইগুলোর স্বত্ব আসলে কাজী আনোয়ার হোসেনের হওয়া উচিত, হাকিমের নয়।   কেন?  সহজ কথায়, যে কোনও সৃজনশীল কাজের কপিরাইট নিজে থেকেই তার স্রষ্টার কাছে থাকে। মানে, কেউ যদি একটা গান তৈরি করে, অথবা নিজের লেখা কোনও বই প্রকাশ করে, তাহলে সেটির কপিরাইট হবে সেই সঙ্গীতশিল্পী কিংবা লেখকের। এই স্বত্ব দাবী করার জন্যে আলাদা করে কোথাও নিবন্ধন করার দরকার পড়ে না। বইয়ে অথবা এলবামের কোথাও কোনও ঘোষণার দরকার হয় না