শনিবার, মে ১৮, ২০১৯

অক্ষয় মালবেরিঃ মণীন্দ্র গুপ্ত



এই বইটির পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখবার ক্ষমতা আমার নেই। 
আমি দীন হীন এক শব্দ কাঙাল, নিজের সমস্ত অপারগতা হাতের আঙুলে জড়িয়ে আমি এই বইটি পাশে নিয়ে বসে চুপ করে নিজের বোধিলাভ প্রত্যক্ষ করতে পারি শুধু, আর কিছু নয়। 
এর চেয়ে সুন্দর কিছু আজ অব্দি খুব বেশি পড়িনি, এই জীবনে এর চেয়ে স্বপ্নিল কিছু আর বেশি পড়তে পাবো না, এটাও জানি। 
নিজের সীমাহীন খামতি আর মুগ্ধতা এইখানে শুধু লিপিবদ্ধ করে রাখলাম।

শনিবার, মার্চ ৩০, ২০১৯

শিবব্রত বর্মনের গল্প সংকলন- বানিয়ালুলু


এখন পর্যন্ত বছরে আমার পড়া সবচেয়ে চমৎকার বাংলা বই এর নাম- ‘বানিয়ালুলু’। ইচ্ছে হচ্ছে লোকেদের ডেকে এনে ধরে ধরে পড়াই বইটা। 
আমাদের যাদের বাংলা কল্পবিজ্ঞানের হাতেখড়ি হয়েছেকপোট্রনিক সুখ দুঃখবাতোমাদের জন্যে ভালবাসাবইগুলোর মাধ্যমে, তাঁদের কাছে বাংলা কল্পবিজ্ঞানের জগতে বিজ্ঞানের চেয়েও মানবিকতার পাল্লার ভার বেশি। আমি নিশ্চিত যে আমার সমবয়সী বাংলা পাঠকদের সবচেয়ে প্রিয় গল্পের নামের তালিকায় থাকবেটুকুনজিল’, কিংবাটুকি ঝাঁ এর প্রায় দুঃসাহসিক অভিযানঅথবানিউটনের ভুল সুত্রগল্পগুলো। বিষয় এবং গল্প বলার ভঙ্গিতে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে, তবুও বলতে দ্বিধা নেই, ’বানিয়ালুলুবইটি পড়তে গিয়ে বহুদিন বাদে সেই বইগুলো পড়ার আমেজ এবং আনন্দ ফিরে পেলাম। 
বইয়ের প্রথম গল্পের নামইবানিয়ালুলু’। এই গল্পটা পড়ে খানিকটা আশাভঙ্গ হয়। এটা যতটা না কল্পবিজ্ঞান, তারচেয়ে বেশি বেশ উচ্চমানের সারকাজম। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, পরের গল্পগুলো পড়তে গিয়ে টের পাই, বানিয়ালুলু নামের গল্পটা এক কথায় এই পুরো বইটির প্রস্তাবনা। লেখক এই গল্প দিয়েই যেন আমাদের স্বাগত জানিয়েছেন তার তৈরি করা একটা অদ্ভুত জগতে। অনেকটা যেন বাকি বইয়ে ঢোকার আগে প্রস্তুতিপর্বের কাজ করে এই গল্পটা। 
পরের প্রায় সবকটি গল্পই চমৎকার অথবা দুর্দান্ত বিশেষণে বিশেষায়িত হবার যোগ্য। 
দুই শিল্পীভাল লেগেছে, কিন্তু হঠাত করে শেষ হয়ে গেছে মনে হলো। প্রতিদ্বন্ধীপড়ে লেখকের কল্পনাশক্তির বিস্তার দেখে অভিভূত হয়েছি। মনে মনে বেশ কয়েকবার অজান্তেই প্রশংসা করেছি গল্প এগিয়ে নেবার পারদর্শিতার। বেশ কিছু গল্পে লম্বা বর্ণনা দিয়েছেন লেখক, গল্পের মূলে ঢুকবার আগে। যেমন ধরা যাকডঃ মারদ্রুসের বাগান।সেই বর্ণনাগুলো ঝুলে যাবার একটা আশংকা ছিল, কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম শেষমেশ আগ্রহ ধরে রেখে পুরো গল্পটা টেনে নিয়ে যেতে পেরেছেন তিনি, অতিরিক্ত মনে হয়নি আর সেগুলো। সবচেয়ে বড় কথা, যে বাগানের আপেল অথবা কমলাগুলো আসলে শেক্সপিয়রের সনেট, সে বাগানে আরেকটু লম্বা সময় কাটাতে পারলে ক্ষতি নেই। 
ভেতরে আসতে পারি?’, ’দ্বিখন্ডিতএবংবহুযুগের ওপার হতেসবগুলোই খুব ভাল মানের গল্প। খেয়াল করে দেখলাম, একেবারে নতুন বিষয়ে লেখা গল্পে লেখক যেমন দক্ষ, তেমনই গল্পের বিষয় যেখানে পুরনো- সে গল্পের বর্ণনায় তিনি সাবলীলভাবে নতুন কোন ভঙ্গি নিয়ে এসেছেন। 

বইটিকে পাঁচের ভেতর নির্দ্বিধায় সাড়ে চার দিব আমি। লেখক শিবব্রত বর্মনের লেখা আগে পড়িনি কখনো, কিন্তু এখন থেকে তিনি আমার অবশ্যপাঠ্যের তালিকায় পাকাপাকি জায়গা করে নিলেন। 

মুহম্মদ জাফর ইকবাল-এর অবিশ্বাস্য সুন্দর পৃথিবী


এই বুড়ো বয়সে এসে বই পড়তে গিয়ে চশমার কাচ ঝাপসা হয়ে আসা খুবই বিব্রতকর। এদিক ওদিক তাকিয়ে মুখে একটা গোবেচারা হাসি ঝুলিয়ে চশমা পরিষ্কার করে আবার মুখ ডুবিয়ে দিয়েছি পড়ায়। 
পড়তে পড়তে অনেকবার গা দুলিয়ে হেসেছিও। গা দোলাবার কারণ, লাইব্রেরিতে বসে পড়ছি তাই শব্দ করা যাবে না, শব্দ আটকানোর অসম্ভব পরিশ্রমের বহিঃপ্রকাশ এই গা দোলানো। 
মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসে সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে এরকম কৌতুক করে লিখতে পারা মানুষ খুব বেশি নেই পৃথিবীতে। নিজেকে হত্যা করতে উদ্যত মানুষটাকে যেন গণপিটুনিতে মেরে ফেলা না হয়, স্ট্রেচারে শুয়ে হাসপাতালে যেতে যেতে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার মানুষের সংখ্যা আরও কম। সুস্থ হয়ে জেলে গিয়ে সেই লোককে দেখে আসবার সাহস দেখে শিউরে উঠেছি। 
সবচেয়ে হাসি পেয়েছে লেখককে দেখতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের কথাতে, ”আপনি কনুই দিয়ে একটা গুঁতো দিতে পারলেন না?” হাহাহা ! 
দুর্জনের মুখে ছাই আর পেটে কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে এভাবেই আপনি আরও যুগ যুগ বেঁচে থাকুন, খুব প্রিয় মুহম্মদ জাফর ইকবাল!

শুক্রবার, মার্চ ০৮, ২০১৯

সুহানের বই, ইবইয়ের প্রচ্ছদ এবং বইদ্বীপ



খুব চমৎকার একটি প্রচ্ছদসহ সুহানের এই বইটি প্রকাশিত হয়েছে বইমেলা ২০১৯ এ।
বইদ্বীপ থেকে ইবুক হিসেবে প্রকাশের জন্যে আমরা যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন আমিই হঠাত প্রস্তাব করি, ইবুকের জন্যে একদম নতুন একটা প্রচ্ছদ করলে কেমন হয়? সুহান রাজি হতেই এঁকে ফেলি এই প্রচ্ছদ। এবং ওর দোনোমনাকে পাত্তা না দিয়ে প্রচ্ছদে লেখকের নামের ফন্ট সাইজ বড় করে দিই বইয়ের নামের চেয়ে, ঠিক যেমনটা দেখি বহির্বিশ্বের বইগুলোয়। 

আমাদের দেশে এখনো অবশ্য ইবুক বলতেই আমরা বুঝি প্রকাশিত বইগুলোর স্ক্যান করা পাতাগুলো জুড়ে দিয়ে তৈরি একটা পিডিএফ ফাইল। কিন্তু ইবুক মানে তা নয়। হার্ডকাভার এবং পেপারব্যাক যেমন বইয়ের দু
টা সংস্করণ, ইবুক হলো তৃতীয় সংস্করণ। ইপাব বা মোবি তে বাংলা অক্ষর পড়বার আনন্দই অন্যরকম। বইদ্বীপের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন বিরামহীন ভাবে ইবুকের কার্যকারিতা নিয়ে প্রচার চালিয়েছি। সেটা করতে গিয়ে টের পেয়েছি, আমরা বাংলাদেশিরা কাগজের মেইলের বদলে ইমেইলকে মেনে নিয়েছি নিঃসংকোচে, কিন্তু বইয়ের বদলে ইবইয়ের কথা এলেই খুঁজি শুধু স্ক্যান করা পিডিএফ! এ কথা খুব কম মানুষকে বোঝাতে পেরেছি যে ইবই এর আলাদা অস্তিত্ব যত দ্রুত মেনে নেয়া যাবে, বাংলা বইয়ের প্রচার ও প্রসার তত বেশি দ্রুতগামী হবে। 

সুহানের এই বইটি অনেকগুলো কারণে আমার কাছে বিশেষ একটা বই। প্রথমত এটি খুব ভালো মানের একটি উপন্যাস। অনেকদিন বাদে সমসাময়িক কোন লেখকের লেখা পড়ে এতটা আশান্বিত ও আনন্দিত হয়েছি। আর দ্বিতীয়ত, বইদ্বীপ থেকে এই প্রথম কোন বাংলা বইয়ের আলাদা ইবুক প্রকাশিত হলো, ছাপা বইয়ের ইসংস্করণ নয়, সত্যিকারের আলাদা ইবই, যার রয়েছে আলাদা প্রচ্ছদ ও কন্টেন্ট। এই ব্যাপারটি আমার জন্যে অপরিসীম আনন্দের। এই সুযোগ করে দেবার জন্যে সুহান রিজওয়ান-কে তাই অনেক ধন্যবাদ জানাই।
বইটি পাওয়া যাচ্ছে এখানেঃ
https://www.boidweep.com/2019/03/blog-post.html

রবিবার, ফেব্রুয়ারী ১০, ২০১৯

সুহান রিজওয়ান এর উপন্যাস - ‘পদতলে চমকায় মাটি’

     
        সমর কুমার চাকমা আমার কাছের কেউ নয়। বলা যায় পাশের বাড়ির মানুষ। পাশের বাড়ির মানুষেরা তো আমার নিজের বাড়ির মানুষদের মত আপন কেউ নয় আসলে। ওয়াইফাই আর ফোরজি সিগন্যালের কল্যাণে আমরা পুরো বিশ্বের সাথে নিজেদের সংযুক্ত করে ফেলেছি ঠিকই, কিন্তু একই সাথে শত ফুট উঁচু দেয়াল তুলে দিয়েছি নিজের চারপাশে। এই দেয়াল টপকানো সহজ কোন কাজ নয়। 
            পত্রিকার পাতায় পড়তে পাই আমার প্রতিবেশীর খবর। পত্রিকা, সে-ও তো দূরের কোন ব্যাপার। আমার মত ‘মডারেট-স্বার্থপর’ এবং অল্পবিদ্যার পাঠকেরা নিজেদের চারপাশে একটা কল্পরাজ্যের আড়াল তুলে রাখতে ভালবাসি। পত্রিকার পাতার অস্বস্তিকর বাস্তবতা থেকে চোখ সরিয়ে নিয়মিত তাই রোমান্টিক নায়কের সাথে অপরূপা নায়িকার বাড়ির রাস্তায় পথ চলি। এসকেপিস্ট? হয়তো বা। আমরা তবু খুশি, অন্তত স্বস্তিটুকু থাকুক। 
সুহান ঠিক এই জায়গাটাতেই একটা ধাক্কা দিয়েছে। বাস্তবতা থেকে মুখ ঘুরিয়ে স্বস্তি পেতে আমরা যেদিকে তাকাই, ঠিক সেই খানটায় এসে ও সটান করে দাঁড়িয়ে গেছে, আর হাতের মুঠো খুলে আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছে একটা উপন্যাসের বই, যেখানে রয়েছে সবুজ মানুষদের গল্প। সবুজ মাটি, সবুজ অশ্রু আর রক্তের আখ্যান- এই ‘পদতলে চমকায় মাটি’। 
আবার কী আশ্চর্য, বইয়ের বিভিন্ন পাতায় কেমন করে যেন খুঁজে পাই আমাকে এবং আমার বাড়ির লোকেদের। এই যে একেবারে গড়পড়তা একটা মানুষ আরিফ, সে কি আমি নই? বা খানিকটা সমাজ-সচেতন হিমেল, অথবা অথর্ব সিস্টেমের খপ্পরে পড়ে একটা দুর্দান্ত খেলোয়াড় না হয়ে উঠতে পারা শামীম আজাদ, তাঁরা তো আসলে আমরাই। আর এই যে শান্তিপ্রিয়া, সে যে আমাদের সকলের চিরচেনা একজন মানুষ। 
এই সব মানুষদেরই কথা জমিয়ে রাখা সুহানের এই বইটির প্রতিটি পাতায়। মুগ্ধ হয়ে পড়ে গেছি শুরু থেকে শেষ। আর তার মাঝে কতবার চোরা চোখে একটা ভীষণ সত্যবাদী আয়নায় চোখ পড়ে যাওয়ার অস্বস্তিতে মুখ লুকিয়েছি, তার হিসেব নেই কোন। 
খুব চমৎকার করে এগিয়েছে প্রতিটি চরিত্রের গল্প। যেন আড়মোড়া ভেঙ্গে ডালপালা ছড়িয়ে ঘুম থেকে উঠে দাঁড়ালো একটা ছাতিম গাছ। সমর খুঁজবে শান্তি-কে, সুহানের কলমের জোরে তাতে আর আশ্চর্য কী! বরং মনের অবচেতনে আমরাও পুরোটা সময় খুঁজে গিয়েছি শান্তিপ্রিয়াকে। যতটা সমরের জন্যে, কে জানে ততটাই হয়তো ঠিক আমাদের জন্যে। 
অবলীলায় বলতে পারি, এই উপন্যাসটি পড়ার অভিজ্ঞতা আমার মনে থাকবে আজীবন। কত সহজেই আরিফ আর হিমেল মিলে মিশে যায় বিজয় আর সন্তুর সাথে, আবার মিশে যেতে পারে কি আসলে? হয়তো না। সমর আর শামীম আজাদ যেমন করে একে অপরের ছায়া হয়ে দাঁড়ায়, আবার হয়ে যায় একে অন্যের ছায়াবৃক্ষ, এই সব কিছুর সাক্ষী হবার অনুভূতি একেবারে তুলনাহীন। 
উপন্যাসটির সমাপ্তি হয়েছে সবচেয়ে চমৎকার ভাবে। যে কোন ভালো গল্পকে আমার চিরদিনই মনে হয় একেবারে নির্ভুল সুর-লয়-তালে মেশানো একটা চমৎকার সঙ্গীতায়োজন, ঠিক একই আমেজ পেলাম যেন এই উপন্যাসটিতে। 
পড়া শেষ করে তাই অদ্ভুত এক বোধে আচ্ছন্ন হতে হয়। সেটা যে কী আসলে, তা বুঝে উঠতে পারি না। নিজেকে হঠাত করে রূপকথার গল্পের সেই ন্যাংটো রাজার মত মনে হয়, তখন কেমন ভয়ার্ত চোখে আমি সেই ঠোঁটকাটা শিশুটিকে খুঁজি, যে আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দিবে আমার দীনতা। খুঁজতে গিয়ে চোখ পড়ে আমার হাতে ধরা বইটির ওপরে। 
তখন মনে হয়, সেই বোধ হয়তো অনেকগুলো দীর্ঘশ্বাসের শব্দ, আর কিছু নয়। কিংবা হয়তো কেবল একটা অক্ষম মৃদু অস্বস্তি, কিন্তু ভ্রম কাটে না ঠিক কী সেটা। কেবলই মনে হতে থাকে, আমার চিরকালীন স্বস্তিকর নির্বিবাদী জীবনে কোথাও একটা খড়িমাটির দাগ যেন ভেসে উঠেছে, সে দাগ সহজে যাবার নয়।
লেখকের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। ব্লগ আর বইয়ের কল্যাণে গত বছর দশেক ধরে সুহানের লেখা পড়ছি, উত্তরোত্তর তাঁর লেখনীর জোরে বাংলা সাহিত্য নিয়ে আমাদের আশা বাড়ছেই কেবল। 
বাংলায় সাম্প্রতিক যা কিছু পড়েছি বা পড়ি, তার থেকে বুঝতে পারি বাংলা উপন্যাসের জগত এখন কেবলই ভনিতাময়। এখানে সৎ সুন্দর গল্প নেই আর কোন, সৎ সুন্দর গল্পের ভান আছে কেবল। 

আমি বলব একটা লম্বা সময়ের পরে সম্ভবত এই এতদিনে আমরা সুহান-এর মাধ্যমে আমাদের আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হক এবং হাসান আজিজুল হকের যোগ্য উত্তরসূরি পেয়ে গেলাম। সুহান রিজওয়ান এই সকলের মিলে মিশে নিজেই অনন্য হয়ে ওঠা একজন অসাধারণ শব্দশিল্পী।