বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২০, ২০০৯

প্রকাশায়তন নিয়ে টুকটাক ভাবনা-

১।
বিদেশী বইগুলো সরাসরি ইংরেজিতে পড়া শুরু করি মূলত দেশের বাইরে এসে। তবে খুব আনন্দ নিয়ে নয়, বাংলা বইয়ের যোগান ছিলো না পর্যাপ্ত, এদিকে বই না পড়লে মাথায় তালগোল লেগে যায়, তখুনি স্থানীয় গণপাঠাগারে গিয়ে বই আনা শুরু করি। সেবা প্র‌কাশ‌নীর অনুবাদের পর সেই প্রথম বিদেশী সাহিত্যের সাথে ভালমতন মোলাকাৎ হলো, লেখকের নাম ধরে ধরে বই শেষ করার পুরনো অভ্যাসটা আবার ভাল মতন জাগিয়ে তুললাম।

সাহিত্যের প্রসঙ্গ অবশ্য আজ তুলবো না। সম্প্রতি প্রকাশায়তনের আত্মপ্রকাশ সম্পর্কিত ঘোষণার পর থেকে মাথায় একটা জিনিস ঘুরছে, তাই নিয়ে আলাপ জুড়বো বলেই আজ লিখতে বসা।
এখানে এসে পড়া বইগুলো হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখি, প্রায় অনেকগুলো উপন্যাস বা গল্পের বইয়ের লেখক ছাড়াও সম্পাদক ( এডিটর এর বাংলা এ ক্ষেত্রে কী হবে?) বলে একজন আছেন সেখানে।
পত্র-পত্রিকার বাইরে বইয়ের সম্পাদ্ক হিসেবে কাউকে দেখতে আমরা অভ্যস্ত নই আসলে। বইয়ের সম্পাদক যিনি, সেটাও ক্ষেত্র বিশেষে, যেখানে আসলে তিনি সংকলক। হয়ত লোকান্তরিত কোন কবি বা সাহিত্যিকের লেখা নিয়ে একটা সমগ্র বেরুবে, সেখানে লেখাগুলো একসাথে জড়ো করে একটা জবরদস্ত ভুমিকা লিখে দেয়া আমাদের সংকলকের দায়িত্ব।
আমি একটু অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, বিদেশি বইগুলোয় ঠিক এরকমটা হচ্ছে না। এখানে একটা পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস বা গল্প সংকলনের বই, লেখকের জীবিতাবস্থায়ই একজন সম্পাদকের নাম সহ প্রকাশিত হচ্ছে। আমার আগ্রহ জন্মালো, এই সম্পাদকের ভূমিকাটা আসলে কী?

২।
লেখালেখি সম্পর্কিত প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা টিক্ষা না থাকায় হুট করে বুঝে নিতে একটু সময় লাগলো। শেষমেষ লাইব্রেরি ঘেঁটে ধরে বেঁধে নিয়ে আসলাম বেশ কিছু ক্রিয়েটিভ রাইটিং সংক্রান্ত বই। পড়ে টড়ে টের পেলাম যে এসব দেশে সম্পাদকের বেশ কদর আছে। একজন লেখক একটা বই লিখে হুট করে ছাপিয়ে হয়ত ফেলতেই পারেন, কিন্তু এটা এখানকার, যাকে বলে সিস্টেমেটিক ওয়ে, সেটা না। সাধারণত যেটা হয়, লেখক সেটা প্রকাশকের দপ্তরে পাঠাবার আগে কিংবা পরে সেই পান্ডুলিপিটি একজন সম্পাদকের হাতে যাবে। সম্পাদক বাছাইয়ের কাজ লেখক বা প্রকাশক যে ইচ্ছা করতে পারেন। সম্পাদক তখন পান্ডুলিপিটি পড়ে তার মতামত জানাবেন লেখককে, এবং তারপরে লেখক ও সম্পাদকের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি হবে লেখাটির চূড়ান্ত কপি।

এটা অবশ্য একেবারেই পুঁথিগত বিবরণ, আদতেই এরকম হয় কি না জানি না। তবে কয়েকদিন আগে সালমান রুশদির একটা লেখার অনুবাদ করছিলেন একজন সচল, সেখানেও দেখলাম সম্পাদকের উল্লেখ আছে। সম্ভবত মিডনাইট়স চিল্ডরেন বইটি প্রসঙ্গে সম্পাদকের ক্রিয়াকলাপের কথা বলেছিলেন তিনি।

৩।
আমি ভাবছিলাম, বাংলাদেশে এই ব্যাপারটার চর্চ্চা আছে কিনা। সম্ভবত, নেই।
সেটার কারণ অনেক হতে পারে। যেমন ধরা যাক লেখকদের স্বাধীনতাবোধ। অনেকেই নিজের লেখার উপরে এত বেশি আস্থা রাখেন যে আর কোন সম্পাদকের কলমের সামনে তাঁদের পান্ডুলিপিকে রাখতে রাজি হন না। বড় বড় লেখকদের কথা বাদই দিলাম, এই যে আমি একজন অলেখক, সেই আমিও ক্লাশ এইটে পড়বার সময় একটা দেয়ালপত্রিকার জন্যে জমা দেয়া গল্পে বাংলা ম্যাডামের কলম চলায় গল্প ফেরত নিয়ে এসেছিলাম। এখন মনে পড়লেও হাসি পায়, কারণ, এটা অনুচিৎ হয়েছিলো, এখন বুঝতে পারি।

আরেকটা কারণ হতে পারে, খরচ।
পান্ডুলিপি থেকে বই হিসেবে বের হওয়া পর্যন্ত অনেক সময় লেগে যায়, অনেক খরচও পড়ে। এর মাঝখানে আবার একজন সম্পাদককে নিয়ে আসাটা সময় ও অর্থ দুইদিক হয়তো একটু ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে।

তবে বাংলাদেশে এরকম কিছু আসলেই প্রয়োজন আছে কিনা, সেটা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
গতকালই একটা বইয়ের কথা লিখেছি এখানে। মেজর হামিদুল হোসেন তারেক বীর বিক্রমের লেখা একাত্তরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। এই বইটি পড়ার সময় আমার মনে হয়েছিলো, যদি বই ছাপানোর আগে কাউকে দিয়ে পান্ডুলিপিটি একটু সম্পাদনা করা যেত, তাহলে বেশ হতো। সবমিলিয়ে এমনিতেই খুব চমৎকার একটি বই এটি, কিন্তু ভাষা বা শব্দ নিয়ে আরেকটু যত্ন করা গেলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই বইটি দ্বিধাহীন ভাবে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হয়ে দাঁড়াতো।

৪।
সচলায়তন থেকে প্রকাশনা বিষয়ে একটা চমৎকার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, প্রকাশায়তন নাম দিয়ে। এ সংক্রান্ত সন্দেশের পোস্টটিতে সচলদের করা মন্তব্যগুলো পড়লেই বোঝা যায় ব্যাপারটি বেশ সাড়া ফেলেছে, অনেকের মনেই প্রকাশায়তন থেকে বই বের করার ইচ্ছে জন্মেছে।
প্রকাশায়তন বইয়ের জগতে শুরু থেকেই ব্যতিক্রমী অনেক উদাহরণ তৈরি করবে বলে আশা করছি, সেই সাথে ভাবছি, প্রকাশিতব্য সব বইগুলো সম্পাদক বা সম্পাদকমন্ডলীর সহায়তা বা পরামর্শ নিয়ে আরও নিখুঁত হিসেবে বের করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে কি? অবশ্যই সেটা হবে লেখকের সম্মতিক্রমে। এবং এখানে সম্পাদক কোনভাবেই কোন জোরজবরদস্তি খাটাবেন না, বরং পান্ডুলিপি পড়ে লেখক ও প্রকাশায়তনকে তার মতামত জানাবেন। অতপর সেই মতামতের আলোকে লেখক ও প্রকাশায়তন ঐকমত্যে পৌঁছালে পরে বই প্রকাশিত হবে।
মানসম্মত বই প্রকাশের ক্ষেত্রে এরকম কোন উদ্যোগ নেয়া হলে কেমন হবে আসলে? আমার ব্যক্তিগত ধারণা ব্যাপারটি খুবই ভালো হবে, হয়ত এর সুফল প্রতিফলিত হলে আস্তে ধীরে এটাই আমাদের প্রকাশনা জগতের একটা সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়াবে।

কোন মন্তব্য নেই: