সোমবার, ডিসেম্বর ৩১, ২০০৭

বেসিক্যালি ... ... সংগীত শিল্পী

বুড়ো হয়ে যাচ্ছি নাকি আমি?

আহেম, না, নতুন কোন কবিতার লাইন নয় এটা। এই কথা বলবার সময় আয়নায় তাকিয়ে নেই, তাই মাথার পাকা চুল দেখতে দেখতে এমনটা বলছি, তা-ও ঠিক নয়।
গত কদিন ইউটিউবে ঘুরতে ঘুরতে আমার মনে এই ভাবনার উদয় হলো, এই আধ-বুড়ো বয়েসেই আমি বোধহয় পুরোপুরি বুড়িয়ে যাচ্ছি।

ঘটনা কি?
তেমন কিছুই না। অরূপদার পোস্ট থেকে এই কাহিনীর সূত্রপাত। ওনার ঢাকার চিঠিতে খুঁজে পেলাম 'বেসিক্যালি নজরুল সংগীত শিল্পী' আনিলার কিছু গান। তো সেই গান শুনে কেমন লাগলো? হুমম, আনিলার গলা ভালোই, তবে ফুয়াদের কম্পোজিশান শুনে একেবারে বদহজম হবার জোগাড়।
তো এইসব গানই নাকি ইদানীং শুনছে সবাই।
কোনসব, তার একটা ধারণা নিতে ইউটিউবে ঘুরলাম দু'দিন। মাশাল্লাহ, আরও কিছু জিনিস পেয়ে গেলাম।
একজন হলেন মিলা। আনিলার তবু গানের গলাটা বেশ, কিন্তু মিলা যে ঠিক কি দিয়ে গান গায়, মানে, গলা দিয়ে যে নয় সেটা কনফার্ম, তবে গান আসে কেমনে, সেটাই বুঝছি না। তারউপর শুনলাম ইনিও নাকি সেই 'বেসিক্যালি নজরুল সংগীত শিল্পী।'
আহা, বেচারা নজরুল!

মিলার দুইখান ঝাকানাকা ভিডিও পেলাম ইউটিউবে।
১। বাবুরাম সাপুড়ে-


২। যাত্রাবালা-


---------
আইয়ুব বাচ্চুর 'কষ্ট' এলবাম বের হলো যখন, আমরা তখন কিশোর। দিন নেই রাত নেই পাগলের মত সেই গান শুনছি, মনে আছে। আমার বাবা বেশ কয়েকদিন আমার অত্যাচার সহ্য করলেন। তারপর একদিন বেশ খেপে টেপে গিয়ে বললেন, " এইগুলা কুনো গান হইলো? আরে ব্যাটা তুই কষ্ট পাছ পা, কিন্তু চিল্লা-পাল্লা কইরা এইসব জানাইতে হয়??"
আব্বার অনুভূতি শুনে বেশ 'কষ্ট' পেয়েছিলাম। এত ফাটাফাটি গানের মর্ম বুঝলো না! পরে অবশ্য নিজেকে স্বান্তনা দিয়েছিলাম, বুড়ো হয়ে গেলে বাবাদের এমনই হয়।

ভাবছি, মিলা-ফুয়াদের গান শুনে আমি যখন হাস-ফাঁস করছি, আমার ঘাড়ের পাশে কেউ বিড়বিড় করে বলছে কি না, "নাহ, কনফু ব্যাটা বুড়া হইয়া গ্যাছে! "

আর কেউ আছেন নাকি আমার মতন বুড়াদের দলে? কে আছো জোয়ান, হও আগুয়ান!

বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ২৭, ২০০৭

দুঃখিত, আমিও।



উপরের ছবিটা আজকের প্রথম আলো থেকে নেয়া। পাকিস্তানের ইসলামাবাদ প্রেসক্লাবের এক সমাবেশের পরে সেখানকার কিছু আইনজীবি ও সাংবাদিকদের দেখানো ব্যানার এটা।
এই ব্যানার দেখে মনের ভেতর অনেক কথা জমে উঠলো। খানিকটা ভালো লাগলো, একটা দেশের জনগণ আর সরকার সম্ভবত সবসময় এক অর্থ করে না, বুঝা গেলো সেটা। এরকমটা আগেও দেখেছি, সেই ৭১এ-ই। একদিকে পাকিস্তানের সহায়তা করেছিলো আমেরিকান সরকার, অন্যদিকে জর্জ হ্যারিসনদের মতন মানুষেরা বাংলাদেশের জন্যে অর্থ সংগ্রহ করছিলেন মরিয়া হয়ে।
পাকিস্তানের এই মানুষদের মনোভাবকে শ্রদ্ধা করি। আমাদেরকে সমবেদনা জানিয়েছেন তারা, ঠিক আছে।
কিন্তু আর কিছু না, মনের ভেতর কোন মুক্তিযোদ্ধা অথবা বীরাংগনার স্মৃতি না এনেই, আমাদের লক্ষ শহীদদের কথা একবারও মনে না করেই আমি শুধু ব্যানারের 'জেনোসাইড' শব্দটার দিকে তাকাচ্ছিলাম। বারবার। সত্যি, মনে হলো অদৃশ্য কোন লাল রঙে লেখা ঐ শব্দটার পাশে ঐ 'স্যরি' শব্দটাকে বড্ড বেশি হাল্কা মনে হচ্ছিলো, অনেকটা দায়সারা আর খেলো লাগছিলো! একটা জেনোসাইডের জন্যে শুধুই একটা স্যরি?

আমি জানি, তারা দুঃখ প্রকাশ না করলেই বা আমরা কি করতাম? কিচ্ছু করার ছিলো না। 'ক্ষমা চাইতেই হবে' এরকম চোখ রাঙানোর মতন মেরুদন্ড বাংলাদেশের এখনও নেই, ঠিক কবে যে সেরকম 'বড়' হয়ে উঠবো আমরা, জানি না।

দলছুট কিছু পাকিস্তানীকে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু আমি আমার পূর্বপুরুষদের রক্তের গন্ধ শুঁকে বড় হয়েছি, আমাদের মায়েদের কান্নায় ভিজে ভিজে।
স্যরি, আপনাদের 'স্যরি'তে আমার মন ভরলো না।

সোমবার, ডিসেম্বর ১৭, ২০০৭

আর্থ আওয়ারঃ প্রিয় পৃথিবীর জন্যে একটি ঘন্টা


আর্থ আওয়ার-এর মূল ধারণাটা এরকমই। প্রিয় পৃথিবীর জন্যে একটা কিছু করা। আমাদের সামর্থ্যের মধ্যে থেকেই এমন কার্যকরী কোন পদক্ষেপ; যেটা আপাত দৃষ্টিতে খুব সামান্য হতে পারে, কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে এর অবদান হয়ে যাবে অনেক বড়।
পৃথিবীর উষ্ণতা বেড়ে গেলে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হবে যে দেশগুলো, তাদের তালিকায় বাংলাদেশ যে অনেক উপরের দিকে, এটা আজকের নতুন কোন খবর নয়। কাগজ কলমের হিসাব অনুযায়ী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি আর এক মিটার বেড়ে যায়, তাহলে আমাদের ছোট্ট দেশটার পনের ভাগ এলাকাই ডুবে যাবে পানির নীচে। ঘরহারা হবে প্রায় ১৩ মিলিয়ন মানুষ। এই হিসাবের বাইরে এরকম দুর্যোগে আর কি কি হতে পারে, সিডরের পরের গত এক মাসে আমরা তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। মাঠের শস্য ভেসে যায় পানিতে,ক্রমশ বাড়তে থাকা মৃত মানুষের অংক আমাদের কাছে হয়ত কিছু সংখ্যা, কিন্তু অনেকের জন্যে তারাই তাদের আত্মীয়, আত্মার পরিজন।
তো, এই উষ্ণতা বাড়ার পেছনে কারা দায়ী? চোখবুজে আপনারা লাদেনকে দোষারোপ করতে পারেন, সাথে তার প্রিয় বন্ধু জর্জ ডব্লিউ বুশকেও। দুজনই পৃথিবী জুড়ে এত বেশি বিস্ফোরণ আর যুদ্ধ বাধিয়ে রেখেছে, উষ্ণতা বাড়বার ক্ষেত্রে এই দুই মাথামোটার অবদানও কিন্তু কম নয়!
যাকগে, সিরিয়াস কথায় আসি। আমাদের সৌভাগ্য এই যে এই একটা ক্ষেত্রে আমরা নন্দ ঘোষ বলে বিবেচিত হই নি বাকি বিশ্বের কাছে। আমাদের গরিবী এখানে আমাদের দায় অল্প হলেও কমিয়েছে। কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়বার পেছনে সবচে বেশি কাজ করছে উন্নত বিশ্বের তাপ বা শক্তি উৎপাদনের উৎসগুলো। না, এই উৎসগুলো আলাদা কোন কাঠামো বা দালান কোঠা নয়, পুরো পরিবেশ, সমাজ বা দেশটাই এই উৎস হিসেবে কাজ করে। যেমন রাতের বেলা আলোর জন্যে জ্বালানো বাতি, অথবা গরমের দিনে চালানো এয়ার কুলার। সবসময় ব্যবহৃত হচ্ছে যেসব যন্ত্র সেগুলোও উষ্ণতার উৎস, যেমন রেফ্রিজারেটর, কম্পিউটার, টিভি, এবং সবচেয়ে প্রয়োজনীয় যে বাহন- গাড়ি!
এই সবগুলো জিনিসই মানুষের জীবনের সাথে এমন তীব্রভাবে জড়িয়ে গেছে যে এগুলো হুট করে পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তাহলে গ্রীণ হাউজ এফেক্ট বন্ধের উপায় কি?
না, পুরোপুরি বন্ধের কোন কার্যকরী বা সুলভ উপায় পাওয়া যায় নি এখনো। তবে সেটা কমাবার কোন উপায় আছে কি না, এবং তাতে আমাদের মতন সাধারণ মানুষ কোনভাবে অংশগ্রহণ করতে পারতে কি না, এই চিন্তা থেকেই জন্ম নিয়েছে আর্থ আওয়ার-এর ধারণা।

শুরু করেছিলো সিডনীবাসীরা, আরেকটি সংগঠন WWF এর সাথে একাত্ম হয়ে। এ বছর, মানে ২০০৭ এর মার্চের শেষ দিনে সিডনী শহরের ২.২ মিলিয়ন মানুষ এবং প্রায় ২১০০ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রাত সাড়ে সাতটা থেকে এক ঘন্টার জন্যে তাদের সমস্ত বাতি নিভিয়ে দিয়েছিলো। যারা ভাবছেন এতে আর এমন কি-ই বা হতে পারে, তাদের জন্যে তথ্যঃ ঐ এক ঘন্টা সময়ের ঐটুকু কাজের জন্যে সিডনির এনার্জি কনসাম্পশান তখন ১০.২% কমে গিয়েছিলো। এটা হচ্ছে প্রায় ৪৮,০০০ গাড়িকে রাস্তা থেকে এক ঘন্টার জন্যে সরিয়ে নেবার সমান! এই কাজে অংশগ্রহন করেছিলো সিডনীর প্রশাসনও, তাদের সহায়তায় আলো নিভিয়ে রেখেছিলো এমনকি হার্বার ব্রিজ এবং সিডনীর আরেক আইকন অপেরা হাউস।
সুন্দর একটা ভিডিও রয়েছে এ বিষয়ে, আর্থ আওয়ার-এর ওয়েব সাইটে।


এই বছর এই আর্থ আওয়ার ক্যাম্পেইনটি আরো বিস্তৃতি লাভ করেছে। বিশ্বের প্রায় ১২ টি বড় শহর ২০০৮ এর ২৯ মার্চ রাত আটটা থেকে এক ঘন্টার জন্যে তাদের সমস্ত বাতি নিভিয়ে দিবে। সিডনী, মেলবোর্ণ, ব্রিসবেন, শিকাগো, কোপেনহেগেন, টেল আভিভ, ম্যানিলা, টরোন্টো এবং আরো কিছু শহর রয়েছে এই তালিকায়।
বিশ্বের উষ্ণতা বাড়ার মোট পরিমাণের তুলনায় এই এক ঘন্টার উদ্যোগ হয়তো নিতান্তই ছোট, কিন্তু বিন্দু বিন্দু পানি জমেইতো মহাসাগর হয়।
আমাদের দেশ ইচ্ছেয় হোক বা অনিচ্ছেয়, লোডশেডিং-এর কল্যাণে বেশিরভাগ সময়েই বাতি নিভিয়ে বসে থাকে। তবু যদি আলাদা করে বছরে একটি ঘন্টা প্রিয় পৃথিবীর জন্যে আর্থ আওয়ার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে, তবে আসলেই খুব ভালো হয়।
আমরা নিজেরাও ব্যক্তি উদ্যোগে এই ক্যাম্পেইনটিকে সফল করতে পারি। তালিকার বাইরের যে বড় শহরগুলোয় আমাদের বসবাস, সেখানে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে পারি। আর্থ আওয়ার ওয়েবসাইটটি এ ব্যপারে সাহায্য করছে।
আমাদের প্রতিবেশী বা বন্ধুদেরও জানাতে পারি এ কার্যক্রম সম্পর্কে। নানারকম পরিকল্পনা করা যেতে পারে ঐ এক ঘন্টার জন্যে, হয়তো বন্ধুরা সবাই মিলে নিজেদের ঘরের বাতি নিভিয়ে চলে যাওয়া যেতে পারে কোন মুভি শো-তে। ঐ এক ঘন্টা বাতিহীন কাটানো কোন সমস্যাই নয় আসলে।
ঠিক করেছি, ২০০৮ এর ২৯ মার্চ, শনিবার রাতে এক ঘন্টার জন্যে বাতি নিভিয়ে আমি আর আমার বউ মোমের আলোয় একটা ক্যান্ডল-লাইট ডিনার সেরে ফেলবো!
আমাদের এই ছোট্ট নীল-সবুজ পৃথিবীর জন্যে আপনি কি করবেন, সেটা এক্ষুণি ঠিক করে ফেলুন!

বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০০৭

পরবাসে তাবলীগের বশে

ইউনিভার্সিটি হলগুলোয় পরিচিত এক দৃশ্য ছিলো, আমাদের স্বাভাবিক বহুল তরংগায়িত জীবনে আরেক তরংগ আর কি। সেটা হলো, দুপুরের খাবারের পরে হয়তো সবাই চুপচাপ, বেডে শুয়ে আরাম করছে, কোথাও কোন রুমে হয়তো চলছে আড্ডা, এরকম অবস্থায় হুট করেই পুরো ফ্লোরে ফিসফাস করে ছড়িয়ে পড়লো খবর, "ঐ আইছে, আইছে রে, ভাগ সবাই!"
ব্যস, সবাই শোয়া বসা ছেড়ে হুড়মুড় করে গায়ে শার্ট চাপিয়ে পড়িমড়ি করে দে ছূট।
তা কে সেই সুধীজন, যার আগমনে এই পলায়ন নাটিকা?
না,ক্যাডার বা ঐ গোত্রীয় কেউ নন, তারা হলেন তাবলীগী জামাতের মানুষ।
লাঞ্চের পরপরই মূলত তারা 'হামলা' চালাতেন। মুখে অমায়িক হাসি, কথার শুরুতেই হাত মিলানোর জন্যে হাত চেপে ধরেন, এবং অলৌকিক ভাবে সেই হাত ছাড়ার কথা পুরোপুরি ভুলে যান। একদম মাগরিবের নামাজের পরে আজকের জমায়াতে হাজির থাকবো- এইরকম একটা অদৃশ্য সনদে সম্মতিসূচক দস্তখত না করা পর্যন্ত মুক্তি মিলে না।
তাবলীগি জামাতের পেছনের মূল কাহিনিটা আমার জানা নেই। তবে ধারণা করতে পারি, বিপথে যাওয়া মুমিনদের যায়-যায়-ঈমানকে পাকাপোক্ত করতেই তারা নিজেদের নিয়োজিত করেছেন। আমার অবশ্য কোনই আপত্তি নেই তাতে। তবে বার তিনেক প্রায় একই ধরণের লম্বা লেকচারের মাঝে ঐ অমায়িক হাসিওয়ালা মানুষদের বিরক্ত করতে পারিনি বিধায় আমার টিউশানীর বাস ছুটে গেছিলো, তারপর থেকে আমিও সেই আতংকায়িত দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলাম। সেই অমায়িক হাসি দেখলেই আমার পিলে চমকে যেত, রাত বিরেতে দুয়েকটা দুঃস্বপ্ন দেখে ফেলেছিলাম কি না মনে পড়ছে না, তবে রুমের দরজায় লাগানো হ্যাঙারে একটা তৈরি শার্ট সবসময়েই ঝুলতো। যেন তাহাদের আগমনী বার্তা কানে এলেই নাগাল সীমার বাইরে চলে যেতে পারি।
মনে আছে, বন্ধু রানা এইরকম ক্রিটিকাল সময়ে একবার শেষমুহুর্তে ওদের হাতে পাকড়াও হয়ে গিয়েছিলো। ওর উপস্থিত বুদ্ধি খুব ভাল, মুহুর্তেই মুখ করুণ করে বলেছিল, "আমি ভাই জগন্নাথ হলে থাকি,এমনিই এসেছিলাম এখানে!'
ব্যস, ইতিহাসে সম্ভবত ওর হাতই সবচে দ্রুত সেই নাগপাশ থেকে মুক্তি পেয়েছিলো!
--------------

ক'দিন আগে বিকেলে, কাজ নেই তাই বাসায় বসে আছি আরাম করে। দরজায় ঠকঠক। বউ উঠে গেলো দরজা খুলতে। গিয়েই সাথে সাথে ফিরে এলো। "তুই যা।" আমি চোখে মুখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন ঝুলিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি মাথায় টুপি, লম্বা পাঞ্জাবী পরনে, শ্মশ্রুমন্ডিত দুইজন মানুষ। ঢাকা থেকে মেলবোর্ণ আসতে আসতে পরিবেশ আবহাওয়া আর মানুষের ধরণ ধারণ সবই বদলে গেছে, কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে সেই অমায়িক হাসি বদলায় নি। এতদিন বাদে সেই চিরচেনা হাসির ধরণ দেখেই চিনলাম, যদিও ঠিকঠাক বিশ্বাস হচ্ছিলো না আমার, এখানেও?!?
আমি তখন আমার সবচেয়ে প্রিয় পোশাক পরা, হাফপ্যান্ট আর টি-শার্ট। খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থা আমার। দু'জনের মধ্যে একজনই কথা বললেন সব। কথা না বলে প্রশ্নবান চালালেন বলা চলে। বাংলায়। কি করি, পড়ি না পি আর, বাড়ি কই, কোথায় পড়েছি, স্কুল কলেজ, এখানে কোথায়, কি জব করি...। সর্বশেষ ভিসা ফরম বাদে নিজের সম্পর্কে এওসব ব্যাক্তিগত প্রশ্নের উত্তর আর কোথায় দিয়েছি আমার মনে পড়ে না!
ভদ্রলোক এখানকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। এটুকু শুনে বসতে বললাম ভেতরে। হাজার হোক, শিক্ষক মানুষ। আমাকে জানালেন তিনি বুয়েটে পড়েছেন, শিক্ষকতাও করেছেন সেখানে বেশ কয়েক বছর।
ঘরে ঢুকতেই টিভি-র সাথে লাগানো এক্সবক্স গেইম স্টেশান দেখে উনি বোধহয় আন্তরিক হতে চাইলেন একটু, জিজ্ঞেস করলেন, 'কার এটা, আপনার বাচ্চার?'
আমি বিষম খেলাম। ভূঁড়িটা বেড়েছে ইদানীং জানি, এবং খানিকটা গাট্টাগোট্টাও হয়ে গেছি, কিন্তু তাই বলে বাচ্চার বাপ!
হাসিমুখে জানালাম, না, ওটা আমারই। বাচ্চা কাচ্চা এখনো নেই।
তারপরে লম্বা আলাপ হলো। প্রায় বছর পাঁচেক আগে শোনা কথাগুলোর সাথে কোন তফাত নেই। পার্থক্য এই যে এইবারে টিউশানী ধরার তাড়া ছিলো না, তাই মুখে হাসি ধরে রেখে সব শুনলাম। তবে এখন আমিও অনেক বদলে গেছি, হাসিমুখে 'না' বলে দিতে পারি। স্পষ্ট করেই জানালাম যে আমি নিজের মত করেই ধর্মকর্ম করি, এবং এইরকম মজলিশে যাবার ব্যাপারে উৎসাহী নই।
আগের বারের গুলোর তুলনায় ইনি আসলেই নিতান্তই ভদ্রলোক। খানিক চেষ্টার পরে বুঝলেন, হবে না, তাই জোরও করলেন না আর। পাশের মানুষটা এতক্ষণ কোন কথা বলে নি, প্রতি কথায়ই শুধু হেসে হেসে মাথা নাড়ছিলো, তাই এতক্ষণ বুঝিই নি উনি বাংগালী নন। যাবার আগ মুহুর্তে ইংরেজীতে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আশপাশে পরিচিত কোন মুসলিম ব্রাদার আছে কি না?
তা আছেন বেশ ক'জন। তবে ঠিক কোনজনের বিকেলের আরাম মাটি করবো সেই সিদ্ধান্ত নিতে খানিকটা দেরি হলো, অবশেষে একজনের বাড়ির হদিশ দিয়ে বিদায় জানালাম।
বুঝতে পারছি না, এই অমায়িক হাসি কি এখন থেকে নিয়মিতই দেখতে হবে কি না!