বৃহস্পতিবার, মে ০৩, ২০০৭

একজন জননীর জন্যে-


''পঞ্চাশের দশকে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, জাহানারা ইমাম তখন ঢাকা শহরের সুচিত্রা সেন। ''
আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ এমন করেই তাঁর স্মৃতিচারণে জানিয়েছেন, জাহানারা ইমামকে প্রথম দেখে তিনি চমকে উঠে ভেবেছিলেন কোলকাতা থেকে এত দূরে, ঢাকায়, কি করে অবিকল একই রকম একজন সুচিত্রা সেন থাকতে পারে, যিনি পর্দার অলীক নায়িকা নন, বাস্তব মানুষ!
'৯৪ এ লেখা এই প্রবন্ধটি প্রায় এক যুগ বাদে প্রথমবারের মত পড়বার সময় আমি নিজেও চমকে উঠেছিলাম! বস্তুত, জাহানারা ইমামকে শহীদ জননী হিসেবেই জানি, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির প্রধান হিসেবে জানি- তিনি একজন সাধারণ মানবী নন, একজন অতিমানবী। ঠিক এরকম ভাবনাগুলোর সাথে সুচিত্রা সেন-এর ছবিটা মিলছিল না, সে কারণেই যখন তাঁরই সমবয়েসী ও সমকালীন সায়ীদ স্যারের লেখায় জানলাম, তৎকালীন যুব সমাজের কাছে তিনি ছিলেন ঢাকা শহরের সুচিত্রা সেন, এই প্রথমবারের মত অনেক কাঠিন্যের পেছনে তাঁর মানবী রূপটিও যেন সহসাই চোখে পড়লো।
অনেক রকমের স্মৃতিচারণের মাঝে এই নতুনত্বটুকু বেশ উপভোগ্য লাগলো।
----------------

এইট বা নাইনে পড়ি, কলেজ লাইব্রেরীর বাংলা বইয়ের শেলফের কোন এক কোনায় একটা বই সবসময়ে চোখে পড়তো, ক্যান্সারের সাথে বসবাস। লেখক- জাহানারা ইমাম। কখনো পড়িনি, পড়বার আগ্রহও বোধ করি নি, বরং ফেলুদার কীর্তিকলাপ বেশ কয়েকবার রিভিশান দেয়াতেই আগ্রহ ছিল বেশি। সেসময়েই একবার মুহম্মদ জাফর ইকবালের কোন একটা লেখায় জাহানারা ইমামের কথা পড়লাম, সহজ সরল জলের মতন ভাষায় জাফর ইকবাল কি লিখেছিলেন মনে নেই, তবে সেটা পড়ে চোখ ভিজে গিয়েছিল মনে আছে। পরের লাইব্রেরী ক্লাসেই ইস্যু করি ক্যান্সারের সাথে বসবাস। তারপরের সপ্তাহে- একাত্তরের দিনগুলি। এবং মন্ত্রমুগ্ধের মতন পড়ে যাই। একবার নয়, বেশ কয়েকবার। ফেলুদার বদলে রুমি-জামিই আমার খুব কাছের মানুষ হয়ে গিয়েছিল তখন। প্রায় চেনা ভঙ্গিতে এমন সুন্দরভাবে লিখেছেন তিনি, যেন তাঁকে সঙ্গী করেই সকল আনন্দ বেদনা অনুভব করতে করতে '৭১ এর ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়ালাম বেশ কয়েকটা দিন।

তারপর, ক্রমশ বড় হই, বড় হতে হতে এই ভীষন বড় মানুষটার কথা যখন আরো বেশি করে জানতে পারি, শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে যাই।

--------------
আজ শ্রদ্ধেয় জাহানারা ইমামের জন্মদিন। কাছের মানুষেরা তাঁকে আম্মা বলে ডাকে। অথবা কে জানে, আম্মা ডেকেই হয়ত সবাই তাঁর খুব কাছের মানুষ হয়ে যায়!

জন্মদিনের দিন মৃত্যুর কথা বলতে নেই। তবু যে মানুষটা চলে গেছেন, তাঁর জন্মদিনেও যেন তাঁকে হারাবার বেদনাটাই বেশি করে বুকে বেজে ওঠে।
ঢাকার রাস্তায় যখন জাহানারা ইমামকে কালো কফিনে শুইয়ে বিদায় জানানো হচ্ছিল, সেই কফিনবাহী লাশের পাশ দিয়ে যেতে যেতে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের কথাটুকু দিয়েই শেষ করি বরং-
" একটা ভারী কষ্ট গলা অব্দি উঠে এসে বুক চেপে বসে রইল। আমার চোখ ছাপিয়ে পানি টলমল করে উঠল, কিন্তু মাটিতে পড়লো না। আমরা এখন আর কাঁদি না। বয়সের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জেনেছি, যে দুঃখের অশ্রু একবার মাটিতে ঝরে, সে দুঃখকে মানুষ হারিয়ে ফেলে।''
-------------

আপনার জন্যে বুকের গভীর থেকে উঠে আসা ভালবাসা জানাই শহীদ জননী। কখনো কোন মানুষের জন্যে যদি অমরত্ব প্রার্থনা করার সুযোগ পেতাম, নিঃসন্দেহে সেটা আপনিই হতেন।


কোন মন্তব্য নেই: