মঙ্গলবার, জানুয়ারী ২৩, ২০০৭

গল্পঃ সমান্তরাল


১।
মাঝে মাঝে এমন হয় যে, গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে চোখ দুটো না খুলেই যখন অন্ধকারের গায়ে কান পাতি, নিস্তব্ধ রাতের ভেতরের কোন একটা উৎস থেকে খুব মৃদু ভাবে তবলার বোলের মত শব্দ ভেসে আসতে থাকে। একটা বা দুটো আঙুল দিয়ে খুব আদুরে ভঙ্গিতে যদি বাজানো হয় - সেটা ঠিক তেরে কেটে ধিন হয় না, বদ্ধ ঘরের দরজার এপাশ থেকে ভেতরের গুম-গুম শব্দ শুনতে পেলে যেমন লাগে, অনেকটা সেরকম।
প্রথম প্রথম হৃৎপিন্ডের শব্দ ভেবে ভুল করতাম; পরে বুঝেছি, ওটা আসলে রাতেরই নিজস্ব শব্দ। দেয়ালের গায়ে অবিচল বসে থাকা টিকটিকি যেমন শুধু রাত হলেই টিকটিক করে উঠে; অথবা দেয়াল ঘড়িটা, সারাদিন চুপচাপ অবিরাম ঘুরে যায়, শুধু রাত গভীর হলেই যেন সেটাও টিকটিকির সাথে গলা মেলায়, তেমনি করে কেবল রাত হলেই যেন অন্ধকারের শব্দ শুনতে পাই আমি।
এখন যদিও বিকেল, আকাশে মেঘ তাই সন্ধ্যে বলে ভুল হয়। অবিরাম ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে- থামবার লক্ষণ নেই দেখে খানিকটা অপেক্ষা করার পর হাল্কা পায়ে দৌড়ে আমরা ক'জন প্রায় ধ্যানমগ্ন মানুষ এই গাছটার তলায় এসে আশ্রয় নিয়েছি। সামনে তাকালে কেবলই বৃষ্টি, চেয়ে থাকার কোন মানে হয় না, তবুও আমরা সবাই সেদিকে তাকিয়ে থাকি। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকায় হঠাৎ করেই বৃষ্টির ফোঁটাগুলো খুব বড় মনে হয়। আমার এমনও মনে হতে থাকে, যেন অনেক ওপর থেকে আমি বিশেষ কোন একটা ফোঁটাকে চোখে চোখে রেখে নীচে নামতে দেখছি, খানিকপর সেটা মাটিতে পড়ে ছিটকে উঠছে যেন। আমি ঠিক এমন করেই অনেক- অনেকগুলো বৃষ্টির ফোঁটাকে অনুসরণ করতে থাকি, এবং এমনটা করতে করতে যেন এর মাঝেও সেই নিস্তব্ধ রাতের তবলার বোলের শব্দের যে ছন্দ, আমি সেটা খুঁজে পাই।
আমি আনমনে, বৃষ্টি বাঁচিয়ে ঠোঁটে একটা সিগারেট গুঁজে দেই, তারপর লাইটারটা বের করার জন্যে পকেট হাতড়াই। ঠিক সেই সময় আমার বন্ধু দীপু হঠাৎ করে আমার কাঁধে হাত রাখে। কখন যে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, কোন ফাঁকে, আমি টেরই পাইনি। ওর মাথায় একটা লাল টুকটুকে রুমাল বাঁধা। আমি একটু থমকে যাই। লাইটার হাতে নিয়ে বৃষ্টি বাঁচিয়ে আমি যে মুহুর্তে আগুন ধরাই - ঠিক তখুনি গভীর পানির তলদেশ থেকে ক্রমশ বড় হতে হতে উপরে উঠতে থাকা বুদবুদের মত অনেক আগের একটা ঘটনা আমার মনে পড়ে যায়।
আমি আর দীপুই ছিলাম সেবারও। দুজনেরই বয়স তখন দশ, কিংবা এগারো হবে। ছাদের পাশের সিঁড়ির ঘরটায় গিয়ে কুড়িয়ে পাওয়া আধ-খাওয়া একটা সিগারেটের টুকরাতে আগুন ধরিয়ে টানছিলাম আমরা। একেকবার টান দেবার সাথে সাথে ঐ সিগারেটের চেয়েও বেশি লাল হয়ে উঠছিল আমাদের মুখ। কাশির দমক আটকে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ঘরটায় আমরা দুই কিশোর যখন অনভ্যস্ত ভঙ্গিতে একের পর এক টান দিয়ে চলেছি সিগারেটে- আর ফিসফিস করে ঠিক করছি- বন্ধুদের কাছে কেমন করে এই বীরত্বের গল্প করা যায় - ঠিক সেই মূহুর্তে বাবা এসে দরজা খুলে দাঁড়ান।
বাবাকে সেদিন শীতের কুয়াশা কেটে কেটে নদীর ওপার থেকে ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসা ডিঙি নৌকার মাঝির মত লাগছিল আমার কাছে - মনে আছে।
দীপু একটুও দেরি করেনি। ছুটে পালিয়ে গিয়েছিল ও। আর বাবা, চোখে অবাক দৃষ্টি নিয়ে আমার কাছে এসে হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে গিয়েছিলেন। তারপরে আচমকাই প্রচন্ড জোরে চড় মেরেছিলেন আমাকে। আমি ছিটকে পড়েছিলাম মেঝের ওপর। কোনো কথা না বলে তিনি নীচে নেমে গিয়েছিলেন সেদিন।
আগে পরে অনেকবারই মার খেয়েছি, কিন্তু সেদিনের কথা মনে আছে বেশ। খুব ব্যথা পেয়েছিলাম এটা ঠিক, তবু সেদিন একটুও রাগ করিনি বাবার ওপর - কারণ, বাবা আমার এই কীর্তির কথাটা মাকে কখনো বলেননি।
২।
আমার মা। প্রায় সারাটা জীবন দেখেছি তিনি বিছানায় শুয়ে আছেন। কী একটা অসুখ ছিল মায়ের - তিনি খুব বেশি নড়াচড়া করতে পারতেন না। এমন নয় যে সারাদিন কাশতেন বা খুব জ্বরে ভুগতেন- সেরকম কিছু নয়। প্রায় সুস্থ মানুষের মতনই দেখাতো তাকে। পার্থক্য এই যে তিনি বিছানা শুয়ে থাকতেন সারাদিন।
ভীষন ফর্সা ছিলো তার গায়ের রঙ- চোখ দুটো- মনে আছে- ছিল আশ্চর্য রকমের গভীর আর কালো। মা যখন মাঝে মাঝে কাছে ডাকতেন আমাকে, আমি বিছানার পাশটিতে চুপ করে বসে থাকতাম আর শুরু হত তার রাজ্যের সব গল্প। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকতাম সেসব, আর মনে মনে ভেবে যেতাম আজগুবি সব ভাবনা।
কখনো কিছু লুকোতে চাইলে মায়ের চোখের দিকে তাকাতাম না কখনো। অন্যদিকে চেয়ে থাকতাম। মা কেমন করে যেন বুঝে যেতেন, আমাকে বলতেন তার দিকে তাকাতে। আমি তাকিয়ে দেখতাম- পাথরের মত কালো দুটি চোখ, কিন্তু কি গভীর আর কি স্বচ্ছ তারা! খানিক তাকিয়েই মা বুঝে যেতেন কোথাও গোপন কোন কথা আছে আমার, সযত্নে লুকোনো। তারপর গলায় আদর নিয়ে তিনি কেমন করে যেন আমার কাছ থেকে সে খবর ঠিকই বের করে নিতেন।
মায়ের বিছানার পাশে দেয়াল ঘেঁষে একটা মাকড়সার জাল ছিল, মাঝে মাঝে সেখানে কালো রঙের একটা মাকড়সা এসে বসতো। মা সেটাকে বলতেন তার বন্ধু। আমরা যখন থাকি না বাসায়, মা নাকি সেই মাকড়সার সাথে গল্প করেন। আমাদের কাজের বুয়া সেসব শুনেছে মাঝে মাঝে।
মাকড়সার চোখ কোথায় থাকে জানি না, কিন্তু প্রায় প্রতিবারই মনে হত, মাকড়সাটা যেন আমার দিকেই কঠিন মুখ করে চেয়ে আছে। যেন বা আমার এখানে, এইভাবে, মায়ের কোল ঘেঁষে বসে থাকাটা তার পছন্দ হচ্ছে না। কখনো কখনো শিউরে উঠে আমি সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে মনে মনে ভাবতাম, আচ্ছা, ও কি বাবার দিকেও একই চোখ করে তাকিয়ে থাকে?
৩।
বাবা চিরকালই খুব নির্বিবাদী মানুষ ছিলেন। শহরের একমাত্র সরকারী কলেজে পড়ান। সারা দিনের পর বাসায় ফিরলে মাঝে মাঝে দু'একজন ছাত্র তার কাছে টিউশান নিতে আসে, তিনি তাদেরকে ঘন্টা দুই সময় দেন, তারপরে পত্রিকা নিয়ে বসে পড়েন - একেবারে রাতের খাওয়ার আগে পর্যন্ত- যতক্ষণ না মা তাকে তার ঘরে ডেকে পাঠান।
বাবা ও মায়ের মধ্যে নাকি একসময় গভীর প্রেম ছিল - এ কথা আমার কেন যেন বিশ্বাস হতে চায় না। মা বিছানায় শোয়া থাকলেও ভীষন ছটফটে স্বভাবের মানুষ। প্রায় সারাক্ষণই কথা বলে যাচ্ছেন- অথবা কাজের বুয়াকে এটা ওটা বলে যাচ্ছেন। সেই তুলনায় বাবা একেবারেই মৃদুভাষী। কেমন করে যে তাদের মিল হলো!
বাবা মা প্রায়শই বসে বসে অনেক গল্প করেন। গল্প মানে- মা একাই বলে যেতে থাকেন, বাবা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতেন সেসব। মানুষের চোখ থেকেও যে কখনো ভালবাসা ঝরে পড়ে, এ ব্যাপারটা তখন বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝেছিলাম। প্রায় প্রতিটি কথার মৃদু স্বরে জবাব দিতেন - কিন্তু গলার স্বরেও সেটা টের পাওয়া যেত।
আমার পনের বছর বয়সে যেদিন মা মারা যান- বাবা সেদিন একদম স্থির হয়ে বসেছিলেন সারাদিন। বারান্দার এক কোনায় চেয়ার পেতে। আমাদের নিকট আত্মীয়স্বজনেরা এসে মায়ের দাফনের ব্যবস্থা করেছিলেন, বাবাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়নি।
সারাদিন একঠায় বারান্দায় বসে থেকে- সন্ধ্যার পরে তিনি প্রথম কথা বলে ওঠেন। ক্লান্ত স্বরে আমাকে ডেকে বলেন, আজকের পেপারটা একটু দিয়ে যাবি আমাকে?
আমি সেদিন কোনো এক ফাঁকে মায়ের ঘরে গিয়ে দেখি - মাকড়সাটি নেই আর ওখানে। তারপরে আর সেটাকে কখনো দেখিনি আমাদের বাসায়।
৪।
বৃষ্টি ঝরতে থাকে। একটু বাড়ে, আবার কখনও কমে যায়। ভিজে চলা দাঁড়কাকের মতন ঋষিসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে আমরা ক'জন প্রায় ধ্যাণমগ্ন মানুষ এই গাছটার তলায় দাঁড়িয়ে থাকি। দীপু আমার কাঁধে হাত দিয়ে থাকে, এইটুকু স্পর্শকেও যেন ভীষণ প্রয়োজনীয় মনে হয় তার। সামনে তাকালে কেবলই অবিরাম বৃষ্টি, চেয়ে থাকার কোন মানে হয় না, তবু আমরা সবাই নিদারুণ আলস্যে সেদিকেই তাকিয়ে থাকি। খানিকটা দূরে, প্রায় অস্বচ্ছ অবয়বের অজানা অচেনা কিছু লোক নির্বিকার মনোযোগে মাটি খুঁড়ে চলেছে। তাদের মুখে কোনো শব্দ নেই, শুধু কান পাতলে ঝুপ ঝুপ করে একটা ভোঁতা আওয়াজ পাওয়া যায়। আমি সেই আওয়াজের প্রতি আরও বেশি মনোযোগী হই, অল্প প্রচেষ্টার পরেই সেটাও আমার কাছে সুরময় হয়ে ওঠে, আর তখন আমার মায়ের কথা মনে পড়ে যায়।
মা চলে যাবার পরে বুকের মধ্যে একটা শূণ্যতার মত তৈরি হয়েছিলো। ঠিক সেই সময় মনে হয়েছিল সেটা আসলে কখনই পূরণীয় হবার নয়। কিন্তু তেমনটা হলো না আসলে। কলেজে থাকার সময়টা বা যতক্ষণ বন্ধুদের সাথে থাকা হয়, মাকে মনে পড়তো না। বাড়ি ফিরলেই শুধু একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগতো। আমাদের বাড়ির চেহারাও তেমন একটা বদলালো না। সেই পুরোনো বুয়াই বহাল রইলেন। শুধু বাচ্চা মতন একটা ছেলেকে এনে রাখা হলো ছোটখাট ফাই-ফরমাশ খাটার জন্যে।
বাবার সাথে দেখা হওয়া কমে গিয়েছিল আরও। তিনি আরও চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন। আরও বেশি পত্রিকা-প্রিয়। দেখতে অত্যন্ত সুপুরুষ ছিলেন। বাবার বন্ধুরা এসে তাকে নানা জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যেতে চাইতেন, বাবার ভাল লাগবে এই ভেবে। কিন্তু তিনি তেমন একটা পাত্তা দেননি সেসবে। দু'একজন মুখ ফুটে আবার বিয়ে করার কথাও বললেন, কিন্তু বাবার চোখের পলক পড়ছে বলে মনে হয়নি কখনও।
বছর গড়িয়ে যায়।
আমি তখন সদ্য যুবক। প্রিয়তির সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেছে ততদিনে। ক্লাশের ফাঁকে খানিকক্ষণ কথা বলা, অথবা কথা না বলে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা, সবই আমার কাছে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ। রিকশায় পাশাপাশি বসলে যখন আমাদের দুজনের গা ছুঁয়ে থাকে, আমি কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে যাই। ততদিনে গাঁজা টানাও শিখে গেছি। কিন্তু গাঁজার ঘোরের চেয়েও আমার কাছে প্রিয়তির গা ছুঁয়ে থাকাটা আরো বেশি মধুময় মনে হয়।
একদিন ক্লাশ শেষে - আমরা দুজন বসে আছি। প্রিয়তি কি একটা গল্পের বই পড়ছে আমার সাথে কথা না বলে। আমি সেটা টুক করে কেড়ে নিতে চাইলাম, ও দিলো না, সেটাকে চেপে ধরলো একদম বুকের সাথে। আমি আবারও জোর করতে যেতেই কী যে হলো, আমার হাতের দু'টো আঙুল হঠাৎ ওর বুক ছুঁয়ে গেল। দু'জনেই একটু চমকে উঠলাম- তারপর -কিছুই হয়নি - মত করে ও আবারও বই পড়া শুরু করলো। কিন্তু আমার মধ্যমা আর তর্জনীর চমক তখনো কাটেনি। আমি অবাক দৃষ্টিতে আমার আঙুলের দিকে তাকিয়ে রইলাম- কী আশ্চর্য একটা সুখানুভুতি সেখানে।
সেদিন রিকশায় করে ফেরার সময় কেউ কোন কথা বলিনি।
বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে গিয়ে চুপ করে শুয়ে পড়েছি- আর খানিক পর পর হাত চোখের সামনে তুলে আঙুল দুটোকে দেখেছি। হঠাৎ খুব বেশি আপন মনে হচ্ছিল ঐ দুটোকে, এমনকি ভাত খাবার সময় যখন খাবার মুখে তুলছিলাম, বারবার মনে হচ্ছিল, এই দু'জন বেশি কষ্ট পাচ্ছে না তো!
রাতে কিছুতেই ঘুম আসছিল না সেদিন। বিছানায় এপাশ ওপাশ শুধু একসম খুব তৃষ্ণা পেলে উঠলাম পানি খেতে। রান্নাঘরে যাবার প্যাসেজটায় এসে দাঁড়াতেই হঠাৎ গোঙানির মত একটা শব্দ শুনলাম যেন। আমি দাঁড়িয়ে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম কোত্থেকে আসছে সেটা।
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বুঝতে বুঝতেই দেখি বাবা বের হয়ে আসছেন হন্তদন্ত হয়ে, এপাশে আলো না থাকায় আমাকে দেখেননি - ঘাম দেয়া শরীরে ছুটতে ছুটতে চলে গেলেন নিজের ঘরে। আমি খানিকটা এগিয়ে রান্না ঘরে উঁকি মেরে দেখলাম- আমাদের কাজের ছেলেটা উঠে বসে হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। পাশেই পড়ে থাকা লুঙিটায় চোখ মুছছে শুধু একটু পর পর।
এরকম করেই ঠিক একদিনে দু'বার আমার পৃথিবী বদলে গেল।
৫।
নিউমার্কেটের সামনের বড়ো রাস্তাটা পার হবার জন্যে প্রিয়তি যখন নির্বিঘ্নে আমার হাত ধরে, আমার ইচ্ছে করে এই হাতটা, এই নিউমার্কেটটা, এই সময়, এই জায়গা, সবকিছুকে সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে রাখি!
কিন্তু বাড়ি ফিরলেই আবারও সেই বিচ্ছিরি বোধ। বাবাকে দেখলেই একটা বমি-মতন অনুভূতি দলা পাকিয়ে উঠতো গলার কাছটায়। কখনই আমাদের চোখে চোখ পড়তো না। আমি চাইতাম, হয়ত ঠিক যেমন করে মা তাকাতেন আমার দিকে, আমার গোপন কথা জানবার জন্যে, কিন্তু বাবা অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলতেন সবসময়। আমি তীব্র দৃষ্টি নিয়ে অপেক্ষা করতাম কখন তিনি আমার দিকে তাকাবেন- আর আমি আমার সবটুকু ঘৃণা ঢেলে দিব সেখানে।
ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে আমি চলে এলাম আমাদের শহর ছেড়ে। একই বিষয় নিয়ে পড়তে প্রিয়তিও চলে এল। আমরা দুজনেই হলে থাকতাম, একসাথে পড়তাম, ঘুরতাম, ফিল্ম সোসাইটি করতাম। মিছিল, মিটিং, আন্দোলন আর ভালোবাসাবাসি- সব চলতে লাগলো একসাথে।
ছুটিছাটায়ও বাড়ি যেতে চাইতাম না আর। অনেক দিন বাদে বাদে বাবার সাথে হঠাৎ হঠাৎ ফোনে কথা হতো।
একবার তিনি খুব অসুস্থ হয়ে গেলেন। হার্টের অসুখ। বাইপাস করাতে হলো। হাসপাতাল- ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি, সবই একা প্রিয়তি করলো, আমি কেবলই তাকে সঙ্গ দিলাম।
অপারেশনের পরদিন আমি বাবার বিছানার পাশে বসা। প্রিয়তি বাইরে গেছে কিছু একটা কাজে। বাবা ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ করে তিনি চোখ মেলে তাকালেন। এবং অনেক অনেকদিন পরে আমাদের চোখাচোখি হলো।
বাবার চোখ দেখে আমি চমকে উঠলাম। কি গভীর ক্লান্তি, লজ্জা আর আকুতি সেখানে! কিছু না বলে তিনি আমার হাত ধরতে চাইলেন, আমি চট করে উঠে দাঁড়ালাম। অনেকদিনের পুষে রাখা ঘৃণাটুকু ঢালতে গিয়ে দেখি- সেটুকু গ্রহন করবার ক্ষমতা আর তার নেই। অঝোরে পানি পড়ছে তাঁর চোখ থেকে।
ঘৃণা করতে না পারার অক্ষমতায় আমি সেখান থেকে ছুটে বের হয়ে এলাম।
৬।
আবারও বছর গড়ায়। গড়িয়েই চলে।
প্রিয়তি আর আমার ছোট্ট সংসার। প্রিয়তি এখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ায়। আর আমি পুরোপুরি সিনেমাওয়ালা। হলে চলে না- দর্শকে দেখে না- এমন সব ছবি বানাই। বছর বছর নিয়মিতভাবে পুরস্কার এনে দেয় সেসব সিনেমাগুলো, আর আমি সেই আনন্দে প্রতিদিন প্রিয়তিকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকি।
এমনি করেই চলছিল আমাদের। গতকাল পর্যন্ত।
কাল রাতেই হঠাৎ ফোন এলো বাড়ি থেকে। জরুরী তলব। আর আমরা আজ সকালে এসে পৌঁছাই আমাদের ছোট্ট শহরে- এক ঝাঁক কালো মেঘ মাথায় নিয়ে।
*
সিগারেটটা শেষমেষ ধরাতে পারি। ওটার মাঝামাঝি আসতে আসতে বৃষ্টির মধ্যে খুঁজে পাই সেই তবলার বোলের ছন্দ। শেষ হবার আগেই দীপু আমার কাঁধ ধরে ইশারা করে। বৃষ্টি থেমে গেছে, আমরা কয়েকজন নিশি পাওয়া মানুষের মতন হেঁটে এসে দাঁড়াই সেখানে।
কবরে লাশ নামানো হয়। বাবাকে মাটি চাপা দেয় সবাই মিলে। দেখি চেনা অচেনা সব লোকজন গভীর মনোযোগে বাবার কবরে মাটি ফেলতে থাকে। আমি এক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকি। হঠাৎ বড় চাচা বলে ওঠেন, বাবা রে, মাটি ফেলবি না একটু?
আমি মাথা নাড়ি। হাতের সিগারেটটা শেষ প্রায়। কোথায় ফেলবো বুঝে পাই না। তারপর কি ভেবে ফেলে দিই সেটা কবরের ভেতর। এরপর নিচু হয়ে এক গাদা মাটি মুঠো করে ছড়িয়ে দিতে থাকি সেটার ওপরে।
বৃষ্টি গুমোট বেঁধে থাকে আকাশে, মেঘ ডেকে ওঠে। আমার হাত থেকে মুঠো মুঠো মাটি বৃষ্টির মত ঝরে পড়তে থাকে, সেখানে - একটা সিগারেটের সাথে আমার বাবা ক্রমশ চাপা পড়তে থাকেন।

-----------------
অনলাইন ম্যাগাজিন গুরুচন্ডালিতে প্রকাশিত।
ছবির ক্রেডিটঃ কঙ্কাবতী।

৬টি মন্তব্য:

sutapa বলেছেন...

viisson valo lekha.....asomvob asadharan likhechen. carry on

konfusias বলেছেন...

সুতপা,
পড়বার জন্যে অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

দ্রোহী বলেছেন...

চমৎকার!!!!!!!!!

সুহান রিজওয়ান বলেছেন...

কনফু ভাই, আপনি বস...
লেখাটা আগে পড়ি নাই বলে নিজেরে বেকুব পাঠক বলে মনে হৈতেসে...

ত্রিনিত্রি বলেছেন...

একটা ঘোরের মাঝে ছিলাম যেন! অসাধারন লেখা।

bondhu বলেছেন...

এ রকম লেখা মাঝে মাঝে চোখে পড়ে। তখন অবাক হয়ে ভাবি মানুষ এইভাবে লেখে কিভাবে।
চমৎকার।