মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ২২, ২০০৯

তিন বছর


কীভাবে যে উড়ে যায় দিন,
সাথে নিয়ে কয়েকটি ভুলে থাকা ঋণ।
মুঠো মুঠো সাদা কালো জমে শুধু এলবামে,
আমাদের সব ছবি আজকে রঙীন।
আমরা হাসতে গিয়ে একসাথে
আমরা হাঁটতে গিয়ে একসাথে
আমাদের নিঃশ্বাস একসাথে গেয়ে ওঠে,
আমাদের মায়ার হরিণ।
স্বপ্নেতে ঘোরাঘুরি, প্রতি দানে হাজারটি ভুল।
তবু আমাদের সঙ্গে আকুল,
তিনটি বছর জুড়ে ফুঠে ওটা আমাদের লাল নীল ফুল।
-------------
২২/১২/০৯

শনিবার, ডিসেম্বর ০৫, ২০০৯

অমিতাভ রেজার নাটক

বাংলাদেশি নাটকে পরিচালকের নাম দেখে নাটক বাছাই করার অভ্যেসের শুরু মোস্তফা সারওয়ার ফারুকীর কল্যাণে। কিন্তু সেই ঊষা লগ্ন এখন গত-প্রায়, এখনও তার নাটক দেখি, কেবল যদি পর্যাপ্ত সময় থাকে হাতে। তারপরেও কিছুটা একঘেয়েমিতে ভুগি, ফারুকীর নাটকের পাত্র-পাত্রীরা সবাইই কেন জানি খুব উচ্চ স্বরে কথা বলে। আর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অবিরাম ঝগড়া করতে থাকে কেউ কেউ, এবং নাটকে মোবাইলের ব্যবহার দৃষ্টিকটু রকমের বেশি, বাংলাদেশে মোবাইলের প্রথম যুগের মত অনেকটা। যেন সবাইই গত পরশু মোবাইল ফোন কিনে গতকাল সারাদিন ব্যাটারি চার্জ দিয়ে আজ নাটকের শ্যুটিং করতে চলে এসেছে।

তারপরেও নাটক দেখার অভ্যাস এখনও পাকাপোক্ত আছে অল্প কজন পরিচালকের গুণে, তাঁদের একজন অমিতাভ রেজা।

সম্ভবত গত ঈদেই দেখেছিলাম [i]ইকুয়াল টু[/i]। ছিমছাম একটা নাটক, আরজে নওশীন ছিলো অভিনয়ে, নাটকেও আরজেরই ভুমিকা তার। গল্পটা চমৎকার, এবং দেখতে দেখতে বারবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নালু সময়টায় ফিরে যাচ্ছিলাম।


অবশ্য, অমিতাভ রেজার ভক্ত হয়েছি তারও আগে, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের গল্প অবলম্বনে বানানো নাটক '[i]একটা ফোন করা যাবে প্লিজ?[/i]' দেখার সময়। (অবশ্য ধন্যবাদ প্রাপ্য কমরেড ইউটিউব, তোমাকে লালসালাম।) :)

মার্কেজের মূল গল্পটা বহুবার পড়া। আমার খুবই 'অপ্রিয়' গল্প এটা। হুমায়ুন আজাদের উপন্যাসগুলোর কিছু কিছু লাইন আছে এমন, পড়ার সময় মনের ওপর খুব চাপ পড়ে, হাসফাঁস লাগে, দম বন্ধ করা একটা অনুভুতি কাজ করতে থাকে মনে। মার্কেজের, বিশেষ করে এই গল্পটা তেমনি। যতক্ষণ পড়তে থাকি চারপাশের সবকিছুর ওপর অবিশ্বাস চলে আসে। প্রকৃতির নিষ্ঠুরতায় হত বিহবল হয়ে পড়তে হয়। গল্পটা এরকম- রাতের অন্ধকারে পথ ভুল করে বসে একটা মেয়ে। বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে যে বাসে চড়ে বসে, সেটা ছিলো আসলে একটা মানসিক হাসপাতালের বাস। ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে মেয়েটি, সকালে যখন উঠে, দেখতে পায়, হাসপাতালে নেমেছে সে, ডাক্তার ও নার্স পরিবেষ্টিত, এবং সবাই ভাবছে, সে-ও একজন মানসিক রোগী। মেয়েটা কোনভাবেই বিশ্বাস করাতে পারে না যে সে রোগী নয়, বারবার শুধু সে তার স্বামীকে ফোন করতে চায়, শুধুই আকুতি করে, একটা ফোন করা যাবে প্লিজ?

মার্কেজের মূল গল্পটা শেষ হয় বুকের ভেতরটা একদম দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে। গল্পে আছে, মেয়েটা ওই হাসপাতালেই থেকে যায় চিরকাল, ওর স্বামী বহুদিন পরে ওকে খুঁজে পায় সেখানে। কিন্তু কে জানে কার উপর অভিমানে সে আর ফিরে আসতে চায় না, ওখানেই থেকে যায় বাকি জীবন।

অমিতাভ রেজা গল্পটাকে নাটক বানানোর সময় আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপট দেখিয়েছেন। মেয়েটির ভূমিকায় ছিল সম্ভবত তাঁরই স্ত্রী, জেনি। ডাক্তার ছিলেন ইরেশ যাকের। প্রত্যেকের অভিনয়ই অনবদ্য ছিলো। প্রথমবার নাটকটি দেখার সময় মার্কেজের গল্প পড়ার সময়কার চাপটা টের পাচ্ছিলাম বেশ। নাটকের শেষটুকু দেখতে চাইছিলাম না একদম, জানিই তো কী হবে, আবারও মন খারাপে ডুবে যাবো। কিন্তু দেখি, অমিতাভ রেজা কাহিনি বদলেছেন ওখানে, নাটকের মেয়েটি শেষমেষ খুঁজে পায় ওর প্রেমিককে, এবং নাটকের শেষ পরিণতি হয় মিলনাত্মক।



আমি রীতিমত খুশি হয়ে গেছিলাম এই বদলে, মনে মনেই অনেক ধন্যবাদ জানিয়েছি তাঁকে, মুগ্ধ হয়েছি তাঁর এডাপশানের মুন্সীয়ানায়।
*

গতকাল দেখলাম তাঁর বানানো এবারের ঈদের নাটক, [i]এ সময়[/i]।
নাটকের মূল গল্পটি নেয়া হয়েছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প 'মিলির হাতে স্টেনগান' থেকে। আশ্চর্য এ-ই যে, এ গল্পটিও আমার বহু বহুবার পড়া। আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্পগুলোর একটি এটি। গল্প হিসেবে এটি অসম্ভব শক্তিশালী। কিছু কিছু গল্পের প্লট আছে, যেগুলো বেয়াড়া ঘোড়ার মতন, কেবলই তেড়ে ফুঁড়ে আসে, এগুলোকে লাগাম পড়ানো শক্ত কাজ। ইলিয়াস ছাড়া আর কেউ এই গল্পটি সামলাতে পারতেন কিনা, সে নিয়ে আমার ব্যাপক সন্দেহ।
তো, এই অসম্ভব প্রিয় গল্পের নাট্যরূপ দেখতে পাবো আরেকজন প্রিয় পরিচালকের হাতে, এই আশা নিয়েই নাটক দেখতে বসা।
নাটক খারাপ লাগেনি, নাটক হিসেবে এটি ভালই হয়েছে। কিন্তু গল্পটা জানা থাকায় খানিকটা হতাশ হয়েছি আমি।

গল্পটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালীন সময়ের। তরুণ যোদ্ধারা ফিরে এসে সবাই ঠিক পথে হাঁটেননি। কেউ কেউ বেছে নিয়েছিলেন অন্ধকার জগত, গল্পের মূলভাবটা সেরকমই। কিন্তু নাটকে, এটাকে একদম এই সময়ের গল্প বানিয়ে ফেলা হয়েছে। নাটকের অন্যতম মূল চরিত্র আব্বাস পাগলা। এই চরিত্রটি অবিকল ছিল অবশ্য, এবং বলা চলে গল্প আর নাটকের একমাত্র যোগসূত্রও ছিলো আব্বাস পাগলাই। গল্পে অন্ধাকার জগতের ব্যাপারটা ছিলো আবছায়ার মত, তার ফলাফল অবশ্য ছিল সামনেই। নাটকের প্রয়োজনেই হয়তো আবছায়াগুলোকে শরীর দেয়া হয়েছে, নতুন চরিত্র আনা হয়েছে অনেক, স্পষ্ট হয়েছে মিলির ভাই রানার কর্মকান্ড।

আমার অবশ্য মনে হয়েছে, এটার দরকার ছিলো না। এইটুকু স্পষ্টতা না দেখালেও চলতো। মূল গল্পকে অনুসরণ করে নাটকটা নির্মিত হলে আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠত সেটা।

মিলির হাতে স্টেনগান গল্পের আসল অংশ হচ্ছে এর শেষটুকু। যেখানে দেখায়, আব্বাস পাগলা ভাল হয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু তাঁর কষ্টটুকু পাগলামি হয়ে ঢুকে পড়ে মিলির মাথায়, সে তখন ছাদের উপরে উঠে গিয়ে আকাশে উড়াল দেবার জন্যে পা ঝাপটায়।

আমার তীব্র আগ্রহ হচ্ছিলো, এটাকে চিত্রায়ন করা হয় কীভাবে তা দেখার। নাটকে ইলিয়াসের লেখার এই অনুভুতি নিয়ে আসা সহজ নয়। তো, [i]এ সময়[/i] নাটকটির শেষটুকু দেখেও আবারও খানিকটা হতাশই হতে হলো। ওরকম আবেদন আসেনি। নাটকটা হয়ে গেছে বিপথগামী কোন যুবকের বোনের গল্প, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের টানাপোড়া সেখানে অনুপস্থিত।

আগের বার খুশি হয়েছিলাম, কিন্তু এইবার, এই বদলে মন খারাপ হলো।
জানি সম্ভব নয়, তবু যদি পারতাম, আমি অমিতাভ রেজাকেই অনুরোধ করতাম নাটকটা আরেকবার বানাতে, আর কাউকে নয়।

পুনর্জন্ম বিষয়ক একটি ব্যর্থ রচনা-

ভূমিকাঃ
-------
আমি টিভি খুব একটা দেখি না। একটা লম্বা সময় হোস্টেলে থেকেছি বলে টিভি-র প্রতি আকর্ষণ একদমই উবে গেছে। সিরিজ ধরনের নাটক বা ডকুগুলোর প্রতি আবার বিশেষ এলার্জি আছে, টিভিতে ওগুলো দেখাই হয় না তেমন।
এখানে এসে অবশ্য একটা উপকার হয়েছে, দোকানে গেলে বাংলাদেশী সিরিয়ালগুলো এক ডিভিতে সব দিয়ে দেয়, বিজ্ঞাপনের কোন ঝঞ্জাট নেই, মাঝখানে খবর দেখার টানাটানি নেই, একেবারে এক বসায় দশ পর্ব এক সাথে দেখে ঢেঁকুর তোলা যায়। কিন্তু এখানকার চ্যানেল বা তাতে প্রচারিত অনুষ্ঠান বিষয়ে আমি একেবারেই ওয়াকিবহাল নই। বাঙালীদের কোন আড্ডায় গেলে কেউ যখন চলমান কোন বিজ্ঞাপন বা সিরিয়াল নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে, আমি তখন ভ্যাবলার মত চেয়ে থাকি।

এই আমারও অবশ্য মাঝে মাঝে টিভি দেখা হয়। এবং কিম আশ্চর্যম, সেটা হয় অন্য কারও বাসায় বেড়াতে গেলে। হতে পারে আমার অমিশুক স্বভাব এর জন্যে দায়ী, অথবা নতুন কারও সাথে হুট করে আলাপ জমাতে পারি না বলে হয়তো গভীর মনোযোগে টিভির দিকে তাকিয়ে থাকি। কিন্তু বাসায় ফিরলেই আবার যে-কে সেই। আমার ঘরের টিভি মাসে একবারও জেগে ওঠে না।

বর্ণনাঃ
----------
সেদিন এমনই করে এক বন্ধুর বাসায় বেড়াতে গিয়ে টিভি দেখছিলাম। এনিমেল রেসকিউ ধরণের একটা প্রোগ্রাম। এখানে একটা সংস্থার মত আছে, এরা বিপদে পড়া পশু পাখিকে উদ্ধার করতে দৌড়ায়। ব্যাপারটা লাইভ সম্প্রচার নয় অবশ্য, তবে ঐ উদ্ধারকারী দলের সাথে সবসময়েই টিভি ক্যামেরা থাকে। উদ্ধারের পুরো সময়টাকে তারা ক্যামেরায় বন্দী করে নেয়, পরবর্তীতে টিভিতে সম্প্রচার করে।
টিভিতে উপস্থাপনের স্টাইলটা বেশ আকর্ষণীয়। এক সাথে তিনটা ঘটনা দেখাতে থাকে পরপর। আমি যেদিন দেখছিলাম, সেদিন দেখাচ্ছিলো, একটা বাড়ির সীমানার দেয়াল এবং ঘরের দেয়ালের মাঝখানে ৫ সেন্টিমিটারের মতন একটা ফাঁক, সে জায়গাটায় একটা বিড়াল আটকে গেছে, আর বেরুতে পারছে না।
অন্যদিকে দেখালো, একটা ক্যাঙারু, বেশ ক্ষ্যাপাটে বোঝাই যাচ্ছিলো, সেটা ঢুকে গেছে জাল দিয়ে ঘেরা একটা ছোট্ট জায়গার মধ্যে, ওখানেই আটকে আছে সেটা।
আর সমান্তরালে অন্য যেটা দেখাচ্ছিলো, একটা বাড়ি থেকে পঁচা গন্ধ পেয়ে এনিমেল রেস্কিউ টিমকে ফোন করে প্রতিবেশিরা, গিয়ে দেখা যায় বাড়ির বাসিন্দারা কেউ নেই, ভেতরে দুটো কুকুরের একটা মরে পড়ে আছে, অন্যটা মৃতপ্রায়।

তিনটে ঘটনার শুরুটা দেখায় পরপর, শ্বাসরুদ্ধ্বকর অবস্থা যাকে বলে। বিজ্ঞাপন বিরতির পরে আবার শুরু হয় অনুষ্ঠান, দেখায়, বিড়ালটাকে উদ্ধারের জন্যে রেসকিউ টিমের সাথে যোগ দিয়েছে দমকল বাহিনী। ওরা এসে বাড়ির দেয়াল ভাঙ্গার আয়োজন করা শুরু করে। সৌভাগ্যবশত, দেয়ালে হাতুড়ি ঠোকার শব্দে ভয় পেয়ে বিড়ালটা নিজেই টেনে হিঁচড়ে কেমন করে যেন বেরিয়ে আসে। টিভি পর্দার উদ্ধারকর্মীদের সাথে সাথে আমিও হাঁপ ছেড়ে বাঁচি।

অন্যদিকে ক্যাঙারুটাকে ধরবার জন্যে বেশ বেগ পেতে হয় সবাইকে। একটা চাদরে একদম অতর্কিতে আটকে ফেলা হয় তাকে, তারপরে ছেড়ে দায় হয় বনের ভেতর।
আর সর্বশেষ, কুকুরটাকে তুলে নিয়ে আসা হয় উদ্ধারকর্মীদের গাড়িতে করে, সোজা পশু হাসপাতালে। সেখানে ডাক্তারদের হাতে সঁপে দেয়া হয় তাকে।

পুরো অনুষ্ঠানটাই মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখলাম। রেসকিউ টিমের তৎপরতা আসলেই সাধুবাদ দেয়ার যোগ্য। কোন পশু-পাখী বিপদে আছে, এরকম ফোন পাওয়া মাত্রই তারা ছুটে যায় সেখানে, তারপরে অসীম ধৈর্য্য ও যত্নের সাথে উদ্ধার প্রক্রিয়া চালায়।
------------------------------------------------------------------------
টিভি প্রোগ্রামের গল্প শুনছেন, মাঝে একটা বিজ্ঞাপন বিরতি থাকবে না তা কী হয়?
নিলাম একটা বিরতি, ফিরে আসছি তারপরেই, সঙ্গে থাকুন।
------------------------------------------------------------------------

ঈদ গেল, অথবা যায়নি এখনও, যাই যাই করছে। আমরা এখানে কুরবানী দেই না, কিন্তু পরিচিত অনেকেই দেয়। তাদের বন্ধু-তালিকায় আছি বলে, অথবা কে জানে, হয়ত আপনাতেই "গরীব-দুখী"দের তালিকায় পড়ে যাই বলে ঘরে প্যাকেট ভর্তি কুরবানীর গোশত চলে আসে।
ঈদের খাবার দাবার তৃপ্তি নিয়ে খাই পেট পুরে।
আজ খেয়ে দেয়ে, পত্রিকা খুলে বসলাম। গত কদিনের ব্যস্ততায় খবর পড়া হয়নি একদম। প্রথম আলো-র প্রথম পাতা খুলেই দেখি লঞ্চডুবির ছবি।


ইতিমধ্যে মারা গেছে ৭৬ জন। ৩৬ জনকে এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। সাড়ে তিনশ ধারণ ক্ষমতার লঞ্চে যাত্রী তুলেছিলো তিন হাজার। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ভেতরের খবর পড়তে গিয়ে মন খারাপ হয়ে গেলো আরো। লঞ্চে পানি ওঠা শুরু করেছিলো শুরু থেকেই, লঞ্চ কর্তৃপক্ষ পাত্তা দেয়নি। খানিক পরে যাত্রীরা টের পেয়ে নেমে যেতে চাইলেও কর্তৃপক্ষ আটকে দেয়, অনেকেরই টিকেট কাটা হয়নি সে জন্যে। টিকেট না কেটে কোন ফাঁকিবাজ যাত্রী যেন না নামতে পারে, "বুদ্ধিমান" চালক তাই লঞ্চকে নিয়ে যায় মাঝ নদীতে। ওখানে [i]বিশৃংখল[/i] যাত্রীদের মধ্যে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে আনসার বাহিনি তাদের মারধর করে লঞ্চের পেছন দিকে নিয়ে যায়, সবাই একপাশে চলে আসায় তাল সামলাতে না পেরে লঞ্চ ডুবে যায়।
স্থানীয়রা অভিযোগ করছে, সরকারী ডুবুরিরা ডুব দিয়ে দিয়ে "[i]কী যেন খুঁজে[/i]", কিন্তু কোন লাশ পায় না। নিহতদের আত্মীয় স্বজনেরা তাই নিজেরাই নেমে পড়ে পানিতে লাশের খোঁজে।
উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ঠিক ৩৭ ঘন্টা পরে, যদিও আগের দিন নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান এসে বলে গিয়েছিলেন, এক ঘন্টার মধ্যেই জাহাজ এসে উদ্ধারকাজ শুরু করবে।

উপসংহারঃ
-------------

পরজন্মে পৃথিবীতে নামবার আগেই যদি সুযোগ পাওয়া যায়, বঙ্গদেশের মানুষ হয়ে জন্মাবার বদলে এই দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর-তীরবর্তী দেশের ক্যাঙারু বা নিদেনপক্ষে একটা বিড়াল হয়ে জন্মানো যায় কি না, এই বিষয়ে ঈশ্বরের কাছে তদবীর করার উপায় জানা আছে কারো?

শুক্রবার, নভেম্বর ২৭, ২০০৯

কবি

যখন বয়েস কম ছিলো, অনেক সাহসী ছিলাম তখন। একেকটা ছোট ছোট রুলটানা কাগজের ডায়েরি, সেগুলোতে গোল গোল হরফে নানা রকম হাবিজাবি লিখে রাখতাম। কেউ জিজ্ঞেস করলে যে “কী এগুলো?”, নেপোলিয়ান অথবা আলেকজান্ডারের চেয়েও বেশি অহমিকা নিয়ে উত্তর দিতাম, “এগুলো কবিতা। কবিতা লিখেছি। ”

তারপর অনেকদিন গেলো। দিন যেতে যেতে পৃথিবীতে সবচেয়ে বাজে যে ব্যাপারটা ঘটল তা হলো যে, আমি বড় হয়ে গেলাম।

কেন যে বড় হলাম, এই নিয়ে আমার দুখের সীমা নাই। এখন আর ডায়েরিতে হিজিবিজি লিখতে পারি না, লেখা আসেই না একদম। অনেকদিন পরে পরে হয়তো আসে দুয়েকটা লাইন, ভীষণ আনন্দ নিয়ে সেগুলোকে লিখে ফেলি খাতায়, কিন্তু তারপরে যখন পড়তে যাই, বুঝে যাই যে আমার সাহস কমে গেছে, আগের মতন দুর্মর বা দুর্বার ভঙ্গিতে এখন মোটেও সেগুলোকে কবিতা দাবি করতে পারি না। মনে ভয় হয়।
অথচ কবি হবার লোভ আমার অনেকদিনের। এই লোভের বয়েস, যদি দিন মাস গুনতে বসি, তাহলে ঠিক আমার বয়েসেরই সমান। কিন্তু কবি হতে পারিনি আমি, অথবা কবি হওয়া হয়ে ওঠেনি আমার।

ক্লাস সেভেনের দিকে নির্মলেন্দুতে জমেছিলাম খুব। এই দীর্ঘকায় কবির কবিতাগুলো কেমন করে যেন আমাকে জাদুটোনা করে ফেলেছিলো। শহরে থাকি বলে চাঁদ দেখতে পাইনা তখন, কলেজে বিদ্যুত গেলে বিশ্রি শব্দে জেগে উঠত জেনারেটর, তবু, নির্মলেন্দুর কবিতাগুলোই তখন আমার কাছে চাঁদমাখা স্বপ্ন হয়ে আসতো, আমাকে চন্দ্রাহত করে রাখতো সেগুলোই।

কবিতা আসলে আফিমের মতই, এমনি বাজে একটা নেশা, নেশা জেনেও যাকে ছেড়ে যাবার কোন উপায় নাই।
কবিতার রাস্তাটাও অনেক বর্ণিল, সেখানে পথ হারাবার ভয় নেই, সেখানে আঁধার নামলে পরে শক্তি, সুনীল, জীবনানন্দরা আবুল হাসানের সাথে মিলে ল্যাম্পপোস্ট হয়ে আলো জ্বেলে দেন।
তো এরকম ল্যাম্পপোস্ট হবার লোভেও আমি কবি হতে চেয়েছিলাম।

কদিন আগে নতুন একটা মুভি দেখা হলো, ঋতুপর্ণ ঘোষের, সব চরিত্র কাল্পনিক। মুভিটা একজন কবিকে নিয়ে, একজন কবি, যার প্রয়াণের পরে শোকসভা থেকে সিনেমার শুরু। সেখানে মৃত কবিকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে তার ইঞ্জিনিয়ার সহকর্মীরা, তার কবিতা পাঠকেরা, আবৃত্তিকারেরা, এবং তার স্ত্রী। মুভি দেখতে দেখতেই ভাবছিলাম, একটা সত্যিকারের কবির চরিত্রই আসলে এসেছে সেখানে, খানিকটা বোহেমিয়ান, যে তার ঘরের কাজের লোককে নিয়ে লিখে ফেলে দীর্ঘ কবিতা, অথচ সে লোক রাতে না খেয়ে আছে কিনা সেটা জিজ্ঞেস করতে ভুলে যায়। অথবা স্ত্রীর অসুখের সময়ে উদাসীন কবি, অথচ স্ত্রীর লেখা একটা কবিতার ছেঁড়া কাগজ খুজে নিতে যে গভীর রাতে বনে বাঁদাড়ে দৌড়ায়।

এরকম একটা কবি, সিনেমায় দেখালো, তার মৃত্যুতেও কত মানুষ কাঁদলো, কত মানুষে তাকে ভালবাসলো!

সিনেমা শেষ করে অনেকদিন পরে কিছু লাইন লিখে ফেললাম ঝটপট, তারপরে, গুটি গুটি পায়ে বুকশেলফ থেকে ডেকে নিয়ে আসলাম আবুল হাসানকে, বালিশের এক পাশে তাঁকে বসিয়ে ফিসফিসিয়ে বললাম, বুঝলেন গুরু, আমারও কবি হতে ইচ্ছে করে খুব।

বিকেলবেলায়...

কবেকার কোন বৈশাখী মেলা থেকে একটা লাল
ডুরে শাড়ি কিনে এনে দিইনি বলে সে
আমার থেকে দূরে সরে সরে থাকে শুধু।
ব্যস্ত দুপুরের কোন একদিন একটা কাঠি
লজেন্স অথবা হাওয়াই মিঠাই এর আবদার আমার
মন ভুলে গিয়েছিলো হয়ত, সেই
থেকে, অভিমানী মেয়ে গাল ফুলিয়ে কেবলই
ছলছল চোখে চেয়ে দেখে আমাকে, কাছে আসে না।
বিকেলের ভেজা আলোয় আজ মনে পড়লে এক হাতে রঙিন
ফিতে আর অন্য হাতে কিছু ঝিলিমিলি চুড়ি নিয়ে আনাচে
কানাচে কেবলই খুঁজে বেড়াই তাকে।
দেয়ালে বসা টিকটিকি যেন শুনে না ফেলে অথবা আমার
জানলায় উঁকি দেয়া কাঠবিড়ালিকে লুকিয়ে আমি
ফিসফিস করে ডাকি, কবিতা, কোথায় রে তুই?
আর একটিবার আমার কাছে আয় সোনা মেয়ে।


মরে যাবার আগে একটা দিন আমি কবি হয়ে বাঁচি।
-------------
২১/১১/০৯

মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৭, ২০০৯

কবি বলেছেন -

কবি বলেছেন, জ্ঞানের কোন শর্টকাট নাই।
কিন্তু আমরা বুদ্ধিমান মানুষ, বোকা কবির কথায় ভুলবো কেন? আমরা তাই জ্ঞানার্জনের জন্যে অসংখ্য শর্টকাট খুঁজে বের করে ফেলি। উচ্চ নম্বরের সিঁড়ি বানাই, পাঞ্জেরী হই, ফোকাস করে করে পড়ি।
ছোটবেলায় কোন এক গল্পে পড়েছিলাম, বালিশের নিচে ভূগোল বই রেখে ঘুমিয়েছে এক ছেলে, রাতের বেলা স্বপ্নের ভেতর তাই সে সারা দুনিয়ার ভূগোল দেখে ফেলেছে।

এই গল্প পড়ে ব্যাপক উৎসাহিত হয়েছিলাম। পরীক্ষার আগের রাতে বালিশের নিচে বই নিয়ে ঘুমানোটা প্রায় অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছিলো। স্বপ্ন-মামার যেন কোন স্বপ্ন দেখাবে এসব ভেবে কষ্ট না হয়, এ জন্যে যে চ্যাপ্টার পড়া হয়নি, ঠিক ঐ চ্যাপ্টারটাই খুলে রেখে ঘুমাতাম। অবশ্য দুঃখের বিষয়, তেমন কাজে আসেনি এই বুদ্ধি।

আরেকটু বড় হয়ে যখন প্রোফেসর শঙ্কুর সাথে দেখা হলো, খুবই মজা পেলাম। দেখি এই ভদ্রলোক নানান রকম বটিকা নিয়ে ঘোরাফেরা করেন। মৎস্যবটিকা নামের এক জিনিস খাওয়ান তার বিড়ালকে, বিড়াল নাকি আসল মাছের সাথে তার তফাৎ করতে পারে না। নিজের জন্যে আছে ক্ষুধানিবারণ বটিকা। এটাও জব্বর জিনিস, একবার খেলে দুতিনদিন আর খাওয়া লাগে না।

আমি ভাবলাম, এই ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হওয়া ভীষণ দরকার। অনুরোধ করে একটা লেখাপড়া বটিকা বানিয়ে নিবো, খেলেই যেন লেখাপড়া সব পেটে ঢুকে বসে থাকে। এটা বানাতে বেশি কষ্ট হলে আলাদা আলাদা করেই না হয় বানাতে বলবো- বাংলা বটিকা, কেমিস্ট্রি বটিকা, ফিজিক্স বটিকা।

বড় হতে হতে বুঝে গেলাম, বটিকায় কাজ হবে না আসলে। জ্ঞানের আসলেই কোন শর্টকাট নেই।

সম্প্রতি ইউটিউব ঘুরতে ঘুরতে আমার মনে হলো, নাহ, একটা শর্টকাট হয়তো সত্যিই এখনো আছে, লোকেদের অগোচরে যদিও!

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ফরম নিয়ে কিছু দুই নম্বুরি করেছে কয়েকটা কোচিং সেন্টার। সেখান থেকে ফরম কিনেছিলো প্রায় কুড়ি হাজার শিক্ষার্থী, তারা কেউই নাকি এডমিট কার্ড পায়নি, পরীক্ষায় বসাও অনিশ্চিত। ভুক্তভোগী সেসব শিক্ষার্থীরা ফার্মগেটে মিছিল করেছে, নিজেদের দাবী জানিয়েছে। আমাদের সর্ব-কর্ম-পটীয়সী পুলিশ যথারীতি সেখানে গিয়ে লাঠি চার্জ করে বসেছে। বিশৃঙ্খলা তাদের সহ্য হয় না কি না!

ইউটিউবের একটা ভিডিওতে এটিএন বাংলার সংবাদের একটা ছোট্ট অংশ দেখলাম। সেখানে শিক্ষার্থীদের বক্তব্য এসেছে কিছু, দেখছিলাম, তারপরে দেখি পুলিশদেরও দেখাচ্ছে, তাও দেখছিলাম, এবং সবশেষে দেখলাম, এই ছাত্রদের লাঠিপেটা করা ছাড়াও সাথে ফাও হিসেবে জনৈক পুলিশ অফিসার জ্ঞান অর্জনের সহজ উপায়ও তাদের বাতলে দিচ্ছেন। তিনি সুন্দর ভাবে ক্যামেরার সামনেই শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন, লেখাপড়া পুটকির মধ্যে ভইরা দিবো একদম!



আমি বিস্মিত, হতবাক। এই সাংঘাতিক শর্টকাট দুনিয়ায় আর কারও মাথায় কেন আসলো না?
তাইতো রে ভাই, দিন নেই রাত নেই বই খুলে বসে বসে পড়ালেখা শেখা, তারচেয়ে এটা কতই না কাজের। আমি বারবার রিওয়াইন্ড করে সেই পুলিশ অফিসারের মুখমন্ডল দেখলাম। ইস, বুঝতে পারছি যে এভাবে পেছন দিয়ে লেখাপড়া ভরে ভরে, ইয়ে, আই মিন, করে করে ভদ্রলোকের খুব কষ্ট হয়েছে এতদিন। কিন্তু দেখুন, সেটা কত কাজে এলো! লাঠি সোটা হাতে একেবারে পুলিশ বনে গিয়েছেন। বুঝুন তাহলে!

একটু দুঃখও হলো। এবারের নোবেল ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়ে ফেলেছে বেকুবগুলা, তা না হলে এই পুলিশ ভদ্রলোকের নাম সেই কমিটিতে পাঠিয়ে দেয়া যেতো। ইদানিং কত কিছু করে লোকে নোবেল পায়, ওবামার মত ভাগ্যবান হলে কিছু না করেও পায়। আর, আমাদের পুলিশ অফিসার, এরম চমৎকার একটা আবিষ্কারের যথাযোগ্য মূল্য পাবে না?
তা হয় না।
কবি বলেছেন, নামে নয়, কর্মেই পরিচয়। তাই উক্ত পুলিশ অফিসারকে তার কর্মের উপযুক্ত পুরস্কারে ভূষিত করার দাবি জানাই।

পরিশিষ্টঃ
---------
১।পুলিশের কথাটা একটুও সেন্সর না করেই লিখে দিলাম। ইচ্ছে করেই। আমি দুঃখিত যে, এরকম অশালীন কাজ করেছি বলে আমি একটুও দুঃখিত নই।
২। এটিএন বাংলার সেই সাংবাদিককে ধন্যবাদ, সংবাদ সম্পাদনার টেবলে বসেন যারা, তাদেরকেও অনেক ধন্যবাদ এ অংশটুকু না কেটে এটা টিভিতে সম্প্রচার করেছেন বলে। এই নিউজটা সবার দেখার দরকার ছিলো।

বুধবার, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০০৯

আলভী আহমেদের পোস্ট

মুগ্ধ পাঠক -২ : কনফুসিয়াস (হৃদয়ে ছুরি চালানো লেখক।)

২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১২:১০



চুমুর মধ্যে ভেজা চুমুই ভাল। ঠোঁটের প্রান্তভাগ স্পর্শ করার সাথে সাথে নীচের ঠোঁটটা টুপ করে গিলে ফেলে জিভের সঙ্গে জিভ লাগিয়ে -----------

খাটি গদ্য আমার কাছে অনেকটা ভেজা চুমুর মত মনে হয়। গদ্যের মধ্যে ভেজা ভেজা হৃদয়ে ছূরি চালানো গদ্য আমার ভাল লাগে

আমি নিশ্চিতভাবে জানি, ব্লগের সাহিত্যিকরা অন্য কথা বলবেন। হয়তবা আমার ছেলেমানুষীতে হেসেও নেবেন দু'একবার। কিন্তু, আমার পছন্দ এরকম। এজন্যই কন্ঠস্বর গোষ্ঠীর লেখকদের হিসেব করা, কঠিন কঠিন শব্দের মাপা গদ্যের চেয়ে সুনীলের গদ্যই আমার বেশি পছন্দ।

ভাবছেন, এর সাথে আমাদের কনফু'র সম্পর্ক কী?

সম্পর্ক আছে।

`যে জীবন দোয়েলের ফড়িঙের', মানুষ হয়েও এমন জীবন চায় যে কনফু - তার ব্যাপারে এটুকু ভূমিকার দরকার আছে।

কনফু'র গদ্য আমার এতটাই জাদুকরী মনে হয়, ও কী লিখেছে কখনো পড়বার প্রয়োজন বোধ করি না। হয়তবা, ও লিখেছে নেহায়ত সাধারণ কোনো ঘটনা, সাউথ আফ্রিকায় যাপিত জীবনের কথা। অথবা হুমায়ুন আজাদের বইয়ের রিভিউ, বা পুরনো দিনের নাটকের গানের কথা।

আমি গদ্যের বুণন, সাবলীল প্রকাশ, রসে (আদিরস নয়) ভেজা শব্দে হারিয়ে যাই।

মুগ্ধ হয়ে পড়ি, কনফু যখন ভার্সিটি লাইফ নিয়ে স্মৃতিকাতরতায় ভোগে।

সাহানা'র গানের চেয়ে কনফুর লেখা রিভিউটাই কেন যেন বেশি ভাল লাগে।

'আজ তোমার মেঘে মেঘে রঙধনু' পড়তে যেয়ে বুকের মধ্যে দুর্বোধ্য এক অনুভূতি হয় - যে ধরণের অনুভূতির সাথে আগে পরিচয় নেই। সাদামাটা, সহজ গদ্যের কি বিপুল ঐশ্বর্য! বুকের ভেতরে অদ্ভুত এক ভাললাগা, সাথে দলাপাকানো একটা কষ্ট একসাথে খিচুড়ী পাকায়। কম্পিউটার স্ক্রীণের কালো কালো অক্ষরগুলো চোখের সদর থেকে মস্তিষ্কে যায় না, সরাসরি জায়গা করে নেয় মনের অন্দরে। হৃদয়ে ছুরি চালায়।

একবার কনফু'র করা কোন একটা পোস্টে আমি বিনীত অনুরোধ করেছিলাম - ও যেন প্রতিদিন অন্তত একপাতা হলেও লেখে। আবারও একই অনুরোধ করছি। আমি প্রতিদিন ও'র লেখা পড়তে চাই।

[পোস্টটাতে তুমি করে বলে গেলাম কনফু'কে। কেন যেন আপনি বলতে ইচ্ছা করল না। বোধহয়, ওর গদ্যের আপন করা জাদুই আমাকে এই সাহসটি দিয়েছে।]

[বানান ভুল থাকলে নিজ দায়িত্বে ক্ষমা করে দিয়েন। আমি ইউনিকোডে অভ্যস্ত নই।]


[wjsK=http://www.somewhereinblog.net/blog/konfusiasblog/28698242]


সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে নভেম্বর, ১৯৯৯ রাত ১২:০০


  • ৩৬ টি মন্তব্য
  • ৭১৭ বার পঠিত,
Send to your friend Print


রেটিং দিতে লগ ইন করুন

পোস্টটি ৩ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১২:১২
comment by: আলভী বলেছেন: লিংক দেয়ার ট্রাই করছিলাম,আজ তোমার মেঘে মেঘে রঙধনু লেখাটার। লিংকটা দিতে পারলাম না।
২. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১২:১৩
comment by: অনুভূতি শূন্য কেউ একজন বলেছেন: মুগ্ধতার সীমার খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাই ওর লেখা পড়ার পর ।

--
তয় পোলাটা কই জানি পালাইছে । অনেকদিন দেখি না । ব্যস্ত বোধহয়?
"পজজাপতি" এই কমেন্ট পড়লে একটা উত্তর দি্ও ।

৩. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১২:১৩
comment by: দ্রোহী বলেছেন: আলভী ভাই,

দারুন হয়েছে! কনফু ডরাইবো, অনুপ্রেরণাও পাইবো।
৪. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১২:১৫
comment by: অনুভূতি শূন্য কেউ একজন বলেছেন: আলভী ভাই, লিংক এর জিনিষটা ঠিকই আছে, যে টেক্সটুকু লিংক করতে চান সেই টুকু [..]* [/..] * এর জায়গায় লিখুন ।
৫. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১২:১৫
comment by: দ্রোহী বলেছেন: !@@!436684 !@@!436685 !@@!436686 !@@!436687 !@@!436688

আমি লিংকটা দিলাম। কনফু আমার পছন্দের লেখকদের একজন।
৬. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১২:১৮
comment by: আলভী বলেছেন: থ্যাংকু @ অনুভূতিময় একজন এবং দ্রোহী
৭. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১২:৩৫
comment by: দৃশা বলেছেন: আলভী ভাল লাগল আপনার মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতা দেখে...এবং কারো প্রসংশা করার সাবলীলতা দেখে--যা অনেক মহান মহান ব্যক্তিদের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যায় না।
৮. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১:২৭
comment by: কিংকর্তব্যবিমূঢ় বলেছেন: খুব সুন্দর লিখছেন বস ... কনফু ভাই আমারো খুব প্রিয় লেখক ... প্রজাপতিও ...

একটা মজার জিনিস দেখলাম ... ব্লগে যেসব জুটি আছেন তারা সবাই খুব ভাল লেখেন ... নাম্বার ওয়ান অবশ্যই কনফু - প্রজাপতি ... এরপর আসবে অরূপ - মাশীদ ... শাহানা - সামহোয়্যার আউট ... আর কোন জুটি কি আছে? ... ইয়েস, আরেকটা মনে পড়ল , যদিও তারা এখন রেগুলার না ... আনিকা - ইথার ...

ভাবতেছি বউরেও ব্লগে নিয়া আসমু ... লেখার মান যদি কিছু বাড়ে :-)
৯. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১:৩৫
comment by: রেজওয়ান বলেছেন: কনফুসিয়াসের লেখা তো অবশ্যই অসাধারন এবং আমার প্রিয়, আপনাকেও ধন্যবাদ আপনার ভাললাগা প্রকাশ করার জন্যে।

দেখি আমাদের সবার অনুরোধ কনফুসিয়াস ফেলতে পারে কিনা।
১০. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১:৪৫
comment by: হোসেইন বলেছেন: আরো কিছু জুটি আছে:
নজমুল আলবাব-(ভাবীর নাম ভুলে গেছি।কয়েকটা পোস্ট দিছে)

মাহবুব সুমন-স্বাতী জুটি:(ভাবী বেশ ভালো লেখে,কয়েকটা পোস্ট তো দেখলাম)

জেবতিক আরিফ -অর্না জেবতিক জুটি:(ভাবী রেগুলার না।কিন্তু শুনেছি আগে থেকে লেখালেখি করে।নজমুল ভাইয়ের বন্ধু।

জামাল ভাস্কর-মৌসুম জুটি:(দুজনেই ভালো লেখক।)
১১. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১:৪৭
comment by: আলভী বলেছেন: হোসেইন ভাই> আপনার চেহারার এক কনা পাইলেও একটা জুটি বাইন্ধা ফেলতাম।
১২. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১:৪৯
comment by: আলভী বলেছেন: দৃশা,কিংকর্তব্যবিমূঢ়, রেজওয়ান > অনেক ধন্যবাদ। আপনাদের উত্সাহে সিরিজটি দীর্ঘায়িত করার ইচ্ছা রইল।
১৩. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১:৫১
comment by: হোসেইন বলেছেন: আপনার ব্লগে এসে কমেন্ট করার একটা গোপন কারন আছে।@আলভী।

আপনি যে দিন ফিল্ম বানাইবেন,মানে কমার্শিয়াল ফিলিম আর কি,আমারে হিরু কইরা দিয়েন।দেখেন কেমন মার মার কাট কাট কইরা দেই।
১৪. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১:৫৪
comment by: আলভী বলেছেন: দুষ্টু গান কয়টা রাখতে হবে? @ হোসেইন
১৫. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১:৫৫
comment by: নজমুল আলবাব বলেছেন: আমি কইলাম হোসেইনের লগে লাইনে আছি! ওর মত সুন্দর্য না হইলেও চলনসই আছি!!!

কনফু মিয়ার ভক্ত তালিকায় আমিও আছি।

হোসেইন আমার বউর নামটা খুব সহজ কিন্তু!
১৬. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ২:০৭
comment by: হোসেইন বলেছেন: আলভী ভাই:
দুষ্টু গান রাখা লাগব না।একবার নায়ক হইলে বাইরেই বহুত কাজ সাইরা ফালামু,আপনেরে কষ্ট কইরা আর শুটিং করা লাগব না।
----------------
অফ দ্য টপিক একটা কথা কই।আপনি এই সিরিজের প্রথম পোস্ট দিছেন জেবতিক দা কে নিয়া। তার একটা জোকসের বই আছে,পইড়া দেইখেন। হাসতে হাসতে আপনার কাম সারা হইব।আপনার পৃয় লেখক,তাই আপনাকে ইনফর মেশন দিলাম।(কসম,প্রকাশকের টাকা খাই নাই)


নজমুল ভাই:
অন্যের বউয়ের নাম মুখে আনে কোন গাড়লে।শুনেছি,সিলেটে আপনাদের (হা.মো,জেবতিক আর আপনাদের দলের) বিরাট পাওয়ার।
১৭. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ২:২৮
comment by: নজমুল আলবাব বলেছেন: হোসেইনকি তৃতীয় নয়ন সমৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছে ইদানিং! না ভোদাই! কোন পাওয়ার কার জন্য কিছুই দেখি সে বুঝেনা!!!
১৮. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ দুপুর ১:২১
comment by: আলভী বলেছেন: নজমুল আলবাব ভাই> থ্যাংকস।
হোসেইন> শাহবাগ পাওয়া যায় বইটা?
১৯. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ বিকাল ৫:০৬
comment by: আনোয়ার সাদাত শিমুল বলেছেন: কনফুসিয়াস আমারও প্রিয় একজন ব্লগার। তাকে নিয়ে চমৎকার পোস্টের জন্য ধন্যবাদ!
কনফু গেলো কই???
২০. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ৮:৪৯
comment by: আলভী বলেছেন: আর্মি ধরছে।
২১. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ৯:০১
comment by: কিংকর্তব্যবিমূঢ় বলেছেন: ধইরা বলছে দৌড় দে ...
২২. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ৯:০৬
comment by: আরিফ জেবতিক বলেছেন: আলভী,বইটি আমি পাঠিয়ে দিতে পারি।তবে হোসেইন এর কথা শুনে উতসাহিত হইয়েন না,বেটা একটা চাপাবাজ।আমাকে মেইল করে ঠিকানা দিয়েন।
(প্রকাশক জাগৃতি।আজিজের দোতালায় পাওয়া যাওয়ার কথা।)
২৩. ২০ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ৯:১০
comment by: আলভী বলেছেন: আমি বইটি নিজের পয়সায় কিনতে চাই আরিফ ভাই।
it will be my pleasure

আপনার প্রস্তাবের জন্য ধন্যবাদ। আমি কালেক্ট করে নেব।
২৪. ২১ শে এপ্রিল, ২০০৭ ভোর ৫:০৬
comment by: কনফুসিয়াস বলেছেন: এই পোষ্ট পড়ে আমার মাথায় দুটি সম্ভাবনার কথা ঝিলিক মেরে উঠলো।
সম্ভাবনা ১।। ব্লগে নিশ্চয়ই আরেকটা কনফুসিয়াসের উদয় হয়েছে, এবং এই পোষ্ট তাকে নিয়েই লেখা। কারণ আমার সম্পর্কে একসাথে এত এত ভাল ভাল কথা জীবনেও শুনি নি!
সম্ভাবনা ২।। আলভী আসলে কনফুসিয়াসেরই আরেকটা নিক। :-))

জনতার কাছে দাবী জোরদার তদন্ত চালানো হোক! :-)))

( আলভী, এমনিতে আমি লাজুক প্রকৃতির নই, তবে খানিকটা মুখচোরা আছি। এই পোষ্টের খবর পেয়ে ব্লগে এসে ঘুরঘুর করলাম বেশ কয়েকবার, ভীষন আনন্দ হলো পড়ে, শুধু ধন্যবাদে সেটা শোধ হবার নয়, তবুও আপনাকে ধন্যবাদ।
আরো অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছে হচ্ছিলো, কিন্তু ঠিকঠাক গুছিয়ে উঠতে পারছি না। আসলে এরকম সোজাসাপ্টা প্রশংসা শুনে আমার লেখাতেও খানিকটা তোতলামি চলে এসেছে, সেটা কাটানোর জন্যে আপাতত পালাই। :-))
আপনি ভাল থাকুন। শুভ কামনা। )
২৫. ২১ শে এপ্রিল, ২০০৭ দুপুর ২:১০
comment by: আলভী বলেছেন: আরে কনফু কখন আইলো?

আইল তো আইলোই, বরাবরের মত সাবলীল গদ্য নিয়া আইল।
২৬. ২২ শে এপ্রিল, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:০০
comment by: অনুভূতি শূন্য কেউ একজন বলেছেন: কনফু রে ধইরা মাইরা দেয়া লাগবে ।
পাঠকদের কথা ভাবে না !
২৭. ২২ শে এপ্রিল, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:২৮
comment by: কনফুসিয়াস বলেছেন: অপবাদ দাও আমায়, শুধু এ কারনে ....
২৮. ২২ শে এপ্রিল, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:৫২
comment by: হোসেইন বলেছেন: আমার ধারনা আলভী আসলে আরিফ জেবতিক আর কনফুর কাছ থেকে টাকা খাইছে।

নাইলে অন্যরা যেখানে একটা কমেন্ট করার ভদ্রতা দেখায় না,আলভী সেখানে পুরা পোস্ট মারল এদেরকে নিয়া,এটা সন্দেহজনক।

আপনার উদ্যোগ অব্যাহত থাকুক।@আলভী
২৯. ২২ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ৮:১৪
comment by: অনুভূতি শূন্য কেউ একজন বলেছেন: হোসেইন, তুমি অফ যাও তো ..
এইটা সিরিয়াস পোস্ট ।
তোমারে পরে ৫ দিমু ।
৩০. ২২ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ৮:২৩
comment by: আরিফ জেবতিক বলেছেন: আলভী,চলতে থাকুক পরের পর্বগুলো।
৩১. ২২ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ৮:২৬
comment by: আরিফ জেবতিক বলেছেন: অনুভূতি শূণ্য এটা কী করলেন।হায় হায়,হোসেইনের লগে টক্কর।তাইলে আরো কিছুক্ষন লগইন থাকি।আজ আবারো জমবে মনে হয়।পোস্ট কি আপনি আগে দিবেন না হোসেইন?
(জাস্ট কিডিং।নো সেন্টু প্লিজ)
৩২. ২২ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ৮:৪৮
comment by: দ্রোহী বলেছেন: আলভী ভাই......

আমারে নিয়ে পোষ্ট হবে না?
৩৩. ২২ শে এপ্রিল, ২০০৭ রাত ৮:৫৭
comment by: অনুভূতি শূন্য কেউ একজন বলেছেন: কী যে বলেন না, জেবতিক ।
লগঅফ করেন, যান - ভাবি মাইর দিবে ।

আমি সেন্টু খাইলে
হোসেইন ভাইটি .. আমাকে শেখাবে কি আর আইটি ?
৩৪. ২৩ শে এপ্রিল, ২০০৭ দুপুর ২:০৮
comment by: আলভী বলেছেন: দ্রোহী> সেটা ডিপেণ্ড করছে কত টাকা দিচ্ছেন, তার ওপর:)))

[নো ক্রেডিট কার্ড, নো চেক, আই ওয়ান্ট ক্যাশ:)))]
৩৫. ২৩ শে এপ্রিল, ২০০৭ দুপুর ২:১৫
comment by: সুমেরু বলেছেন: ধন্যবাদ।

কনফুসিয়াস ভালো থাকুক, আরো লিখুক।
৩৬. ০৫ ই মে, ২০০৭ রাত ১১:২৪
comment by: জ্বিনের বাদশা বলেছেন: আমিও ভক্ত । সব্যসাচী টাইপের লেখক ... আর লেখায় কনফিডেন্সটা দেখা যায় পুরোমাত্রায় ... ঈর্ষনীয়

মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ০১, ২০০৯

এইসব সাদা কালো ফ্রেম-

আমার বাকশে থাকতো এতটুকু ছানা মিষ্টি,
আমার চোখের কোণে তোর আটকে থাকা মুখ
আমি বলতাম, বৃষ্টি!

ডাক শুনে হুঁ বলে তুই তাকাতি আমার দিকে,
তোর নীলচে সবুজ স্কার্টে বাদামী ধুলো-
তোর সাদা শার্ট আর সাদাটে ফুল চারদিকে

তোকে ডাকলাম কই, আমি বলতাম, বৃষ্টি নামবে দেখ।
তোর অবাক ভুরু- আচ্ছা পাজি তো-
তোর চোখে টলটলে মেঘ।

আমাদের বাড়ির ঠিক পাশেই, তোদের পাশের বাড়ি,
আমাদের পাশাপাশি ইশকুল, আমাদের রোদ্দুর কাড়াকাড়ি।

আমার তোবড়ানো স্যান্ডউইচ-
তোর বাকশের আলু পরোটা দিলে
আমরা পাশাপাশি বসে, কতগুলো দুপুর উড়ে উড়ে চলে।

আমার বাকশের গোল টিফিনের সাথে,
মাঝে মাঝে থাকতো আমার মন
তুই জানতি, ঠিকই টের পেতিস
তুই আঙুল ছুঁয়ে বসে থাকতি যখন।

সেই অনেক দূর থেকে ভেসে আসা এইসব সাদা কালো ফ্রেম
আমরা দূরান্তে বয়ে যাই, মনে পড়ে আমাদের টিফিন বেলার প্রেম।
-----------------------
২৭/০৮/০৯

শুক্রবার, আগস্ট ২৮, ২০০৯

অনুবাদ প্রসঙ্গেঃ এইবার তবে উলটো পথে চলো-

এখানকার একটা নামকরা দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতা পড়তে গিয়ে সম্ভবত প্রথম মাথায় আসে কথাটা। অথবা তারও আগে, হয়ত ঝুম্পা লাহিড়ি পড়ছিলাম যখন, তখন। অথবা, এখন মনে হচ্ছে আরও খানিক আগে, মার্কেজের গল্পগুলো যখন পড়ছিলাম, সম্ভবত তখনই।

সাহিত্যপাতায় যে গল্পটা পড়ছিলাম, সেটা আবার সে পত্রিকার সাহিত্য আয়োজনে প্রথম পুরষ্কারপ্রাপ্ত। গল্পের শুরুতে আলাদা রঙ ও ফন্টে সে কথা বিশেষভাবে জানান দেয়া, গল্পের মাঝামাঝি আলাদা একটা বাক্সে লেখকের নাতিদীর্ঘ পরিচিতি, এবং গল্পের সাথে মানানসই চমৎকার একটা ছবি। বেশ আগ্রহ নিয়ে পড়তে শুরু করলাম, একজন লেখকের গল্প। ল্যাপটপে গল্প লিখতে গিয়ে তার কাছে গার্লফ্রেন্ডের ফোন আসে, গল্প না গার্লফ্রেন্ড এই দ্বিধায় কেটে যায় গল্পের বাকি অংশটুকু, সবশেষের লাইনে, দেখা যায় ল্যাপটপ খুলে রেখে লেখক বসে, মোবাইলটা সুইচ্ড অফ।
গল্পটা খারাপ লাগে না, পড়ে নিয়ে ভাবি, গল্পটা মন্দ নয়; কিন্তু তারপরেই ভাবি, গল্পটা আসলে কতটুকু ভাল?

ঝুম্পা লাহিড়ি পড়তে গিয়ে এমন হয়েছিলো। খুব ভাল লেগেছিলো ইন্টারপ্রেটার অব মেলাডিস, এই সহজ সরল বর্ণনা, বিষয় বাছাইয়ের সারল্য, সবই। কিন্তু মাথায় ঘুরছিলো ওয়ালীউল্লাহ বা হাসান আজিজুল হকের গল্পগুলোর ধার। তুলনা টানার প্রশ্নই আসে না, আমি ভাবছিলাম অন্য কিছু। ভাবছিলাম, শুধু ইংরেজিতে লেখা বলেই এই গল্পের লেখকেরা বিনা আয়াসেই কেমন করে পৌঁছে গেলেন আমার মতন একজন ভিনভাষীর কাছে।

কদিন আগে কোয়েটজি-র ডিসগ্রেস পড়ছিলাম, এখনো শেষ করিনি, কিন্তু পড়ার সময় খুব ভাল লাগছিলো, বর্ণনাগুলো কি টানটান, হুট করে গল্পের এমাথা ওমাথা এফোঁড় ওফোঁড় করে চিরে দেয়া কিছু দৃশ্যপট। আমার মনে হচ্ছিলো, আমাদের ইলিয়াসের গল্পের যে চমৎকারিত্ব, সেও কি কিছু কম?
আমার খানিকটা দুঃখবোধ হলো তখন। আমাদের ইলিয়াস, মানিক, মাহমুদুল হক, হাসান আজিজুল, এঁরা কেবল আমাদেরই রয়ে গেলেন, যাবেন, পুরো বিশ্বের পাঠকদের কাছে তাঁদের পৌছানো হবে না কোনদিন। কারণ, এনাদের সাহিত্যকর্ম কেবল বাংলায়ই পাওয়া যায়, ইংরেজি বা আর কোন ভাষায় নয়। অথচ যদি এঁদের লেখা পড়তে পেতো পুরো দুনিয়া,তবে বুঝতো, আমাদের এই সোঁদাগন্ধের বাংলা মাটিতে কতই না রত্ন ছড়িয়ে আছে!

মাইকেল মধুসুদন গোত্রীয় কোন ভাবনা আমার মাথায় চেপে বসেছে ভাবার কোন কারণ নাই। আমি বলছি না, আমাদের লেখকদের ইংরেজিতে লেখার দরকার ছিলো।
কদিন আগে সৈয়দ হক এর একটা লেখায় এরকম কিছু পড়েছিলাম, ফজলে লোহানী কোন এক আলাপচারিতায় তাঁকে বলেছিলেন ইংরেজিতে লিখতে। কারণ, ইংরেজির মাধ্যমেই পুরো পৃথিবির কাছে পৌঁছানো যায়। সৈয়দ হক, স্বভাবতই এ কথা কানে নেননি। আমারও সেই একই কথা। আমাদের লেখকদের ইংরেজিতে কেন লিখতে হবে? কেন তাঁদের লেখাগুলোকেই আমরা দায়িত্ব নিয়ে ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিবো না?

অনুবাদ সাহিত্য আমাদের ভাষায় এখন পোক্ত আসন করে নিয়েছে। বিশ্বের নানান ভাষার ক্লাসিক বা শ্রেষ্ঠতম গল্প-উপন্যাসগুলো আমরা অনুবাদের কল্যাণে চট করে বাংলায় পড়ে ফেলতে পারছি। এ কারণে, আমি ব্যক্তিগতভাবে, আমাদের অনুবাদকদের কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমি ভাবছি, অনুবাদের ক্ষেত্রে এবার বোধহয় আমাদের উলটো পথে হাঁটবার সময় হয়ে এসেছে। বিশ্বসাহিত্যের বাংলা অনুবাদই শুধু নয়, এখন থেকে আমাদের বাংলা সাহিত্যর ইংরেজি অনুবাদ প্রকল্প নিয়েও ভাবা উচিৎ।

মার্কেজ পড়া শুরু করার পরে এই ভাবনাটা একটা পাকাপাকি আসন পেল মাথায়। আমি দেখলাম, মার্কেজ কি দারুণ ভাগ্যবান। উনি নিজের ভাষায়ই লিখেন, কিন্তু লিখবা মাত্রই সেসব অনুবাদ হয়ে চলে আসে আমাদের কাছে। রাশানরা একসময় পৃথিবি জুড়ে এই অনুবাদ প্রকল্প ছড়িয়ে দিয়েছিলো, তাদের গল্প-উপন্যাস, রূপকথা, সবকিছুর নানান ভাষার অনুবাদ পাওয়া যেত সবখানে। তাহলে আমরা পারবো না কেন? এরকম উদ্যোগ সরকারী বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নেয়া কি একেবারেই অসম্ভব?

আমি এখনো জানি না, বুঝতে পারি, অনেক বড় একটা প্রকল্প হয়তো এটা, হয়ত অনেক অর্থের প্রয়োজন। তবু আমার স্বপ্ন, কখনো যদি সুযোগ পাই, আমাদের ভাষার শ্রেষ্ঠ কাজগুলিকে অন্ততপক্ষে ইংরেজিতে অনুবাদ করার একটা উদ্যোগ অবশ্যই নেব।
আমার এরকম স্বপ্ন দেখতে ভাল লাগে, কাম্যুর যে আগন্তকের দুঃখে এই সুদূরে বসে আমি ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ি, অথবা মার্কেজের যে কর্নেলের পাশে বসে একটা কখনো-না-আসা চিঠির অপেক্ষা করি, তেমনি করেই হয়ত কোন একদিন সেই জর্মন বা স্পেনের কোন এক জানালায় বসা কোন এক কিশোর ইলিয়াসের হাড্ডি খিজিরের সাথে ঘুরে বেড়াবে ঢাকার গলি-ঘুপচি, অথবা মাহমুদুল হকের আব্দুল খালেকের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে রেখাকে ডেকে বলবে, গিরিবালা, ও গিরিবালা, তোমার এত রাগ কেন গো গিরিবালা?

ছোটবেলায় রচনা বইয়ে পড়েছিলাম, যদি এক কোটি টাকা পাইতাম, তবে সকল গুড় ভাত দিয়া খাইতাম।
আমি আজ ভাবি, এক কোটি টাকা সত্যিই যদি পাইতাম, তবে বাংলা সাহিত্য অনুবাদ করে দুনিয়াময় ছড়িয়ে দিতাম।

বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২০, ২০০৯

প্রকাশায়তন নিয়ে টুকটাক ভাবনা-

১।
বিদেশী বইগুলো সরাসরি ইংরেজিতে পড়া শুরু করি মূলত দেশের বাইরে এসে। তবে খুব আনন্দ নিয়ে নয়, বাংলা বইয়ের যোগান ছিলো না পর্যাপ্ত, এদিকে বই না পড়লে মাথায় তালগোল লেগে যায়, তখুনি স্থানীয় গণপাঠাগারে গিয়ে বই আনা শুরু করি। সেবা প্র‌কাশ‌নীর অনুবাদের পর সেই প্রথম বিদেশী সাহিত্যের সাথে ভালমতন মোলাকাৎ হলো, লেখকের নাম ধরে ধরে বই শেষ করার পুরনো অভ্যাসটা আবার ভাল মতন জাগিয়ে তুললাম।

সাহিত্যের প্রসঙ্গ অবশ্য আজ তুলবো না। সম্প্রতি প্রকাশায়তনের আত্মপ্রকাশ সম্পর্কিত ঘোষণার পর থেকে মাথায় একটা জিনিস ঘুরছে, তাই নিয়ে আলাপ জুড়বো বলেই আজ লিখতে বসা।
এখানে এসে পড়া বইগুলো হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখি, প্রায় অনেকগুলো উপন্যাস বা গল্পের বইয়ের লেখক ছাড়াও সম্পাদক ( এডিটর এর বাংলা এ ক্ষেত্রে কী হবে?) বলে একজন আছেন সেখানে।
পত্র-পত্রিকার বাইরে বইয়ের সম্পাদ্ক হিসেবে কাউকে দেখতে আমরা অভ্যস্ত নই আসলে। বইয়ের সম্পাদক যিনি, সেটাও ক্ষেত্র বিশেষে, যেখানে আসলে তিনি সংকলক। হয়ত লোকান্তরিত কোন কবি বা সাহিত্যিকের লেখা নিয়ে একটা সমগ্র বেরুবে, সেখানে লেখাগুলো একসাথে জড়ো করে একটা জবরদস্ত ভুমিকা লিখে দেয়া আমাদের সংকলকের দায়িত্ব।
আমি একটু অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, বিদেশি বইগুলোয় ঠিক এরকমটা হচ্ছে না। এখানে একটা পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস বা গল্প সংকলনের বই, লেখকের জীবিতাবস্থায়ই একজন সম্পাদকের নাম সহ প্রকাশিত হচ্ছে। আমার আগ্রহ জন্মালো, এই সম্পাদকের ভূমিকাটা আসলে কী?

২।
লেখালেখি সম্পর্কিত প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা টিক্ষা না থাকায় হুট করে বুঝে নিতে একটু সময় লাগলো। শেষমেষ লাইব্রেরি ঘেঁটে ধরে বেঁধে নিয়ে আসলাম বেশ কিছু ক্রিয়েটিভ রাইটিং সংক্রান্ত বই। পড়ে টড়ে টের পেলাম যে এসব দেশে সম্পাদকের বেশ কদর আছে। একজন লেখক একটা বই লিখে হুট করে ছাপিয়ে হয়ত ফেলতেই পারেন, কিন্তু এটা এখানকার, যাকে বলে সিস্টেমেটিক ওয়ে, সেটা না। সাধারণত যেটা হয়, লেখক সেটা প্রকাশকের দপ্তরে পাঠাবার আগে কিংবা পরে সেই পান্ডুলিপিটি একজন সম্পাদকের হাতে যাবে। সম্পাদক বাছাইয়ের কাজ লেখক বা প্রকাশক যে ইচ্ছা করতে পারেন। সম্পাদক তখন পান্ডুলিপিটি পড়ে তার মতামত জানাবেন লেখককে, এবং তারপরে লেখক ও সম্পাদকের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি হবে লেখাটির চূড়ান্ত কপি।

এটা অবশ্য একেবারেই পুঁথিগত বিবরণ, আদতেই এরকম হয় কি না জানি না। তবে কয়েকদিন আগে সালমান রুশদির একটা লেখার অনুবাদ করছিলেন একজন সচল, সেখানেও দেখলাম সম্পাদকের উল্লেখ আছে। সম্ভবত মিডনাইট়স চিল্ডরেন বইটি প্রসঙ্গে সম্পাদকের ক্রিয়াকলাপের কথা বলেছিলেন তিনি।

৩।
আমি ভাবছিলাম, বাংলাদেশে এই ব্যাপারটার চর্চ্চা আছে কিনা। সম্ভবত, নেই।
সেটার কারণ অনেক হতে পারে। যেমন ধরা যাক লেখকদের স্বাধীনতাবোধ। অনেকেই নিজের লেখার উপরে এত বেশি আস্থা রাখেন যে আর কোন সম্পাদকের কলমের সামনে তাঁদের পান্ডুলিপিকে রাখতে রাজি হন না। বড় বড় লেখকদের কথা বাদই দিলাম, এই যে আমি একজন অলেখক, সেই আমিও ক্লাশ এইটে পড়বার সময় একটা দেয়ালপত্রিকার জন্যে জমা দেয়া গল্পে বাংলা ম্যাডামের কলম চলায় গল্প ফেরত নিয়ে এসেছিলাম। এখন মনে পড়লেও হাসি পায়, কারণ, এটা অনুচিৎ হয়েছিলো, এখন বুঝতে পারি।

আরেকটা কারণ হতে পারে, খরচ।
পান্ডুলিপি থেকে বই হিসেবে বের হওয়া পর্যন্ত অনেক সময় লেগে যায়, অনেক খরচও পড়ে। এর মাঝখানে আবার একজন সম্পাদককে নিয়ে আসাটা সময় ও অর্থ দুইদিক হয়তো একটু ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে।

তবে বাংলাদেশে এরকম কিছু আসলেই প্রয়োজন আছে কিনা, সেটা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
গতকালই একটা বইয়ের কথা লিখেছি এখানে। মেজর হামিদুল হোসেন তারেক বীর বিক্রমের লেখা একাত্তরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। এই বইটি পড়ার সময় আমার মনে হয়েছিলো, যদি বই ছাপানোর আগে কাউকে দিয়ে পান্ডুলিপিটি একটু সম্পাদনা করা যেত, তাহলে বেশ হতো। সবমিলিয়ে এমনিতেই খুব চমৎকার একটি বই এটি, কিন্তু ভাষা বা শব্দ নিয়ে আরেকটু যত্ন করা গেলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই বইটি দ্বিধাহীন ভাবে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হয়ে দাঁড়াতো।

৪।
সচলায়তন থেকে প্রকাশনা বিষয়ে একটা চমৎকার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, প্রকাশায়তন নাম দিয়ে। এ সংক্রান্ত সন্দেশের পোস্টটিতে সচলদের করা মন্তব্যগুলো পড়লেই বোঝা যায় ব্যাপারটি বেশ সাড়া ফেলেছে, অনেকের মনেই প্রকাশায়তন থেকে বই বের করার ইচ্ছে জন্মেছে।
প্রকাশায়তন বইয়ের জগতে শুরু থেকেই ব্যতিক্রমী অনেক উদাহরণ তৈরি করবে বলে আশা করছি, সেই সাথে ভাবছি, প্রকাশিতব্য সব বইগুলো সম্পাদক বা সম্পাদকমন্ডলীর সহায়তা বা পরামর্শ নিয়ে আরও নিখুঁত হিসেবে বের করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে কি? অবশ্যই সেটা হবে লেখকের সম্মতিক্রমে। এবং এখানে সম্পাদক কোনভাবেই কোন জোরজবরদস্তি খাটাবেন না, বরং পান্ডুলিপি পড়ে লেখক ও প্রকাশায়তনকে তার মতামত জানাবেন। অতপর সেই মতামতের আলোকে লেখক ও প্রকাশায়তন ঐকমত্যে পৌঁছালে পরে বই প্রকাশিত হবে।
মানসম্মত বই প্রকাশের ক্ষেত্রে এরকম কোন উদ্যোগ নেয়া হলে কেমন হবে আসলে? আমার ব্যক্তিগত ধারণা ব্যাপারটি খুবই ভালো হবে, হয়ত এর সুফল প্রতিফলিত হলে আস্তে ধীরে এটাই আমাদের প্রকাশনা জগতের একটা সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়াবে।

আপনার সন্তানকে অন্তত এই বইটি পড়তে দিন-

একদম পলকা একটা বই। বড় বড় হরফে ছাপা সবমিলিয়ে মাত্র ৬৪ পৃষ্ঠা। তার নিজস্ব ওজনের সিংহভাগই হচ্ছে শক্ত বাঁধাইয়ের কল্যাণে। আমার খাবার টেবলের পাশে রাখা ওজন মাপার মেশিনটায় তুললে কাঁটা খুব একটা নড়ে চড়ে না, দেখেছি। কিন্তু পড়তে গিয়ে যতবারই বুকের ওপর রেখেছি, মনে হয়েছে, এর চেয়ে ওজনদার বা ভারী কিছু বোধহয় আর নেই!
বইয়ের নাম, একাত্তরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। মেজর হামিদুল হোসেন তারেক বীর বিক্রমের লেখা বই। একাত্তর সালে লেখক নিজেও কমবয়েসী ছিলেন, হায়ার সেকেন্ডারীতে পড়তেন। তবু সেই সময়েই তিনি যুদ্ধে চলে যান; এবং দেশের নানা জায়গায় তিনি সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন।
এই বইটি অবশ্য মেজর হামিদুল হোসেনের নিজের গল্প নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি বেশ কয়েকজন কিশোরের সংস্পর্শে আসেন যারা নানা ভাবে যুদ্ধের ময়দানে তাঁকে সহযোগীতা করেছিলো। সেইসব কিশোরদের নিয়ে স্মৃতিচারণ করেই এই বই।

সাতটি আলাদা অনুচ্ছেদে সাতজন কিশোর কিশোরীর কথা আছে এখানে। রমজান আলী, শশীলাল চর্মকার, নুরু নাপিত, পুতুল, আজিজ মন্ডল, বারেক ও তোতা।
মেজর হামিদুল হোসেন নিয়মিত সাহিত্যিক নন। এই বইটির ভাষায় তাই তেমন কোন মাধুর্য্য নেই। একদম সোজা সাপ্টা লেখা। লেখকের বাংলাও খুব যে ভাল নয়, সেটাও স্পষ্ট হয় কিছু কিছু শব্দের ব্যবহার বা বাক্যের গঠন দেখলেই। কিন্তু, এটা এমনই একটা বই, ভাষার সৌন্দর্য্য যেখানে খুব একটা গুরুত্ব বহন করে না। এই বইয়ের ভাষার উৎপত্তি কলমের মাথা থেকে নয় বলেই বোধ হয়। এটার উৎপত্তি ভিন্ন কোন জায়গা থেকে, বুকের খুব গভীরের, প্রাণের কাছাকাছি কোন চোরাকুঠুরি থেকে।

শশীলাল চর্মকার বা নূর মোহাম্মদ নাপিত, যারা পরিবার হারিয়ে এখানে ওখানে ঠোকর খাচ্ছিলো, পরে লেখকের দলের সাথে জড়িয়ে পড়ে এরা, নানা অভিযান সফল করে তুলতে বিস্তর ভূমিকা রাখে। পুতুল নামে এক কিশোরীর কথা আছে, যে পাকবাহিনীর গায়ে গ্রেনেড ছুঁড়ে বাঁচিয়ে দিয়েছিলো কজন মুক্তিযোদ্ধাকে। এরকম এক এক করে প্রত্যেকের অসীম সাহসিকতার কথা বলা এই বইয়ে।

রমজান আলী নামে এক কিশোরের কথা বলেছেন লেখক, রাজাকার সন্দেহে লেখকের দলের মুক্তিযোদ্ধারা যাকে ধরে এনেছিলো। পরে আসল ঘটনা জানা যায়। বিহারীরা ওর পুরো পরিবারকে মেরে ঘরদোর জালিয়ে দেয়। পরে যার আশ্রয়ে যায় রমজান, তার দোকানে এক রাজাকার কমান্ডারের আনা গোনা ছিলো, ওখান থেকেই রমজানকে নিয়ে যায় সে। সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে এসে পুর দস্তুর যোদ্ধা বনে যায় সে। শত্রুপক্ষের খবর নিয়ে আসে, সরাসরি যুদ্ধেও অংশ নেয়। এবং একটা অপারেশনে গিয়ে রমজান পাকসেনাদের পাতানো মাইনে পা দিয়ে ফেলে, তার দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। শহীদ হয় কিশোর মুক্তিযোদ্ধা রমজান।

বইয়ের প্রতিটি কিশোর মুক্তিযোদ্ধার কথা পড়তে গিয়ে গলা বুজে আসে। কী ভাগ্য আমাদের যে শুধু কষ্ট করে আমাদের একটু জন্মাতে হয়েছে, সাথে সাথে বিনেপয়সায় একটা দেশ পেয়ে গেছি আমরা। অথচ এই দেশটাকে আনবার জন্যে কত কত মানুষের রক্ত অশ্রু আর ত্যাগ যে জড়িয়ে আছে, তার কিছুই আমরা জানি না!

এমাজন ডট কমে দেখলাম হ্যারি পটারের নতুন বইটার দাম বাংলাদেশী টাকায় সাড়ে নয়শো টাকা। আর একাত্তরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা বইটির মূল্য ঠিক তার ষোল ভাগের একভাগ, মাত্র ষাট টাকা।
উঁহু, যারা ভাবছেন হ্যারিকে পছন্দ করি না আমি, ভুল ভাবছেন। রূপকথার আমি আজীবন ভক্ত, হ্যারি ও তার বন্ধুরা আমার কম প্রিয় নয়। আজকের শিশুরা হ্যারি পটার পড়তে পড়তে বড় হোক, এ নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। আমি শুধু চাইবো, হ্যারি পটারের সাথে সাথে আপনারা আপনাদের সন্তানের হাতে একটি করে একাত্তরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা বইটিও তুলে দিন।

রূপকথার জাদুকর কিশোরকে স্বপ্নের নায়ক ভেবে নিক নতুন প্রজন্ম, সমস্যা নেই, কিন্তু সেই সাথে জীবন যুদ্ধের যারা সত্যিকারের নায়ক, তাদের যেন জানতে পারে তারা, চিনতে পারে; তাতে যেন ভুল না হয় আমাদের।

শুক্রবার, আগস্ট ০৭, ২০০৯

সাপুড়ে লেখক, মাহমুদুল হক?

মাহমুদুল হকের "কালো বরফ" পড়তে পড়তে, সম্ভবত, বার তিনেক আমাকে পাতা উল্টে প্রথম প্রকাশের তারিখটা দেখে নিতে হয়েছে। ১৯৯২ সালে বেরিয়েছিলো এই বই। ঠিক সতের বছর আগে। কিন্তু তারচেয়েও বড় ব্যাপার হলো, এটির রচনাকাল আরও পেছনে, অগাস্ট ১৯৭৭! তিরিশ কিংবা তারও বেশি বছর বাদে, আমার নিজের চেয়েও বেশি বয়েসী এই বইটা হাতে নিয়ে আমি অবাক হয়ে ভাবছি, মাহমুদুল হক কেমন করে এত বছর আগেই এরকম একটা চির-আধুনিক উপন্যাস লিখে গেলেন!

চারপাশের পাওয়া বইগুলোকে চিরকালই আমি উঁইপোকার চেয়েও বেশি যত্নে আর আদরে গিলে নিয়েছি। লেখক বা বইয়ের সংখ্যা হিসেব করলে সেটা অ-নে-ক ল-ম-বা একটা লিস্টি হয়ে দাঁড়াবে কোন সন্দেহ নেই। এবং, কে জানে, মনের গভীরে কোথাও এই নিয়ে হয়তো কোন আত্মতৃপ্তিও কাজ করে আমার মধ্যে। কিন্তু সেটি যে আসলে অনেকটা বোকার স্বর্গের মতই ব্যাপার, এটা টের পেলাম সম্প্রতি "প্রতিদিন একটি রুমাল" আর "কালো বরফ" পড়ার পরে।

লেখায় জাদু-টাদুর কথা শুনেছি অনেক। কালো বরফের প্রতিটা পাতায় আমি মনে হলো সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। উত্তম পুরুষে লেখা একটানা উপন্যাস। আবার ঠিক একটানা নয়। একটা জীবনেরই দুটি সময়ের কথা পরপর অথবা পাশাপাশি বলে যাওয়া, অবলীলায়। এরকমটা অবশ্য অনেক দেখেছি। এই মুহুর্তেই মনে পড়ছে দূরবীন এর কথা, শীর্ষেন্দুর, আমার খুবই পছন্দের একটা লেখা। কিন্তু সেখানে একটা আয়োজন ছিল। একটা মানুষের জীবনের গল্প ফুটিয়ে তুলবার জন্যে যে বিপুল বিস্তারের দরকার, যতখানি আড়ম্বরের দাবীদার সেটা, শীর্ষেন্দু সেসবে একেবারেই অকৃপণ। কালো বরফে তার একদম উল্টো। কোন আয়োজন নেই, যেন, আমি বলে যাচ্ছি, তুমি শুনলে শুনো না শুনলে নেই, এরকম একটা ড্যাম কেয়ার ভাব।

একটু আগে বলেছিলাম উত্তম পুরুষে লেখা, আসলে পুরোপুরি তা নয়। শৈশবের অংশটুকু উত্তম পুরুষে, কিন্তু সাথে সাথেই বড় হয়ে যাবার অংশটুকু লেখকের বয়ানে বলা। কিন্তু কোথাও বেসুরো লাগেনি। বেসুরো, এই শব্দ ব্যবহারের কারণ, প্রতিটা চমৎকার গল্প বা উপন্যাসই আমার কাছে খুব যত্ন নিয়ে গাওয়া গানের মত মনে হয়। ঠিক সুরে, তালে মিলিয়ে মিশিয়ে একটা চমৎকার সঙ্গীত। কালো বরফও তাই।

প্রচ্ছদ আকর্ষণীয় নয়, রঙের বাহুল্য চোখে লাগে। আমাদের এখনকার বইগুলোর মত ব্যাক কাভারে ছবিসুদ্ধ লেখক পরিচিতি নেই। কিন্তু বাইরের সৌন্দর্যের পুরো ঘাটতি পুষিয়ে দিয়েছে বইটার ভেতরকার সৌন্দর্যটুকু।

হক সাহেব শুনেছি ব্যক্তিজীবনে রত্ন বা পাথর নিয়ে কাজ করতেন। ওনার লেখা পড়ে আমার সন্দেহ হচ্ছে, উনি গোপনে গোপনে সাপুড়ে ছিলেন না তো? তা নইলে এরম অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তির খোঁজ উনি কেমন করে পেলেন! লেখা পড়ে যাই, কিন্তু লেখা তো নয় যেন সাপের চোখে চোখ ফেলে বশ হয়ে গেছি!
তো পড়ে টড়ে, সবমিলিয়ে, নিজের প্রতি আমার গভীর অনুকম্পা হলো। এরকম দুর্দান্ত লেখা পড়তে আমার জীবনের সাতাশটা বছর খরচ করে ফেললাম, দুর!
আমায় দিয়ে আসলে কিসসু হবে না।

বুধবার, জুলাই ০৮, ২০০৯

আবুল হাসান

এই বুড়ো বয়সে প্রায় বালকবেলার মতই উল্লসিত হয়ে উঠেছি, যখন কাগজের প্যাকেট খুলে দেখি, সেখানে চুপটি করে আমার জন্যে বহুকাল ধরে অপেক্ষা করছেন আবুল হাসান।
আমার শৈশব বা কৈশোর কেটেছে আবুলহাসানবিহীন, এবং আশ্চর্য হলো তাতে আমার কোন দুঃখও নেই। প্রাপ্তবয়স্ক হবার আগে মদের পেয়ালা মুখে তোলা মানা, এটা কে না জানে? এই দুপুর-রাতে তাই মাঝারি স্বাস্থ্যের বইটার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে অজান্তেই কেমন নেশাতুর হয়ে পড়ি।
মজার ব্যাপার হলো, আবুল হাসানের নাম প্রথম ভালভাবে শুনি মির্জাপুরের সাকেব ভাইয়ের কল্যাণে। তিনি তখন প্রবল বিক্রমে সামহোয়ারইনে ব্লগিং করেন, কিন্তু আসল নামে নয়। একটা অদ্ভুত নিকে- চামেলি হাতে নিম্নমানের মানুষ। এই লম্বা ও আজব নিকের খোঁজ নিতে গিয়ে প্রথম শুনলাম আবুল হাসানের নাম, তারপরে পড়া হলো তাঁর আশ্চর্য সব কবিতা।

সাকেব ভাইই প্রথম কোট করেছিলেন, ঝিনুক নীরবে সহো, সহে যাও, ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও।
তারপরে কোত্থেকে কেমন করে খুঁজে পাই সেই বিখ্যাত কবিতা, আসলে আমার বাবা ছিলেন নিম্নমানের মানুষ…। পড়ে টড়ে আমি বেমক্কা তব্দা খেয়ে বসে ছিলাম অনেকক্ষণ।

এবার তাই দেশ থেকে বই আনাবার সুযোগ পেতেই লিস্টির একদম শুরুতে রেখেছিলাম আবুল হাসানের কবিতা সমগ্রের নাম।
অবশেষে ঠিক যেন আকাশ থেকে টুপ করে আমার হাতে চলে এলো বইটা।

এটা একটা আশ্চর্য বোধ, যেন তেপান্তরের মাঠের মধ্যিখানে কেউ হঠাৎ করে আমার হাতে কোন অমূল্য রত্নভান্ডার ধরিয়ে দিয়ে উধাও হয়ে গেছে, আমি পাতার পর পাতা মুগ্ধ চোখে পড়েই যাচ্ছি কেবল। সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে- এই কবিতার নামও- আবুল হাসান!

একটু বোধহয় মাতলামীতে পেয়েছে আমাকে আজ। আপাতত সদ্য পড়া একটা চমৎকার কবিতা শুনিয়ে বিদেয় হই।

নিঃসঙ্গতা

অতটুকু চায়নি বালিকা!
অত শোভা, অত স্বাধীনতা!
চেয়েছিল আরো কিছু কম,
আয়নার দাঁড়ে দেহ মেলে দিয়ে
বসে থাকা সবটা দুপুর, চেয়েছিল
মা বকুক, বাবা তার বেদনা দেখুক!

অতটা চায়নি বালিকা!
অত হৈ রৈ লোক, অত ভিড়, অত সমাগম!
চেয়েছিল আরো কিছু কম!

একটি জলের খনি
তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি, চেয়েছিল

একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!

শুক্রবার, জুলাই ০৩, ২০০৯

সদ্য পড়া বইঃ শমন শেকল ডানা

হাসান ভাইয়ের বইটা হাতে আসতে বেশ লম্বা সময় লেগে গেলো।
বইমেলার পরপর একবার বই আনিয়েছিলাম কিছু, এবারে দেশ থেকে আরও কিছু বই আনালাম। বইগুলো হাতে পেয়ে দেখি একেবারে হাসান-হোসেনময় বই সব! আবুল হাসান আর আবু হাসান শাহরিয়ারের কবিতার কালেকশান, হাসান ভাইয়ের শমন শেকল ডানা আর আকমল হোসেন নিপুর জলদাসের মৎস্য ঘ্রাণ। শমন শেকল ডানাই পড়া শেষ হলো সবার আগে।

বইটার প্রচ্ছদেই বিষণ্ণ ছাপ রয়েছে একটা, মন খারাপ করিয়ে দেয়া একটা অনুভুতি, আশ্চর্য এই যে এই অনুভুতিটাই পুরো বইটুকু পড়ার সময় হাত ধরে হেঁটেছে আমার সাথে।

ফ্ল্যাপের ভূমিকাটুকু কে লিখেছে জানি না, কিন্তু খুব ভাল লিখেছেন। বই পড়তে শুরু করার আগেই বেশ ভাল রকম প্রস্তুত করিয়ে দেয় মনটাকে।
বইয়ের গল্পটা একেবারেই আমাদের চেনাজানা গল্প। গত কবছরে, বা তারও আগে থেকে এখন পর্যন্ত, বা আর কোন অজানা ভবিষ্যত পর্যন্ত হয়ত এই গল্পের ভেতরের ঘটনাগুলোকে ঘটতে দেখেছি এবং দেখতে থাকবো আমরা। বামপন্থী মিছিলের সামনে দাঁড়ানো ছেলেটি সামরিক বাহিনিতে যোগ দিয়ে কেমন করে বদলে যায়, অথবা রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়িকা নাসিমা আপা মৌলবাদী স্বামীর কবলে পড়ে কেমন করে বোরকার অন্তরালে চলে যায়। পাহাড়ের মানুষদের উচ্ছেদের গল্পও আছে এখানে, ধর্মের ব্যবধানে সংখ্যায় কম যারা, অত্যাচারিত হয়ে তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাবার দুঃখও আছে। একদম, পত্রিকার পাতায় প্রতিদিনের খবরগুলোই গল্প হয়ে এসেছে এ বইটিতে।
তবে এখানেই খানিকটা সমস্যা আছে। বইয়ের গল্পটি আমাদের জানা, এবং বইটি পড়ে শেষ করার পর আমি আর নতুন কোন অনুভবে আন্দোলিত হইনি। এই জায়গাটায় সম্ভবত হাসান ভাই কিছু করে দেখাতে পারতেন।
হাসান ভাইয়ের লেখার স্টাইল চমৎকার, খানিকটা ফিচারধর্মী, অবশ্য একথা বললে সরলীকরণ হয়ে পড়ে। আরেকটু ভালভাবে বললে, উনি যা করেন, একটা স্টেটমেন্ট দেন, তারপর সেটাকে ঘিরেই আবর্তিত হতে থাকে গল্পের বুনোট।

একটু অবাক করা ব্যাপার হলো, বইটির মধ্যে তাড়াহুড়োর ছাপ পেয়েছি আমি। অথচ এমনটা হবার কথা নয়। গ্রন্থ হিসেবে বের হবার কথা ছিলো গতবইমেলায়, তার মানে তখুনি একটা বই হিসেবে এটা তৈরিই ছিলো, কিন্তু বের হয়েছে এবারের বইমেলায়। মাঝখানে অন্তত এক বছর সময় ছিলো, এর পরেও বইটির কোথাও তাড়াহুড়োর চিহ্ন আশা করিনি।

গল্পের যে মূল চরিত্র, মানে কথক, তার সাথে একাত্ম বোধ করার জন্যে যথেষ্ঠ সময় দেননি লেখক। পড়ছিলাম, মনে হচ্ছিলো, খবরের কাগজের পাতা ওল্টাচ্ছি যেন, ঘটনাগুলোও আমার পরিচিত, জানা, কিন্তু কোনটাই যেন ঠিক আমার ঘটনা নয়, যেন দেয়ালে লাগানো স্ক্রাপবুকের মত করে আঠা দিয়ে সাঁটা বিচ্ছিন্ন কিছু ছবি দেখে চলেছি আমি। এই ব্যাপারটাতেই আমার মনে হয়েছে, আরেকটু যদি আপন আপন করে তুলতেন চরিত্রটাকে, আরেকটু যদি আমি-আমি!

অবশ্য, বইয়ের পরিচিতি দিতে গিয়ে ফ্ল্যাপে বলা হয়েছে, এটি একটি ডকুফিকশন। এ কথাটা মাথায় রাখলে উপরের অনেক অভিযোগই খন্ডিত হয়ে যায়, কিন্তু তারপরেও আমার মতে, এটিতে ফিকশনের চেয়ে ডকু-র পাল্লাই ভারী থেকে গেছে!

আর, বইয়ের চেহারা ছবি নিয়ে বেশ দুঃখ পেলাম। খানিকটা এতিম এতিম লেগেছে বইটিকে। প্রকাশনায় যত্নের খানিকটা অভাব ছিলো যেন। বইয়ের ফরম্যাটিং অমনোযোগের ছাপ নিয়ে এসেছে, কাটা বা বাঁধাইয়েও পাশ মার্ক পাবে টেনেটুনে। ঠান্ডা, বা ভন্ড- এ ধরণের শব্দগুলোর "ন্ড" আসেনি একটাও, ফ্ল্যাপের সব গুলো "ণ" সপাটে হয়ে গেছে "ন", আর মায়িশা নামটা অনেক জায়গায় হয়ে গেছে মালশা! বাংলা হরফে লেখা ইংরেজি যে বাক্যগুলো কথোপকথনে ব্যবহৃত হয়েছে, তাতেও রয়ে গেছে অনেক ভুল। আরও দুঃখ পেয়েছি, বইয়ের বিভিন্ন পৃষ্ঠায় বিভিন্ন রকমের স্পেসিং দেখে, দু লাইনের মাঝের ফারাক কোথাও কম, কোথাও বেশি। হাতে এক বছর পাবার পরেও বইটির উঠ-ছেঁড়ি-তোর-বিয়া ধরণের গেটআপ মনঃপুত হয়নি আমার।

দীর্ঘ অপেক্ষার পরে বইটি হাতে পেয়ে মনে হলো, লেখক ও প্রকাশক এই বেচারা পাঠকের উপরে সুবিচার করেননি তেমন।
তবে আমি জানি, খুব ভাল করেই জানি যে হাসান ভাইয়ের হাতে জাদু আছে। পরবর্তী বইয়েই তিনি আবার তাঁর মত করে ফিরে আসবেন বলেই আশা রাখি।

বৃহস্পতিবার, জুন ০৪, ২০০৯

আহত ভারতীয় ছাত্র এবং অজিদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ-

আমার সহকর্মী ভারতীয় ছেলেটা আমাকে উত্তেজিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি গিয়েছিলে আজ, ফেডারেশন স্কয়ারে?
আমি কী একটা খুটখাট করছিলাম কম্পিউটারে। ওর দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, ঘটনা খারাপ, পাশের চেয়ার দেখিয়ে বসতে বলে জানালাম, না যাইনি, আমি তো সকাল থেকেই এখানে। কী খবর বলো তো?
ও বেশ উঁচু গলায় হড়বড় করে অনেক কথা বলে গেলো। সারমর্ম এরকম, আজ নাকি প্রায় হাজার পাঁচেক ভারতীয় ছাত্র প্রোটেস্ট করেছে সেখানে। পুলিশের সাথে ব্যাপক কথা কাটাকাটি হয়েছে। প্রায় নাকি মারামারি হবার জোগাড় কয়েকবার। ছাত্রদের অভিযোগ ভিক্টোরিয়ান পুলিশ ততটা সক্রিয় নয় নিরাপত্তার ব্যাপারে।

মাত্র কদিন আগের ঘটনা। একটু রাতের দিকে স্টেশানে নেমে বাড়ি ফিরছিলো কয়েকজন ভারতীয় ছাত্র। সেখানে হুট করেই ওদেরকে আক্রমণ করে বসে বেশ কিছু ককেশিয়ান যুবক। আক্রমণটা হেলা ফেলা করার মত নয়। মেরে ধরে সাথে যা ছিলো সবই কেড়ে নেয়া হয়েছে, এবং সেই সাথে দু জনকে মারাত্মক আঘাত করা হয়েছে স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে। আমি সেদিন টিভিতে ভিডিও দেখেছিলাম কিছু, দেখে শিউরে উঠেছিলাম, বুকের মাঝামাঝি থেকে একেবারে পেটের তলদেশ পর্যন্ত চিরে ফেলেছে একজনের। তার অবস্থা ভয়াবহ। টিভিতেই দেখালো যে ডাক্তার বলছে বাঁচবে কি না নিশ্চিত নয়। অন্যজনের অবস্থাও তদ্রুপ।

ঘটনার আকস্মিকতায় লোকজন বেশ চমকে গেছে এখানে। ভারতীয় ছাত্ররা বেশ ক্ষেপে গেছে, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তারা খোলাখুলি জানিয়ে দিয়েছে, অস্ট্রেলিয়রা বর্ণবাদী।
ভিক্টোরিয়ান পুলিশ খুবই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আছে এই মুহুর্তে, তারা বলছে, ঘটনার কারণ আসলে বর্ণবাদ নয়, এর পেছনে দায়ী এলকোহল।

আমি যা বুঝি, দুই পক্ষই মোটামুটি ঠিক।
আক্রমণ যারা করেছে, তাদের সোজা বাংলায় আমরা জান্কিজ বলি। এরা সারাদিন মদ খেয়ে পড়ে থাকে, মূলত রেল স্টেশানের আশপাশেই। অথবা ড্রাগ নেয় কিছুটা আড়ালে পড়া জায়গাগুলোয় দাঁড়িয়ে। এবং পুলিশ দেখলেই ভদ্র হয়ে যায়, অথবা দৌড়ে পালায়। পুলিশের দাবি সত্য, কারণ আক্রমণ করেছে এরকমই জান্কিজদের একটা দল। কিন্তু ছাত্রদের কথাও সত্য এ জন্যে যে, এই জান্কিজরা ওদের ধরেছে ওরা বাদামী চামড়ার বলেই। সাদা চামড়া হলে কখনোই ধরতো না। এ ক্ষেত্রে আমি বলবো, জান্কিজরা বর্ণবাদী নয় ঠিক, অনেকটা সহজ শিকার হিসেবে বাছাই করেছে ছাত্রদের।

আমি নিয়মিত পত্রিকা দেখতে পারিনি কদিন। এই ঘটনা নিয়ে যা কিছু শোনা, বেশিরভাগই পরিচিত ভারতীয় ছাত্র বা সহকর্মীদের কাছ থেকে।
বিশেষ করে ভারতে নাকি এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। ঘটনার সত্যতা জানি না, দিল্লীতে নাকি অজি রাস্ট্রদূতকে তলব করে তিরস্কার করা হয়েছে। এখানে টিভিতে দেখলাম ভারতীয় রাস্ট্রদুত হাসপাতালে গিয়েছেন আহত ছেলেটাকে দেখতে, এবং পরে নাকি সংবাদ মাধ্যমের বেশ অনমনীয় বক্তব্য রেখেছেন।

ছাত্রদের এরকম প্রতিক্রিয়া আমার কাছে অস্বাভাবিক লাগেনি একদমই।
আমি ব্যক্তিগতভাবে বেশ কয়েকজনকে চিনি যারা এরকম হ্যারাসমেন্টের শিকার। আমার পরিচিত একজনকে একবার মেরে হাত ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিলো, ঊনি ছয় মাস হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে ঘুরে বেড়িয়েছেন। আরেকজনের কথা জানি যাকে স্যাটারডে নাইটে রাস্তায় একা পেয়ে একদল ছেলে পেলে ঘিরে ধরে গায়ে বিয়ার ঢেলে দিয়েছে।
ইন্টারেস্টিং হচ্ছে এরকম ঘটনা কিন্তু হরহামেশাই ঘটছে। বিশেষ করে মূল শহর থেকে একটু দুরে যেসব উপশহর ( সাবআর্ব) রয়েছে, সেখানকার নির্জন স্টেশানগুলোয় এরকম প্রায়শই ঘটে। কিন্তু এবারে ব্যাপারটা নিয়ে এত তোলপাড় হবার কারণ, সম্ভবত, এবারই প্রথম ভিক্টিমকে হাসপাতালে নিতে হয়েছে মুমূর্ষু অবস্থায়।

এদিক ওদিক থেকে ভারতীয় অনেক ছাত্রের নানা অভিযোগ এতদিনে সবার নজরে এলো।
বেশিরভাগেরই অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে। একজন বললো, রাতে বাড়ি ফিরতে গেলে জান্কিজরা উৎপাত করতো, পুলিশের কাছে অভিযোগ করায় তারা নাকি বলেছে, বাসা বদলে ফেলো!
টাকা না পেয়ে মারধর করেছে, এই অভিযোগের ব্যাপারে পুলিশের উত্তর হলো, সবসময়ে সাথে কিছু টাকা-পয়সা রাখো।
ফেডারেশন স্কয়ারের প্রোটেস্টের সময় অনেক ছাত্রই পুলিশের উদ্দেশ্যে মধ্যমা প্রদর্শন করেছে নির্বিকারে। কেউ কেউ বলেছে, পুলিশ যদি না পারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাহলে সেটা খোলাখুলি জানিয়ে দিক, আমরা নিজেরাই সেটার ব্যবস্থা করবো।

পুলিশের কার্যকলাপ নিয়ে আসলেই মাঝে মাঝে অবাক লাগে। আমার বাসায় একবার চুরি হয়েছিলো বেশ অনেকদিন আগে। পুলিশ ডাকার পরে ওরা আমাকেই হাজারো প্রশ্ন করে প্রায় নাস্তানাবুদ করে ফেলেছিলো, তারপর লম্বা সময় ধরে দরজা জানালা থেকে হাতের ছাপ টাপ নিয়ে চলে গিয়েছিলো। এরপরে আর কোন হদিশ পাইনি।
এ দেশে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস পরীক্ষা করা আর পার্কিং ফাইন দেয়া ছাড়া পুলিশের সত্যিই আর কোন কাজ আছে কি না আমার প্রায়শই সন্দেহ হয়।

এই ঘটনাটায় লোকেদের টনক নড়েছে বোঝা গেলো। নড়েছে সরকারেরও, অবশ্য তা ছাড়াও উপায় নেই। যদ্দুর জানি, শিক্ষা "রপ্তানী" করে, অর্থাৎ এই বিদেশী ছাত্রদের কাছ থেকেই প্রতি বছর বিরাট অংকের টাকা আসে অস্ট্রেলিয়ায়, যাদের বেশিরভাগই ভারতীয়।

তাই আর্থিক লাভের কারণেই হোক, অথবা নিজেদের বর্ণবাদী অপবাদ ঘোচানোর জন্যেই হোক, আমি সত্যিই আশা করছি এবারে এর একটা সমাধান এদেশের সরকার নিশ্চয়ই খুঁজে বের করবে।

মঙ্গলবার, মে ২৬, ২০০৯

হাওয়াই মিঠাই ১৪

সূর্য বললো ইশ, তুই খাস কেন কিসমিস?
এখানকার আবহাওয়াটা সম্ভবত কোন কারণে খুব কনফিউজড হয়ে আছে। কখন কেমন আচরণ করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। বাইরে ঝাঁ চকচকে রোদ, কিন্তু বেরুলেই দেখা যায় সে রোদে কোন তাপ নেই। আমি মনে মনে একচোট হেসে নিই এসব দেখলে। নরকে শুনেছি এমন আগুন থাকবে, তাতে কোন আলো নেই, কিন্তু তাপে সেটা গনগনে হবে। এই রোদের ঠিক উল্টো আচরণ দেখে ভাবি, লোকে এবারে এ জায়গাটাকে স্বর্গ বলে ভুল না করে বসলেই হলো।
আলাপের বিষয় খুঁজে না পেলে নাকি আবহাওয়ার আলাপ দিয়েই শুরু করতে হয়। আমি বুঝছি না, আমিও কি সেই পন্থাই ধরলাম? কিছু না পেয়ে শেষে রোদ-সূর্য নিয়ে পড়লাম?
অথবা, হয়তো আমিও এখানকার সূর্যের মতই কনফিউজ্ড হয়ে আছি। রাতের বেলা হিটার আর পাখা দুটা জিনিসই বিছানার পাশে দাঁড় করিয়ে রাখি। হুট করে ঘুম ভেঙ্গে গেলে প্রয়োজন মত সুইচ টিপে দিই, ব্যস, আবহাওয়া বদলে যায়।
গত কদিন ধরে ভাবছি, আমার হাতে আসলে আরও কিছু সুইচ থাকা খুব দরকার ছিলো। অন্তত, ইচ্ছে হলেই যদি চারপাশের দেশটা বদলে ফেলতে পারতাম!

বাসা ভেঙ্গে বাক্স বানাই
চার মাস আগে আমার ফেইসবুকের স্ট্যাটাস ছিলো এরকম কিছু।
চারমাস আগে আসলে বাসা বদলাচ্ছিলাম। এটা একটা বিরাট যন্ত্রণা। দেখে মনে হয় কিছুই না, কিন্তু সব কিছু একটা একটা করে গোছাতে গেলে দেখা যায় রাজ্যের জিনিস জমে গেছে। সব কিছু ঠাসাঠাসি করে বাক্সে ভরো, তারপরে সেটা নিয়ে চলো নতুন বাসায়, তারপরে সেসব বাক্স থেকে বের করে নিয়ে আবার সাজাও নতুন করে।
আমি অলস প্রকৃতির মানুষ। কোথাও ঠেলে ঠুলে নিজের জায়গা করে নিতে পারলে আর কিছু চাই না। সহজে নড়তে চড়তেও চাই না। কোন একভাবে জীবন কাটিয়ে দিতে পারলেই হলো। কিন্তু সেটা মানুষের সহ্য হবে কেন? মন খারাপ
বাড়িওয়ালী নোটিশ দিয়েছে, দু মাসের মধ্যে বাসা ছাড়ো। সম্ভবত কিছু ঘষামাজা করে নতুন করে বাড়তি ভাড়া বসাবে। এ জন্যে পুরো বিল্ডিং-এর ছয়টা ইউনিটের সবাই দুম করে আমরা বাস্তুহারা কমিটির সদস্য হয়ে গেলাম!
একদম মহা বিপদে পড়েছি।
এখানে বাসা ভাড়া পাওয়া সোনার হরিণের কাছাকাছি ব্যাপার। তার উপরে মাত্রই কদিন আগে নতুন বাসায় এসে সবে স্থিত হয়েছি, এখন আবার বাসার খোঁজে দৌড় ঝাঁপ অসহনীয় লাগছে!
আমার দৈনন্দিন রুটিনে বেশ বদল ঘটে গেছে। রোজ রাতে কাজ থেকে ফিরে নেটে বাসা খুঁজে বেড়াই। সকালে উঠে কাজে যাবার আগে আবার লিস্টি মিলিয়ে সেগুলো দেখে আসি। কিন্তু মন মতন হয় না একটাও। বাসা ভাল হলে দেখা যায় ভাড়া সাধ্যের বাইরে। ভাড়া দেখে খুশি হয়ে দেখি বাসার অবস্থা সুবিধের নয়।
আমরা দুই বুড়ো-বুড়ি এখন সকাল বিকেল কোরাসে হা-পিত্যেশ করি। জীবনে ভালবাসার কোন অভাব নেই আমাদের, কিন্তু একটা ভালো বাসার আজ বড়ই প্রয়োজন!

সোমবার, মে ০৪, ২০০৯

পুরনো প্রেমিকাদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে-

উহুঁ, আলাদা ফিস-টিস নেই
চাইলে, হাতে লেখা সাদা কাগজের একটা
ফরম দিতে পারি।
সেখানে নাম-ধাম লিখে-
সাথে পিতার বৈষয়িক বৃত্তান্ত,
এবং নীল না পেলে না হয় সাদা খামে পুরেই
আমার বুক পকেটে ফেলে যেও মেয়ে।

শুধু তোমার জন্যই, জেনো,
শুধু তোমাকে ভেবেই আমি
কাগজে বিজ্ঞাপন দেইনি কোনও।
নইলে দু"কলামে রঙীন হরফে
ছেপে দেয়াই তো যেতো-
"কবি-র প্রেমিকা পদে লোক নিয়োগ হচ্ছে।"

হাওয়া শুঁকে শুঁকে আমি টের পেয়ে গেছি,
আমার পুরনো সব প্রেমিকাদের ইদানিং
সার বেঁধে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।

--------------
৪ মে, ২০০৯

রবিবার, এপ্রিল ২৬, ২০০৯

ঈশ্বর যেখানে অবশ্যই উপস্থিত-

অল্প কয়বছর হলো আমি খানিকটা সুস্থির হয়েছি, তার আগে, যখন ছোট ছিলাম, অথবা এমনকি কলেজে থাকাকালীনও, যাবতীয় রোগ বা অসুখের আমি খুব প্রিয় ছিলাম। যখন যে রোগের চল দেখা যেত, আমি বীরত্বের সাথে সেই রোগ বাঁধিয়ে বসতাম।


ক্লাস সেভেনের থার্ড টার্মে, আমাদের কলেজে একধারসে অনেকের চিকেন পক্স হয়ে গেলো। ক্লাসের বন্ধুরা একেকদিন ক্লাসে আসে, লানচের পরে গেমসে যাবার সময় দেখি হাসপাতালের বারান্দা থেকে তাদের বিগলিত হাসি। কী হয়েছে? না, ওনারা চিকেন পক্স বাঁধিয়ে বসেছেন। আগামী একুশ দিন তাদের কলেজের যাবতীয় পিটি-প্যারেড-পাঙ্গা থেকে ছুটি! কি মজা, আমি নিশ্চিত যে আমারও হবে। কিন্তু টার্ম প্রায় শেষ হতে চললো আমার পক্সের কোন লক্ষণ নেই। বিরক্ত হয়ে ভাবছি ব্যাপার কী? তো, টার্ম শেষের তিন দিন আগে পক্স বাবাজী ভাবলেন, এ ছেলেকে হতাশ করে কী লাভ? তিনি আমাতে অবতীর্ণ হলেন। সবাই যখন ছুটিতে যাবার আনন্দে মশগুল, আমি তখন বিরস বদনে হাসপাতালে গেলাম।
একুশ দিনের ছুটির আঠারো দিনই আমার ঘরবন্দী কেটে গেলো, বিছানায়।

এরকম কম ঘটেনি। হাত-কাটা বা পা-ভাঙ্গা, এসব সাধারণ ঝামেলা বাদেও আমি নিজ থেকে আরও ভয়াবহ সব অসুখে পড়তাম নির্দ্বিধায়!
এর ধারাবাহিকতা কাটলো না কলেজ থেকে বেরুবার পরেও।
২০০০ সাল। পরীক্ষা টরীক্ষা দিয়ে আমরা তখন ঢাকায় নিজেদের ভবিষ্যৎ খুঁজে বেড়ানোয় ব্যস্ত। আমার মত মফস্বলের ছেলেরা কেউ মেসে, কেউ বা আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছে। আমিও তাই।
তো এরকমই এক সুন্দর বিকেলে, বাইরে তখন কন্যাসুন্দর আলো, এরকম সময়ে নাকি লোকের মাথায় প্রজাপতি বসে। আমি অভাগা মানুষ, প্রজাপতি কপালে নাই, তাই সেই মাহেন্দ্রক্ষণে আমার ঘাড়ের পাশে এসে টুক করে বসলো এক….। হু, কী আবার, এক ডেঙ্গু মশা! তিনি এসে হাল্কা আদরে আমার চামড়ায় হুল ফুটিয়ে দিলেন, আমি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলাম।
এরকমটা অবশ্য আগেই ভেবেছিলাম। কারণ সে বছরই কেবল এই বিদঘুটে নামের জ্বরের প্রকোপ শুরু হয়েছে। পত্রিকার পাতা খুললে চমকে উঠতাম, নানা জায়গায় অনেক লোক মরছে, মৃতদের নামের তালিকায় কয়েকজন ডাক্তার থাকায় লোকেদের আতঙ্ক একেবারে তুঙ্গে। আমি আগেই বুঝেছিলাম, এরকম একটা মহিমান্বিত অসুখ আমার না হয়ে যাবে কোথা?

হলো, কদিন জ্বরে ভুগলাম। কেউ অবশ্য শুরুতে বুঝলো না যে এটাই ডেঙ্গু। কুমিল্লা থেকে মামা এসে আমাকে নিয়ে গেল বাসায়। সেখানে গিয়েও জ্বর কমে না। দুদিন পরে শুরু হলো অসহ্য হাড়ব্যথা। আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজে। ডাক্তার এলেন, নানান পরীক্ষা চালালেন, নার্স এলেন ইন্জেকশান নিয়ে। এসে তিনি সুইয়ের বদলে সোজা আমার দিল মে চাক্কু বসিয়ে দিলেন!
কানে কানে বলি, ডেঙ্গুর প্রকোপে আমার তখন জান যায় যায়, তার মধ্যেও পষ্ট বুঝলাম, জীবনে এর চেয়ে সুন্দরী নার্স দেখা আমার কপালে নাই। সাদা পোষাকে যেন সাক্ষাৎ হীরামনের গল্প থেকে উঠে আসা পরী।
হায়! সেই আনন্দ বেশিক্ষণ টিকলো না। ডাক্তার ধরে ফেললেন, মানে, আমাকে না, আমার অসুখকে। তিনি বাংলা সিনেমার জাজদের চেয়েও বেশিরকম বিষন্ন সুরে ঘোষনা দিলেন, মহাশয়ের ডেঙ্গু হয়েছে।

আমি শুনে বেকুব হয়ে গেলাম। মাথার মধ্যে ঘুরছিলো পত্রিকা আর টেলিভিশনে দেখা মৃত্যুসংবাদগুলো। আমার বাসার সবার অবস্থাও কাহিল। মোটামুটি মরাকান্না জুটিয়ে দিলো সকলে। এর মধ্যেই এম্বুলেন্সে করে আমাকে নিয়ে আসা হলো ঢাকা মেডিক্যালে কলেজ হাসপাতালে।
সেখানে বেশ কদিন ছিলাম। ভাল হয়ে উঠেছিলাম আস্তে আস্তে। তবে সে অন্য গল্প। আজ আর ওদিকে যাবো না।
এসব কথা আজ হুট করে মনে পড়ে গেলো ফেইসবুকে একটা ভিডিও দেখে। ঢাকা মেডিক্যালেরই সেটা। যেখানে রাত গভীর হলে ওয়ার্ড বয় আর সুইপাররা ডাক্তার বনে যান। অষুধ প্রেসক্রাইব করাই শুধু নয়, ওনারা অপারেশনও করেন!



ভিডিও দেখে আমি নিজের ভাগ্যকে হাজার কোটিবার ধন্যবাদ দিলাম, এই সময়ে আমাকে অসুখে পড়ে সেখানে যেতে হলো না বলে। ধন্যবাদ দিলাম সেই রূপবতী ডেঙ্গু মশাটাকেও, আর নয় বছর দেরিতে কামড়ালেই আমাকে আর দেখতে হতো না।
ঈশ্বরবিশ্বাসীরা প্রায়শই নাস্তিকদের সোজা পথে আনানোর জন্যে নানান আলামত হাজির করেন। এই ভিডিও দেখে আমার মনে হলো, সেসবের কোন দরকারই নেই। তাদের সবাইকে একবার করে ঢাকা মেডিক্যালে ঘুরিয়ে আনা হোক। ওয়ার্ড বয় বা সুইপারের হাতে অপারেশন হবার পরেও স্বয়ং ঈশ্বর ব্যাতীত আর কেউ তাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন, আর যে করুক, আমি অন্তত এ কথা বিশ্বাস করি না!