সোমবার, ফেব্রুয়ারী ২৫, ২০০৮

একুশের গল্পঃ বউ কথা কও



'সবচেয়ে ভালো.../ পছন্দের/ শক্তিশালী...' এইরকম শর্ত দিয়ে কিছু বেছে নিতে বললে বিপদে পড়ে যাই। এই ব্যাপারগুলো সময়ের সাথে বারবার বদলে যায়। আজ এটা ভালো লাগলো, কাল হয়তো অন্যটা।
তবু মাঝে মাঝে অল্প কিছু লেখা মনে খুব দাগ কেটে যায়। বদলে যাবার তালিকায় ওরা আর থাকে না তখন, বরং পাহাড়ের মতন অবিচল থেকে মনের ভেতর একটা জায়গা করে নেয়।

একাত্তর নিয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী লেখা বেছে নিতে বললে আমি তাই চোখ বুজে আহমদ ছফা-র ওঙ্কার তুলে নিবো। তেমনি করে একুশ নিয়ে যদি বাছতে চাই- জহির রায়হানের একুশের গল্প থাকবে লিষ্টিতে, সাথে আরেকটা গল্প- টিটো রহমানের 'বউ কথা কও'।

টিটো আমার জিগরি দোস্ত। একই ব্যাকগ্রাউন্ডের কলেজে পড়েছি আমরা, ও বরিশালে, আমি কুমিল্লায়। পরিচয় হয়েছে ঢাবি-তে এসে। ঢাবি-র ফিল্ম সোসাইটির জান-প্রাণ দেয়া সদস্য ও। প্রথম বর্ষে এসে ওর তালে পড়ে আমিও ঢুকে গেছি ওখানে। ভালই সময় কাটাতাম টিএসসি-র দোতলায় ফিল্ম সোসাইটির রুমটায়। বিশেষত জমত যখন কোন একটা চলচ্চিত্র উৎসব হতো, দিনরাত খাটুনি, এড জোগাড় করো, স্যুভেনির ছাপাতে ফকিরাপুলে মাহী ভাইয়ের প্রেসে দৌড়াও। এত সব কষ্টের পরে আনন্দে মন ভরে উঠত, যখন টিএসসির অন্ধকার অডিটরিয়মে টর্চ হাতে নিয়ে ঘুরতাম টিকেটম্যান হিসেবে। আর অপেক্ষায় থাকতাম কখন কোন এক সুন্দরী অন্ধকার হাতড়ে এসে টিকেট বাড়িয়ে দিবে, আর আমরা এক হাতে তলোয়ার (থুড়ি, মানে টর্চ) আর অন্যহাতে সুন্দরীর হাত ধরে বীরের বেশে তাকে জায়গামতন বসিয়ে দিবো।
দিনশেষে আমাদের মধ্যে প্রতিযোগীতা হতো আজ কে কজনকে হাত ধরে সিটে পৌঁছে দিয়েছে। টিটো-মিশু-মাসুমের জ্বালায় আমি টপে থাকতে পারতাম না অবশ্য, তবে আমার পার্ফর্মেন্সও নেহায়েত খারাপ থাকতো না।

সেই সময় টিটো যুগান্তরের ফান ম্যাগাজিন বিচ্ছু-তে নিয়মিত 'আজেবাজে' লেখা লিখতো। আজেবাজে বললাম এ কারণে, টিটোর ক্ষমতা জানা আছে আমার, তাই ওর হাত দিয়ে বের হওয়া ঐ লেখাগুলোকে আজেবাজে বলতে বাঁধে না একটুও।
সেইসময় পকেটমানি-র খানিকটা টানাটানি চলছিলো আমার। টিটোই একদিন জোর করে পরিচয় করিয়ে দিলো রবি ভাই ( আশীফ এন্তাজ রবি, বিচ্ছুর সম্পাদক) - এর সাথে। ব্যস, আমিও তারপর কদিন অনিয়মিত ভাবে টিটোর চেয়েও 'আজেবাজে' লেখা নামিয়ে বিচ্ছুর ফাঁকা জায়গাগুলো ভরতাম। বিপদের দিনে হাল্কা-পাতলা রোজগার হয়েছিলো, রবি ভাইয়ের কাছে তাই অশেষ কৃতজ্ঞতা। আমাদের তিন বন্ধুকে- আমি,আহসান, টিটো- যথেষ্ঠ লাই দিয়েছিলেন তিনি। এমনও দিন গেছে, সকালে উঠে রবি ভাইয়ের কাজীপাড়ার বাসায় চলে গেছি আমরা, ওখানেই নাস্তা করেছি। তারপর দুইজনে কাগজ কলম নিয়ে ওখানে বসেই হাবিজাবি লিখে রবি ভাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে দুপুরে আবার মিতু ভাবীর মজাদার রান্নার লাঞ্চ সেরে তারপর বেরিয়েছি।
আহ, সে বড় সুখের দিন ছিলো।

তো, আমরা যখন কার্জন হল থেকে একটা পত্রিকা বের করলাম যুযুধান নাম দিয়ে, তখন টিটোকে চেপে ধরতেই ব্যাটা দুদিন খেঁটেখুঁটে এই গল্প নামিয়ে দিলো। আর আমি সেই গল্প পড়ে পারলে ওরে ধরে মাথায় তুলে নাচি! এই রকম উড়াধুড়া কল্পনাশক্তি না থাকলে আবার লেখক কীসের!

সেই গল্প প্রথম ছাপা হলো আমাদের পত্রিকা- যুযুধানে। একুশের গল্প হিসেবে আমার সবচেয়ে পছন্দের গল্প।
সচলদের জন্যে পত্রিকার পাতা থেকে গল্পটা স্ক্যান করে দিলাম। আশা করি সবাই পড়বেন, পড়ে মতামত দিবেন।
অমর একুশের শুভেচ্ছা সবাইকে।


মন্তব্য-পোষ্টঃ বদরুদ্দীন উমরের কলাম পড়ার পরে-

জুবায়ের ভাইয়ের লিংক থেকে গিয়ে সমকালে ছাপা হওয়া জনাব উমরের লেখাটি পড়লাম। সোজা বাংলায় বললে বেশ আক্রমণাত্মক একটা লেখা, বিষয় এবং লেখার ভাষা- দু দিক থেকেই।
পড়া শেষ করে কিছু ব্যাপারে কনফিউশান রয়ে গেছে। যেমন, উমর বললেন, ৫২ থেকে ৭১ পর্যন্ত কোন স্মৃতিচারণ করা হয় নি, কারণ ব্যাক্তিগত প্রচার কেউ চাইতেন না।
স্মৃতিচারণ না করাটা সাধুবাদের যোগ্য কি না এই নিয়ে আমি খানিকটা দ্বিধায় আছি। এবং আন্দোলনের পরের বছর থেকেই এই নিয়ে 'বিরাট কিছু করে ফেলেছি' জাতীয় মনোভাব আসাটাও বাস্তবসম্মত নয়। আমার ধারণা, এরকম বড় ঘটনাগুলোর মুল মর্ম ঠিকঠাক উপলব্ধিতে আসে অনেকটুকু সময় পেরিয়ে গিয়ে যখন পেছনে ফিরে তাকানো হয়, তখন। তার আগে খুব নিকট সময়ে হয়তো ভালো মতন আলো ফেলাটা দুরুহ হয়ে ওঠে।
সে সময়ের ফেব্রুয়ারির সাথে এ সময়ের ফেব্রুয়ারির পার্থক্যের জন্যে ওনার খারাপ লাগাটা বুঝতে পারি, কিন্তু এটাও কি বাস্তবসম্মত নয়? তখন আর এখনকার পরিপ্রেক্ষিত কি মানুষের কাছ থেকে একই আচরণ দাবী করে? সেই সময় আমাদের নিজের একটা দেশ ছিল না, নিজেদের মৌলিক অধিকারগুলোও বাস্তবায়িত হচ্ছিলো না ঠিকমত, সেই সময়ে আমাদের অন্যতম সাফল্য ছিলো ভাষা আন্দোলন, এবং তাই সেটাকে সামনে রেখে অনুপ্রাণিত হয়ে পুরো মাসটাতেই প্রতিরোধ ধরণের মনোভাব থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতা এখনো আশা করা যায় কি না, সেই নিয়েও দ্বিধায় আছি।

অবশ্য, রাত বারোটায় শহীদ মিনারে যাওয়াটা আমারও পছন্দ নয়। জনাব উমরের সাথে একমত এক্ষেত্রে, প্রভাত ফেরীর আবেদনটাই আলাদা। যেটা এখন একদমই পোশাকি হয়ে গেছে রাজনৈতিক দল আর টিভি ক্যামেরার বদৌলতে।

জনাব উমর লেখার এক পর্যায়ে বলেছেন- ভাষাসৈনিকদের সংখ্যাবৃদ্ধির কথা। উনি লিখেছেন, প্রাকৃতিক ভাবে ভাষাসৈনিকদের সংখ্যা কমে যাবার কথা ছিলো, কিন্তু হচ্ছে উল্টোটা।
আমার ধারণা, এটার কারণ অন্যরকম হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ঢাকা মেডিকেলের পাশেই আটকে ছিলো- আমাদের সব লেখালেখি, গল্প প্রবন্ধ ইতিহাস সবই ছিলো শহীদ মিনার কেন্দ্রিক। এখন পত্রিকাগুলোর চেষ্টায় কিছুটা তার বাইরে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ চলছে। এ কারণেই এতদিন পর্যন্ত যারা ফোকাসে ছিলেন না, তাদের অবদানগুলো উঠে আসছে।
এই উঠে আসার ক্ষেত্রে কিছু মিথ্যের মিশেল ঘটে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে, এ কথা সত্যি। জনাব বদরুদ্দীন উমরও তার কলামে এই নিয়েই আক্ষেপ করেছেন।
তবে আমার কথা হলো- এই মিথ্যেগুলোকে তো আলাদা করবার সুযোগ রয়েইছে আমাদের হাতে। সে সময়ে অন্য যারা ছিলেন, তারা তো এই ব্যপারগুলো জাস্টিফাই করতে পারেন। মিথ্যে হবার সুযোগ আছে বলেই যে আমরা সে দিনের ঘটনাগুলো আর কারো কাছ থেকে জানতে চাইবো না- এরকম অভিমত ভালো লাগে নি। দ্বার বন্ধ করে ভ্রমটাকে রুখতে গিয়ে সত্যটাকে আটকে দেবার সেই সরল সিধা ভাবসম্প্রসারণই মনে পড়ে গেলো।

প্রাসঙ্গিক এক অংশে উমর লিখেছেন, সেই সময়ের পোষ্টার মারা লোক, এমনকি পোষ্টার পড়া লোকও ভাষা সৈনিকদের কাতারে!
শেষোক্ত কথাটি (পোষ্টার পড়া লোক) শ্লেষ আর বিরক্তি থেকে বলা ধরে নিয়ে বলি, সেই সময়ে সরকারী বাঁধা পাত্তা না দিয়ে দেয়ালে পোষ্টার মারাটা কি খুব সহজ কাজ ছিলো? আমি জানি না। কিন্তু আমার কাছে এই ব্যাপারটিকেও খুব ছোট কিছু বলে মনে হয় নি। সে সময়ে চেতনা থেকে নয়, পেশাগত কারণেও যদি কেউ পোষ্টার মেরে থাকেন, তাহলেঅ তার সাহসের তারিফ করতে হয়। অন্তত আমার মত সাধারণ মানুষেরা এটাকে অনেক বড় করেই দেখি। জনাব উমরের কাছে এ ব্যাপারটি গুরুত্ব পায় নি কেন বুঝতে পারি নি। শুধু গুরুত্বহীন নয়, লেখার ভাষা বলে, অনেক বেশি অবজ্ঞাও করেছেন তিনি।

সর্বশেষ, ভাষাসৈনিক শব্দের সৈনিক নিয়ে আপত্তি।
উমর দেখিয়েছেন এ ব্যপারটির শুরু সামরিক শাসনের সময় থেকে। বাকিটা বলেন নি, কিন্তু আমরা ধারণা করতে পারি তিনি বুঝিয়েছেন- ওই সময়ে কিছু চাটুকারশ্রেণীর লোকজনের উদ্যোগেই এ ধরণের শব্দের উৎপত্তি ঘটেছে।
এইখানে আমি যেটা বুঝি, এ ধরণের যে কোন উপাধি-র সাথে আবেগ জড়িত থাকে। সেই আবেগটা কতটুকু আসল বা নকল এটা আমাদের 'বুঝে' নিতে হয়। এ কারণেই বিদ্যাসাগর, শেরে বাংলা বা বঙ্গবন্ধু এক কাতারে থাকে, আর অন্যদিকে থাকে পল্লী-বন্ধু, ভাষা কন্যা এই জাতীয় উপাধিগুলো। স্পষ্টতঃ উনি ভাষাসৈনিক শব্দটাকে দ্বিতীয় কাতারে ফেলেছেন। এইখানে আমার প্রশ্ন, আমাদের অন্য বুদ্ধিজীবিদেরও তাই মত? নাকি শুধু বদরুদ্দীন উমর সাহেবই এমনটা ভাবেন? এটা জানা দরকার এ কারণে যে, চাটুকারদের দেয়া উপাধি সময়ের সাথে সাথে লোকে আপনা থেকেই ঝেড়ে ফেলে দেয়, কারও আর মনে থাকে না, ব্যবহার তো দুরে থাক। সেই দিক থেকে বলা যায় ভাষাসৈনিক শব্দটা তবে বিরাট ব্যতিক্রম? নাকি এটা সত্যিই মানুষের মন থেকে দেয়া উপাধি ছিলো? নইলে এতদিন পরে এখনো কেন লোকে অবলীলায় সেই শব্দ ব্যবহার করে চলছে? এক সামরিক শাসন থেকে আরেকটায় এসে পড়বার আগে আমরা মধ্যিখানে লম্বা সময় 'গণতান্ত্রিক দেশ' ছিলাম, এটা ভুলে গেলে চলবে না।
আরেকটা সংশয় যেখানে, সৈনিক কথাটা ব্যবহারে এত আপত্তির কারণ কি হবে? সৈনিক শব্দটা কি শুধুই আমাদের দেশের সামরিক বাহিনীর ড়্যাংক হিসেবে ব্যবহৃত কোন শব্দ? আমার তো মনে হয় না। সৈনিক শব্দটা আমাদের জীবনের প্রেক্ষিতে, অথবা জীবন সংগ্রামের প্রেক্ষিতে আমাদের প্রত্যেকের জন্যেই গুরুত্ব রাখে অনেক। সে তুলনায় ভাষা নিয়ে আন্দোলন তো এক ধরণের যুদ্ধই ছিলো বলা চলে। তাহলে সেই যুদ্ধের যোদ্ধারা ভাষাসৈনিক হলে দোষ কোথায়? নাকি ভাষাযোদ্ধা হলে ঠিক হত? আমার ধারণা শ্রুতিমধুরতারও একটা ব্যাপার আছে। এ কারণেই মুক্তিসৈনিক না হয়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে, আর ভাষাযোদ্ধা না হয়ে ভাষা সৈনিক।
এটাই স্বাভাবিকতা। সামরিক বাহিনী প্রিয় নয় বলেই যেখানেই সৈনিক শব্দটির উল্লেখ পাবো, সেখানেই তাদের গন্ধ খুঁজে বেড়াবো- এরকম মানসিকতা বাড়ির আড্ডায় বসে চা খেতে খেতে শুনলে ঠিক শোনায়, কিন্তু পত্রিকায় কোন বুদ্ধিজীবির কলামে এ কথা পড়লে ঠিক যেন হজম হয় না। পুরো কলামটি পড়ে আমার মনে হয়েছে, উনি খুব বেশি একপেশে মনোভাব নিয়ে লিখেছেন। সবকিছুকে সরলীকরণ-অথবা আরো ভালো বলা যায়-খারাপীকরণ করে ফেলেছেন তিনি। এই সব ব্যাপারগুলোরই ভাল মন্দের ভারসাম্য বজায় রেখে একটা সুন্দর কলাম লেখার সুযোগ ছিলো, কিন্তু তিনি শুধুই মন্দটুকুই তুলে ধরেছেন, ভালো দিকগুলো ইচ্ছেয় বা অনিচ্ছেয়- হয়েছে পুরোপুরি উপেক্ষিত।

বদরুদ্দীন উমরের কলাম পড়ে এত এত প্রশ্ন আর সংশয় মনে আসতেই একটা দুঃখবোধও জাগ্রত হলো- কেন যে ভদ্রলোক সচলায়তনে ব্লগিং করেন না! এখন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কেমনে পাবো?

সোমবার, ফেব্রুয়ারী ১৮, ২০০৮

হাওয়াই মিঠাই ৩

মোবাইলের মাধ্যমে অনেক ধরণের সার্ভিস চলে এসেছে এখন বাজারে। প্রথমে ছিলো শুধুই কথা বলা, তারপরে এলো মেসেজ। এরপর ইন্টারনেট, টিভি দেখা, ক্যামেরা, ভিডিও... আরো কত হাবি জাবি। কিন্তু মোবাইলের মাধ্যমে সাত-সমুদ্র পার করে বন্ধুদের পশ্চাদ্দেশে লাথি কষাবার কোন ব্যবস্থা নাই কেন? থাকা দরকার ছিলো।
এই মুহুর্তে রাগে দুঃখে ক্ষোভে অস্থির হয়ে আছি!

আমাদের কলেজের রি-ইউনিয়ন হচ্ছে। টানা তিনদিন ধরে। পাঁচ বছর পর পর একবার করে হয়। প্রথমটা পেয়েছিলাম যখন কলেজেই পড়ি, সাঙ্ঘাতিক মজা হয়েছিলো সে বারে। তখন কলেজেও আমরা সিনিয়ার, সম্ভবত ইলাভেনে পড়ি, তাই ভাবসাব ছিলো বেশ। পরেরটা কলেজ থেকে বের হবার বছর তিনেকের মধ্যেই, সম্ভবত ২০০৪ এ।

প্রতিবারই রিইউনিয়নের নাম দেয়া হয় 'উৎসব'- সাথে সাল যোগ হয়, উৎসব'৯৩, উৎসব'৯৯ এরকম। এবারেও কি তাই হয়েছে? জানি না।
১৪ তারিখ থেকে শুরু হয়ে আজ শেষ হবে সব প্রোগ্রাম। এই তিনটা দিনই খুব অস্থির হয়ে ছিলাম। সারাক্ষণ মিস করেছি পুরনো বন্ধুদের, কলেজকে।

মেসেজে হাল্কা পাতলা খবর পাচ্ছিলাম, আজ দুপুরে আর থাকতে না পেরে ফোনই করে ফেল্লাম। তানভীরের সাথে একটু কথা বলেই ফোন হাত বদল হতে থাকলো। তারপরে নাঈম, নেভীতে আছে এখন, মাঝে নাকি নেভাল একাডেমীর এডজুটেন্টও ছিলো ও। মোরশেদের গলা শুনলাম বহুদিন বাদে। কলেজে থাকবার সময় ও হাসানের গান গেয়ে বিখ্যাত হয়ে গেছিলো। আমি ভাবতাম এরকম ভারিক্কি গলা দিয়ে ও হাসানের মতন চিকন-চাকন গান বের করে ক্যামনে?
ফয়সলের সাথেও কথা হলো- লম্বা সময় বাদে, আমাদের ব্যাচের একমাত্র ডাক্তার! বউ নিয়ে গেছে ও সাথে। সব মিলিয়ে নাকি ২১ জন গেছে আমাদের ব্যাচের। বিশাল ব্যাপারই বলা যায়- কলেজ থেকে বের হবার পরে এরকম করে আর একসাথে হয় নি বোধহয় অনেকেই। যুবায়েদের সাথে কথা হলো। জলপাই যুবায়েদ তার কলাপাতা রঙের মোটর বাইকে চেপে নাকি ঢাবিতে টহল দিয়ে বেড়ায়, এই নিয়ে টিজ করলাম বেশ।

তাদের আনন্দ করার লিষ্টি শুনে গা জ্বলে গেল আমার। আজ নাকি মাইলস আসবে রাতে। শুরুর দিন ছিলো হায়দার হোসেন। মাঝে নাকি মিলা (!!!) আর সোনিয়াকেও আনার কথা।
মাইলসের কনসার্ট মিস করলাম- এই ভেবে আমার অলরেডি রাতের ঘুম নাই হয়ে যাচ্ছে!

রি-ইউনিয়নের মূল মজাটা অবশ্যই পুরনো বন্ধুদের কাছে পাওয়া। সাথে আরো আছে- আগে পরের ব্যাচের অনেককে দেখা, যাদের সাথে এক সময় হয় ভালো সম্পর্ক ছিলো, অথবা খারাপ।
অনেক স্যারদের সাথেও দেখা হয় তখন। আমি নিশ্চিত এবারেও আবু মুহম্মদ রইস স্যার ও লতিফা ম্যাডাম ঠিকই আমাদের রিইউনিয়নে চলে এসেছেন। স্যার আর ম্যাডাম যে কলেজেই থাকুন না কেন আমাদের কলেজের জন্যে একটুও টান কমে নি তাদের- রিইউনিয়নের সময় প্রতিবার নিয়ম করে হাজিরা দেন আমাদের কলেজে।

পুরনো অনেক শিক্ষকেরা, যারা একসময় জীবন হারাম করে দিয়েছিলেন, তারাও যখন রিইউনিয়নের সময় বেশ হেসে হেসে কথা বলেন, আমার বেশ মজাই লাগে।
ফোনে বন্ধুদের সাথে কথা বলে আসলেই মন খারাপ হয়ে গেলো। ব্যাটারা নিজেরা মজা করে আর আমাকে সেই মজার বিবরণ দিয়ে দিয়ে মেসজ পাঠায়! কেমনটা লাগে!!

মনের দুঃখে একটা মানপত্র লিখে ফেলবো কি না ভাবছি।
হে মাইলস, ওগো মিলা-সোনিয়া, আর হে আমার পেট-প্রিয় রোস্টকৃত খাসীদ্বয়, তোমাদের ভুলি নাই, ভুলিবনা। এইবছর আর তোমাদের সাক্ষাৎ পাইলাম না, কিন্তু মনে রাইখো হে ডাইনিং হলের ঝকমকে বিরিয়ানি- এই দিন দিন নয়, আরো দিন আছে।

নাহ, সত্যি ভাবছি, এবারে যাওয়া হলো না, পরেরটা হবে পাঁচ বছর বাদে আবার। পাঁ-আ-আ-চ বছর!
কিন্তু ততদিনে তো আমি বুড়ো হয়ে যাবো!

হাওয়াই মিঠাই ২

অস্ট্রেলিয়ার প্রধান মন্ত্রী কেভিন রাড একটা ইতিহাস তৈরি করে ফেললেন।

ব্যাপারটার বর্ণনা আরও অনেক সুন্দর ভাবে দেয়া যায় নিশ্চয়- পত্রিকায় যেমন লিখেছে- অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে একটি সোনালী পাতা যোগ হলো- বা এরকম কিছু। কিন্তু আমি এত কিছু বুঝি না, আমার কাছে মনে হয়েছে- আলাদা পাতা-টাতা নয়, এই ব্যপারটা নিজেই একটা ইতিহাস।

পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে কেভিন রাড- এই দেশের আদিবাসীদের উপর গত ২২০ বছর ধরে যে অন্যায় ও অত্যাচার হয়েছে, তার জন্যে সোজাসুজি দুঃখ প্রকাশ করেছেন, এবং ক্ষমা চেয়েছেন। বিশেষ করে তাদের কাছে, যাদেরকে বহু বছর আগে নিজেদের বাবা-মা-পরিবারের কাছ থেকে জোর করে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিলো, এ দেশে যাদেরকে 'স্টোলেন জেনারেশান' নামে ডাকা হয়।
আদিবাসীদের ইতিহাস বোধকরি পৃথিবীর কোথাওই আলাদা কিছু নয়। হোক সেটা আমেরিকা, ভারত, বাংলাদেশ অথবা অস্ট্রেলিয়া!

সাদা মানুষেরা এই দেশে বসতি বানাবার জন্যে নির্মূ্লের কাছাকাছি নিয়ে গেছে এখানকার এবঅরিজিনদের। মাল্টিকালচারাল দেশগুলোতে যা হয়, এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। এ দেশের শিশুরা তাই বড় হয় সাদা এবং এবঅরিজিন হিসেবেই। কেভিন রাডের ক্ষমা প্রার্থনা- হয়ত তাদের সাদা-কালো না হয়ে- শুধু অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে বড় হবার একটা সুযোগ করে দিবে।

বড় শহরগুলোর রাস্তায়, রেস্তোরায় আর খেলার মাঠে বিগ স্ক্রীণে সরাসরি সম্প্রচার হয়েছে কেভিনের বক্তৃতা। ক্যানবেরায় পার্লামেন্ট হাউজের বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন শত শত এবঅরিজিন, বক্তৃতার এক পর্যায়ে যখন কেভিন উচ্চারণ করলেন 'আই এপোলোজাইজ', অনেকেই আবেগে কেঁদে ফেলেন।
আদিবাসী নেতা প্যাট ডডসনের কথাটা চমৎকার লেগেছে আমার কাছে, " ক্ষমা চাইতে সাহস লাগে, ক্ষমা করতেও সাহসী হতে হয়, গন্তব্য জানা নেই, সেরকম স্বপ্নময় একটা যাত্রা শুরু করতেও অনেক বেশি সাহসের প্রয়োজন হয়।'

বেশ কিছুদিনের প্রস্তুতির পরে গত ১৩ তারিখে কেভিন পার্লামেন্টে তাঁর বক্তব্য রাখেন। ব্যপারটা খুব মসৃণ ছিল এমন নয়। নিজের দল, মানে লিবারেল পার্টির বেশ ক'জন সংসদ সদস্য কেভিনের পক্ষে ছিলেন না। শুরুতে একেবারেই সমর্থন পান নি বিরোধী দলের নেতা নেলসনের কাছ থেকেও। এই ভদ্রলোক বেশ গোঁয়ার আছেন বুঝা গেল, সেদিনের অনুষ্ঠানেও উনি 'যা কিছু হয়েছিলো ভালোর জন্যেই' জাতীয় কিছু মন্তব্য করে বসেছিলেন স্টোলেন জেনারেশানের মানুষদের নিয়ে। তার ফলও মিলেছে সাথে সাথেই, সবাই দুয়ো ধ্বনি ছুঁড়েছে তার উদ্দেশ্যে। তবে শেষমেষ কেভিনের আহবানে সাড়া দিয়েছেন ভদ্রলোক।
প্রাক্তন চারজন প্রধানমন্ত্রী এসেছিলেন সেদিন পার্লামেন্টে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন না..., কে বলুনতো?- জনাব জন হাওয়ার্ড।
দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চাইবার পুরো ব্যাপারটাকে ভেটো দিয়েছেন তিনি।

রাডের একটা কথা খুব ভাল লেগেছে। বলেছেন, আবেগ কখনো ইতিহাস তৈরি করে না, আমাদের কাজের মাধ্যমেই সেই ইতিহাস তৈরি হয়।
তা যে হয়, সেটা অন্তত ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগ নিয়ে ও তা বাস্তবায়ন করে রাড বুঝিয়ে দিয়েছেন।
এবার দেখা যাক, যাদের জন্যে এত আয়োজন, সত্যি সত্যিই তারা এর ফলে উপকৃত হতে পারে কি না!

বুধবার, ফেব্রুয়ারী ১৩, ২০০৮

ডালিমকুমার কথন

ছ' বছর আগে একদিন
---------------------------
ঢাবি-র ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের ক্লাশ। কার্জন হলের দোতলা- গ্যালারিতে।
ফার্স্ট ইয়ারের তরতাজা রঙীন ছেলে-মেয়েরা সব, শীতের দুপুরে বসে বসে থার্মোডিনামিক্সের গলি ঘুঁপচিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
একটা ছেলে স্যারের চোখ এড়িয়ে ক্লাশে ঢুকে গেলো। বুঝাই যাচ্ছে, শীতের আলসেমো কাটিয়ে সকালে উঠতে পারে নি, এখন তাই হন্তদন্ত হয়ে ক্লাশে ছুটে আসা।
শার্টের বোতাম সব ক'টা লাগানো শেষ হয় নি এখনো। মাথার চুলে চিরুনি পড়ে নি বোধহয় মাসখানেক হয়। পানি দিয়ে হাত ভিজিয়ে তা দিয়েই চুল আঁচড়ানোর কাজ চলে যায়।
ক্লাশে ঢুকে এক পলক দৃষ্টি ছুটে বেড়ায় পুরো রুম জুড়ে।
নাহ, জায়গা নেই ওখানে, তাই সোজা পেছনের বেঞ্চিতে গিয়ে বসে পড়ে।
খানিকপর ঠুক ঠুক ঠুক। সামনের বেঞ্চির একজন একটা দলা পাকানো কাগজ বাড়িয়ে দেয়। ভুরু কুঁচকে তাকাতেই তার আঙুল অনুসরণ করে দৃষ্টি চলে যায় পাঁচ ছটি বেঞ্চ সামনে। মিষ্টি একটা মুখ ওখান থেকে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। চোখে রাজ্যের রাগ।
চিরকুটটা খুললো ছেলেটা- দ্যাখে- সেখানে লেখা-
'ব্যাটা তুই দেরি করে এলি তো এলি, আমার পাশে বসলি না ক্যান? জানি তো বলবি জায়গা নেই! বলি, এই মোটকাটারে যদি গুঁতো দিয়ে সরাতেই না পারলি, তবে ভাত খাস ক্যান? যা গিয়ে, ভাতের মাড় খা'।

হাসতে হাসতে চিরকুটটা ভাঁজ করে পকেটে ভরে ও। তারপর ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্যারের দৃষ্টি এড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়। গন্তব্য- দৈত্য দানো পরিবেষ্টিত কঙ্কাবতীর বেঞ্চ।
*

ছ' বছর পরে
------------------
শীতের চাদরে মোড়ানো মেলবোর্ণ শহর।
সেই ভোরে উঠে জবে চলে গিয়েছিলো ছেলেটা। শব্দ না করে উঠে আস্তে করে দরজা খুলে বের হয়ে গিয়েছিলো ও। যেন ঘুম না ভাঙে কঙ্কাবতীর।
সারাদিনের ক্লান্তি শেষে ঘরে ফিরে ও।
দরজা খুলতেই মনে পড়লো, আজ তো কঙ্কাবতীরও কাজ রয়েছে বিকেলে। ঘরে কেউ নেই তাই।
টেবিলের ওপরে প্লেট সাজানো। রাইস কুকারের বাতিটা জ্বলছে এখনো।
শোবার ঘরে গিয়ে কম্পিউটারের সামনে চেয়ার টেনে বসে পড়ে ও। জিমেইল খুলে বসে।
ইনবক্সে একটাই মেইল।
ক্লিক করতেই হাসিতে ভরে ওঠে মুখ,
" ...,
আজকে দিনে এখন পর্যন্ত দেখাই হলো না তোর সাথে, রাত আটটা পর্যন্ত হবেও না...এটা কোন কথা বল??? ধুত্তুরি। আমি মাত্র খেয়ে নিলাম, মুরগী রেঁধেছি আজ। রানগুলোর সাইজ দেখে তুই ভয় পেয়ে যাবি, ইয়া বিশাল বিশাল, বিচ্ছিরি! রান্নাটাও মনে হয় ভালো হয় নি আজ, মাংস কেটে কেটে দিয়েছি তবু মনে হয় মশলা ঢোকে নি ঠিক মত। আমার প্লেটে ভাত পড়ে আছে, খেতে খেতে মনে হচ্ছিলো অনন্তকাল ধরে খাচ্ছি, হি হি হি, পরে দুম করে যতটা ছিলো রেখে উঠে গেছি। তবুও মনে হচ্ছে বেশি খেয়ে ফেলেছি।
তুই অবশ্যই ঠিকমতন খেয়ে নিবি। ব্লগ নিয়ে বসে থাকবি না সারাক্ষণ। আমি ব্রেক পেলে ফোন করতে পারি, আবার না-ও পারি। আর খবরদার এঁটো প্লেট মাজবার দরকার নেই, আমি এসে করে নিবো।
সকালে ঘুম হয় নি ভালো করে, এখন তাই টাইট হয়ে ঘুমো...'



ডিসক্লেইমারঃ
---------------
আমার বন্ধু, ডালিমকুমার, বললো ওর হয়ে যেন পোস্টটা করে দিই ব্লগে। তাই-ই দিলাম।
ওদের এই রূপকথায় তাই আমার কোন দায়ভার নেই।
বসন্তের শুভেচ্ছা সবাইকে।

হাওয়াই মিঠাই

এইরকম শীত শীত দুপুরগুলোয় কোল পেতে আরো বেশি শীত টেনে নিতে ইচ্ছে করে। হাতের আঁজলা ভরে বেশ খানিকটা শীত তুলে নিয়ে মুখে মাখিয়ে ঝরঝরে রোদে ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে করে।
কাগজে কলমে সামার এখন। কিন্তু আচমকা কোত্থেকে যে শীতের বুড়ি এসে এইখানে বেশ করে চাগিয়ে বসলো, কে জানে! কদিন আগেও গরমে মাথার তালু চিড়বিড় করে উঠতো, টেম্পারেচার ছিল ৩৮, ৪০। এখন সেখানে দেখায় নীরিহ নিপাট ১২, অথবা খুব বেশি হলে ১৪। রাতের বেলা গায়ের উপর আয়েশী কম্বল টেনে নিলে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ বলে মনে হয়। কিন্তু হায়, সকাল বেলা আমীররে তুই, ফকির সন্ধ্যাবেলা। সেই কাক-না-ডাকা ভোরে যখন সেই কম্বল ঠেলে উঠে কাজে যেতে হয়, মনের ভেতর ভীষন রাগ চেপে যায়, ইচ্ছে করে এখুনি দেশের টিকেটের ব্যাপারে খোঁজ খবর নেয়া শুরু করি।
তা আর হয়ে ওঠে না। লাট্টুর মতন ঘুরতে ঘুরতে জীবন কাটাতে থাকি, প্রতি দিনকার বাঁধা ধরা পৌনপুনিকতায়।
*

ওজন বেড়ে যাচ্ছে সাংঘাতিক ভাবে। খাওয়া কমাতে পারি না, তাই ওজন ঠেকাতে একটা ব্যায়ামের যন্তর কেনা হলো। কিন্তু সেটা দিয়ে আর কিছু করা হয়ে ওঠে না। রোজ সকালে উঠে সেই মেশিনটার দিকে ঘড়ি ধরে তিন মিনিট তাকিয়ে থাকি। ব্যস, তাতেই কেমন হাস ফাঁস লেগে ওঠে। তারপরে পাশে রাখা স্কেলে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ক্রমবর্ধমান ওজন নিয়ে চিন্তায় পড়ে যাই।
ইদানীংকালের পত্রিকা পড়ে একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম, আমার নিজের ওজনের সাথে বাংলাদেশের চাল-ডালের দামের রয়েছে অত্যাশ্চর্য মিল! এই দুটাই একবার বেড়ে গেলে সহজে আর কমে না। ক্রমশ বাড়তেই থাকে।
মিল খুঁজে পেয়ে আপাতত আমার ওজন মাপা বাদ দিয়েছি। কোন লাভ নেই। বরং চালের দাম কমলে কেউ একজন আমাকে জানিয়ে যাবেন এখানে, প্লীজ। সেদিনই না হয় আবার মেপে দেখবো।
*

অস্ট্রেলিয়ান ওপেন হয়ে গেলো ক'দিন আগে।
কোন এক কালে, যখন কুর্নিকোভাদের টেনিস কোর্টের এমাথা থেকে ওমাথায় হরিণীর মতন ছুটোছুটির অভ্যাস ছিলো, আমার মতন টেনিস বিশেষ-অজ্ঞও তখন টিভির পর্দায় চোখ লেপ্টে বসে থাকতাম।
এখন আর সেই যুগ নাই। তারপরেও অল্প বিস্তর দেখি, খেলোয়াড় বেছে বেছে অবশ্যই।
মারিয়া শারাপোভাকে নিয়ে কদিন বেশ লেখালেখি হলো দেখলাম। আমি প্রায়শই ভাবতাম, এই সুন্দরী মেয়েটা প্রতিবার শট নেবার সময় কেন যে ওরকম ষাঁড়ের মতন চেঁচিয়ে ওঠে!
সেদিনের পত্রিকা খুলে দেখি জম্পেশ কাহিনি। মারিয়া'র চিৎকার মাপা হয়েছে, সবচেয়ে জোরে যেটা ছিলো- তার পরিমাপ ৭২ ডেসিবেলের কাছাকাছি।
এইটুকু বললে অবশ্য বেশি কিছু বোঝার উপায় নেই। পত্রিকায় তাই গ্রাফ এঁকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে- একটা মাঝারি মানের ভ্যাকুয়াম ক্লিনার সর্বোচ্চ শব্দ করে ৭০ ডেসিবেলের মতন। আর একটা পাওয়ার ড্রিলের জন্যে সেটা হয়ে যায় ৮০ ডেসিবেল! মারিয়া শারাপোভা রয়েছেন এই দুইয়ের ঠিক মাঝামাঝি!
আচ্ছা, আপনাদের কারো কি ষাঁড়ের চিৎকারের পরিমাপ জানা আছে? জানলে..., একটু মিলিয়ে দেখতাম আর কি!
*

(এই লেখাটার শিরোনাম কি দিবো এই নিয়ে খানিক ভেবে টেবে শেষমেষ দিলাম হাওয়াই মিঠাই।
দিল্লী কা লাড্ডু দিলে সবচেয়ে ভালো হতো, গুণে মানে তার চেয়ে এটা উন্নতমানের কিছু নয়। যো খায়েগা ও পস্তায়েগা, যো নেহী খায়েগা ও ভী পস্তায়েগা।
তো পস্তানোর জন্যে আপনাদের দিল্লীতে পাঠিয়ে দেয়াটা একটু পাষানীয় কান্ড হবে বিধায় তা আর দিলাম না।
আপাতত না হয় হাওয়াই মিঠাই খেয়েই পস্তান! )

সোমবার, ফেব্রুয়ারী ০৪, ২০০৮

মন্তব্য-পোষ্টঃ প্রজাপতিকাল

প্রজাপতিকাল দেখা শুরু করেছি রাত বারোটায়, এবং তাও সকাল পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠতেই হবে এরকম একটা তাড়া নিয়ে। তবে সত্যি কথা হচ্ছে, টেলিফিল্মটি শুরু হবার পরে ঘুমের কথা একেবারেই ভুলেই গেছি, এবং ঘুম থেকে উঠবার কথাও।

এক কথায় অনুভুতি জানতে চাইলে বলবো, খুব ভাল লেগেছে। কিন্তু তাহলে আরো কিছু বলার বাকি থেকে যায়।

প্রথমেই চমকে উঠেছি বাবু'র মেকআপ দেখে। দুর্দান্ত হয়েছে সেটা, একদম প্রথমবার স্ক্রীণে বাবুকে দেখেই একটা গা শিউরানো ভাব হয়েছে মনে। কিন্তু নাটক ক্রমশ এগুতে থাকলে জয়া ( বাবুর স্ত্রী) যেমন করে ঐ ভয়ংকর মুখটার আড়ালে সবচেয়ে সুন্দর মুখ খুঁজে পেয়েছিল, জয়ার সাথে সাথে আমরাও দেখতে পাই যেন সেই মুখটাকে।

জয়ার অভিনয় চমৎকার হয়েছে। বাবুর কথা নতুন করে বলার নেই আর। এই সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী অভিনেতার নাম জানতে চাইলে আমি কোন দ্বিধা ছাড়াই বলবো বাবুর নাম।
ভাল হয়েছে মিলনের অভিনয়ও। সোজা করে আচড়ানো চুলের সমান্তরালে বারবার হাত মুখের উপর বুলিয়ে নেয়ার দৃশ্যায়ন বাস্তব মনে হয়েছে পুরো সময়েই। অথবা কাজীর সামনে জয়া'র বিয়ে হয়ে যাবার আকস্মিকতায় হঠাৎ যখন সে কেঁদে ওঠে, একটুও বাড়াবাড়ি লাগে নি।
নিমা রহমানকে অনেকদিন পর দেখলাম পর্দায়। আলাদা কোন আবেদন রাখতে পারেন নি তিনি।
পুলিশের চরিত্রটা ভালো লেগেছে, আগের ও এখনকার পার্থক্য বুঝাতে মানানসই মেকআপ খুবই ভালো হয়েছে।

শুরুতে প্রফেসরের চরিত্রটা দরকারী মনে হয় নি। যদিও খুব বেশি সময় সেটা পর্দায় ছিলো না, তবে ওনার অভিনয়ে অনেকটা আড়ষ্টতা ছিলো। নাটকের শুরুটা অন্যরকম হলেও ভালো হতো বলে মনে হয়েছে বেশ কয়েকবার। একটা বাস্তবগল্পের উপরে বানানো হয়েছে কাহিনি, শুরুতেই বলা হয়েছে সেটা, তাই ভেবে নিয়েছি হয়তো সেই গল্পের সাথে মিল রেখেই এরকম একটা স্টার্টিং দেয়া হয়েছে নাটকে। কিন্তু তবু মনে হলো, নাটকের খাতিরে গল্পের খানিকটা পরিবর্তন করা তো যেতেই পারে, না কি?

নাটকের পেছনের শব্দ ( যেটাকে আবহ সঙ্গীত বলে বোধহয়) নিয়ে মিশ্র অনুভুতি হলো। কিছু জায়গায় খুব ভালো লেগেছে, আবার কিছু জায়গায় লাগে নি। মিলন যখন বাজারের ভেতরে ঢুকতে থাকে, তখন পেছনে বাজে পুরনো হিন্দি গান, এটা বেশ জমেছে। এবং এই সময়টায় ক্যামেরার কাজও বেশ মুগ্ধ হয়ে দেখলাম। এবং আর কিছু দৃশ্যে চারপাশের শব্দের প্রতি খুব মনযোগ দেয়া হয়েছিলো, এটা টের পাওয়া গেছে বেশ। কিন্তু শুরুর দৃশ্যে সংলাপহীন একটানা মিউজিক একটা সময়ে ক্লান্তিকর লেগেছে, যেটা আরেকটু ছোট হলেও পারতো। একই ব্যাপার ঘটেছে আরও কিছু দৃশ্যের সুরে।
চমৎকার গানের অংশ রয়েছে নাটকে। খুবই দারুন। এবং জয়াকে নিয়ে ' ঘরের রানী' গানটা চোখে আরাম দিয়েছে বেশ, শুনতেও ভালো লেগেছে। তবে একটা আপত্তি রয়েছে এখানে, কেমন করে যেন গানটা নাটকের বাইরে থেকে হুট করে জায়গা করে নিয়েছে বলে মনে হলো। অপ্রাসঙ্গিক বা সামঞ্জস্য নেই- এইরকম রূঢ় কোন অর্থ বুঝাতে চাইছি না, অর্থাৎ এইখানে এরকম একটা গানের খুব দরকার ছিলো, তবে হয়তো ঠিক এই গানটাই নয়, এরকম করেই নয়।

ছোট ছোট কিছু দৃশ্য মাথায় গেঁথে থাকবে মনে হচ্ছে অনেকদিন। খালিপায়ে এসে থেমে গিয়ে জয়ার পায়ে স্যান্ডেল পরার দৃশ্য, অথবা জয়া ও বাবুর ছোয়াছুয়ি খেলার দৃশ্যটা অসাধারণ বললেও কম বলা হবে। পরিচালকের উদ্দেশ্যে গুণে গুণে তিনবার তালি দেয়াই যেতে পারে এ জন্যে।

ব্লগে অলৌকিক হাসানের দেখা পেয়ে, এখানকার বাংগালী দোকানে নাটক নিতে গিয়ে একবার কামরুল হাসানের পরিচালিত নাটক আছে কি না খোঁজ করছিলাম। কিন্তু আমাদের পরিচালকের নাম দেখে নাটক দেখার সংস্কৃতি সরওয়ার ফারুকীকে দিয়ে শুরু হয়ে সেখানেই আটকে আছে, তাই নাটকের নাম না জানায় দোকানী তেমন সাহায্য করতে পারলো না, আমিও সারিবদ্ধ করে রাখা দুই শেলফ ভর্তি নাটকের ডিভিডিগুলো উল্টে পাল্টে খুঁজে দেখার কষ্ট করতে চাইলামনা।
প্রজাপতিকাল দেখার পর, বলতে দ্বিধা নেই, কামরুল হাসানের খোঁজে ওরকম তিনচারটে শেলফ খুঁজতে হলেও সম্ভবত আর পেছপা হবো না।