বুধবার, জুন ২৬, ২০১৯

শাম্মী



২০০৪ সালের কোন এক বিকেল। হঠাৎ সিদ্ধান্তে একটা জরুরি কাজে আমাকে যেতে হবে দিল্লী। ‘বহু দূর’- অর্থে দিল্লী না, সত্যি সত্যি নয়া দিল্লী। দিন সাতেকের কাজ। এই প্রথম দেশের বাইরে যাওয়া হচ্ছে আমার। বন্ধুদের সবাই প্রায় পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত, একেবারে একা যেতে হবে এই নিয়ে একটু ভাবনায় ছিলাম। শাম্মী-কে জিজ্ঞেস করলাম, যাবি নাকি আমার সাথে? শাম্মী খুব বেশি সময় নিলো না, কয়েক মুহুর্ত চিন্তা করে বললো, যাবে। কিন্তু ওর ভিসা করানো নেই, পাসপোর্টও মাইমানসিং-এ, আর আমার যাবার পরিকল্পনা আগামীকাল। আমি বললাম, নিয়ে আয় পাসপোর্ট। 
শাম্মী দৌড়ালো মাইমানসিং। পরদিন সকালে সেই পাসপোর্ট নিয়ে সোজা ইন্ডিয়ান এমব্যাসিতে। একবারে ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে গেছে। আমি বলেছি, ভিসা পেলে সোজা বাস স্টপে চলে আসবি, আর না পেলে হলে চলে যাবি। 
 দুপুর পর্যন্ত ভিসা-র কোন খবর নেই। আমি ঢাকা-কোলকাতা বাসে দুইজনের জন্যে দু’টা টিকেট কেটে নিয়ে বসে আছি। এর মাঝে ওর মোবাইলের ব্যাটারি গেছে মরে। খোঁজ নেয়ার উপায়ও বন্ধ। একটু পর পর ঘড়ি দেখছি, সময় বেশি বাকি নেই। বাস ছাড়ি ছাড়ি করছে। 
শেষ মুহুর্তে পড়ি মরি করে শাম্মী দৌড়ে ঢুকলো বাসে, মুখে সেই চিরপরিচিত সব দাঁত বের করা হাসি। ভিসা পেয়েছে! 
আমাদের যাত্রা শুরু হলো। ভারত যাত্রা। 
আমি আমার কাজের চিন্তায় খুব বেশি কিছু ভাবতে পারছি না, কিন্তু শাম্মী সবসময়ের মতই বিন্দাস, মাথায় একটা ক্যাপ চাপিয়ে আরাম করে ঘুরে বেড়াচ্ছে! 
কোলকাতায় আমাদের প্রথম স্টপেজ। সেখানে দুদিন থেকে পরের গন্তব্য দিল্লী। 
কোলকাতা থেকে দিল্লীর ট্রেনে উঠে হতভম্ভ হয়ে গেলাম। বাদ বাকি যাত্রীরা সবাই দেখি বিছানা-বালিশ-লেপ নিয়ে এসেছে। কেন তা কিছুই বুঝতে পারছি না। কিন্তু খুব বেশি অপেক্ষা করতে হলো না, রাত হতেই বুঝে গেলাম কারণ। ভয়ংকর ঠাণ্ডা পুরো ট্রেনে, জানালা লাগিয়েও মানানো যাচ্ছে না। ট্রেন ছুটছে, সেই সাথে কোন একটা ফুটোফাটা দিয়ে হুহু করে বাতাস ঢুকছে। আমার সাথে লেপ দুরে থাকুক, একটা গরম কাপড় নেই। ঠাণ্ডায় জমে গেছি একেবারে। নিচের বাংকে তাকিয়ে দেখি শাম্মী ওর ব্যাগ থেকে সাথে করে নিয়ে আসা দু’টা লুঙ্গি এক সাথে করে মাথা ঢুকিয়ে গিট্টু মেরে দিয়েছে। লুঙ্গি আমার খুব অপছন্দের একটা জিনিস, কিন্তু সেই প্রথম লুঙ্গি সাথে নেই বলে ব্যাপক আফসোস হলো। 
দিল্লী-তে পৌঁছে আমার কাজের ফাঁকে ফাঁকে বিস্তর ঘুরে বেড়াচ্ছি। লাল কেল্লা, কুতুব মিনার, কিচ্ছু বাদ নেই। এমনকি মাঝে সিনেমা হলে গিয়ে মারদাঙ্গা দু’টা সিনেমাও দেখে ফেলেছি। সেরকম ঘুরতে ঘুরতেই হঠাৎ একবার থেমে গিয়ে শাম্মী বললো, সবচেয়ে জরুরি কাজটাই কিন্তু করা হয় নাই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী? শাম্মী আঙ্গুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দিলো সামনে, একটা বিশাল হলুদ রঙের ইংরেজি অক্ষর, এম। ম্যাকডোনাল্ডস! তখন পর্যন্ত কেবল টিভি-তেই দেখেছি, কখনও সত্যি সত্যি দেখিনি। মন্ত্রমুগ্ধের মত আমরা ঢুকলাম গিয়ে সেখানে, পেট পুরে বার্গার খেলাম। খেয়ে দু’জনেই খুব ভাব নিতে লাগলাম। হু হু বাবা, ম্যাকাস। 
অমর একুশে হলে আমার দুই রুম পরেই থাকতো শাম্মী। প্রায় প্রতি সকালে আমার ঘুম ভাঙলেই টের পেতাম আমার পায়ের দিকটায় বসে কেউ একজন পত্রিকা পড়ছে। ঘুমের ভান ধরে ইচ্ছে করেই পা দিয়ে ঠেলা দিতাম বার কয়েক। শাম্মী বিরক্ত হতো, আর যে কোন বিরক্তিতে শাম্মীর এক শব্দের প্রতিবাদ ছিল, ‘অই’! 
খুব মেধাবী ছিল ও। বুয়েটে সিভিলে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু ওর জেদ ছিল কম্পিউটার নিয়েই পড়বে, পরের বছর তাই পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা ভার্সিটিতে চলে এলো কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগে। সবসময়ে শুনে এসেছি, ও দেশে থাকবে না। ক্যানাডা চলে যাবে। পত্রিকা খুলে প্রথমেই আমরা সবাই পড়তাম খেলার পাতা। শাম্মী পড়তো, চলতি বিশ্ব। ওর কথা হচ্ছে, দেশেই যখন থাকবো না তাহলে দেশের খবর পড়ে কী হবে, এখন থেকেই বহির্বিশ্বের খবর নিয়ে তৈরি থাকা ভালো। 
তিথি-র একবার শখ হলো রান্না করে খাওয়াবে আমাকে। রোকেয়া হল থেকে রান্না হয়ে টিফিন বক্সে করে খিচুড়ি আর বিফ চলে এলো অমর একুশে হলে। আমি সেসব নিয়ে খেতে বসলাম, সাথে শাম্মী। তিথির রান্না প্রথম খাচ্ছি, আমি তো ব্যাপক আপ্লুত। শাম্মী-কে জিজ্ঞেস করলাম, কী রে, কেমন লাগছে? শাম্মী খেতে খেতেই ভাবলেশহীন হয়ে উত্তর দিলো, ভালাই, তয় কইস লবণ একটু কম হইছে! 
এরকমই ছিল শাম্মী। মনের কথা অকপটে বলে দিত মুখে। কোন ঘোরপ্যাঁচ ছিল না, মাথায় বা চিন্তায়, মনে ও না। 
একদিন রুমে ফিরে দেখি আমার বিছানায় পা গুটিয়ে চুপ করে বসে আছে। মন ভালো না, দেখেই বুঝে গেলাম। আমি এটা সেটা জিজ্ঞেস করে শেষমেশ জানতে চাইলাম, কী হয়েছে তোর? শাম্মী ওর পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে দিলো, ওর মায়ের লেখা। কী যে মায়া মাখানো ছিল সেই চিঠিটা! আমার এখনো মনে আছে চিঠির কথাগুলো। 
ওর ইচ্ছে পূরণ হয়েছিল জানি, ইউনি শেষ করে শাম্মী সত্যিই দেশের বাইরে চলে গিয়েছিলো। আর আজ সকালে হঠাৎ খবর পেলাম, এবারে দেশ নয় শুধু, এই জগত ছেড়েই ও চলে গেছে অনেক দূরে, না ফেরার দেশে।  
আসলে টেরই পাইনি, কবে কেমন করে যে এই বয়সে পৌঁছে গেলাম, যেখানে বন্ধু হারানোর কষ্টগুলো আস্তে আস্তে ছুঁয়ে দেয়া শুরু করবে আমাদের। শাম্মীর চলে যাওয়াটা কেমন একটা ধাক্কা দিলো মনে, হঠাৎ দুপুরে অচেনা কারও কড়া নাড়ার শব্দের মতন কেমন চমকে দিল যেন। 
হয়তো অর্থহীন আর অবাস্তব আমাদের এই চাওয়া, তবু মন থেকে চাই, আমাদের এই বন্ধুটা ভালো থাকুক। 

শনিবার, মে ১৮, ২০১৯

অক্ষয় মালবেরিঃ মণীন্দ্র গুপ্ত



এই বইটির পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখবার ক্ষমতা আমার নেই। 
আমি দীন হীন এক শব্দ কাঙাল, নিজের সমস্ত অপারগতা হাতের আঙুলে জড়িয়ে আমি এই বইটি পাশে নিয়ে বসে চুপ করে নিজের বোধিলাভ প্রত্যক্ষ করতে পারি শুধু, আর কিছু নয়। 
এর চেয়ে সুন্দর কিছু আজ অব্দি খুব বেশি পড়িনি, এই জীবনে এর চেয়ে স্বপ্নিল কিছু আর বেশি পড়তে পাবো না, এটাও জানি। 
নিজের সীমাহীন খামতি আর মুগ্ধতা এইখানে শুধু লিপিবদ্ধ করে রাখলাম।

শনিবার, মার্চ ৩০, ২০১৯

শিবব্রত বর্মনের গল্প সংকলন- বানিয়ালুলু


এখন পর্যন্ত বছরে আমার পড়া সবচেয়ে চমৎকার বাংলা বই এর নাম- ‘বানিয়ালুলু’। ইচ্ছে হচ্ছে লোকেদের ডেকে এনে ধরে ধরে পড়াই বইটা। 
আমাদের যাদের বাংলা কল্পবিজ্ঞানের হাতেখড়ি হয়েছেকপোট্রনিক সুখ দুঃখবাতোমাদের জন্যে ভালবাসাবইগুলোর মাধ্যমে, তাঁদের কাছে বাংলা কল্পবিজ্ঞানের জগতে বিজ্ঞানের চেয়েও মানবিকতার পাল্লার ভার বেশি। আমি নিশ্চিত যে আমার সমবয়সী বাংলা পাঠকদের সবচেয়ে প্রিয় গল্পের নামের তালিকায় থাকবেটুকুনজিল’, কিংবাটুকি ঝাঁ এর প্রায় দুঃসাহসিক অভিযানঅথবানিউটনের ভুল সুত্রগল্পগুলো। বিষয় এবং গল্প বলার ভঙ্গিতে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে, তবুও বলতে দ্বিধা নেই, ’বানিয়ালুলুবইটি পড়তে গিয়ে বহুদিন বাদে সেই বইগুলো পড়ার আমেজ এবং আনন্দ ফিরে পেলাম। 
বইয়ের প্রথম গল্পের নামইবানিয়ালুলু’। এই গল্পটা পড়ে খানিকটা আশাভঙ্গ হয়। এটা যতটা না কল্পবিজ্ঞান, তারচেয়ে বেশি বেশ উচ্চমানের সারকাজম। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, পরের গল্পগুলো পড়তে গিয়ে টের পাই, বানিয়ালুলু নামের গল্পটা এক কথায় এই পুরো বইটির প্রস্তাবনা। লেখক এই গল্প দিয়েই যেন আমাদের স্বাগত জানিয়েছেন তার তৈরি করা একটা অদ্ভুত জগতে। অনেকটা যেন বাকি বইয়ে ঢোকার আগে প্রস্তুতিপর্বের কাজ করে এই গল্পটা। 
পরের প্রায় সবকটি গল্পই চমৎকার অথবা দুর্দান্ত বিশেষণে বিশেষায়িত হবার যোগ্য। 
দুই শিল্পীভাল লেগেছে, কিন্তু হঠাত করে শেষ হয়ে গেছে মনে হলো। প্রতিদ্বন্ধীপড়ে লেখকের কল্পনাশক্তির বিস্তার দেখে অভিভূত হয়েছি। মনে মনে বেশ কয়েকবার অজান্তেই প্রশংসা করেছি গল্প এগিয়ে নেবার পারদর্শিতার। বেশ কিছু গল্পে লম্বা বর্ণনা দিয়েছেন লেখক, গল্পের মূলে ঢুকবার আগে। যেমন ধরা যাকডঃ মারদ্রুসের বাগান।সেই বর্ণনাগুলো ঝুলে যাবার একটা আশংকা ছিল, কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম শেষমেশ আগ্রহ ধরে রেখে পুরো গল্পটা টেনে নিয়ে যেতে পেরেছেন তিনি, অতিরিক্ত মনে হয়নি আর সেগুলো। সবচেয়ে বড় কথা, যে বাগানের আপেল অথবা কমলাগুলো আসলে শেক্সপিয়রের সনেট, সে বাগানে আরেকটু লম্বা সময় কাটাতে পারলে ক্ষতি নেই। 
ভেতরে আসতে পারি?’, ’দ্বিখন্ডিতএবংবহুযুগের ওপার হতেসবগুলোই খুব ভাল মানের গল্প। খেয়াল করে দেখলাম, একেবারে নতুন বিষয়ে লেখা গল্পে লেখক যেমন দক্ষ, তেমনই গল্পের বিষয় যেখানে পুরনো- সে গল্পের বর্ণনায় তিনি সাবলীলভাবে নতুন কোন ভঙ্গি নিয়ে এসেছেন। 

বইটিকে পাঁচের ভেতর নির্দ্বিধায় সাড়ে চার দিব আমি। লেখক শিবব্রত বর্মনের লেখা আগে পড়িনি কখনো, কিন্তু এখন থেকে তিনি আমার অবশ্যপাঠ্যের তালিকায় পাকাপাকি জায়গা করে নিলেন। 

মুহম্মদ জাফর ইকবাল-এর অবিশ্বাস্য সুন্দর পৃথিবী


এই বুড়ো বয়সে এসে বই পড়তে গিয়ে চশমার কাচ ঝাপসা হয়ে আসা খুবই বিব্রতকর। এদিক ওদিক তাকিয়ে মুখে একটা গোবেচারা হাসি ঝুলিয়ে চশমা পরিষ্কার করে আবার মুখ ডুবিয়ে দিয়েছি পড়ায়। 
পড়তে পড়তে অনেকবার গা দুলিয়ে হেসেছিও। গা দোলাবার কারণ, লাইব্রেরিতে বসে পড়ছি তাই শব্দ করা যাবে না, শব্দ আটকানোর অসম্ভব পরিশ্রমের বহিঃপ্রকাশ এই গা দোলানো। 
মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসে সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে এরকম কৌতুক করে লিখতে পারা মানুষ খুব বেশি নেই পৃথিবীতে। নিজেকে হত্যা করতে উদ্যত মানুষটাকে যেন গণপিটুনিতে মেরে ফেলা না হয়, স্ট্রেচারে শুয়ে হাসপাতালে যেতে যেতে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার মানুষের সংখ্যা আরও কম। সুস্থ হয়ে জেলে গিয়ে সেই লোককে দেখে আসবার সাহস দেখে শিউরে উঠেছি। 
সবচেয়ে হাসি পেয়েছে লেখককে দেখতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের কথাতে, ”আপনি কনুই দিয়ে একটা গুঁতো দিতে পারলেন না?” হাহাহা ! 
দুর্জনের মুখে ছাই আর পেটে কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে এভাবেই আপনি আরও যুগ যুগ বেঁচে থাকুন, খুব প্রিয় মুহম্মদ জাফর ইকবাল!

শুক্রবার, মার্চ ০৮, ২০১৯

সুহানের বই, ইবইয়ের প্রচ্ছদ এবং বইদ্বীপ



খুব চমৎকার একটি প্রচ্ছদসহ সুহানের এই বইটি প্রকাশিত হয়েছে বইমেলা ২০১৯ এ।
বইদ্বীপ থেকে ইবুক হিসেবে প্রকাশের জন্যে আমরা যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন আমিই হঠাত প্রস্তাব করি, ইবুকের জন্যে একদম নতুন একটা প্রচ্ছদ করলে কেমন হয়? সুহান রাজি হতেই এঁকে ফেলি এই প্রচ্ছদ। এবং ওর দোনোমনাকে পাত্তা না দিয়ে প্রচ্ছদে লেখকের নামের ফন্ট সাইজ বড় করে দিই বইয়ের নামের চেয়ে, ঠিক যেমনটা দেখি বহির্বিশ্বের বইগুলোয়। 

আমাদের দেশে এখনো অবশ্য ইবুক বলতেই আমরা বুঝি প্রকাশিত বইগুলোর স্ক্যান করা পাতাগুলো জুড়ে দিয়ে তৈরি একটা পিডিএফ ফাইল। কিন্তু ইবুক মানে তা নয়। হার্ডকাভার এবং পেপারব্যাক যেমন বইয়ের দু
টা সংস্করণ, ইবুক হলো তৃতীয় সংস্করণ। ইপাব বা মোবি তে বাংলা অক্ষর পড়বার আনন্দই অন্যরকম। বইদ্বীপের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন বিরামহীন ভাবে ইবুকের কার্যকারিতা নিয়ে প্রচার চালিয়েছি। সেটা করতে গিয়ে টের পেয়েছি, আমরা বাংলাদেশিরা কাগজের মেইলের বদলে ইমেইলকে মেনে নিয়েছি নিঃসংকোচে, কিন্তু বইয়ের বদলে ইবইয়ের কথা এলেই খুঁজি শুধু স্ক্যান করা পিডিএফ! এ কথা খুব কম মানুষকে বোঝাতে পেরেছি যে ইবই এর আলাদা অস্তিত্ব যত দ্রুত মেনে নেয়া যাবে, বাংলা বইয়ের প্রচার ও প্রসার তত বেশি দ্রুতগামী হবে। 

সুহানের এই বইটি অনেকগুলো কারণে আমার কাছে বিশেষ একটা বই। প্রথমত এটি খুব ভালো মানের একটি উপন্যাস। অনেকদিন বাদে সমসাময়িক কোন লেখকের লেখা পড়ে এতটা আশান্বিত ও আনন্দিত হয়েছি। আর দ্বিতীয়ত, বইদ্বীপ থেকে এই প্রথম কোন বাংলা বইয়ের আলাদা ইবুক প্রকাশিত হলো, ছাপা বইয়ের ইসংস্করণ নয়, সত্যিকারের আলাদা ইবই, যার রয়েছে আলাদা প্রচ্ছদ ও কন্টেন্ট। এই ব্যাপারটি আমার জন্যে অপরিসীম আনন্দের। এই সুযোগ করে দেবার জন্যে সুহান রিজওয়ান-কে তাই অনেক ধন্যবাদ জানাই।
বইটি পাওয়া যাচ্ছে এখানেঃ
https://www.boidweep.com/2019/03/blog-post.html

রবিবার, ফেব্রুয়ারী ১০, ২০১৯

সুহান রিজওয়ান এর উপন্যাস - ‘পদতলে চমকায় মাটি’

     
        সমর কুমার চাকমা আমার কাছের কেউ নয়। বলা যায় পাশের বাড়ির মানুষ। পাশের বাড়ির মানুষেরা তো আমার নিজের বাড়ির মানুষদের মত আপন কেউ নয় আসলে। ওয়াইফাই আর ফোরজি সিগন্যালের কল্যাণে আমরা পুরো বিশ্বের সাথে নিজেদের সংযুক্ত করে ফেলেছি ঠিকই, কিন্তু একই সাথে শত ফুট উঁচু দেয়াল তুলে দিয়েছি নিজের চারপাশে। এই দেয়াল টপকানো সহজ কোন কাজ নয়। 
            পত্রিকার পাতায় পড়তে পাই আমার প্রতিবেশীর খবর। পত্রিকা, সে-ও তো দূরের কোন ব্যাপার। আমার মত ‘মডারেট-স্বার্থপর’ এবং অল্পবিদ্যার পাঠকেরা নিজেদের চারপাশে একটা কল্পরাজ্যের আড়াল তুলে রাখতে ভালবাসি। পত্রিকার পাতার অস্বস্তিকর বাস্তবতা থেকে চোখ সরিয়ে নিয়মিত তাই রোমান্টিক নায়কের সাথে অপরূপা নায়িকার বাড়ির রাস্তায় পথ চলি। এসকেপিস্ট? হয়তো বা। আমরা তবু খুশি, অন্তত স্বস্তিটুকু থাকুক। 
সুহান ঠিক এই জায়গাটাতেই একটা ধাক্কা দিয়েছে। বাস্তবতা থেকে মুখ ঘুরিয়ে স্বস্তি পেতে আমরা যেদিকে তাকাই, ঠিক সেই খানটায় এসে ও সটান করে দাঁড়িয়ে গেছে, আর হাতের মুঠো খুলে আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছে একটা উপন্যাসের বই, যেখানে রয়েছে সবুজ মানুষদের গল্প। সবুজ মাটি, সবুজ অশ্রু আর রক্তের আখ্যান- এই ‘পদতলে চমকায় মাটি’। 
আবার কী আশ্চর্য, বইয়ের বিভিন্ন পাতায় কেমন করে যেন খুঁজে পাই আমাকে এবং আমার বাড়ির লোকেদের। এই যে একেবারে গড়পড়তা একটা মানুষ আরিফ, সে কি আমি নই? বা খানিকটা সমাজ-সচেতন হিমেল, অথবা অথর্ব সিস্টেমের খপ্পরে পড়ে একটা দুর্দান্ত খেলোয়াড় না হয়ে উঠতে পারা শামীম আজাদ, তাঁরা তো আসলে আমরাই। আর এই যে শান্তিপ্রিয়া, সে যে আমাদের সকলের চিরচেনা একজন মানুষ। 
এই সব মানুষদেরই কথা জমিয়ে রাখা সুহানের এই বইটির প্রতিটি পাতায়। মুগ্ধ হয়ে পড়ে গেছি শুরু থেকে শেষ। আর তার মাঝে কতবার চোরা চোখে একটা ভীষণ সত্যবাদী আয়নায় চোখ পড়ে যাওয়ার অস্বস্তিতে মুখ লুকিয়েছি, তার হিসেব নেই কোন। 
খুব চমৎকার করে এগিয়েছে প্রতিটি চরিত্রের গল্প। যেন আড়মোড়া ভেঙ্গে ডালপালা ছড়িয়ে ঘুম থেকে উঠে দাঁড়ালো একটা ছাতিম গাছ। সমর খুঁজবে শান্তি-কে, সুহানের কলমের জোরে তাতে আর আশ্চর্য কী! বরং মনের অবচেতনে আমরাও পুরোটা সময় খুঁজে গিয়েছি শান্তিপ্রিয়াকে। যতটা সমরের জন্যে, কে জানে ততটাই হয়তো ঠিক আমাদের জন্যে। 
অবলীলায় বলতে পারি, এই উপন্যাসটি পড়ার অভিজ্ঞতা আমার মনে থাকবে আজীবন। কত সহজেই আরিফ আর হিমেল মিলে মিশে যায় বিজয় আর সন্তুর সাথে, আবার মিশে যেতে পারে কি আসলে? হয়তো না। সমর আর শামীম আজাদ যেমন করে একে অপরের ছায়া হয়ে দাঁড়ায়, আবার হয়ে যায় একে অন্যের ছায়াবৃক্ষ, এই সব কিছুর সাক্ষী হবার অনুভূতি একেবারে তুলনাহীন। 
উপন্যাসটির সমাপ্তি হয়েছে সবচেয়ে চমৎকার ভাবে। যে কোন ভালো গল্পকে আমার চিরদিনই মনে হয় একেবারে নির্ভুল সুর-লয়-তালে মেশানো একটা চমৎকার সঙ্গীতায়োজন, ঠিক একই আমেজ পেলাম যেন এই উপন্যাসটিতে। 
পড়া শেষ করে তাই অদ্ভুত এক বোধে আচ্ছন্ন হতে হয়। সেটা যে কী আসলে, তা বুঝে উঠতে পারি না। নিজেকে হঠাত করে রূপকথার গল্পের সেই ন্যাংটো রাজার মত মনে হয়, তখন কেমন ভয়ার্ত চোখে আমি সেই ঠোঁটকাটা শিশুটিকে খুঁজি, যে আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দিবে আমার দীনতা। খুঁজতে গিয়ে চোখ পড়ে আমার হাতে ধরা বইটির ওপরে। 
তখন মনে হয়, সেই বোধ হয়তো অনেকগুলো দীর্ঘশ্বাসের শব্দ, আর কিছু নয়। কিংবা হয়তো কেবল একটা অক্ষম মৃদু অস্বস্তি, কিন্তু ভ্রম কাটে না ঠিক কী সেটা। কেবলই মনে হতে থাকে, আমার চিরকালীন স্বস্তিকর নির্বিবাদী জীবনে কোথাও একটা খড়িমাটির দাগ যেন ভেসে উঠেছে, সে দাগ সহজে যাবার নয়।
লেখকের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। ব্লগ আর বইয়ের কল্যাণে গত বছর দশেক ধরে সুহানের লেখা পড়ছি, উত্তরোত্তর তাঁর লেখনীর জোরে বাংলা সাহিত্য নিয়ে আমাদের আশা বাড়ছেই কেবল। 
বাংলায় সাম্প্রতিক যা কিছু পড়েছি বা পড়ি, তার থেকে বুঝতে পারি বাংলা উপন্যাসের জগত এখন কেবলই ভনিতাময়। এখানে সৎ সুন্দর গল্প নেই আর কোন, সৎ সুন্দর গল্পের ভান আছে কেবল। 

আমি বলব একটা লম্বা সময়ের পরে সম্ভবত এই এতদিনে আমরা সুহান-এর মাধ্যমে আমাদের আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হক এবং হাসান আজিজুল হকের যোগ্য উত্তরসূরি পেয়ে গেলাম। সুহান রিজওয়ান এই সকলের মিলে মিশে নিজেই অনন্য হয়ে ওঠা একজন অসাধারণ শব্দশিল্পী। 

শনিবার, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০১৮

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এর পোর্ট্রেইটঃ প্রসেস ভিডিও

প্রোক্রিয়েট এপ দিয়ে আঁকবার এই এক মজা, প্রসেস ভিডিও বানিয়ে দেয় এটা।  ইউটিউবে এই ভিডিওগুলো আপলোড করে ফেলবো আস্তে আস্তে।
আজকে দিলাম গুরু-র ছবি, দি গ্রেট 
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।

বৃহস্পতিবার, জুলাই ১২, ২০১৮

শাহাদুজ্জামান-এর উপন্যাস 'একজন কমলালেবু'-

কিছু বিষাদ হলো পাখি। সম্ভবত প্রতিটি বাঙালি কিশোরের প্রথম ঈশ্বর দর্শন হয় জীবনানন্দের কবিতা পড়ে। 
বছর কুড়ি বা তারও বেশি আগে, কোন এক মেঘলা মফস্বলের চুপচাপ দুপুরে, প্রায় হঠাতই হাতে আসা নিউজপ্রিন্টের দুর্বল কাগজে ছাপা একটা বইয়ের ভেতর আমি প্রথম চোখ মেলে দেখি, সেখানে অলস গেঁয়োর মত এক টুকরো ভোরের রোদ মাথা পেতে শুয়ে আছে ধানের উপরে। একটা ইগনরেন্ট দানবের মত অবহেলাভরে সেই যে জীবনানন্দ আমাকে ছুঁয়ে দিলেন, সেই ঘোর আমার আজও কাটেনি, মনে প্রাণে চাই, কখনও যেন না কাটে। আকাশের ওপারে আকাশ ভেসে বেড়ায় যার হাতে, হৃদয়ের আদিগন্ত জুড়ে ঝুলে থাকে যে এক বিপন্ন বিস্ময়, এই নোংরা পৃথিবীকে অবলীলায় যিনি মায়াবী পারের দেশ বলে ঘোষণা দিতে পারেন, তাঁর চেয়ে অপার্থিব চোখ কারও নেই, জানি, তাঁর চেয়ে বেশি পার্থিব আর কোন মানুষের হবার সম্ভাবনা নেই, তাও জানি।

শাহাদুজ্জামানের লেখা ‘একজন কমলালেবু’ যেন একটা নিঃসঙ্গ সেতারের বাজনা। খুব ভালো লেগেছে বইটি পড়ে। একটা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তিনি জীবনানন্দকে বইয়ের পৃষ্ঠায় বিছিয়ে দেবার চেষ্টা করেছেন, তবু এটি পড়তে গিয়ে সারাক্ষণ বুকের ভেতরে একটা কষ্ট দম চেপে আটকে ছিল ঠিক গলার নিচটায়। কিছু কিছু সিনেমা দেখি আমরা, কিছু বই পড়ি, যেখানে নায়কের দুঃখ দুর্দশা আমাদের মন ভিজিয়ে দেয়, আমরা আন্দোলিত হই, কিন্তু সেই সাথে মনের ভেতরে এ-ও জানি যে এটা সাময়িক, খুব শীঘ্রই তার দেখা হয়ে যাবে কোন রূপবতী নায়িকার সাথে, অথবা পেয়ে যাবে কোন মোটা বেতনের চাকরি। এই সুখময় যবনিকার সম্ভাবনা আমাদেরকে নিষ্কৃতি দেয় সেই মন খারাপ থেকে। কিন্তু, একজন কমলালেবু-তে সেটার কোন উপায় নেই। একটা হতাভাগা জীবনানন্দের কাহিনী আমরা সেখানে পড়ি, যার শেষমেশ সিনেমার নায়ক হয়ে ওঠা হয় না। প্রতি পৃষ্ঠা ওলটাতে হয় এটা জেনেই যে, এই কষ্টানুভুতি থেকে কোন নিস্তার নেই, কখনও মিলবে না। 
নানা ভাবে জীবনানন্দকে জানা যায় এখানে। তাঁর প্রথম কবিতা, বরিশালের জীবন, সমসাময়িক শিল্পাঙ্গনের মানুষদের অবহেলা...। তাঁর নগণ্য সংখ্যক বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করি নানা সময়ে। কিন্তু সর্বোপরি, খুব কষ্ট হয় সেই মানুষটার জন্যে। কবিতারা কেমন ভুতের আছর হয়ে নেমেছিল তাঁর ওপরে। সেই যন্ত্রণা মাথায় নিয়ে একটা পুরো জীবন তিনি কাটিয়ে দিলেন। পরের এক শতকে অগণিত মানুষের মনের প্রভুত্ব রইবে যার হাতে, সেই মানুষটি তবু মন পেলেন না একজন শোভনার। কিছু কবিতাহত মানুষের সবচেয়ে আপনজন যিনি, তিনি তবু আপন হয়ে উঠতে পারলেন না একজন লাবণ্যর। 
অনেকগুলো কবিতার প্রেক্ষাপট জানা হলো বইটির মাধ্যমে। আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে। কবিতার পাশে সেগুলোকে বসিয়ে তাকাই যখন, কবির প্রতি মায়া বেড়ে যায় আরও। কবির জীবনকে খণ্ড খণ্ড দৃশ্যাবলীর সমন্বয়ে একটা চলচ্চিত্রের মত করে দেখার চেষ্টা যেন। শাহাদুজ্জামান সফল হয়েছেন তাতে। এর চেয়ে তথ্যবহুল জীবনী হয়তো পাওয়া যাবে খুঁজলে, কিন্তু এই বইটিতে লেখকের আন্তরিকতাটুকু অনন্য। 
‘একজন কমলালেবু’ বইটি পড়া শেষ হলে আমরা দেখি অসীম প্রতিভাবান কিন্তু আদ্যোপান্ত এক ব্যর্থ ও হতাশ মানুষকে। সুখ নামের জটিল হিসাবকে যিনি মিলিয়ে উঠতে পারেননি। যার কলম থেকে ঝরনাধারার মত ঝরে ঝরে পড়ে ভালোবাসা, কিন্তু কী রুঢ় একটা ভালবাসাহীন জীবন তিনি যাপন করে চলে গেলেন একটা অথর্ব অভিমান নিয়ে। 
তবু পৃথিবীর প্যারাডক্স এই, প্রিয় জীবনানন্দ, আমি তবু আজীবন আপনার লেখা আমার প্রিয়তম কবিতাটিকেই করে নিবো অবারিত আলোর উৎস।  
“ এখন রজনীগন্ধা-প্রথম-নতুন-/ একটি নক্ষত্র শুধু বিকেলের সমস্ত আকাশে;/ অন্ধকার ভালো বলে শান্ত পৃথিবীর/ আলো নিভে আসে।
অনেক কাজের পরে এইখানে থেমে থাকা ভালো;/ রজনীগন্ধার ফুলে মৌমাছির কাছে;/ কেউ নেই, কিছু নেই, তবু মুখোমুখি / এক আশাতীত ফুল আছে।” 
( শব্দ কৃতজ্ঞতাঃ মেঘদল, শাহাদুজ্জামান এবং জীবনানন্দ) 

বুধবার, মার্চ ২৮, ২০১৮

পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ হাসান আজিজুল হক- এর 'ছোবল'

ভূমিকাতেই লেখক জানিয়ে দিয়েছেন, এই বইটি মুখ নয়, মুখোশও নয়, বরং একটা ‘কথামুখ’ এর আদল তৈরি করা হয়েছে কেবল। 
শেষ পৃষ্ঠার নম্বর ৪৫ হলেও, সব মিলিয়ে আট ন’হাজারের বেশি হবে না শব্দ সংখ্যা। না গল্প, না উপন্যাস, একটা বড় গল্প বরং বলা যেতে পারে এটিকে। তাই বইটির এই ক্ষীণ আকৃতির কারণেই যে লেখকের এই ভূমিকা, তা বলাই বাহুল্য। 
তবু এর মাঝেই একাধারে সব করকম মুনশিয়ানা দেখালেন হাসান আজিজুল হক। কী দুর্দান্ত সূচনা। আবারও মনে হলো, গল্পের শুরুটা যদি পাঠককে অপেক্ষায় রাখতে পারে শেষটুকুর জন্যে, তাহলেই কেবল সেটা সার্থক গল্প হয়ে উঠতে পারে।  
চার দশক আগের ঢাকা। ক্রমশ বাড়ছে এর পরিধি। মূল ঢাকায় যাদের জমি কেনার সামর্থ্য নেই, ঢাকার অদূরেই এক টুকরো জমি কিনতে আসা কিছু মানুষের গল্প এটি। একটা বিষধর সাপের মতন নগর কেমন করে আড়মোড়া ভেঙে ধীরে ধীরে গ্রাস করে চলে এর আশপাশের গ্রাম্যতা, আর সবুজকে,  এবং সবুজ গ্রাম্যতায় পরিপূর্ণ মানুষের জীবনগুলোকে, ‘ছোবল’ তারই একটা আভাস। 
মুগ্ধ হয়ে পড়লাম। ‘চাঞ্চল্য আর গভীরতা দুই ভয়ানক বিপরীত শক্তির বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে মুহূর্তের জন্যে ঝুমু হেলালের দিকে তাকায়। আমারটার মতো সাদা রাজহংসী নয়, একটা টগবগে মাদী ঘুড়ী-বিদ্যুতের মতো চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল আর ক্ষুরের মতো ধারালো একটা চাবুক সাঁৎ করে হেলালকে দুই ভাগ করে ফেলে। নিমেষে এটা ঘটে, কারণ তক্ষুনি হেলাল আবার জোড়া লেগে যায়।’ 
লেখা এমনই হওয়া উচিত আসলে। লেখার আকৃতি ছোট বা বড়তে তেমন কিছুই যায় আসে না। যতক্ষণ পড়লাম, আর পড়ার পরে এই এতক্ষণ ধরে যে ভেবে চলেছি হামিম, ঝুমু, হেলাল বা জাকিয়ার কথা, হাবিবা অথবা তাহমিনা বা তফাজ্জলের কথা, ঠিক এখানটাতেই লেখক হয়ে যান জাদুকর। 
বইমেলার শুরু থেকেই এবারে দেশে ছিলাম বলে বেশ কিছু বই কেনা হয়েছে, দেশে পাওয়া অবসরের কল্যাণে সেগুলো পড়াও ধরেছি। পড়তে পড়তে কেমন দম বন্ধ লাগছিল, শান্তি পাচ্ছিলাম না। আক্ষেপ করে লিখেছিলাম, “কোথাও একটা দুর্দান্ত গল্প পাই না খুঁজে। খুব আগ্রহ নিয়ে নতুন কেনা বইগুলো হাতে নিই, সেখানে শব্দের চাতুর্য আছে, বাক্য বিন্যাস নিয়ে নিরীক্ষা আছে, জাদুকরের টুপি থেকে উঁকি দেয়া খরগোশের মতন চমক আছে... কিন্ত একটা সুন্দর পরিপাটি মেঘ, অথবা গভীর কালো জলের শান্ত কূয়োর মতন অসামান্য কোন গল্প নেই কোথাও। তারা সব কোথায় হারিয়ে গেছে!’’ 
ভালো ভালো লেখা পড়াটা যে কী ভীষণ জরুরি! 

‘ছোবল’ যেন একটা খড়কুটোর মত আমার হাতে এসে পড়লো, এক মুঠো অক্সিজেন হয়ে আমাকে কেমন বাঁচিয়ে দিয়ে গেলো, মন ভালো করে দিয়ে গেলো। ধন্যবাদ আপনাকে, হাসান আজিজুল হক।  

সোমবার, মার্চ ২৬, ২০১৮

সাদাত হোসাইন-এর উপন্যাস 'আরশিনগর'-

এবারের বইমেলা থেকে কিনে আনা বইগুলো একে একে পড়তে শুরু করেছি। সর্বশেষ পড়া হলো, বইমেলার বেশ জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসাইনের উপন্যাস ‘আরশিনগর’। গুডরিডসে বইটিকে পাঁচ এর ভেতরে দেড় দিতে চেয়েছিলাম, সেটার উপায় না থাকায় দুই রেটিং দেবার পরে মনে হলো, বিস্তারিত না হলেও কারণগুলো অন্তত সংক্ষেপে এখানে টুকে রাখি।
যা ভালো লাগেনি-
১/ অসংখ্য পুনরাবৃত্তি। ‘কোন এক অদ্ভুত কারণে’।
২/ বিস্ময়বোধক চিহ্নের অসংখ্য অকারণ ব্যবহার, বক্তব্যকে দুর্বল করে দিয়েছে।
৩/ আবারো, অসংখ্য বাক্যের অকারণ পুনরাবৃত্তি, একই প্যারার শুরুতে, মাঝে ও শেষে, শব্দের অবস্থান বদলে বদলে একই বাক্যের উপস্থিতি বারবার।
৪/ ফরম্যাটে ফেলা অভিব্যক্তি। ‘তাঁর এই কান্নার শব্দ কেউ শুনল না। কেউ না।’ 
‘তাঁর খুব জানতে ইচ্ছা করে। খুব।’ ‘সে কত কিছু ভাবে। কত কিছু! কিন্তু তাঁর কাউকে কিছু বলতে ইচ্ছা করে না। কাউকে না। ’
৫/ অনেক চরিত্রকেই শুধু শুধু মহিমান্বিত করা হয়েছে শুরুতে, পরিসমাপ্তিতে তার প্রতিফলন নেই কোন।
৬/ চরিত্রগুলো পূর্ণতা পায়নি অনেক ক্ষেত্রেই, উপন্যাসে বেশিরভাগের উপস্থিতিই অকারণ। এমনকি মূল চরিত্রটিও মনে শেষমেষ কোন দাগ কাটতে পারেনি।
৭/ গল্প ঝুলে গেছে। পড়তে পড়তে বহুবার পড়া থামিয়ে দিয়েছি, আবার হাতে তুলে নেবার তাড়া অনুভব করিনি কোন।
৮/ দুর্বল ও দ্বিধান্বিত সমাপ্তি। কাল রাতে পড়া শেষ হলো, সকালে এখন লিখতে বসে শেষটা মনে করতে পারছি না, আবার বই খুলে দেখে নিতে হলো। এরকম সমাপ্তির জন্যে উপন্যাসটিকে ভুলে যাওয়াও সহজ হবে।
যা ভালো লেগেছে-
১/ বড় কলেবর। নতুন লেখকদের মধ্যে এই কলেবরে লেখার প্রবণতা কম।
২/ উপন্যাসের পটভূমির ব্যাপ্তি এবং সেই সাথে অনেক চরিত্রের সমাবেশ। এদের সামাল দেবার মতন সাহস লেখকের রয়েছে।
৩/ লেখায় মায়া আছে। কথ্য গল্পের একটা ছোঁয়া আছে, একটা সহজবোধ্যতা আছে। আবার সমবন্টনের ভঙ্গিতে পুরে দেয়া ছদ্ম-গভীরতাও আছে।
আমরা যারা বাংলা সাহিত্যের মাঝারি মানের পাঠক, তাঁদের চির চেনা এক লেখকের লেখন-ভঙ্গির ছাপ রয়েছে সাদাত হোসাইনের লেখায়, তবে দুর্ভাগ্যবশত সেই প্রাণটুকু নেই। তবে তাতে বোধকরি তাঁর জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় কোন বাঁধা নেই। বরং অনুমেয় কারণে আগামী মেলাগুলোতেও সাদাত হোসাইনের বইয়ের কাটতি বাড়বার সম্ভাবনা বেশি বলেই আমার মনে হয়েছে।