শনিবার, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০১৮

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এর পোর্ট্রেইটঃ প্রসেস ভিডিও


প্রোক্রিয়েট এপ দিয়ে আঁকবার এই এক মজা, প্রসেস ভিডিও বানিয়ে দেয় এটা। 
ইউটিউবে এই ভিডিওগুলো আপলোড করে ফেলবো আস্তে আস্তে।
আজকে দিলাম গুরু-র ছবি, দি গ্রেট 
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।

বৃহস্পতিবার, জুলাই ১২, ২০১৮

শাহাদুজ্জামান-এর উপন্যাস 'একজন কমলালেবু'-

কিছু বিষাদ হলো পাখি। সম্ভবত প্রতিটি বাঙালি কিশোরের প্রথম ঈশ্বর দর্শন হয় জীবনানন্দের কবিতা পড়ে। 
বছর কুড়ি বা তারও বেশি আগে, কোন এক মেঘলা মফস্বলের চুপচাপ দুপুরে, প্রায় হঠাতই হাতে আসা নিউজপ্রিন্টের দুর্বল কাগজে ছাপা একটা বইয়ের ভেতর আমি প্রথম চোখ মেলে দেখি, সেখানে অলস গেঁয়োর মত এক টুকরো ভোরের রোদ মাথা পেতে শুয়ে আছে ধানের উপরে। একটা ইগনরেন্ট দানবের মত অবহেলাভরে সেই যে জীবনানন্দ আমাকে ছুঁয়ে দিলেন, সেই ঘোর আমার আজও কাটেনি, মনে প্রাণে চাই, কখনও যেন না কাটে। আকাশের ওপারে আকাশ ভেসে বেড়ায় যার হাতে, হৃদয়ের আদিগন্ত জুড়ে ঝুলে থাকে যে এক বিপন্ন বিস্ময়, এই নোংরা পৃথিবীকে অবলীলায় যিনি মায়াবী পারের দেশ বলে ঘোষণা দিতে পারেন, তাঁর চেয়ে অপার্থিব চোখ কারও নেই, জানি, তাঁর চেয়ে বেশি পার্থিব আর কোন মানুষের হবার সম্ভাবনা নেই, তাও জানি।

শাহাদুজ্জামানের লেখা ‘একজন কমলালেবু’ যেন একটা নিঃসঙ্গ সেতারের বাজনা। খুব ভালো লেগেছে বইটি পড়ে। একটা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তিনি জীবনানন্দকে বইয়ের পৃষ্ঠায় বিছিয়ে দেবার চেষ্টা করেছেন, তবু এটি পড়তে গিয়ে সারাক্ষণ বুকের ভেতরে একটা কষ্ট দম চেপে আটকে ছিল ঠিক গলার নিচটায়। কিছু কিছু সিনেমা দেখি আমরা, কিছু বই পড়ি, যেখানে নায়কের দুঃখ দুর্দশা আমাদের মন ভিজিয়ে দেয়, আমরা আন্দোলিত হই, কিন্তু সেই সাথে মনের ভেতরে এ-ও জানি যে এটা সাময়িক, খুব শীঘ্রই তার দেখা হয়ে যাবে কোন রূপবতী নায়িকার সাথে, অথবা পেয়ে যাবে কোন মোটা বেতনের চাকরি। এই সুখময় যবনিকার সম্ভাবনা আমাদেরকে নিষ্কৃতি দেয় সেই মন খারাপ থেকে। কিন্তু, একজন কমলালেবু-তে সেটার কোন উপায় নেই। একটা হতাভাগা জীবনানন্দের কাহিনী আমরা সেখানে পড়ি, যার শেষমেশ সিনেমার নায়ক হয়ে ওঠা হয় না। প্রতি পৃষ্ঠা ওলটাতে হয় এটা জেনেই যে, এই কষ্টানুভুতি থেকে কোন নিস্তার নেই, কখনও মিলবে না। 
নানা ভাবে জীবনানন্দকে জানা যায় এখানে। তাঁর প্রথম কবিতা, বরিশালের জীবন, সমসাময়িক শিল্পাঙ্গনের মানুষদের অবহেলা...। তাঁর নগণ্য সংখ্যক বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করি নানা সময়ে। কিন্তু সর্বোপরি, খুব কষ্ট হয় সেই মানুষটার জন্যে। কবিতারা কেমন ভুতের আছর হয়ে নেমেছিল তাঁর ওপরে। সেই যন্ত্রণা মাথায় নিয়ে একটা পুরো জীবন তিনি কাটিয়ে দিলেন। পরের এক শতকে অগণিত মানুষের মনের প্রভুত্ব রইবে যার হাতে, সেই মানুষটি তবু মন পেলেন না একজন শোভনার। কিছু কবিতাহত মানুষের সবচেয়ে আপনজন যিনি, তিনি তবু আপন হয়ে উঠতে পারলেন না একজন লাবণ্যর। 
অনেকগুলো কবিতার প্রেক্ষাপট জানা হলো বইটির মাধ্যমে। আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে। কবিতার পাশে সেগুলোকে বসিয়ে তাকাই যখন, কবির প্রতি মায়া বেড়ে যায় আরও। কবির জীবনকে খণ্ড খণ্ড দৃশ্যাবলীর সমন্বয়ে একটা চলচ্চিত্রের মত করে দেখার চেষ্টা যেন। শাহাদুজ্জামান সফল হয়েছেন তাতে। এর চেয়ে তথ্যবহুল জীবনী হয়তো পাওয়া যাবে খুঁজলে, কিন্তু এই বইটিতে লেখকের আন্তরিকতাটুকু অনন্য। 
‘একজন কমলালেবু’ বইটি পড়া শেষ হলে আমরা দেখি অসীম প্রতিভাবান কিন্তু আদ্যোপান্ত এক ব্যর্থ ও হতাশ মানুষকে। সুখ নামের জটিল হিসাবকে যিনি মিলিয়ে উঠতে পারেননি। যার কলম থেকে ঝরনাধারার মত ঝরে ঝরে পড়ে ভালোবাসা, কিন্তু কী রুঢ় একটা ভালবাসাহীন জীবন তিনি যাপন করে চলে গেলেন একটা অথর্ব অভিমান নিয়ে। 
তবু পৃথিবীর প্যারাডক্স এই, প্রিয় জীবনানন্দ, আমি তবু আজীবন আপনার লেখা আমার প্রিয়তম কবিতাটিকেই করে নিবো অবারিত আলোর উৎস।  
“ এখন রজনীগন্ধা-প্রথম-নতুন-/ একটি নক্ষত্র শুধু বিকেলের সমস্ত আকাশে;/ অন্ধকার ভালো বলে শান্ত পৃথিবীর/ আলো নিভে আসে।
অনেক কাজের পরে এইখানে থেমে থাকা ভালো;/ রজনীগন্ধার ফুলে মৌমাছির কাছে;/ কেউ নেই, কিছু নেই, তবু মুখোমুখি / এক আশাতীত ফুল আছে।” 
( শব্দ কৃতজ্ঞতাঃ মেঘদল, শাহাদুজ্জামান এবং জীবনানন্দ) 

বুধবার, মার্চ ২৮, ২০১৮

পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ হাসান আজিজুল হক- এর 'ছোবল'

ভূমিকাতেই লেখক জানিয়ে দিয়েছেন, এই বইটি মুখ নয়, মুখোশও নয়, বরং একটা ‘কথামুখ’ এর আদল তৈরি করা হয়েছে কেবল। 
শেষ পৃষ্ঠার নম্বর ৪৫ হলেও, সব মিলিয়ে আট ন’হাজারের বেশি হবে না শব্দ সংখ্যা। না গল্প, না উপন্যাস, একটা বড় গল্প বরং বলা যেতে পারে এটিকে। তাই বইটির এই ক্ষীণ আকৃতির কারণেই যে লেখকের এই ভূমিকা, তা বলাই বাহুল্য। 
তবু এর মাঝেই একাধারে সব করকম মুনশিয়ানা দেখালেন হাসান আজিজুল হক। কী দুর্দান্ত সূচনা। আবারও মনে হলো, গল্পের শুরুটা যদি পাঠককে অপেক্ষায় রাখতে পারে শেষটুকুর জন্যে, তাহলেই কেবল সেটা সার্থক গল্প হয়ে উঠতে পারে।  
চার দশক আগের ঢাকা। ক্রমশ বাড়ছে এর পরিধি। মূল ঢাকায় যাদের জমি কেনার সামর্থ্য নেই, ঢাকার অদূরেই এক টুকরো জমি কিনতে আসা কিছু মানুষের গল্প এটি। একটা বিষধর সাপের মতন নগর কেমন করে আড়মোড়া ভেঙে ধীরে ধীরে গ্রাস করে চলে এর আশপাশের গ্রাম্যতা, আর সবুজকে,  এবং সবুজ গ্রাম্যতায় পরিপূর্ণ মানুষের জীবনগুলোকে, ‘ছোবল’ তারই একটা আভাস। 
মুগ্ধ হয়ে পড়লাম। ‘চাঞ্চল্য আর গভীরতা দুই ভয়ানক বিপরীত শক্তির বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে মুহূর্তের জন্যে ঝুমু হেলালের দিকে তাকায়। আমারটার মতো সাদা রাজহংসী নয়, একটা টগবগে মাদী ঘুড়ী-বিদ্যুতের মতো চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল আর ক্ষুরের মতো ধারালো একটা চাবুক সাঁৎ করে হেলালকে দুই ভাগ করে ফেলে। নিমেষে এটা ঘটে, কারণ তক্ষুনি হেলাল আবার জোড়া লেগে যায়।’ 
লেখা এমনই হওয়া উচিত আসলে। লেখার আকৃতি ছোট বা বড়তে তেমন কিছুই যায় আসে না। যতক্ষণ পড়লাম, আর পড়ার পরে এই এতক্ষণ ধরে যে ভেবে চলেছি হামিম, ঝুমু, হেলাল বা জাকিয়ার কথা, হাবিবা অথবা তাহমিনা বা তফাজ্জলের কথা, ঠিক এখানটাতেই লেখক হয়ে যান জাদুকর। 
বইমেলার শুরু থেকেই এবারে দেশে ছিলাম বলে বেশ কিছু বই কেনা হয়েছে, দেশে পাওয়া অবসরের কল্যাণে সেগুলো পড়াও ধরেছি। পড়তে পড়তে কেমন দম বন্ধ লাগছিল, শান্তি পাচ্ছিলাম না। আক্ষেপ করে লিখেছিলাম, “কোথাও একটা দুর্দান্ত গল্প পাই না খুঁজে। খুব আগ্রহ নিয়ে নতুন কেনা বইগুলো হাতে নিই, সেখানে শব্দের চাতুর্য আছে, বাক্য বিন্যাস নিয়ে নিরীক্ষা আছে, জাদুকরের টুপি থেকে উঁকি দেয়া খরগোশের মতন চমক আছে... কিন্ত একটা সুন্দর পরিপাটি মেঘ, অথবা গভীর কালো জলের শান্ত কূয়োর মতন অসামান্য কোন গল্প নেই কোথাও। তারা সব কোথায় হারিয়ে গেছে!’’ 
ভালো ভালো লেখা পড়াটা যে কী ভীষণ জরুরি! 

‘ছোবল’ যেন একটা খড়কুটোর মত আমার হাতে এসে পড়লো, এক মুঠো অক্সিজেন হয়ে আমাকে কেমন বাঁচিয়ে দিয়ে গেলো, মন ভালো করে দিয়ে গেলো। ধন্যবাদ আপনাকে, হাসান আজিজুল হক।  

সোমবার, মার্চ ২৬, ২০১৮

সাদাত হোসাইন-এর উপন্যাস 'আরশিনগর'-

এবারের বইমেলা থেকে কিনে আনা বইগুলো একে একে পড়তে শুরু করেছি। সর্বশেষ পড়া হলো, বইমেলার বেশ জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসাইনের উপন্যাস ‘আরশিনগর’। গুডরিডসে বইটিকে পাঁচ এর ভেতরে দেড় দিতে চেয়েছিলাম, সেটার উপায় না থাকায় দুই রেটিং দেবার পরে মনে হলো, বিস্তারিত না হলেও কারণগুলো অন্তত সংক্ষেপে এখানে টুকে রাখি।
যা ভালো লাগেনি-
১/ অসংখ্য পুনরাবৃত্তি। ‘কোন এক অদ্ভুত কারণে’।
২/ বিস্ময়বোধক চিহ্নের অসংখ্য অকারণ ব্যবহার, বক্তব্যকে দুর্বল করে দিয়েছে।
৩/ আবারো, অসংখ্য বাক্যের অকারণ পুনরাবৃত্তি, একই প্যারার শুরুতে, মাঝে ও শেষে, শব্দের অবস্থান বদলে বদলে একই বাক্যের উপস্থিতি বারবার।
৪/ ফরম্যাটে ফেলা অভিব্যক্তি। ‘তাঁর এই কান্নার শব্দ কেউ শুনল না। কেউ না।’ 
‘তাঁর খুব জানতে ইচ্ছা করে। খুব।’ ‘সে কত কিছু ভাবে। কত কিছু! কিন্তু তাঁর কাউকে কিছু বলতে ইচ্ছা করে না। কাউকে না। ’
৫/ অনেক চরিত্রকেই শুধু শুধু মহিমান্বিত করা হয়েছে শুরুতে, পরিসমাপ্তিতে তার প্রতিফলন নেই কোন।
৬/ চরিত্রগুলো পূর্ণতা পায়নি অনেক ক্ষেত্রেই, উপন্যাসে বেশিরভাগের উপস্থিতিই অকারণ। এমনকি মূল চরিত্রটিও মনে শেষমেষ কোন দাগ কাটতে পারেনি।
৭/ গল্প ঝুলে গেছে। পড়তে পড়তে বহুবার পড়া থামিয়ে দিয়েছি, আবার হাতে তুলে নেবার তাড়া অনুভব করিনি কোন।
৮/ দুর্বল ও দ্বিধান্বিত সমাপ্তি। কাল রাতে পড়া শেষ হলো, সকালে এখন লিখতে বসে শেষটা মনে করতে পারছি না, আবার বই খুলে দেখে নিতে হলো। এরকম সমাপ্তির জন্যে উপন্যাসটিকে ভুলে যাওয়াও সহজ হবে।
যা ভালো লেগেছে-
১/ বড় কলেবর। নতুন লেখকদের মধ্যে এই কলেবরে লেখার প্রবণতা কম।
২/ উপন্যাসের পটভূমির ব্যাপ্তি এবং সেই সাথে অনেক চরিত্রের সমাবেশ। এদের সামাল দেবার মতন সাহস লেখকের রয়েছে।
৩/ লেখায় মায়া আছে। কথ্য গল্পের একটা ছোঁয়া আছে, একটা সহজবোধ্যতা আছে। আবার সমবন্টনের ভঙ্গিতে পুরে দেয়া ছদ্ম-গভীরতাও আছে।
আমরা যারা বাংলা সাহিত্যের মাঝারি মানের পাঠক, তাঁদের চির চেনা এক লেখকের লেখন-ভঙ্গির ছাপ রয়েছে সাদাত হোসাইনের লেখায়, তবে দুর্ভাগ্যবশত সেই প্রাণটুকু নেই। তবে তাতে বোধকরি তাঁর জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় কোন বাঁধা নেই। বরং অনুমেয় কারণে আগামী মেলাগুলোতেও সাদাত হোসাইনের বইয়ের কাটতি বাড়বার সম্ভাবনা বেশি বলেই আমার মনে হয়েছে।

সোমবার, ফেব্রুয়ারী ০৫, ২০১৮

দি রয়েল বেঙ্গল Tee স্টল

বেশ কিছুদিন ধরেই আমার করা কিছু ডিজাইন রেড বাবল সাইটে আপলোড করে দিচ্ছিলাম।
রেড বাবল একটা দারুণ সাইট। সেই সব ডিজাইন থেকে ওরা গ্রাহকদের অর্ডার মাফিক টিশার্ট প্রিন্ট করে বাসায় পাঠিয়ে দেয়। খুবই ভালো সার্ভিস, আমি মুগ্ধ সব মিলিয়ে। নিজের আর বন্ধুদের জন্যে টিশার্ট আনিয়েছি কিছু, কোয়ালিটিও দারুণ।
টিশার্টের সাথে সাথে ওদের ব্যাগ, পোস্টার, মাগস ও আছে। :)
তো, অল্প কিছু ডিজাইন হয়ে যাবার পরে আমি ভাবলাম সেগুলো কে একসাথে করে একটা অনলাইন শপ এর মত করে ফেললে কেমন হয়!
সেই বুদ্ধি থেকে ফেইস বুকের এই পেইজ এর জন্ম।
দি রয়েল বেঙ্গল Tee স্টল
বিশেষ করে প্রবাসীরা এখান থেকে সহজেই পছন্দের টিশার্ট অর্ডার করতে পারবেন। আমি নিয়মিত নতুন নতুন ডিজাইন তুলে দেবার চেষ্টা করব।
লিংকদুটো এখানে আবার দিচ্ছি।
১/ ফেইসবুক পেইজঃ দি রয়েল বেঙ্গল Tee স্টল
২/ রেড বাবলে আমার পেইজ

 

রবিবার, জানুয়ারী ০৭, ২০১৮

দেশ-

রেফারেন্স বডি বলে একটা মজার ব্যাপার প্রথম পড়ি পদার্থবিজ্ঞান বইয়ে। তার সঙ্গত হিসেবে আমাদের মধ্যে একটা কথা খুব চালু হয়ে গেছিলো, ‘আপেক্ষিক ব্যাপার’। সে কতকাল আগে, সময় এখন আর ঠিক মনে নেই। কিন্তু পড়বার পর থেকে খুব ভক্ত হয়ে যাই এটার। বইয়ে দেয়া উদাহরণটা খুব সাধারণ কিছু ছিল হয়ত, চাঁদ ভাবছে সে একটা স্থির পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে কেবল, পৃথিবীটা সূর্যকে নিয়ে একই কথা ভাবছে, অথচ এরা সবাই একটা বিরাট মহাবিশ্বের অংশ হয়ে প্রতিনিয়ত ছুটেই যাচ্ছে। রেফান্সের বডি-র অদল বদল ঘটিয়ে দিলে সবাইই স্থির, আবার সবাইই গতিশীল।
এই জ্ঞান হবার পর থেকেই জেনে গিয়েছিলাম, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্যি কথা হয়তো এটাই যে, পৃথিবীর সব কিছুই আপেক্ষিক, শুধু খেয়াল রাখতে হবে তোমার রেফারেন্স বডি কোনটা।
এক এক করে এই পুরনো পৃথিবীতে অনেকগুলো বছর কাটিয়ে দিলাম। মহাকালের তুলনায় কিছুই না, কিন্তু আমার নিজের জীবনের অর্ধেক বা তার বেশি সময়তো বটেই। বড় কিংবা বুড়ো হতে হতে আমি অবাক আলস্যে দেখেছি, জীবনের নানা সময়ে রেফান্সের বডির বিবিধ পরিবর্তন, আর আপেক্ষিকতায় মোড়ানো সব কিছু। যেমন ধরা যাক আপন জনের ধারনা। এক সময় পরিবারই ছিল সবচেয়ে আপনার, বাই ডিফল্ট। তারপরে কোন একটা অদ্ভুত বয়সে এসে দেখি বন্ধুরাই আসলে সব। আরও কয়েক বছর পরে সেই আমরাই সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা মানুষের হাতে নিজের সব কিছু ছেড়ে দিয়ে সবচেয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকি। কখনো রক্তের টান, কখনও ভালবাসা, কখনও বা স্থান, কাজ, পরিচয়, চেনাশোনা, আনাগোনা, কত কত রেফারেন্স বডির ছড়াছড়ি আমাদের জীবনময়। মন ভুলে কখনও কত পরকে আপন ভেবে নিয়েছি, আবার কত আপন পর হয়ে গেছে দিনে দিনে।
ছোটবেলায়, এমনকি দুয়েকটা ছোট খাটো নির্দোষ মিথ্যা বলতে গিয়েও কেমন গা শিউরে উঠত, জিভ জড়িয়ে যেতো। কিন্তু বড় হতে হতে এত সব বড় বড় সব পাপ করে ফেলেছি যে, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পাপেরা মনের ভেতর আর কোন আবেগের সৃষ্টি করে না, আলোড়ন তৈরি করে না। নৈমিত্তিক অভ্যেসের মতন আলগোছে প্রতিনিয়তই পাপের সংখ্যা বাড়িয়ে চলি।
নিজের শহর কুমিল্লা ছেড়ে যে বছরে ঢাকায় গেলাম পড়তে, একটা শেকড় ছেঁড়া ব্যথা নিয়ে দিন কাটাতাম শুরুতে। ঢাকাকে মনে হত যান্ত্রিক আর জটিল, প্রতিবার কুমিল্লায় ফেরার সময় অভিশাপ দিতে দিতে ফিরতাম। অথচ কি আশ্চর্য, মেলবোর্নে ঘাঁটি গাড়বার পরে যখন অনেকগুলো দিন পার হয়ে গেল, ঢাকার জন্যে মন কেমন করতো কেবল। ঢাকার শাহবাগ, ঢাকার নীলক্ষেত, ঢাকার বইমেলা, আমার কার্জন হল থেকে একুশে হলের মাঝের পায়ে হাঁটা নোংরা রাস্তাটুকু এ সবই বড় আপন মনে হতো। বুঝে গেছিলাম রেফারেন্স বডি বদলে গেছে আবার, আপেক্ষিকতার বদল ঘটে গেছে জীবনে।
দেশে যাওয়া নিয়েও কত কিছু। বাড়ির সবার চাওয়া ঈদের সময়ে দেশে যাই। অথচ মনের মধ্যে সব সময়েই ইচ্ছা করে, ঈদ না, বইমেলার সময়ে যাবো। কাছের মানুষদের অসন্তুষ্ট মুখের জবাবে আবারো আশ্রয় নিই সেই রেফারেন্স বডির। ‘আরে আমরা দেশে যাওয়া মানে তো প্রতিদিনই ঈদ!’ পরিমাণের হিসেবে আনন্দের তো কমতি হয়না তখনো, বদলে বইমেলায় যাওয়াটা অনেকটা বাড়তি পাওনা।
মাঝে কবার এরকম হলো, হয়তো এখানেই বেড়াতে গেছি অন্য শহরে, সিডনি, বা ব্রিসবেন, দুদিন পরেই অস্থির লাগা শুরু করলো, আমার মেলবোর্নের ফেলে আসা ঘরের জন্যে মন কেমন করা শুরু করলো। আমি মনে মনে ভাবলাম, আমার নিজের শহরের সংজ্ঞাও কি বদলে বদলে যাচ্ছে তবে?
তবে হ্যাঁ, শুধু একটা রেফারেন্স বডি কখনও বদলায়নি, আমার মা।
মায়ের কাছে ফিরে ফিরে যাবো বলে, সেই একই আগ্রহ, সেই একই টান, একই ভালবাসা বা একই অপেক্ষার বেদনা নিয়ে বারে বারে ফিরে ফিরে গেছি। ইশকুলের চার দেয়ালের সীমানা থেকে প্রতি ছুটিতে বাসায় যেতাম যখন। অথবা সায়েদাবাদ থেকে বাসে উঠে যখন চোখ বুজে আম্মার কথা ভাবতাম। তারপরে প্রবাস থেকে প্রতিবার যখন দেশের টিকিট কেটে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে আম্মাকে জানাতাম, আমি আসছি। দুই যুগের বেশি সময় ধরে এই এত রকমের ফিরে যাবার মধ্যে কোন পার্থক্য পাইনি আমি।
গতবার দেশ থেকে চলে আসবার সময় আম্মাকে হাসপাতালের বিছানায় রেখে এসেছিলাম। বিদায় বলা হয়নি, চোখ বুজে শুয়েছিল আম্মা। মুখে হাসি অনেকদিন ধরেই ছিল না তাঁর, একটা যন্ত্রণার আভা ছড়িয়ে থাকতো, এমনকি ঘুমের ভেতরেও। আম্মার গালে একটা আঙ্গুল ছুঁয়ে দিয়ে ঠিক ওইভাবেই তাকে রেখে চলে এসেছিলাম আমি। ঢাকার আকাশে বিমানের পেটের ভেতরে বসে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, কোথাও কোন মাটি নেই, দেশ নেই নিচে, আম্মার মুখটাই কেমন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সবখানে।
বছর ঘুরে গিয়ে আবারো দেশে যাবার টিকেট কাটা হলো আমাদের। আলগোছে তারিখ মিলিয়ে দেখলাম, মাঝে বইমেলার কিছু দিনও পাওয়া যাবে। কিন্তু এবারে আর মনের ভেতরে কোন আগ্রহ খুঁজে পাচ্ছি না। একেবারেই না, একদমই মন চাইছে না দেশে যেতে।
এ এক অদ্ভুত বেদনা। এক সুতীব্র কষ্ট। দিকশূন্যহীন, কূল কিনারাহীন এক দিগন্ত বিস্তৃত শূন্যতা। হলপ করে বলতে পারি, এই উথাল পাথাল কষ্ট কেবল যাদের আছে তাঁরাই জানে শুধু, যাদের নেই তাঁরা জানে না, জানা সম্ভব নয়। এই শূন্যতার কোন পরিমাপ নেই, কেবল আছে ভোঁতা অনুভব।
এক বছর তিন মাস হলো, আম্মা নেই। কোন বাড়ি নেই তার এখন আর, কোন শহর বা দেশ নেই। আকাশের তারার মিথ্যা রূপকথা আমি বিশ্বাস করি না, মাটির নিচের জগতকে আমি মানতে পারি না। আমি শুধু জানি, কোথাও আমার মা নেই আর, আজ তাই আমার কোন দেশ নেই কোথাও।

রবিবার, নভেম্বর ২৬, ২০১৭

সিনেমাঃ ডুব

      ‘ডুব’ দেখা হলো অবশেষে।
      মেলবোর্নের সিনেমা হলে বসে বাংলা সিনেমা দেখবার আনন্দ অন্যরকম, সুযোগ এত কম আসে যে যখন আসে তখন মিস করতে ইচ্ছে করে না। দেশের ছবি হলে গিয়ে যদি না দেখি তাহলে সিনেমা শিল্পই বা বেঁচে থাকবে কী করে? 
       এবারে তবু দ্বিধায় ছিলাম অনেক। যাবো কি যাবো না, ট্রেলার দেখে আমার মনে একটা অদ্ভুত ভয়ও কাজ করছিলো, মনে হচ্ছিলো মুভি দেখা শেষে হয়তো ভয়ংকর একটা মন খারাপ নিয়ে বাড়ি ফিরবো। মনে হচ্ছিল এই গল্পের চিত্ররূপ দেখবার জন্যে আমি হয়তো আসলে এখনও প্রস্তুত হতে পারিনি, হয়তো আরও কিছু বছর লেগে যাবে আমার। 
তবু দেখতে গেলাম। সব দ্বিধা পাশ কাটিয়ে, গল্পের জানা পটভূমিকে মাথা থেকে সরিয়ে দিয়ে দেখতে গেলাম ‘ডুব’। 
সিনেমা শেষ করে মনে হলো, মাত্র এক লাইনেই ডুব নিয়ে লিখে ফেলা যায় আসলে, সেটা হচ্ছে, It didn’t make any sense at all. 

গল্পের প্রাচুর্যের সম্ভাবনা যেখানে ছিল, সেখানে ডুব এর কাহিনী বিন্যস্ত হয়েছে অতি দুর্বল গল্পের উপরে। পর পর দৃশ্যের মধ্যিখানে কোন ধারাবাহিকতা নেই, সামঞ্জস্য নেই। পেছনের সব কিছু জানা থাকার পরেও সিনেমাতে গল্প খুঁজে নিতে যুদ্ধ করতে হয়েছে আসলে। ইরফান বা তিশা দুজনেই কি দুর্দান্ত অভিনেতা, তবু ঝর্ণার পারে বসে দুজনের প্রথম দৃশ্যটাকে রোমান্টিক দৃশ্য মনে হয়েছে, বাবা-মেয়ের বলে মনে হয়নি! পুরো মুভিতেই অজস্র কেন-র কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। অপ্রয়োজনীয় দৃশ্যের সংখ্যা অগুনতি। ধারাবাহিকতার অভাব এতটাই যে, অবধারিত মৃত্যুদৃশ্যটি পর্দায় আসার পরে আমার মনে প্রশ্ন এলো, ‘কে মারা গেল?’ 

টুকরো কিছু দৃশ্য ভালো লেগেছে। বাবার জন্যে পানি নিয়ে ছুটে যাওয়ার অংশটুকু ভালো লেগেছে। মায়ের জন্মদিন উদযাপনের পুরো দৃশ্যটাও অনেক সুন্দর ছিল। মেয়েকে ফোন করে বাবা-র আকুতির অংশটুকুও খুব মনে লেগেছে। 

কিন্তু একটা দুটো দৃশ্য দিয়ে তো আর পুরো সিনেমা হয় না। তাই মনে হয়েছে, ডুব আসলেই পরিপূর্ন কোন সিনেমা হয়ে উঠতে পারেনি শেষমেশ। বহুদিন আগে মুগ্ধ হয়ে দেখা নাটক ‘প্রতি চুনিয়া’ বা সদ্য নেটফ্লিক্সের কল্যাণে দেখা ‘টেলিভিশন’ এর মত ভালো সিনেমার নির্মাতার জন্যে ‘ডুব’ আসলে একটা ‘এফ’ গ্রেড মুভি, পাশ মার্ক না পাওয়া একটা মুভি। ভালো সিনেমার দর্শকদের জন্যে যেটা কেবল হতাশা আর বিরক্তিই বয়ে নিয়ে আসে শুধু, আর কিছু না।

রবিবার, অক্টোবর ০৮, ২০১৭

এ. আর. রাহমান


গতকাল রাতে . আর. রাহমান এর লাইভ কনসার্টে গিয়েছিলাম। 
প্রায় পঁচিশ বছরের মুগ্ধতা আরও ঘণ্টা তিনেক বাড়িয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। 
অনেক মৃদুভাষী একটা লোক, এই সব পাগল করা ধুন্ধুমার সব ভেঙ্গে ফেলা গানের ফাঁকে ফাঁকেই মিষ্টি করে হাসেন কেবল। 
আমি অবাক হয়ে দেখলাম। আর বুঝলাম,  নিজেকে ঠিক এতখানি উপরে নিয়ে যেতে পারলেই বোধহয় কেবল এত বেশি বিনয়ী হবার মতন ধৃষ্টতা হয় মানুষের। 

শনিবার, আগস্ট ২৬, ২০১৭

যাও ছেড়ে চলে ভাবনা আমার...

...চাইনা কাছে পেতে তোমাকে আর কেন আসো ফিরে বারে বারে রাত গভীরে না পারি যেতে স্বপ্নে ভেসে চলে দূরে হল যে রাত অনেক কেন আছি তবু জেগে ...


মঙ্গলবার, আগস্ট ১৫, ২০১৭

কথক-এর আয়োজন 'প্রতিধ্বনি শুনি'


    কবিতার ভার অনেক, ধারও অনেক। গানের সাথে তুলনায় যাওয়া হয়তো উচিত হবে না, তবু খানিকটা ধৃষ্টতা দেখিয়ে বলেই ফেলা যায়, গান অনেক বেশি বারোয়ারি, বা পরিশীলিত ভাষায় বলা যায়, সার্বজনীন। চন্দ্রিল ভট্টাচার্য যেমনটা বলেছেন, গানের ব্যাপার অনেকটা রিফ্লেক্সের মতন, কেউ আপনার দিকে একটা টেনিস বল ছুঁড়ে মারলো তো আপনি না চাইলেও সেটা পট করে ধরে ফেলবেন। গানও তেমনি, বাজলো তো শুনবেন। 
     অবশ্য গানের সার্বজনীন হবার আরও বড় কারণ, গান আসলে বড় বেশি মায়াময় একটা ব্যাপার। সুরের সম্মোহন মিশিয়ে কেউ যখন গান গায়, কার হৃদয়ের কোন যে তারে সেটা টুং করে বেজে উঠে এমন অদ্ভুত মায়ার সৃষ্টি করে, সে মায়ায় কখনও ভালো লাগার মেঘে সব ভেসে যায়, কখনও বুক ফুঁড়ে হু হু করে কান্না পায়। মোদ্দা কথা হলো যে, গানের জন্যে পাগল না হয়ে পারা যায় না, গানের জন্যে ভালোবাসাটাও তাই স্বতঃস্ফূর্ত। 
    কবিতা, সে তুলনায়, খানিকটা বুঝবার ব্যাপার, কবিতাকে ভালোবাসাটাও আচমকা কিছু নয়, বরং বেশ অনেকটা প্রস্তুতির ব্যাপার। 
    মেলবোর্নে গানের আয়োজনের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। আনন্দের এবং আশার কথা, সে সব আয়োজনের অধিকাংশই এখন বেশ মন কাড়া, মানসম্মত। কিন্তু সে তুলনায় কবিতার আয়োজন একেবারেই নগণ্য। তাই যখন জানলাম ‘কথক’ এবারে কবিতার আসরের আয়োজন করছে, রীতিমতন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে ছিলাম। ‘কথক’ সত্যিকার অর্থেই মেলবোর্নের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক দল। সর্বশেষ তাঁদের আয়োজন করা ‘যাত্রা’ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। ভিনদেশের অডিটরিয়ামে সত্যি সত্যিই যাত্রার মঞ্চ, আর সেই মঞ্চে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার ঝলমলে পদচারণাই মুগ্ধ করে দেবার জন্যে যথেষ্ঠ ছিল। কিন্তু সেই সাথে উপরি পাওনা ছিল সেই চিরাচরিত ‘বিবেক’ এর উপস্থিতি, আর মঞ্চের পাশে অবিরত সংলাপ বলে যাওয়া প্রম্পটার। সব মিলিয়ে দারুণ! 


    কথক- এর এবারের আয়োজন ছিল ‘প্রতিধ্বনি শুনি’। ‘বিগত কয়েক শতক ধরে শান্তির খোঁজে মানুষের বিরামহীন সংগ্রামের গল্প নিয়ে’ আয়োজিত। 
    চ্যান্ডলার কম্যুনিটি সেন্টারে ঢুকে দর্শকদের রুগ্ন উপস্থিতি দেখে খানিকটা মন খারাপ হলো। আবার এটাও মনে হলো, যারা এলো না তাঁরা যদি জানতে পারতো কি মিসটা করছে! 
    মৃণাল-এর করা মঞ্চসজ্জা সুন্দর ছিল অনেক। আয়োজনের সাথে মানানসই দেয়ালচিত্র সুন্দর সঙ্গত দিয়ে গেছে পুরো অনুষ্ঠান জুড়েই। কয়েক মুহূর্তের জন্যে প্রায় এক যুগ আগের ফেলে আসা শিল্পকলা একাডেমি আর পাবলিক লাইব্রেরির মঞ্চের কথা মনে পড়ে গিয়েছিলো। 
    এনি আজিম এর সাবলীল উপস্থাপনা দিয়ে অনুষ্ঠানের শুরু, তারপরের দুটি ঘণ্টা কেবলই মুগ্ধতা, কেবলই ভালো লাগা। কবিতাগুলোর নির্বাচন যথার্থ হয়েছে। প্রত্যেকেই এত সুন্দর আবৃত্তি করেছেন...,  রাজীবুল ইসলাম, নাজনীন আনোয়ার, জহিরুল মল্লিক- প্রত্যেকেই দুর্দান্ত। ঠিক কতদিন পরে ভাস্কর চৌধুরীর নিরঞ্জনকে শুনতে পেলাম মনে করতে পারছি না, কিন্তু যতবারই ‘মানুষ’ শব্দটির উচ্চারণ শুনলাম, ততবারই কেঁপে কেঁপে উঠলাম। ভালো লেগেছে বাবু-র আবৃত্তি, শুভ্রের গল্প পাঠ তো অসাধারণ। বুকের ভেতরের কোথাও যেন কেউ আচমকা মুচড়ে দিয়ে গেল। আর মৌপিয়া-র কথা কী বলবো, আবৃত্তির সাথে সাথে তাঁর সমস্ত সত্তা যেন জ্বলজ্বল করছিলো মঞ্চে। অনুষ্ঠান শেষে আমি থাকতে না পেরে ওনাকে গিয়ে বললাম, “আপনি হচ্ছেন বস ক্যাটাগরির মানুষ!”  
    কবিতার সাথে সাথে মানানসই গানও ছিল বেশ কিছু। খুব ভালো লেগেছে শায়লা-র গান। ওঁর কণ্ঠে মৌসুমি ভৌমিকের ‘এখানে তুমি সংখ্যালঘু’ গানটি মনে হয়েছে নতুন জীবন পেয়েছে যেন। হিমানীর নিখুঁত কণ্ঠের গানও ভালো লেগেছে। পুরো অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় ছিল মুনশিয়ানার ছাপ। 
    শুধু একটা ব্যাপার, পর পর দুটি কবিতার মাঝের বিরাম খানিকটা অপ্রতুল মনে হয়েছে। কেমন মিলে মিশে মনোটোনাস হয়ে যাচ্ছিলো বার বার। দর্শক শ্রোতাদেরকে কবিতাটি অনুধাবনের জন্যে আরেকটু সময় দিলে ভালো হয়। আর কবি এবং কবিতার নাম জানান দেয়ার কোন উপায় রাখা হলে আরও ভালো হতো। 
    পুরো আয়োজন শুনতে শুনতে সত্যিই মনে হচ্ছিল এ যেন শেষ না হয়, চলুক সারা রাত ধরে। মাথার ভেতর অসংখ্য প্রিয় কবিতারা কেবলই ভিড় করে যাচ্ছিলো, সময়ের সাথে সাথে আরও কবিতা শুনবার তৃষ্ণা বেড়েই যাচ্ছিলো শুধু। 
    খানিকটা হলেও সুখের ব্যাপার, অনুষ্ঠান শুরুর বেশ কিছু পরে আরও কিছু দর্শক-শ্রোতা যোগ দিয়েছিলেন। গ্যালারি ভরে উঠেছিলো ক্রমশ। 
    মেলবোর্নের সংস্কৃতি-প্রিয় মানুষদের বলি, গানের অনুষ্ঠানে গিয়ে সুরের মায়ায় জড়িয়ে যান যেমন করে, তেমনি করে কবিতার আসরেও আসুন আরও বেশি বেশি। এসে হৃদয়টাকে, নিজের অস্তিত্বকে, নিজের চিন্তা-চেতনা-বোধকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে যান।  
    আর কথক-এর কাছে দাবি, আরও নিয়মিত কবিতার আয়োজন চাই আপনাদের কাছ থেকে, আরও অনেক বেশি বেশি।