বুধবার, মার্চ ২৮, ২০১৮

পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ হাসান আজিজুল হক- এর 'ছোবল'

ভূমিকাতেই লেখক জানিয়ে দিয়েছেন, এই বইটি মুখ নয়, মুখোশও নয়, বরং একটা ‘কথামুখ’ এর আদল তৈরি করা হয়েছে কেবল। 
শেষ পৃষ্ঠার নম্বর ৪৫ হলেও, সব মিলিয়ে আট ন’হাজারের বেশি হবে না শব্দ সংখ্যা। না গল্প, না উপন্যাস, একটা বড় গল্প বরং বলা যেতে পারে এটিকে। তাই বইটির এই ক্ষীণ আকৃতির কারণেই যে লেখকের এই ভূমিকা, তা বলাই বাহুল্য। 
তবু এর মাঝেই একাধারে সব করকম মুনশিয়ানা দেখালেন হাসান আজিজুল হক। কী দুর্দান্ত সূচনা। আবারও মনে হলো, গল্পের শুরুটা যদি পাঠককে অপেক্ষায় রাখতে পারে শেষটুকুর জন্যে, তাহলেই কেবল সেটা সার্থক গল্প হয়ে উঠতে পারে।  
চার দশক আগের ঢাকা। ক্রমশ বাড়ছে এর পরিধি। মূল ঢাকায় যাদের জমি কেনার সামর্থ্য নেই, ঢাকার অদূরেই এক টুকরো জমি কিনতে আসা কিছু মানুষের গল্প এটি। একটা বিষধর সাপের মতন নগর কেমন করে আড়মোড়া ভেঙে ধীরে ধীরে গ্রাস করে চলে এর আশপাশের গ্রাম্যতা, আর সবুজকে,  এবং সবুজ গ্রাম্যতায় পরিপূর্ণ মানুষের জীবনগুলোকে, ‘ছোবল’ তারই একটা আভাস। 
মুগ্ধ হয়ে পড়লাম। ‘চাঞ্চল্য আর গভীরতা দুই ভয়ানক বিপরীত শক্তির বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে মুহূর্তের জন্যে ঝুমু হেলালের দিকে তাকায়। আমারটার মতো সাদা রাজহংসী নয়, একটা টগবগে মাদী ঘুড়ী-বিদ্যুতের মতো চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল আর ক্ষুরের মতো ধারালো একটা চাবুক সাঁৎ করে হেলালকে দুই ভাগ করে ফেলে। নিমেষে এটা ঘটে, কারণ তক্ষুনি হেলাল আবার জোড়া লেগে যায়।’ 
লেখা এমনই হওয়া উচিত আসলে। লেখার আকৃতি ছোট বা বড়তে তেমন কিছুই যায় আসে না। যতক্ষণ পড়লাম, আর পড়ার পরে এই এতক্ষণ ধরে যে ভেবে চলেছি হামিম, ঝুমু, হেলাল বা জাকিয়ার কথা, হাবিবা অথবা তাহমিনা বা তফাজ্জলের কথা, ঠিক এখানটাতেই লেখক হয়ে যান জাদুকর। 
বইমেলার শুরু থেকেই এবারে দেশে ছিলাম বলে বেশ কিছু বই কেনা হয়েছে, দেশে পাওয়া অবসরের কল্যাণে সেগুলো পড়াও ধরেছি। পড়তে পড়তে কেমন দম বন্ধ লাগছিল, শান্তি পাচ্ছিলাম না। আক্ষেপ করে লিখেছিলাম, “কোথাও একটা দুর্দান্ত গল্প পাই না খুঁজে। খুব আগ্রহ নিয়ে নতুন কেনা বইগুলো হাতে নিই, সেখানে শব্দের চাতুর্য আছে, বাক্য বিন্যাস নিয়ে নিরীক্ষা আছে, জাদুকরের টুপি থেকে উঁকি দেয়া খরগোশের মতন চমক আছে... কিন্ত একটা সুন্দর পরিপাটি মেঘ, অথবা গভীর কালো জলের শান্ত কূয়োর মতন অসামান্য কোন গল্প নেই কোথাও। তারা সব কোথায় হারিয়ে গেছে!’’ 
ভালো ভালো লেখা পড়াটা যে কী ভীষণ জরুরি! 

‘ছোবল’ যেন একটা খড়কুটোর মত আমার হাতে এসে পড়লো, এক মুঠো অক্সিজেন হয়ে আমাকে কেমন বাঁচিয়ে দিয়ে গেলো, মন ভালো করে দিয়ে গেলো। ধন্যবাদ আপনাকে, হাসান আজিজুল হক।  

সোমবার, মার্চ ২৬, ২০১৮

সাদাত হোসাইন-এর উপন্যাস 'আরশিনগর'-

এবারের বইমেলা থেকে কিনে আনা বইগুলো একে একে পড়তে শুরু করেছি। সর্বশেষ পড়া হলো, বইমেলার বেশ জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসাইনের উপন্যাস ‘আরশিনগর’। গুডরিডসে বইটিকে পাঁচ এর ভেতরে দেড় দিতে চেয়েছিলাম, সেটার উপায় না থাকায় দুই রেটিং দেবার পরে মনে হলো, বিস্তারিত না হলেও কারণগুলো অন্তত সংক্ষেপে এখানে টুকে রাখি।
যা ভালো লাগেনি-
১/ অসংখ্য পুনরাবৃত্তি। ‘কোন এক অদ্ভুত কারণে’।
২/ বিস্ময়বোধক চিহ্নের অসংখ্য অকারণ ব্যবহার, বক্তব্যকে দুর্বল করে দিয়েছে।
৩/ আবারো, অসংখ্য বাক্যের অকারণ পুনরাবৃত্তি, একই প্যারার শুরুতে, মাঝে ও শেষে, শব্দের অবস্থান বদলে বদলে একই বাক্যের উপস্থিতি বারবার।
৪/ ফরম্যাটে ফেলা অভিব্যক্তি। ‘তাঁর এই কান্নার শব্দ কেউ শুনল না। কেউ না।’ 
‘তাঁর খুব জানতে ইচ্ছা করে। খুব।’ ‘সে কত কিছু ভাবে। কত কিছু! কিন্তু তাঁর কাউকে কিছু বলতে ইচ্ছা করে না। কাউকে না। ’
৫/ অনেক চরিত্রকেই শুধু শুধু মহিমান্বিত করা হয়েছে শুরুতে, পরিসমাপ্তিতে তার প্রতিফলন নেই কোন।
৬/ চরিত্রগুলো পূর্ণতা পায়নি অনেক ক্ষেত্রেই, উপন্যাসে বেশিরভাগের উপস্থিতিই অকারণ। এমনকি মূল চরিত্রটিও মনে শেষমেষ কোন দাগ কাটতে পারেনি।
৭/ গল্প ঝুলে গেছে। পড়তে পড়তে বহুবার পড়া থামিয়ে দিয়েছি, আবার হাতে তুলে নেবার তাড়া অনুভব করিনি কোন।
৮/ দুর্বল ও দ্বিধান্বিত সমাপ্তি। কাল রাতে পড়া শেষ হলো, সকালে এখন লিখতে বসে শেষটা মনে করতে পারছি না, আবার বই খুলে দেখে নিতে হলো। এরকম সমাপ্তির জন্যে উপন্যাসটিকে ভুলে যাওয়াও সহজ হবে।
যা ভালো লেগেছে-
১/ বড় কলেবর। নতুন লেখকদের মধ্যে এই কলেবরে লেখার প্রবণতা কম।
২/ উপন্যাসের পটভূমির ব্যাপ্তি এবং সেই সাথে অনেক চরিত্রের সমাবেশ। এদের সামাল দেবার মতন সাহস লেখকের রয়েছে।
৩/ লেখায় মায়া আছে। কথ্য গল্পের একটা ছোঁয়া আছে, একটা সহজবোধ্যতা আছে। আবার সমবন্টনের ভঙ্গিতে পুরে দেয়া ছদ্ম-গভীরতাও আছে।
আমরা যারা বাংলা সাহিত্যের মাঝারি মানের পাঠক, তাঁদের চির চেনা এক লেখকের লেখন-ভঙ্গির ছাপ রয়েছে সাদাত হোসাইনের লেখায়, তবে দুর্ভাগ্যবশত সেই প্রাণটুকু নেই। তবে তাতে বোধকরি তাঁর জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় কোন বাঁধা নেই। বরং অনুমেয় কারণে আগামী মেলাগুলোতেও সাদাত হোসাইনের বইয়ের কাটতি বাড়বার সম্ভাবনা বেশি বলেই আমার মনে হয়েছে।