শুক্রবার, আগস্ট ২৮, ২০০৯

অনুবাদ প্রসঙ্গেঃ এইবার তবে উলটো পথে চলো-

এখানকার একটা নামকরা দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতা পড়তে গিয়ে সম্ভবত প্রথম মাথায় আসে কথাটা। অথবা তারও আগে, হয়ত ঝুম্পা লাহিড়ি পড়ছিলাম যখন, তখন। অথবা, এখন মনে হচ্ছে আরও খানিক আগে, মার্কেজের গল্পগুলো যখন পড়ছিলাম, সম্ভবত তখনই।

সাহিত্যপাতায় যে গল্পটা পড়ছিলাম, সেটা আবার সে পত্রিকার সাহিত্য আয়োজনে প্রথম পুরষ্কারপ্রাপ্ত। গল্পের শুরুতে আলাদা রঙ ও ফন্টে সে কথা বিশেষভাবে জানান দেয়া, গল্পের মাঝামাঝি আলাদা একটা বাক্সে লেখকের নাতিদীর্ঘ পরিচিতি, এবং গল্পের সাথে মানানসই চমৎকার একটা ছবি। বেশ আগ্রহ নিয়ে পড়তে শুরু করলাম, একজন লেখকের গল্প। ল্যাপটপে গল্প লিখতে গিয়ে তার কাছে গার্লফ্রেন্ডের ফোন আসে, গল্প না গার্লফ্রেন্ড এই দ্বিধায় কেটে যায় গল্পের বাকি অংশটুকু, সবশেষের লাইনে, দেখা যায় ল্যাপটপ খুলে রেখে লেখক বসে, মোবাইলটা সুইচ্ড অফ।
গল্পটা খারাপ লাগে না, পড়ে নিয়ে ভাবি, গল্পটা মন্দ নয়; কিন্তু তারপরেই ভাবি, গল্পটা আসলে কতটুকু ভাল?

ঝুম্পা লাহিড়ি পড়তে গিয়ে এমন হয়েছিলো। খুব ভাল লেগেছিলো ইন্টারপ্রেটার অব মেলাডিস, এই সহজ সরল বর্ণনা, বিষয় বাছাইয়ের সারল্য, সবই। কিন্তু মাথায় ঘুরছিলো ওয়ালীউল্লাহ বা হাসান আজিজুল হকের গল্পগুলোর ধার। তুলনা টানার প্রশ্নই আসে না, আমি ভাবছিলাম অন্য কিছু। ভাবছিলাম, শুধু ইংরেজিতে লেখা বলেই এই গল্পের লেখকেরা বিনা আয়াসেই কেমন করে পৌঁছে গেলেন আমার মতন একজন ভিনভাষীর কাছে।

কদিন আগে কোয়েটজি-র ডিসগ্রেস পড়ছিলাম, এখনো শেষ করিনি, কিন্তু পড়ার সময় খুব ভাল লাগছিলো, বর্ণনাগুলো কি টানটান, হুট করে গল্পের এমাথা ওমাথা এফোঁড় ওফোঁড় করে চিরে দেয়া কিছু দৃশ্যপট। আমার মনে হচ্ছিলো, আমাদের ইলিয়াসের গল্পের যে চমৎকারিত্ব, সেও কি কিছু কম?
আমার খানিকটা দুঃখবোধ হলো তখন। আমাদের ইলিয়াস, মানিক, মাহমুদুল হক, হাসান আজিজুল, এঁরা কেবল আমাদেরই রয়ে গেলেন, যাবেন, পুরো বিশ্বের পাঠকদের কাছে তাঁদের পৌছানো হবে না কোনদিন। কারণ, এনাদের সাহিত্যকর্ম কেবল বাংলায়ই পাওয়া যায়, ইংরেজি বা আর কোন ভাষায় নয়। অথচ যদি এঁদের লেখা পড়তে পেতো পুরো দুনিয়া,তবে বুঝতো, আমাদের এই সোঁদাগন্ধের বাংলা মাটিতে কতই না রত্ন ছড়িয়ে আছে!

মাইকেল মধুসুদন গোত্রীয় কোন ভাবনা আমার মাথায় চেপে বসেছে ভাবার কোন কারণ নাই। আমি বলছি না, আমাদের লেখকদের ইংরেজিতে লেখার দরকার ছিলো।
কদিন আগে সৈয়দ হক এর একটা লেখায় এরকম কিছু পড়েছিলাম, ফজলে লোহানী কোন এক আলাপচারিতায় তাঁকে বলেছিলেন ইংরেজিতে লিখতে। কারণ, ইংরেজির মাধ্যমেই পুরো পৃথিবির কাছে পৌঁছানো যায়। সৈয়দ হক, স্বভাবতই এ কথা কানে নেননি। আমারও সেই একই কথা। আমাদের লেখকদের ইংরেজিতে কেন লিখতে হবে? কেন তাঁদের লেখাগুলোকেই আমরা দায়িত্ব নিয়ে ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিবো না?

অনুবাদ সাহিত্য আমাদের ভাষায় এখন পোক্ত আসন করে নিয়েছে। বিশ্বের নানান ভাষার ক্লাসিক বা শ্রেষ্ঠতম গল্প-উপন্যাসগুলো আমরা অনুবাদের কল্যাণে চট করে বাংলায় পড়ে ফেলতে পারছি। এ কারণে, আমি ব্যক্তিগতভাবে, আমাদের অনুবাদকদের কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমি ভাবছি, অনুবাদের ক্ষেত্রে এবার বোধহয় আমাদের উলটো পথে হাঁটবার সময় হয়ে এসেছে। বিশ্বসাহিত্যের বাংলা অনুবাদই শুধু নয়, এখন থেকে আমাদের বাংলা সাহিত্যর ইংরেজি অনুবাদ প্রকল্প নিয়েও ভাবা উচিৎ।

মার্কেজ পড়া শুরু করার পরে এই ভাবনাটা একটা পাকাপাকি আসন পেল মাথায়। আমি দেখলাম, মার্কেজ কি দারুণ ভাগ্যবান। উনি নিজের ভাষায়ই লিখেন, কিন্তু লিখবা মাত্রই সেসব অনুবাদ হয়ে চলে আসে আমাদের কাছে। রাশানরা একসময় পৃথিবি জুড়ে এই অনুবাদ প্রকল্প ছড়িয়ে দিয়েছিলো, তাদের গল্প-উপন্যাস, রূপকথা, সবকিছুর নানান ভাষার অনুবাদ পাওয়া যেত সবখানে। তাহলে আমরা পারবো না কেন? এরকম উদ্যোগ সরকারী বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নেয়া কি একেবারেই অসম্ভব?

আমি এখনো জানি না, বুঝতে পারি, অনেক বড় একটা প্রকল্প হয়তো এটা, হয়ত অনেক অর্থের প্রয়োজন। তবু আমার স্বপ্ন, কখনো যদি সুযোগ পাই, আমাদের ভাষার শ্রেষ্ঠ কাজগুলিকে অন্ততপক্ষে ইংরেজিতে অনুবাদ করার একটা উদ্যোগ অবশ্যই নেব।
আমার এরকম স্বপ্ন দেখতে ভাল লাগে, কাম্যুর যে আগন্তকের দুঃখে এই সুদূরে বসে আমি ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ি, অথবা মার্কেজের যে কর্নেলের পাশে বসে একটা কখনো-না-আসা চিঠির অপেক্ষা করি, তেমনি করেই হয়ত কোন একদিন সেই জর্মন বা স্পেনের কোন এক জানালায় বসা কোন এক কিশোর ইলিয়াসের হাড্ডি খিজিরের সাথে ঘুরে বেড়াবে ঢাকার গলি-ঘুপচি, অথবা মাহমুদুল হকের আব্দুল খালেকের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে রেখাকে ডেকে বলবে, গিরিবালা, ও গিরিবালা, তোমার এত রাগ কেন গো গিরিবালা?

ছোটবেলায় রচনা বইয়ে পড়েছিলাম, যদি এক কোটি টাকা পাইতাম, তবে সকল গুড় ভাত দিয়া খাইতাম।
আমি আজ ভাবি, এক কোটি টাকা সত্যিই যদি পাইতাম, তবে বাংলা সাহিত্য অনুবাদ করে দুনিয়াময় ছড়িয়ে দিতাম।

বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২০, ২০০৯

প্রকাশায়তন নিয়ে টুকটাক ভাবনা-

১।
বিদেশী বইগুলো সরাসরি ইংরেজিতে পড়া শুরু করি মূলত দেশের বাইরে এসে। তবে খুব আনন্দ নিয়ে নয়, বাংলা বইয়ের যোগান ছিলো না পর্যাপ্ত, এদিকে বই না পড়লে মাথায় তালগোল লেগে যায়, তখুনি স্থানীয় গণপাঠাগারে গিয়ে বই আনা শুরু করি। সেবা প্র‌কাশ‌নীর অনুবাদের পর সেই প্রথম বিদেশী সাহিত্যের সাথে ভালমতন মোলাকাৎ হলো, লেখকের নাম ধরে ধরে বই শেষ করার পুরনো অভ্যাসটা আবার ভাল মতন জাগিয়ে তুললাম।

সাহিত্যের প্রসঙ্গ অবশ্য আজ তুলবো না। সম্প্রতি প্রকাশায়তনের আত্মপ্রকাশ সম্পর্কিত ঘোষণার পর থেকে মাথায় একটা জিনিস ঘুরছে, তাই নিয়ে আলাপ জুড়বো বলেই আজ লিখতে বসা।
এখানে এসে পড়া বইগুলো হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখি, প্রায় অনেকগুলো উপন্যাস বা গল্পের বইয়ের লেখক ছাড়াও সম্পাদক ( এডিটর এর বাংলা এ ক্ষেত্রে কী হবে?) বলে একজন আছেন সেখানে।
পত্র-পত্রিকার বাইরে বইয়ের সম্পাদ্ক হিসেবে কাউকে দেখতে আমরা অভ্যস্ত নই আসলে। বইয়ের সম্পাদক যিনি, সেটাও ক্ষেত্র বিশেষে, যেখানে আসলে তিনি সংকলক। হয়ত লোকান্তরিত কোন কবি বা সাহিত্যিকের লেখা নিয়ে একটা সমগ্র বেরুবে, সেখানে লেখাগুলো একসাথে জড়ো করে একটা জবরদস্ত ভুমিকা লিখে দেয়া আমাদের সংকলকের দায়িত্ব।
আমি একটু অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, বিদেশি বইগুলোয় ঠিক এরকমটা হচ্ছে না। এখানে একটা পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস বা গল্প সংকলনের বই, লেখকের জীবিতাবস্থায়ই একজন সম্পাদকের নাম সহ প্রকাশিত হচ্ছে। আমার আগ্রহ জন্মালো, এই সম্পাদকের ভূমিকাটা আসলে কী?

২।
লেখালেখি সম্পর্কিত প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা টিক্ষা না থাকায় হুট করে বুঝে নিতে একটু সময় লাগলো। শেষমেষ লাইব্রেরি ঘেঁটে ধরে বেঁধে নিয়ে আসলাম বেশ কিছু ক্রিয়েটিভ রাইটিং সংক্রান্ত বই। পড়ে টড়ে টের পেলাম যে এসব দেশে সম্পাদকের বেশ কদর আছে। একজন লেখক একটা বই লিখে হুট করে ছাপিয়ে হয়ত ফেলতেই পারেন, কিন্তু এটা এখানকার, যাকে বলে সিস্টেমেটিক ওয়ে, সেটা না। সাধারণত যেটা হয়, লেখক সেটা প্রকাশকের দপ্তরে পাঠাবার আগে কিংবা পরে সেই পান্ডুলিপিটি একজন সম্পাদকের হাতে যাবে। সম্পাদক বাছাইয়ের কাজ লেখক বা প্রকাশক যে ইচ্ছা করতে পারেন। সম্পাদক তখন পান্ডুলিপিটি পড়ে তার মতামত জানাবেন লেখককে, এবং তারপরে লেখক ও সম্পাদকের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি হবে লেখাটির চূড়ান্ত কপি।

এটা অবশ্য একেবারেই পুঁথিগত বিবরণ, আদতেই এরকম হয় কি না জানি না। তবে কয়েকদিন আগে সালমান রুশদির একটা লেখার অনুবাদ করছিলেন একজন সচল, সেখানেও দেখলাম সম্পাদকের উল্লেখ আছে। সম্ভবত মিডনাইট়স চিল্ডরেন বইটি প্রসঙ্গে সম্পাদকের ক্রিয়াকলাপের কথা বলেছিলেন তিনি।

৩।
আমি ভাবছিলাম, বাংলাদেশে এই ব্যাপারটার চর্চ্চা আছে কিনা। সম্ভবত, নেই।
সেটার কারণ অনেক হতে পারে। যেমন ধরা যাক লেখকদের স্বাধীনতাবোধ। অনেকেই নিজের লেখার উপরে এত বেশি আস্থা রাখেন যে আর কোন সম্পাদকের কলমের সামনে তাঁদের পান্ডুলিপিকে রাখতে রাজি হন না। বড় বড় লেখকদের কথা বাদই দিলাম, এই যে আমি একজন অলেখক, সেই আমিও ক্লাশ এইটে পড়বার সময় একটা দেয়ালপত্রিকার জন্যে জমা দেয়া গল্পে বাংলা ম্যাডামের কলম চলায় গল্প ফেরত নিয়ে এসেছিলাম। এখন মনে পড়লেও হাসি পায়, কারণ, এটা অনুচিৎ হয়েছিলো, এখন বুঝতে পারি।

আরেকটা কারণ হতে পারে, খরচ।
পান্ডুলিপি থেকে বই হিসেবে বের হওয়া পর্যন্ত অনেক সময় লেগে যায়, অনেক খরচও পড়ে। এর মাঝখানে আবার একজন সম্পাদককে নিয়ে আসাটা সময় ও অর্থ দুইদিক হয়তো একটু ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে।

তবে বাংলাদেশে এরকম কিছু আসলেই প্রয়োজন আছে কিনা, সেটা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
গতকালই একটা বইয়ের কথা লিখেছি এখানে। মেজর হামিদুল হোসেন তারেক বীর বিক্রমের লেখা একাত্তরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। এই বইটি পড়ার সময় আমার মনে হয়েছিলো, যদি বই ছাপানোর আগে কাউকে দিয়ে পান্ডুলিপিটি একটু সম্পাদনা করা যেত, তাহলে বেশ হতো। সবমিলিয়ে এমনিতেই খুব চমৎকার একটি বই এটি, কিন্তু ভাষা বা শব্দ নিয়ে আরেকটু যত্ন করা গেলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই বইটি দ্বিধাহীন ভাবে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হয়ে দাঁড়াতো।

৪।
সচলায়তন থেকে প্রকাশনা বিষয়ে একটা চমৎকার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, প্রকাশায়তন নাম দিয়ে। এ সংক্রান্ত সন্দেশের পোস্টটিতে সচলদের করা মন্তব্যগুলো পড়লেই বোঝা যায় ব্যাপারটি বেশ সাড়া ফেলেছে, অনেকের মনেই প্রকাশায়তন থেকে বই বের করার ইচ্ছে জন্মেছে।
প্রকাশায়তন বইয়ের জগতে শুরু থেকেই ব্যতিক্রমী অনেক উদাহরণ তৈরি করবে বলে আশা করছি, সেই সাথে ভাবছি, প্রকাশিতব্য সব বইগুলো সম্পাদক বা সম্পাদকমন্ডলীর সহায়তা বা পরামর্শ নিয়ে আরও নিখুঁত হিসেবে বের করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে কি? অবশ্যই সেটা হবে লেখকের সম্মতিক্রমে। এবং এখানে সম্পাদক কোনভাবেই কোন জোরজবরদস্তি খাটাবেন না, বরং পান্ডুলিপি পড়ে লেখক ও প্রকাশায়তনকে তার মতামত জানাবেন। অতপর সেই মতামতের আলোকে লেখক ও প্রকাশায়তন ঐকমত্যে পৌঁছালে পরে বই প্রকাশিত হবে।
মানসম্মত বই প্রকাশের ক্ষেত্রে এরকম কোন উদ্যোগ নেয়া হলে কেমন হবে আসলে? আমার ব্যক্তিগত ধারণা ব্যাপারটি খুবই ভালো হবে, হয়ত এর সুফল প্রতিফলিত হলে আস্তে ধীরে এটাই আমাদের প্রকাশনা জগতের একটা সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়াবে।

আপনার সন্তানকে অন্তত এই বইটি পড়তে দিন-

একদম পলকা একটা বই। বড় বড় হরফে ছাপা সবমিলিয়ে মাত্র ৬৪ পৃষ্ঠা। তার নিজস্ব ওজনের সিংহভাগই হচ্ছে শক্ত বাঁধাইয়ের কল্যাণে। আমার খাবার টেবলের পাশে রাখা ওজন মাপার মেশিনটায় তুললে কাঁটা খুব একটা নড়ে চড়ে না, দেখেছি। কিন্তু পড়তে গিয়ে যতবারই বুকের ওপর রেখেছি, মনে হয়েছে, এর চেয়ে ওজনদার বা ভারী কিছু বোধহয় আর নেই!
বইয়ের নাম, একাত্তরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। মেজর হামিদুল হোসেন তারেক বীর বিক্রমের লেখা বই। একাত্তর সালে লেখক নিজেও কমবয়েসী ছিলেন, হায়ার সেকেন্ডারীতে পড়তেন। তবু সেই সময়েই তিনি যুদ্ধে চলে যান; এবং দেশের নানা জায়গায় তিনি সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন।
এই বইটি অবশ্য মেজর হামিদুল হোসেনের নিজের গল্প নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি বেশ কয়েকজন কিশোরের সংস্পর্শে আসেন যারা নানা ভাবে যুদ্ধের ময়দানে তাঁকে সহযোগীতা করেছিলো। সেইসব কিশোরদের নিয়ে স্মৃতিচারণ করেই এই বই।

সাতটি আলাদা অনুচ্ছেদে সাতজন কিশোর কিশোরীর কথা আছে এখানে। রমজান আলী, শশীলাল চর্মকার, নুরু নাপিত, পুতুল, আজিজ মন্ডল, বারেক ও তোতা।
মেজর হামিদুল হোসেন নিয়মিত সাহিত্যিক নন। এই বইটির ভাষায় তাই তেমন কোন মাধুর্য্য নেই। একদম সোজা সাপ্টা লেখা। লেখকের বাংলাও খুব যে ভাল নয়, সেটাও স্পষ্ট হয় কিছু কিছু শব্দের ব্যবহার বা বাক্যের গঠন দেখলেই। কিন্তু, এটা এমনই একটা বই, ভাষার সৌন্দর্য্য যেখানে খুব একটা গুরুত্ব বহন করে না। এই বইয়ের ভাষার উৎপত্তি কলমের মাথা থেকে নয় বলেই বোধ হয়। এটার উৎপত্তি ভিন্ন কোন জায়গা থেকে, বুকের খুব গভীরের, প্রাণের কাছাকাছি কোন চোরাকুঠুরি থেকে।

শশীলাল চর্মকার বা নূর মোহাম্মদ নাপিত, যারা পরিবার হারিয়ে এখানে ওখানে ঠোকর খাচ্ছিলো, পরে লেখকের দলের সাথে জড়িয়ে পড়ে এরা, নানা অভিযান সফল করে তুলতে বিস্তর ভূমিকা রাখে। পুতুল নামে এক কিশোরীর কথা আছে, যে পাকবাহিনীর গায়ে গ্রেনেড ছুঁড়ে বাঁচিয়ে দিয়েছিলো কজন মুক্তিযোদ্ধাকে। এরকম এক এক করে প্রত্যেকের অসীম সাহসিকতার কথা বলা এই বইয়ে।

রমজান আলী নামে এক কিশোরের কথা বলেছেন লেখক, রাজাকার সন্দেহে লেখকের দলের মুক্তিযোদ্ধারা যাকে ধরে এনেছিলো। পরে আসল ঘটনা জানা যায়। বিহারীরা ওর পুরো পরিবারকে মেরে ঘরদোর জালিয়ে দেয়। পরে যার আশ্রয়ে যায় রমজান, তার দোকানে এক রাজাকার কমান্ডারের আনা গোনা ছিলো, ওখান থেকেই রমজানকে নিয়ে যায় সে। সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে এসে পুর দস্তুর যোদ্ধা বনে যায় সে। শত্রুপক্ষের খবর নিয়ে আসে, সরাসরি যুদ্ধেও অংশ নেয়। এবং একটা অপারেশনে গিয়ে রমজান পাকসেনাদের পাতানো মাইনে পা দিয়ে ফেলে, তার দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। শহীদ হয় কিশোর মুক্তিযোদ্ধা রমজান।

বইয়ের প্রতিটি কিশোর মুক্তিযোদ্ধার কথা পড়তে গিয়ে গলা বুজে আসে। কী ভাগ্য আমাদের যে শুধু কষ্ট করে আমাদের একটু জন্মাতে হয়েছে, সাথে সাথে বিনেপয়সায় একটা দেশ পেয়ে গেছি আমরা। অথচ এই দেশটাকে আনবার জন্যে কত কত মানুষের রক্ত অশ্রু আর ত্যাগ যে জড়িয়ে আছে, তার কিছুই আমরা জানি না!

এমাজন ডট কমে দেখলাম হ্যারি পটারের নতুন বইটার দাম বাংলাদেশী টাকায় সাড়ে নয়শো টাকা। আর একাত্তরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা বইটির মূল্য ঠিক তার ষোল ভাগের একভাগ, মাত্র ষাট টাকা।
উঁহু, যারা ভাবছেন হ্যারিকে পছন্দ করি না আমি, ভুল ভাবছেন। রূপকথার আমি আজীবন ভক্ত, হ্যারি ও তার বন্ধুরা আমার কম প্রিয় নয়। আজকের শিশুরা হ্যারি পটার পড়তে পড়তে বড় হোক, এ নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। আমি শুধু চাইবো, হ্যারি পটারের সাথে সাথে আপনারা আপনাদের সন্তানের হাতে একটি করে একাত্তরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা বইটিও তুলে দিন।

রূপকথার জাদুকর কিশোরকে স্বপ্নের নায়ক ভেবে নিক নতুন প্রজন্ম, সমস্যা নেই, কিন্তু সেই সাথে জীবন যুদ্ধের যারা সত্যিকারের নায়ক, তাদের যেন জানতে পারে তারা, চিনতে পারে; তাতে যেন ভুল না হয় আমাদের।

শুক্রবার, আগস্ট ০৭, ২০০৯

সাপুড়ে লেখক, মাহমুদুল হক?

মাহমুদুল হকের "কালো বরফ" পড়তে পড়তে, সম্ভবত, বার তিনেক আমাকে পাতা উল্টে প্রথম প্রকাশের তারিখটা দেখে নিতে হয়েছে। ১৯৯২ সালে বেরিয়েছিলো এই বই। ঠিক সতের বছর আগে। কিন্তু তারচেয়েও বড় ব্যাপার হলো, এটির রচনাকাল আরও পেছনে, অগাস্ট ১৯৭৭! তিরিশ কিংবা তারও বেশি বছর বাদে, আমার নিজের চেয়েও বেশি বয়েসী এই বইটা হাতে নিয়ে আমি অবাক হয়ে ভাবছি, মাহমুদুল হক কেমন করে এত বছর আগেই এরকম একটা চির-আধুনিক উপন্যাস লিখে গেলেন!

চারপাশের পাওয়া বইগুলোকে চিরকালই আমি উঁইপোকার চেয়েও বেশি যত্নে আর আদরে গিলে নিয়েছি। লেখক বা বইয়ের সংখ্যা হিসেব করলে সেটা অ-নে-ক ল-ম-বা একটা লিস্টি হয়ে দাঁড়াবে কোন সন্দেহ নেই। এবং, কে জানে, মনের গভীরে কোথাও এই নিয়ে হয়তো কোন আত্মতৃপ্তিও কাজ করে আমার মধ্যে। কিন্তু সেটি যে আসলে অনেকটা বোকার স্বর্গের মতই ব্যাপার, এটা টের পেলাম সম্প্রতি "প্রতিদিন একটি রুমাল" আর "কালো বরফ" পড়ার পরে।

লেখায় জাদু-টাদুর কথা শুনেছি অনেক। কালো বরফের প্রতিটা পাতায় আমি মনে হলো সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। উত্তম পুরুষে লেখা একটানা উপন্যাস। আবার ঠিক একটানা নয়। একটা জীবনেরই দুটি সময়ের কথা পরপর অথবা পাশাপাশি বলে যাওয়া, অবলীলায়। এরকমটা অবশ্য অনেক দেখেছি। এই মুহুর্তেই মনে পড়ছে দূরবীন এর কথা, শীর্ষেন্দুর, আমার খুবই পছন্দের একটা লেখা। কিন্তু সেখানে একটা আয়োজন ছিল। একটা মানুষের জীবনের গল্প ফুটিয়ে তুলবার জন্যে যে বিপুল বিস্তারের দরকার, যতখানি আড়ম্বরের দাবীদার সেটা, শীর্ষেন্দু সেসবে একেবারেই অকৃপণ। কালো বরফে তার একদম উল্টো। কোন আয়োজন নেই, যেন, আমি বলে যাচ্ছি, তুমি শুনলে শুনো না শুনলে নেই, এরকম একটা ড্যাম কেয়ার ভাব।

একটু আগে বলেছিলাম উত্তম পুরুষে লেখা, আসলে পুরোপুরি তা নয়। শৈশবের অংশটুকু উত্তম পুরুষে, কিন্তু সাথে সাথেই বড় হয়ে যাবার অংশটুকু লেখকের বয়ানে বলা। কিন্তু কোথাও বেসুরো লাগেনি। বেসুরো, এই শব্দ ব্যবহারের কারণ, প্রতিটা চমৎকার গল্প বা উপন্যাসই আমার কাছে খুব যত্ন নিয়ে গাওয়া গানের মত মনে হয়। ঠিক সুরে, তালে মিলিয়ে মিশিয়ে একটা চমৎকার সঙ্গীত। কালো বরফও তাই।

প্রচ্ছদ আকর্ষণীয় নয়, রঙের বাহুল্য চোখে লাগে। আমাদের এখনকার বইগুলোর মত ব্যাক কাভারে ছবিসুদ্ধ লেখক পরিচিতি নেই। কিন্তু বাইরের সৌন্দর্যের পুরো ঘাটতি পুষিয়ে দিয়েছে বইটার ভেতরকার সৌন্দর্যটুকু।

হক সাহেব শুনেছি ব্যক্তিজীবনে রত্ন বা পাথর নিয়ে কাজ করতেন। ওনার লেখা পড়ে আমার সন্দেহ হচ্ছে, উনি গোপনে গোপনে সাপুড়ে ছিলেন না তো? তা নইলে এরম অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তির খোঁজ উনি কেমন করে পেলেন! লেখা পড়ে যাই, কিন্তু লেখা তো নয় যেন সাপের চোখে চোখ ফেলে বশ হয়ে গেছি!
তো পড়ে টড়ে, সবমিলিয়ে, নিজের প্রতি আমার গভীর অনুকম্পা হলো। এরকম দুর্দান্ত লেখা পড়তে আমার জীবনের সাতাশটা বছর খরচ করে ফেললাম, দুর!
আমায় দিয়ে আসলে কিসসু হবে না।