বৃহস্পতিবার, জুন ০৪, ২০০৯

আহত ভারতীয় ছাত্র এবং অজিদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ-

আমার সহকর্মী ভারতীয় ছেলেটা আমাকে উত্তেজিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি গিয়েছিলে আজ, ফেডারেশন স্কয়ারে?
আমি কী একটা খুটখাট করছিলাম কম্পিউটারে। ওর দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, ঘটনা খারাপ, পাশের চেয়ার দেখিয়ে বসতে বলে জানালাম, না যাইনি, আমি তো সকাল থেকেই এখানে। কী খবর বলো তো?
ও বেশ উঁচু গলায় হড়বড় করে অনেক কথা বলে গেলো। সারমর্ম এরকম, আজ নাকি প্রায় হাজার পাঁচেক ভারতীয় ছাত্র প্রোটেস্ট করেছে সেখানে। পুলিশের সাথে ব্যাপক কথা কাটাকাটি হয়েছে। প্রায় নাকি মারামারি হবার জোগাড় কয়েকবার। ছাত্রদের অভিযোগ ভিক্টোরিয়ান পুলিশ ততটা সক্রিয় নয় নিরাপত্তার ব্যাপারে।

মাত্র কদিন আগের ঘটনা। একটু রাতের দিকে স্টেশানে নেমে বাড়ি ফিরছিলো কয়েকজন ভারতীয় ছাত্র। সেখানে হুট করেই ওদেরকে আক্রমণ করে বসে বেশ কিছু ককেশিয়ান যুবক। আক্রমণটা হেলা ফেলা করার মত নয়। মেরে ধরে সাথে যা ছিলো সবই কেড়ে নেয়া হয়েছে, এবং সেই সাথে দু জনকে মারাত্মক আঘাত করা হয়েছে স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে। আমি সেদিন টিভিতে ভিডিও দেখেছিলাম কিছু, দেখে শিউরে উঠেছিলাম, বুকের মাঝামাঝি থেকে একেবারে পেটের তলদেশ পর্যন্ত চিরে ফেলেছে একজনের। তার অবস্থা ভয়াবহ। টিভিতেই দেখালো যে ডাক্তার বলছে বাঁচবে কি না নিশ্চিত নয়। অন্যজনের অবস্থাও তদ্রুপ।

ঘটনার আকস্মিকতায় লোকজন বেশ চমকে গেছে এখানে। ভারতীয় ছাত্ররা বেশ ক্ষেপে গেছে, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তারা খোলাখুলি জানিয়ে দিয়েছে, অস্ট্রেলিয়রা বর্ণবাদী।
ভিক্টোরিয়ান পুলিশ খুবই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আছে এই মুহুর্তে, তারা বলছে, ঘটনার কারণ আসলে বর্ণবাদ নয়, এর পেছনে দায়ী এলকোহল।

আমি যা বুঝি, দুই পক্ষই মোটামুটি ঠিক।
আক্রমণ যারা করেছে, তাদের সোজা বাংলায় আমরা জান্কিজ বলি। এরা সারাদিন মদ খেয়ে পড়ে থাকে, মূলত রেল স্টেশানের আশপাশেই। অথবা ড্রাগ নেয় কিছুটা আড়ালে পড়া জায়গাগুলোয় দাঁড়িয়ে। এবং পুলিশ দেখলেই ভদ্র হয়ে যায়, অথবা দৌড়ে পালায়। পুলিশের দাবি সত্য, কারণ আক্রমণ করেছে এরকমই জান্কিজদের একটা দল। কিন্তু ছাত্রদের কথাও সত্য এ জন্যে যে, এই জান্কিজরা ওদের ধরেছে ওরা বাদামী চামড়ার বলেই। সাদা চামড়া হলে কখনোই ধরতো না। এ ক্ষেত্রে আমি বলবো, জান্কিজরা বর্ণবাদী নয় ঠিক, অনেকটা সহজ শিকার হিসেবে বাছাই করেছে ছাত্রদের।

আমি নিয়মিত পত্রিকা দেখতে পারিনি কদিন। এই ঘটনা নিয়ে যা কিছু শোনা, বেশিরভাগই পরিচিত ভারতীয় ছাত্র বা সহকর্মীদের কাছ থেকে।
বিশেষ করে ভারতে নাকি এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। ঘটনার সত্যতা জানি না, দিল্লীতে নাকি অজি রাস্ট্রদূতকে তলব করে তিরস্কার করা হয়েছে। এখানে টিভিতে দেখলাম ভারতীয় রাস্ট্রদুত হাসপাতালে গিয়েছেন আহত ছেলেটাকে দেখতে, এবং পরে নাকি সংবাদ মাধ্যমের বেশ অনমনীয় বক্তব্য রেখেছেন।

ছাত্রদের এরকম প্রতিক্রিয়া আমার কাছে অস্বাভাবিক লাগেনি একদমই।
আমি ব্যক্তিগতভাবে বেশ কয়েকজনকে চিনি যারা এরকম হ্যারাসমেন্টের শিকার। আমার পরিচিত একজনকে একবার মেরে হাত ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিলো, ঊনি ছয় মাস হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে ঘুরে বেড়িয়েছেন। আরেকজনের কথা জানি যাকে স্যাটারডে নাইটে রাস্তায় একা পেয়ে একদল ছেলে পেলে ঘিরে ধরে গায়ে বিয়ার ঢেলে দিয়েছে।
ইন্টারেস্টিং হচ্ছে এরকম ঘটনা কিন্তু হরহামেশাই ঘটছে। বিশেষ করে মূল শহর থেকে একটু দুরে যেসব উপশহর ( সাবআর্ব) রয়েছে, সেখানকার নির্জন স্টেশানগুলোয় এরকম প্রায়শই ঘটে। কিন্তু এবারে ব্যাপারটা নিয়ে এত তোলপাড় হবার কারণ, সম্ভবত, এবারই প্রথম ভিক্টিমকে হাসপাতালে নিতে হয়েছে মুমূর্ষু অবস্থায়।

এদিক ওদিক থেকে ভারতীয় অনেক ছাত্রের নানা অভিযোগ এতদিনে সবার নজরে এলো।
বেশিরভাগেরই অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে। একজন বললো, রাতে বাড়ি ফিরতে গেলে জান্কিজরা উৎপাত করতো, পুলিশের কাছে অভিযোগ করায় তারা নাকি বলেছে, বাসা বদলে ফেলো!
টাকা না পেয়ে মারধর করেছে, এই অভিযোগের ব্যাপারে পুলিশের উত্তর হলো, সবসময়ে সাথে কিছু টাকা-পয়সা রাখো।
ফেডারেশন স্কয়ারের প্রোটেস্টের সময় অনেক ছাত্রই পুলিশের উদ্দেশ্যে মধ্যমা প্রদর্শন করেছে নির্বিকারে। কেউ কেউ বলেছে, পুলিশ যদি না পারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাহলে সেটা খোলাখুলি জানিয়ে দিক, আমরা নিজেরাই সেটার ব্যবস্থা করবো।

পুলিশের কার্যকলাপ নিয়ে আসলেই মাঝে মাঝে অবাক লাগে। আমার বাসায় একবার চুরি হয়েছিলো বেশ অনেকদিন আগে। পুলিশ ডাকার পরে ওরা আমাকেই হাজারো প্রশ্ন করে প্রায় নাস্তানাবুদ করে ফেলেছিলো, তারপর লম্বা সময় ধরে দরজা জানালা থেকে হাতের ছাপ টাপ নিয়ে চলে গিয়েছিলো। এরপরে আর কোন হদিশ পাইনি।
এ দেশে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস পরীক্ষা করা আর পার্কিং ফাইন দেয়া ছাড়া পুলিশের সত্যিই আর কোন কাজ আছে কি না আমার প্রায়শই সন্দেহ হয়।

এই ঘটনাটায় লোকেদের টনক নড়েছে বোঝা গেলো। নড়েছে সরকারেরও, অবশ্য তা ছাড়াও উপায় নেই। যদ্দুর জানি, শিক্ষা "রপ্তানী" করে, অর্থাৎ এই বিদেশী ছাত্রদের কাছ থেকেই প্রতি বছর বিরাট অংকের টাকা আসে অস্ট্রেলিয়ায়, যাদের বেশিরভাগই ভারতীয়।

তাই আর্থিক লাভের কারণেই হোক, অথবা নিজেদের বর্ণবাদী অপবাদ ঘোচানোর জন্যেই হোক, আমি সত্যিই আশা করছি এবারে এর একটা সমাধান এদেশের সরকার নিশ্চয়ই খুঁজে বের করবে।