বৃহস্পতিবার, মার্চ ২৭, ২০০৮

জয় বাবা ব্লগোনাথ

যে কোন আড্ডাতেই নিজের গ্রুপের মানুষ খুঁজে নেবার একটা অদৃশ্য প্রবণতা কাজ করে সবার মধ্যে। সাধারণত নতুন আড্ডায় হয় এরকম, অথবা বড়সড় ঘরোয়া চা-চক্রেও।
এ সব গ্রুপের অবশ্য কোন ঠিক ঠিকানা নেই। কোন শহরে বড় হওয়া, এই দিয়েই জিজ্ঞাসা শুরু হয়, উত্তর মিলে গেলে এনারা একটা গ্রুপ। যদি না হয়, তাতেই বা কী, পরের প্রশ্ন 'কোন কলেজ যেন?'। তারপরে আছে, এসএসসি কবে, এইচএসসি?
তো যুগ বদলে গেছে, আন্তর্জালের মাধ্যমে আমরা হয়েছি আরো আন্তর্জাতিক, তাই এই পর পর প্রশ্নে খুঁজে নেবার তালিকায় সম্প্রতি আরেকটা প্রশ্ন যোগ হয়েছে, ' কি ভাই, কোন ব্লগে লিখেন আপনি?'

:-)
একটু বেশিই বলে ফেললাম অবশ্য। বাস্তবে এখনও এরকমটা হয় নি, তবে খুব শিগগীরই হয়ে যাবে, তা নিশ্চিত। আমি অন্তত সেরকমই আলামত পেলাম।

সম্প্রতি এক আড্ডায় যাবার 'সৌভাগ্য' হলো। সৌভাগ্য ইনভার্টেড কমায় লেখা, কারণ সাধারণত বাংলাদেশিদের আড্ডা আমার অপছন্দের। আগেও বলেছি, মুল কারণ হলো দেশ-বিষয়ক হতাশাব্যঞ্জক কথাবার্তায় আমার স্পষ্ট এলার্জি আছে। একদমই সহ্য হয় না। এছাড়াও রয়েছে গসিপ-প্রিয়তা। মোটামুটি সাইজের একটা সামাবেশে উপস্থিত থাকলেই অত্র এলাকার সকল বংগদেশীদের নাড়ি-নক্ষত্র জানা হয়ে যায়।

আমি নিজে মহাপুরুষ নই। লোকের নিন্দা শুরু হলে আমিও তাতে হুট করেই যোগ দিয়ে ফেলি। আর এই ব্যাপারখানা এড়াতে চাই বলেও আমার বংগ-সমাজ-প্রিয়তায় খানিকটা ঘাটতি হয়েছে।

সেদিন, ক্যানবেরা থেকে আমাদের পুর্বপরিচিত এক দম্পতি এলেন এখানে, ইস্টারের কল্যাণে পাওয়া লম্বা ছুটিতে তারা ঘুরে দেখবেন মেলবোর্ণ। সন্ধ্যায় এসে পৌঁছলেন তাঁরা, দেখা করতে আমরা দুইজন রাত এগারোটায় ছুটলাম আন-বাড়ি।

আমার সকল স্বতস্ফূর্ততা আমার লেখার খাতায়।
সামনাসামনি আড্ডায় বসলে আমি ভীষণ মুখচোরা হয়ে যাই, বিশেষ করে গিয়ে যদি পড়ি সদ্য-পরিচিতদের মাঝখানে। আমি আর তিথি বাদে ওখানে বাকি সবাইই আমাদের অনেক সিনিয়র; জীবনযাত্রার জটিলতায় এখনো সেরকম মারপ্যাঁচের শিকার হই নি আমরা, তাই বসে বসে তাঁদের অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ হচ্ছিলাম। সেই ধরাবাঁধা প্রশ্নমালা অনুযায়ী একবার অবশ্য শহরের নাম উল্লেখ করে এন্ট্রি নেবার মৃদু চেষ্টা করেছিলাম, সে চেষ্টা সফল হয় নি।

তখন আচমকাই কোন কথা থেকে কোন কথায় ঘুরে ফিরে যেন ব্লগের কথা উঠলো। তখুনি জানা গেলো, ওখানে একজন নামকরা ব্লগারও বসে আছেন। আমি এইবারে পালে খানিকটা হাওয়া পেলাম, একটু নড়ে চড়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বসলাম।

উনি ইংরেজিতে ব্লগান, স্বনামে এবং বেনামে, দু'ভাবেই। বেশ সুপরিচিত একটা গ্রুপ-ব্লগ। ইংরেজি ব্লগগুলোয় আমার যাতায়াত একেবারেই কম- যদি না কেউ খুব নির্দিষ্ট করে কোন পোস্টের রেফারেন্স দেয়। আর উনিও বাংলা ব্লগে খুব একটা ঘোরাফেরা করেন না। অবশ্য সচলায়তনের কথা জিজ্ঞেস করতেই জানালেন, পড়েছেন অনেক লেখা। বিশেষ আগ্রহী ছিলেন বটু মিয়ার বৈঠকখানার প্রতি।

ঠিক তুলনা নয়, আমরা এমনিতেই নিজ নিজ ব্লগের গল্প করছিলাম।

ব্লগিং কনসেপ্টেও সচলায়তনের সাথে ওনাদের ভিন্নতা টের পেলাম। এখানে আমরা ব্লগেই লিখি, এখানেই খোলামেলা মন্তব্য চলে। এইসব সমালোচনার প্রভাবে লেখার পরিমার্জনাও ঘটে ক্ষেত্রবিশেষে।
কিন্তু ওনাদের ইংরেজি ব্লগে মন্তব্য-সমালোচনার পুরো ব্যাপারটি হয় ইমেইলের মাধ্যমে। সেখান থেকে ফিডব্যাক নিয়ে সুন্দর ঘষামাজা শেষে যে লেখাটা দাঁড়ায়, সেটাই উঠে আসে ব্লগে। অর্থাৎ ব্লগ মূলত প্রকাশমাধ্যম হয়ে উঠেছে। সচলায়তনের 'লেখক ফোরাম' ধরনের ব্লগীয় কনসেপ্টের চেয়ে অনেক আলাদা, তবে এই ভিন্নতাটুকু অস্বাভাবিক মনে হলো না আমার কাছে।

গল্পের এক পর্যায়ে চা-এর যোগান দেয়া হলো, সেই চায়ের কাপ হাতে নিয়ে কথা বেড়েই চললো রাত আরো গভীর করে।

সম্প্রতি ওনাদের ইংরেজি ব্লগের পাশাপাশি একটা বাংলা ব্লগও রান করছে। ব্যাপারটা জানার পর আমি আগ্রহ নিয়ে দেখেছি কদিন সেটা। বেশ ভাল ভাল লেখা আসছে। এবং দেখেছি বিখ্যাত সব লেখকেরা, মূল মিডিয়ায় পরিচিত যারা- তাঁরাও লিখছেন ওখানে। শুরুতে আমি ভেবেছিলাম, এটা বেশ ভালো হলো তো, এরকম লম্বা দৈর্ঘ্যের লেখকেরা যদি সত্যিই ব্লগানো শুরু করেন তো বেশ হয়। কিন্তু সেই সব লেখার মন্তব্যের ঘরে লেখকদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ে নি, এবং না পড়ায় বিস্মিত হয়েছি। শেষ মেষ পুরো ব্যাপারটাই পত্রিকার কলাম সংগ্রহের মতন হয়ে দাঁড়িয়েছে- ঠিক ব্লগ আর হয়ে ওঠে নি।

এই নিয়ে খুব আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করলাম- সেই সব নামী লেখকেরা কি সত্যিই ব্লগান-, নাকি তাঁদের পক্ষ থেকে লেখা আপলোড করা হয়?

আশংকা সত্যি হলো। জানলাম, বেশিরভাগ লেখকদেরই লেখা সংগ্রহ করা হয় লোক মারফত, তারপরে ওখানে তুলে দেয়া হয়। লেখকেরা নিজেরা ব্লগান নি এখনো।
বলতেই হয়, বেশ খানিকটা দমে গেলাম আমি এ কথা শুনে।
মনে হলো, সচলায়তন এদিক দিয়ে বেশ আলাদা, উল্লেখযোগ্য লেখকদের আমরা এখানে ব্লগার হিসেবেও পেয়েছি। ওনারা অন্যদের ব্লগ পড়েন, মন্তব্য করেন এবং নিজেদের ব্লগে আসা মন্তব্যের প্রতি উত্তর দেন।

আলাপে আলাপে রাত আরো বাড়তেই উঠবার তাড়া এলো।
পুরো সময়টুকুই বেশ ভালো লাগলো আমার। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতদের সান্নিধ্যে আসা ছাড়াও- অনেকদিন বাদে এরকম নিষ্কলুষ কিছু আড্ডা দিতে পারলাম। আড্ডায় এরকম একজন ব্লগারের দেখা পেয়েও আমি বেশ আনন্দিত- খুব ভালো লাগলো ওনাকে। কথাবার্তার ফাঁকে ফাঁকে বেশ মজার কিছু আগে-শোনা-কৌতুকও আবার শুনে প্রাণ খুলে হাসলাম। বলার ভঙ্গিতে আন্তরিকতা না থাকলে এরকমটা সম্ভব হতো না।

তো সেই আড্ডা শেষে বউ নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে আমার মনে হলো, সেই দিন আসলেই খুব দূরে নয়, যখন নাম-ঠিকানা-স্কুল কিংবা শহরের নামের সাথে সাথে নিজ নিজ ব্লগের ঠিকানাও প্রাথমিক পরিচিতির একটা অংশ হয়ে দাঁড়াবে।
জয় বাবা ব্লগোনাথ।

হাওয়াই মিঠাই ৪

বাসার মেইলবক্সে নিয়মমাফিক একবার করে উঁকি দিই, প্রতিদিন, সাধারণত বিকেলে, কখনো রাত করে বাড়ি ফিরেও।

ইমেইল-এসএমএস-ফোনের এই ঝটপটে দুনিয়ায় কারো হাতের লেখা চিঠির প্রত্যাশা করি না অবশ্য, সে যুগ অনেক কাল আগেই নেই হয়ে গেছে। চিঠি পাবার অসামান্য আনন্দের দিন পার করে এসেছি। এখন মেইলবক্স খুলে পাই জাগতিক সকল সমস্যার আমলনামা, কখনও নতুন সমস্যায় জড়িয়ে পড়বার লাস্যময় আহবানও। ব্যাংকের কাগজ-নেটবিল-ফোনবিল-ক্রেডিটকার্ড, পাশের রাস্তায় কোন একটা বাড়ির আদরের বিড়াল হারিয়ে গেছে- এই সব নানানরকম ভেজাল।

তার মধ্যেই, গত পরশু- হাত বাড়িয়ে দেখি এয়ার-মেইলে আসা ডাক। দেশ থেকে? আগ্রহ নিয়ে খামটা হাতে তুলে নিই, না, সিংগাপুরের টিকিট লাগানো।

তখুনি মনে পড়লো, ফেইসবুকের মেসেজে কদিন আগেই আমার ঠিকানা দিয়েছিলাম ফারুক হাসান-কে। সিংগাপুর থেকে একুশে উপলক্ষে একটা প্রকাশনা বের করেছেন তাঁরা- অবিনাশী গান- নাম দিয়ে। সেখানে আমার একটা দুর্বল গদ্য তাঁরা ছাপিয়েছেন, তারই সৌজন্য সংখ্যা বয়ে নিয়ে এসেছে এই খাম। পোস্ট করা হয়েছে জানতাম, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি পেয়ে যাবো হাতে, এরকমটা ভাবি নি। অপ্রত্যাশিতই বলা চলে, অনেক ধন্যবাদ তাই।

প্রকাশনাটা হাতে নিয়ে মন ভালো হয়ে গেলো।
কলেজে আমাদের প্রতি টার্মে একটা করে বাংলা আর ইংরেজী সাময়িকী বের হতো। বাংলাটার নাম ছিলো 'তরংগ', ছোটখাটো আকৃতির, সম্ভবত দুই বা তিন ফর্মার হতো সেটা। 'অবিনাশী গান'-এর আকৃতি আমাকে তরংগের কথাই মনে করিয়ে দিলো।
এক রঙা প্রচ্ছদ, ভালো মানের সাদা কাগজে একদম ঝকঝকে ছাপা। খুব আকর্ষনী, এমনটা নয়, কিন্তু বেশ একটা 'ভাব' আছে বলতেই হবে।

লেখাগুলোও সমৃদ্ধ। বাসমতী উপাখ্যান নামে বিলোরা চৌধুরীর কবিতাটা খুব ভাল লেগে গেলো। স্মরণিকা নাম দিয়ে আলাদা একটা অংশে স্মরণ করা হয়েছে তাজউদ্দীন আহমেদ, শামসুর রাহমান এবং একুশের প্রথম কবিতার কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরীকে। এই উদ্যোগটা অভিনন্দনযোগ্য।

গোটা চার সচলের লেখাও ছাপা হয়েছে ওখানে, ঘুরে ফিরে তাঁদের লেখার প্রতি চোখ চলে যাচ্ছিলো বার বার, চেনা জানা নামগুলোর প্রতি ভালোবাসা বেড়ে যাওয়ার মুশকিল টের পাচ্ছি দিন দিন।

মুহম্মদ জুবায়েরের 'একুশ, দুর থেকে'- খুব ভাল লাগলো। পেছন ফিরে এই দুরে তাকানো- একই সাথে দেশ থেকে, আবার অনেক দুর পেছনে ফেলে আসা সময়ের দিকে বেশ আদুরে একটা পরশ বুলিয়ে যাওয়া।
ইশতিয়াক রউফের- প্রবাসের কথোপকথন সিরিজের দুর্দান্ত ভক্ত আমি। একুশ নিয়ে কথোপকথন পড়ে আবারও ভালো লাগলো।

আর সদ্য-প্রয়াত সেলিম আল দীন-কে নিয়ে লেখা ফারুক হাসানের 'নাটকের কবি'- অল্প জায়গায় অনেক বড় একটা মানুষকে ধরে রাখবার প্রয়াস।

প্রবাসে থেকে এরকম একটি সংকলন প্রকাশের পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ দেখে আমি বেশ মুগ্ধ হই। পাতা উলটে যাই, আর নিজের মনেই বার বার বলি, এই সব ভালো লাগে...।
*

বেশ সুন্দর একটা নাটক দেখলাম আজ। মুহম্মদ জাফর ইকবালের - [url=http://www.boishakh.net/forum/viewtopic.php?t=5275]গ্রামের নামটি খঞ্জনা[/url]। একুশ উপলক্ষ্যেই লেখা। একজন সাধারণ বাংগালী মা, তাঁর এই ডিজ্যুস যুগের সন্তানদের কাছে যিনি খুব 'উইয়ার্ড' একটা মানুষ; দেশ, ভাষা আর গর্ভধারিণী- এই তিন মায়ের প্রতি ভালবাসা নিয়ে যিনি দিনাতিপাত করেন। সুবর্ণা মুস্তাফা, কি অসাধারণ পরিমিতিবোধ, যেখানে যেমনটা দরকার, চোখ মুখে ঠিক প্রয়োজনীয় অভিব্যক্তি, একটুও কম কিংবা বেশি নয়- এখনো কেমন করে যে পারেন!

আবহ সংগীতে ছিলেন ইবরার টিপু। ভদ্রলোককে কোন কষ্টই করতে হয় নি বলতে গেলে। রবি-সাম্রাজ্যের অফুরান সম্পদ থেকে তুলে এনে এনে শুধু জায়গামতন বসিয়ে দিয়েছেন।

পাশাপাশি বসে আমরা দু'জন নাটক দেখি। নাটকের গল্পে ডুবে যাই, সেই সাথে রবীন্দ্রনাথের সুরে, সব মিলিয়ে কেমন যে চোখ জ্বালা করে ওঠে, পরস্পরের কাছ থেকে চোখ লুকাই শুধু আমরা।

পরবাসী খাঁচায় আটকে থাকা এই ছটফটে মনটাকে যে কোনখানে লুকাই...।

বৃহস্পতিবার, মার্চ ১৩, ২০০৮

দুই বাংলাভাষীর কথোপকথন

গায়ের চামড়া ভালোই মোটা হয়ে গেছে বুঝতে পেরেছি। হাবিবের গলায় ' দিন যা-আ-আয়, আম্মার প্রেম যায় বেড়ে!'- এই শুনে চমকে ওঠার কথা ছিলো, চমকাই নি।
প্রথমেই ভেবেছি, আম্মাজান সিনেমার অপ্রকাশিত এবং অপ্রচারিত নতুন গান হয়তো এটা। তারপরে ভালো মতন শুনে বুঝলাম, সেরকম কিছু না। গানের আবেগের ঠ্যালায় হাবিব 'আমার'-কে 'আম্মার' বলে ফেলেছে।
অবশ্য বর্তমান সময়ের বাদবাকিদের তুলনায় হাবিবের উচ্চারণ অনেকটুকুই মার্জনীয়।
একটু পেছনে ফিরলে, এমনকি তাহসানের উচ্চারণেও রয়েছে বেশ জড়তা। ইউনিকোডের গোলমালে পড়ে এইখানে আমরা 'র' দিয়ে না লিখতে পেরে 'ড়' দিয়ে লিখি 'ড়্যাব'। কিন্তু এই ইউনিকোডীয় সমস্যা বাই ডিফল্ট কেমন করে তাহসানের মুখে বসে গেল, সেটাই ভাবনার বিষয়।

মিলার নর্তন-কুর্দন নিয়ে নতুন করে আর কিছু বলতে চাইছি না। ( ধুসর গোধুলী এবং সৌরভের সম্মানে অবশ্যই)। আনিলার গানও বেশ চলেবল। এবং আমার বরং আর সবার চেয়ে আনিলার গানই বেশ ভালো লাগে।
সম্প্রতি শিরিনের পাঞ্জাবীওয়ালা শুনলাম। প্রথম একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেও পর পর বেশ কয়েকদিন শুনবার পর দেখি ভালই লাগছে। গানগুলোয় চাঁটগাইয়া প্রভাব থাকায় পুরোপুরি শুদ্ধ বাংলায় শিরিনকে গাইতে হয় নি, এটা শিরিনের জন্যে বিরাট একটা সুবিধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আসলে। প্রথম এলবামে তাই শিরিন, আমার মতে, লেটার মার্ক সহ পাশ।

প্রবাসে বশে ইশকুল-টিচারদের মতন গায়কদের ভুল ধরে বেড়াচ্ছি, বা ভুল ধরতে পারছি- পুরোপুরিই ইউটিউবের কল্যাণে। নেটে ঢুকে ব্লগ বাদে ওখানেই বেশি আসা-যাওয়া হয়। তা নইলে দেশের বর্তমান হালচাল একেবারেই জানাশোনার বাইরে থেকে যেত।
সম্প্রতি এরকম ঘুরতে ঘুরতে একটা ভিডিও পেয়ে গেলাম। মুলত সেটা শেয়ার করার জন্যেই এই পোস্টের অবতারণা।
ভিডিওটি দেখার পরে আমার অনুভুতি কি হয়েছিলো- সেটা আমি কোন এক ফাঁকে মন্তব্যের ঘরে এখানে জানিয়ে যাবো। তার আগে শুনি আপনাদের কেমন লাগলো।
ভেবে চিন্তে এটার নাম দিলাম- দুই বাংলাভাষীর কথোপকথন। এর মধ্যে একজন হলেন উপরোক্ত শিরিন। অন্যজন, এহেম, মানে ওনার নাম তিশমা।
দেখুন তাহলে-

ইংরেজি মাধ্যম নিয়ে অল্প দু'চারটে কথা

সবজান্তার পোস্ট -একুশের কোপাকুপি- পড়ে অনেক পুরনো কথা মাথার ভেতরে ভীড় করে এলো।

ঢা-বির ছাত্র হবার পর পর মনের ভেতর বেশ জোশ নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। কার্জন হলে আমাদের ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের অফিসে নাম রেজিস্ট্রি করতে গিয়ে অফিসের ক্লার্ক যখন আবেদন পত্রটা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন, 'এইখানে একটা সাইন করেন।' আমি বেশ অনেকক্ষণ বুঝতেই পারি নি যে কথাটা আমাকে বলা হচ্ছে। এর আগে কে আমাকে সম্মান করে 'আপনি' সম্বোধন করেছিলো- অনেক ভেবেও মনে করতে পারলাম না।
তো, ঐ কাগজে স্বাক্ষর করতে করতেই বুঝলাম বড় হয়ে গেছি।

কিন্তু এই আনন্দদায়ক ব্যাপারটা একা বুঝলে তো চলবে না, বাসার লোকজনকেও জানান দিতে হবে। তার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আমি একদিন হুট করে ঘোষণা দিয়ে দিলাম, ঢাকায় আমি নিজেই নিজের খরচা-পাতি চালাবো। এরকম ঘোষণার সাহস অবশ্য পেয়েছিলাম টিউশানীর কল্যাণে।

সেই সময় অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে আমি দুটা টিউশানী শুরু করি।
টিউশানী-করুয়াদের কাছে ইংরেজী মাধ্যমের ছাত্রদের বেশ সুনাম রয়েছে। পকেটের স্বাস্থ্য দ্রুত বাড়ানোর জন্যে বাংলার চেয়ে ইংরেজী মাধ্যমের অবদান বেশি থাকে, সাধারণত।

ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীর এই দুই ছাত্রের বাসা কাছাকাছি। একজনের গুলশান ও অন্যজনের কাকলী- ডিওএইচএস। আমার জন্যে বেশ সুবিধে হলো। ক্লাশের পরে টিএসসিতে ঘন্টাখানেক আড্ডা দিয়ে তারপরে শাহবাগ থেকে ছয় নাম্বার অথবা শাপলা ধরে চলে যেতাম কাকলী। ওখানে পড়ানো শেষে গুলশান।
এই দুই ছাত্রকে পড়ানোর ব্যাপারটা বেশ এনজয় করেছি সবসময়েই।

একজন একটু বেশি মেধাবী ছিলো- খুব সহজে সব পড়া বুঝে যেত, আগ বাড়িয়ে হোমওয়ার্ক নিয়ে নিতো- ওর রেজাল্টও ছিল ক্লাশের প্রথম দিকে।
অন্যজন সেই তুলনায় একটু কম মেধাবী- রেজাল্টের অবস্থা করুণ, এবং আলসেমীতেও জুড়ি নেই।
তবে একটা বিষয়ে দুজনের মধ্যেই বেশ মিল ছিলো- দুজনের কেউই বাংলায় ভালো নয়!

প্রথম যখন একজন থার্টিনাইনকে কোন ভাবেই ঊনচল্লিশ বলে চিনতে পারছিলো না- আমি বেশ অবাক হয়ে যাই। এবং মজার ব্যাপার হলো- দু'জনের মা-ই আমাকে বলেছিলেন, 'বাবা, সব সাবজেক্ট যেমন তেমন, কিন্তু বাংলায় ওরা খুবই উইক। তুমি ওটাতেই বেশি জোর দিও।'

এটা বোধহয় বছর ছয় আগের কথা। তখনও দেশে ডিজ্যুস জমানা আসে নি। আমরা, মানে ম্যাংগো-জনতার বাংলা তখনও সাধারণই ছিলো, কোন কিছুর মিলমিশে এখনকার মতন জগাখিচুড়ী হয়ে যায় নি। কিন্তু সেই সময়েই আমার একজন ছাত্রের স্বপ্নের নায়ক ছিলো মাইকেল জর্ডান, অন্যজনের, ওয়েল, শাহরুখ খান।

আমি ওদের সাথে কথা বলতে গিয়ে দেখলাম বাংলা বা বাংলাদেশ নিয়ে ইতিহাস বা অন্য যে কোন সাধারণ জ্ঞানের জায়গাটায় বিশাল ফাঁক রয়ে গেছে।
এই আবিষ্কারটা আমার জন্যে বেশ পীড়াদায়ক ছিল।
তবে বেশ বুঝতে পেরেছিলাম, এর পেছনে ওদের কোনই দোষ নেই। ওদের পড়ানোর বইপত্র, সিলেবাস, স্কুলের পরিবেশ ও আরো নানান হাবিজাবি এর জন্যে দায়ী- পুরোমাত্রায়। ওরা নিজেরা একেবারেই দায়ী নয়।
আমার মনে হয়েছিলো- যদি সেরকম সাপোর্ট ওদের দেয়া যায়- ব্যাপারটা কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব নয়।

আমি খুব অল্প কিছু পদক্ষেপ নিয়ে ছিলাম।
পড়ানোর বাইরের সময়টুকুতে ওদের সাথে আমাদের ভাষা আর দেশ নিয়ে অনেক গল্প করতাম। একদম স্বতস্ফূর্ত বাংলায়। অথবা ওদের বাংলার বিষয়গুলোকেও বেশ সহজ করে গল্পের মত করেই বুঝিয়ে দিতাম। এটা অনেক কাজে লেগেছিলো।
সেই সময় আমি চন্দ্রিলের বেশ ভক্ত ছিলাম। তখন সদ্যই হাতে এসেছিলো চন্দ্রবিন্দুর এলবাম- ত্বকের যত্ন নিন। খুব মজার আর সুন্দর সব গান। একটা গানের নাম ছিলো- বাথরুম। একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের এক সকালের গল্প। যেখানে ছোট এক ছেলের খুব বাথরুম চেপে যায়, কিন্তু থার্ড পিরিয়ডে বাথরুমে যাবার নিয়ম নেই বলে টিচার তাকে কিছুতেই যেতে দিচ্ছে না।

এই দারুন মজার গানটা আমি দুজনকেই শোনালাম।
খুব মজা পেয়ে গেলো ওরা। এই এলবামের অন্য গানগুলোও শুনতে বেশ উৎসাহ দিলাম। ওরা ক্রমশ বাংলা গান শুনতে চাইছে- এই পরিবর্তনটাই তখন বেশ আনন্দদায়ক ছিলো।

বাংলা পড়বার অভ্যেসের জন্যে অনেক ভেবে চিন্তে দু'জনের হাতে তুলে দিলাম সত্যজিৎ রায়ের বই। আমার মনে হচ্ছিলো- এই বয়সের মানসিকতার জন্যে সত্যজিৎই সবচে ভালো সংগী হতে পারবেন।
আমি গল্প বেছে বেছে দিতাম ওদের, পড়বার উৎসাহ দিতাম অনেক। ওরাও বেশ মজা পেয়ে গিয়েছিলো।
আরো মজার ব্যপার হলো- এদের একজন গান শুনতে আগ্রহ পেত বেশি, আর অন্যজন বই পড়তে।
সব মিলিয়ে বছর দুয়েক পড়িয়েছিলাম আমি ওদের। বাংলায় দু'জনের কেউই 'খারাপ' ছিলো না আর।
ওরা বাংলা গান শুনতো, বই পড়তো, সে সব নিয়ে আমার সাথে আলোচনাও করতো! পরীক্ষার খাতায় নম্বরও আসতো বেশ ভালো। একুশ নিয়ে জানতো, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলতো, বাংলাদেশের জার্সি পরে টিভিতে খেলা দেখতে বসতো।

পুনশ্চঃ
একদিন পড়াতে গিয়েছি; আমার ছাত্র চকচকে চোখে এসে আমাকে বলছে, 'ভাইয়া, বিরাট জিনিস জোগাড় করে ফেলেছি!'
আমি বললাম, 'কি?'
ও তার কম্পিউটার খুলে দেখালো- তখন পর্যন্ত বের হওয়া চন্দ্রবিন্দুর সবগুলো এলবামের গান একটা ফোল্ডারে।
আমাকে বলে, ' সব শুনে ফেলবো! আর কার কার গান শোনা যায় বলুনতো?"

পুনশ্চ ২:
আমার অন্য ছাত্রের অবস্থাও তথৈবচ। ওর মা এসে একদিন আমাকে বললেন, 'আজ বইমেলায় গিয়ে ও ঘুরে ঘুরে সত্যজিতের সব কালেকশন কিনে ফেললো। ফেলুদা, প্রোফেসর শংকু- সব।'
বেচারা নিজে এসে আমাকে বলতে বেশ লজ্জা পাচ্ছিলো। আন্টির কথার পরে এক এক করে সবগুলো বই এনে আমাকে উল্টে পালটে দেখালো।
নতুন বই পেলেই আমি নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুঁকি। তাই করতে করতে আমি অনেক কিছু ভাবছিলাম সেদিন।

ঠিকঠাক পরিবেশ আর যত্ন পেলে মানুষের মধ্যে পরিবর্তন আনা যায়- এটা বুঝেছিলাম বেশ ভালমতন।
আরো বুঝেছিলাম- ভালোবাসাকেও মাঝে মাঝে হাতের আঙুল ধরে পথ চলা শুরু করিয়ে দিতে হয়- সেটা দেশের জন্যেই হোক কি ভাষার প্রতি।