শুক্রবার, নভেম্বর ৩০, ২০০৭

বেল পাকিলে কাকের কী?




দৃশ্যত কোন লাভ নেই, কিছু যায় ও আসে না, তবু বেল গাছে বাসা বেঁধেছি কদিনের জন্যে, তাই বেল পাকার খবর নিই আর কি!
ঘটনা হল এই, জন হাওয়ার্ড হেরে গেছে। লেবার পার্টির কেভিন রাড আজ থেকে অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী।

প্রায় মাস ছয়েকের বেশীদিন ধরে নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের সমাপ্তি ঘটলো আজ। আমি অবশ্য তেমন টের টুর পাই নি। আমাদের দেশের মতন নির্বাচনটা এখানে উৎসবে রূপান্তরিত হতে পারে নি। এ দেশের লোকজন নির্বাচন নিয়ে আদৌ কতটুকু সিরিয়াস, সেটা নিয়েও আমার কিঞ্চিত সন্দেহ আছে। আজ হাতে গুনে চারজন আমাকে এসে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা, আশপাশে ভোট কোথায় নেয়া হচ্ছে বলতে পারো? আমার ভোটটা এখনো দেয়া হয় নি!

পত্রিকাগুলো অবশ্য আগেই ভবিষ্যৎবানী করেছিলো, কেভিন জিতে যাবে। নানা রকম জরিপ টরিপ করে তারপরেই এইসব আগাম ঘোষনা দেয়া হয়, তাই এসবের উপরে নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করা যায়। একেবারে শেষমুহুর্তে অবশ্য বেশ জমে উঠেছিলো। হাওয়ার্ডকে বুড়ো বলে বাতিলের চেষ্টা ছিলো শুরু থেকেই। লেবার পার্টি এই নিয়ে কম প্রচারণা চালায় নি। কেভিন সেদিক দিয়ে বেশ এগিয়ে ছিলো। অবশ্য অল্পকদিন আগে প্রচার পাওয়া একটা ভিডিও খানিকটা গোলমালে ফেলে দিয়েছিলো। বেশ আগের একটা ভিডিও ওটা, যেটার কোন এক অংশে দেখা যায়, প্রায় অস্পষ্ট কেভিন রাড বক্তৃতা শুনতে শুনতে আনমনে কানের ময়লা খুটে মুখে দিয়ে বসেছেন!

তো শেষমশষ হাওয়ার্ডের কপালে শিকে ছিড়লো না। আজকে রাতের খবরে শুনলাম, ভদ্রলোক নাকি নিজের আসনটিও হেরে বসেছেন প্রতিপক্ষের কাছে! এ কথা শুনেই আমার মুরালিধরণের কথা মনে পড়ে গেলো। ড্যারিল হার্পারের সাথে গলা মিলিয়ে স্টেডিয়ামের বাইরে থেকে মুরালিকে চাকার ডাকা লোকেদের মাঝে হাওয়ার্ডও ছিলো যে!

লোকজনের মাঝে এখনো মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখলাম। আধ-বুড়ো এক ভদ্রলোক বেশ বেজার মুখ করে আমাকে ইলেকশানের ফল জানালো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি খুশি নও? বললো, নাহ মাইট, একটা হ্যারি পটার আমাদের দেশটা চালাক, তুমি কি তাই চাও?
আমি একবার চোখ বুজে ভাবলাম, ঠিকই বলেছে, কেভিন রাডকে নিয়ে খানিকটা ক্যারিকেচার করলে পটারের মতই লাগবে বটে।
বুড়োর পাশেই দেখি এক ছিমছিমে রূপসী দাঁড়ানো, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কি অবস্থা?
বুড়োর দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে স্মিত হাসিতে জানালো, আমি খুব খুশি, তুমি?
আমি? আমি চিরকাল সুন্দরের পূজারী, তাঁকে দুঃখ দিই কেমনে? বেল আর কাকের প্রবাদ মুহুর্তেই ভুলে গিয়ে বললাম, ইয়াপ, আমিও খুশ!

মঙ্গলবার, নভেম্বর ২০, ২০০৭

প্রিয় সঞ্জীব চৌধুরী


তো যেরকমটা হয়, এভাবেই মৃত্যু এসে হাত ধরে ডেকে নিয়ে যায় জেলে নৌকার মাঝিদের।
আউলা চুলের কাঁধে গামছা মাঝি, চান্নি রাতে গলায় জোয়ার উঠে, আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিলো চাঁদ।
আমরা অন্ধ হই, নিঃস হই, বধির হই। আমাদেরই চোখের সামনে মৃত্যু এসে হাতছানি দেয়, মাঝি চলে যায়।
দোলে ভাটিয়ালি, এ নদী রূপালী, ঢেউয়ের তালে নৌকা বাজাও...
নদী দোলে, ঢেউ দোলে, ঢেউয়ের তালে আপনমনে দিগবিদিক নৌকা ভেসে যায়।
মাঝি নেই হায়, নৌকাও আর বাজে না।

সোমবার, নভেম্বর ১২, ২০০৭

না চাহিলে যারে পাওয়া যায়...

১।
আমায় এমন পাগল করে আকাশ থেকে মধ্য রাতে নামলে কেন,
নামলে যদি মধ্যরাতেই, চোখের দেখা না ফুরাতেই থামলে কেন?

মাঝরাতের ঝুম ঝুম বৃষ্টি নিয়ে দেখা যাচ্ছে বাংলা সাহিত্যের তিন দিকপালই নানা কিছু ভেবেছেন। এক হলেন আমাদের ট্যাগোর আংকেল, তিনি লিখে গেছেন, আমার নিশীথ রাতের বাদল ধারা, এসো হে গোপনে...। তারপরে আছেন ডাকাত-কবি, মানে নির্মলেন্দু গুণ, কি অসাধারণ সব পংক্তি, নামতে তোমায় কে বলেছে, মেঘে মেঘে মেঘ গলেছে, অন্ধকারে।
আর তৃতীয়জন হলাম এই আমি। এখনো কিছু লিখিনি অবশ্য, তবে ইদানিং রাত বিরেতের বৃষ্টিটাকে যে হারে মিস করা শুরু করেছি, খুব শীঘ্রই যে একটা কিছু লিখে ফেলবো, সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই।

২।
লাল কমলা আর গোলাপী, তিনটে রংকেই আমি লাল বলে চালিয়ে দিই। ফিরোজা, সবুজ, কলাপাতা অথবা লেবু- সবই আমার কাছে সবুজ। দুর্জনে আমাকে কালার-ব্লাইন্ড বললে দোষাই কেমনে?
আমি অবশ্য দাবি করি, কালার ব্লাইন্ড নয়, বড়জোর আমাকে কালার-ডাম্ব বলা যেতে পারে। রঙ টং যে চিনি না তাতো নয়। চিনি ঠিকঠাক, তবে বলবার কষ্টটুকু করতে ইচ্ছে করে না আর কি! সে জন্যে ব্লাইন্ড হতে রাজি নই, বড়জোর ডাম্ব হওয়া চলে!

৩।
ভেবে দেখলাম, এই পোড়ার দেশের লোকেরা একেবারে পাকাপাকি সিজন-ব্লাইন্ড!
খুব সুন্দর একটা আবহাওয়া এখন। খুব গরমও নয়, ঠান্ডাও নয়। আকাশটা ঠিক শরতের মতন ঝকঝকে থাকে সারাক্ষণ। মেলবোর্ণের ঠিক মাঝবরাবর 'ইয়ারা' নামে একটা ছোট্ট খাল বয়ে গেছে এধার ওধার। এটাকেই 'ও নদী রে...' বলে গলা কাঁপিয়ে ডাকাডাকি করে কতই না আদিখ্যেতা এদের। আমি দেখে ভাবি, ব্যাটা দেখে যা একবার আমাদের গোমতী, কিংবা ডাকাতিয়া নদীটারে, বুঝবি তবে নদীর মজা!
যেটা বলছিলাম, এই সুন্দর সময়টার জন্যে একটা সুন্দর ইংরেজি নামও আছে, অটাম। কিন্তু কই, এই নামে কেউ ডাকে নাতো এখানে! একদম গোয়ারের মতন ঘাড় বেঁকিয়ে শুধু দুটা জিনিসই জানে তারা, সামার আর উইন্টার। মাঝামাঝি আর কিছু না!
ছয়টি ঋতু ছয়টি পাখি হয়ে এই দেশে এসে শুধু দুইটি সুরেই ডাকাডাকি করে যেন। বাকি সুর সব ভুল হয়ে গেছে!

৪।
কার্জন হলে ক্লাশ শেষ করে যখন বের হতাম, ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের সিঁড়ি বেয়ে নামলেই একদম অট্টাশ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়তাম। লাল লাল আগুনরঙা কৃষ্ণচূড়া দেখে লম্বা সময় নড়চড়ের কোন উপায় ছিল না একদম। চন্দ্রাহত অনেকেই হয় বলে শুনেছি, আমার ধারণা, খুঁজে দেখলে আমার মতন আরো দুয়েকজন কৃষ্ণচূড়াহতর খোঁজ পাওয়া মুশকিল হবে না।

৫।
গত কদিন ধরে ঐ ইয়ারা নদীর পাড়ে আমার আসা যাওয়া বেড়ে গেছে। শরতের আকাশ দেখে আশা জাগে মনে, দুয়েকটা কাশফুল কি চোখে পড়বে না? পড়ে না শেষমেষ।
কদিন আগে লংড্রাইভে ঘুরে আসা হলো অনেকদূর। চারপাশে গাছপালার জংগলের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া, কিন্তু কোথাও শিমুল নেই, কৃষ্ণচূড়া নেই। তেপান্তরের সাইজের মাঠ একেকটা, কিন্তু তার কোনটাই ধানক্ষেত নয়, হলদে পাখির মতন সরিষা ক্ষেতও নয়।

রবীন্দ্রনাথ নেই, নির্মলেন্দু নেই, মাঝরাতের ক্ষণস্থায়ী বৃষ্টি নেই, নিশীথ রাতের বাদল ধারা নেই...। এত সব নেই-এর মাঝে আমি কি নিয়ে যে বেঁচে আছি, পান চিবুনো বুড়ো মানুষদের মতন বসে বসে আমি তা-ই এখন ভাবছি!

চুলোচুলি

প্রতিবার চুল কাটাতে গিয়ে যখন সেলুনের চেয়ারে বসি, হাসিমুখে প্রশ্ন শুনি, কিভাবে কাটাবেন? আমি তখন ভীষণ বিপদে পড়ে যাই।

আমি আলাভোলা মানুষ নই। যদিও রঙ চং পছন্দ করি না, শুধু খানিকটা পরিপাটী থাকি। তবে সেই পরিপাটীত্বের সিলেবাসে আমার চুল নেই। চুলের জন্যে এমনকি চিরুনিও একটা বিলাসিতা যেন আমার কাছে, গোসলের পরে দু হাতের দশটা আঙুল দিয়েই কাজ চলে যায়। আলাদা ভাবে কখনোই ভাবা হয় না তাই চুলের চেহারা বা নক্সা কেমন হবে। আর সে জন্যেই প্রতিবার চুল কাটাতে গেলে কিভাবে কাটাবো, এই বহু পুরাতন প্রশ্নে আমি বারবারই নতুন করে বিপদে পড়ি।

কপালের ওপরে চুলের শেষ সীমানায় আমার একটা লুকোনো ঘূর্ণি আছে। চুল ছোট রাখি বলে বুঝা যায় না। ব্যাপারটা জিনেটিক, সন্দেহ নাই, কারণ আমার বাবা আর ভাইয়ের মাথায় ঘূর্ণিগুলো স্পষ্ট। আমারো চুল খানিকটা বড় হলেই এই ঘূর্ণির কল্যাণে চুলে নানারকম ঢেউ খেলে যায়। এই ব্যাপারটা এড়ানোর জন্যে ছোটবেলা থেকেই সিঁথি করি ডানদিকে, ঐ ঘূর্ণির অনুকুলে। মাথায় চুল খানিকটা বড় হলেই আমার তাই অস্থির লাগা শুরু হয়। গত কদিন যেমন হচ্ছিল, ঘাড়ের কাছে আর কানের ওপরে চুলবুল করছিলো, বুঝছিলাম সময় ঘনিয়েছে। আরও নিশ্চিত হলাম যখন আমার সহকর্মী পাঞ্জাবী ছেলেটা অবলীলায় আমার আঁকাবাঁকা চুল দেখে ঘোষণা দিয়ে বসলো, তোমাকে একদম অমিতাভ-যুগের সিনেমাগুলোর ভিলেনের মত লাগছে!

আমি সেদিনই সেলুনে দৌড়ালাম। এবং গিয়ে সেই পরিচিত প্রশ্নের উত্তরে বললাম প্রায় দেড় যুগের অভ্যাসে তৈরি হওয়া উত্তর, পেছনে আর দু'পাশে অনেক ছোট, আর সামনে অল্প ছোট।
হু, এটাই আমার এক ও অদ্বিতীয় চুলের কাট।

আমার জন্যে অবশ্য এই অভ্যাসটা কখনোই কষ্টকর হয়ে ওঠে নি। বরং সেভেনে উঠে যখন হস্টেলে চলে গেলাম, সেখানে নিয়ম ছিলো, মাসে দু'বার মাথায় বাটি বসিয়ে চুল ছেটে ফেলা হবে। সত্যি সত্যিই বাটি বসানো হতো না অবশ্য। তবে কলেজ থেকে ঠিক করে দেয়া নাপিতদের হাতের দক্ষতা ছিলো ঈর্ষণীয়। বাটি না বসিয়েই তারা মাথার চারপাশে ঠিক সেরকম একটা ছাঁট করে দিতে পারতো।

জুনিয়র ক্লাশে থাকতে সেসব নিয়ে আমাদের আপত্তি ছিলো না, আপত্তির সুযোগও ছিলো না অবশ্য। তবে খানিকটা সিনিয়র হবার পরেই আমাদের মধ্যে চেষ্টা ছিলো, চুল কেমন করে খানিকটা বড় রাখা যায়। ছুটি শেষে কলেজে ফিরবার সময় কর্তৃপক্ষকে লুকিয়ে কিছু টাকা নেয়া হতো, তার একটা অংশ অবশ্যই বরাদ্দ থাকতো সেই নাপিতের জন্যে।
সরকারী কর্মচারীকে ঘুষ দেয়ার অভ্যাসটা অনেকে ছোটবেলায়ই রপ্ত করে ফেলেছিলাম আমরা!
মাঝে মাঝে টাকা পয়সার টানাটানি থাকলে শ্যাম্পুর বোতল অথবা আধ-ব্যবহৃত আফটার শেভ দিয়েও কাজ চলে যেত।

আরেকটু বড় ক্লাশে উঠার পরে আমরা আরো বেশি সাহসী হয়ে উঠেছিলাম। আমাদের ক্লাশের দুজন কেমন করে যেন এক ছুটিতে বাসায় গিয়ে চুল কাটাবার ট্রেনিং নিয়ে এলো। ব্যস, তখন আর আমাদের পায় কে? লুকিয়ে চুরিয়ে একটা চুল কাটাবার মেশিনও চলে এলো। তারপর থেকে চুল কাটাবার সময় এলে আমরা নিজেরা আলাদা একটা রুমে ঐ দুই বন্ধুর হাতেই চুল কাটিয়ে ফেলতাম।

সবসময়েই যে পার পেয়ে যেতাম এমন নয়, তবে যে কবার যেতাম, সেটুকুই লাভ ছিলো!
ঐ ছয়বছরে আমাদের চুল কাটা নিয়ে হাজারখানেক আনন্দ বেদনার স্মৃতি, লিখতে গেলে মহাকাব্য হয়ে যাবে নির্ঘাৎ।

চুলের প্রতি অবহেলার অভ্যাসটা পাকাপোক্ত হয়ে উঠেছিলো সেই সময়েই। হোষ্টেলে যাবার সময় আর সব জিনিসের সাথে একটা চিরুনীও কিনতে হয়েছিলো মনে আছে, কিন্তু ছ'বছর শেষ করে যখন চলে আসি ওখান থেকে, তখনও সেই চিরুনী ছিলো নতুনের মতই ঝকঝকে!

চুল নিয়ে সর্বশেষ কান্ড ঘটলো বছরখানেক আগে।
এক সপ্তাহ পরেই আমার বিয়ে। হবু বউ চুল নিয়ে আমার উদাসীনতা বিষয়ে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল। তাই বিবাহ-পূর্ব চুল কাটানোর যখন প্রয়োজন দেখা দিলো, আমি পাড়ার মোড়ের কোন সেলুনটা সবচেয়ে দ্রুত এই ঝামেলা শেষ করে সেই খোঁজ নেয়া শুরু করলাম, কিন্তু আমার হবু বউ জানালো, অসম্ভব, এবারের চুল কাটাতে হবে হাবিব পারসোনায়, এবং তার অত্বাবধায়নে থাকবেন কর্ত্রী স্বয়ং!
মূর্খ আমি, হাবিব শুনেই বুঝি এক হাবিবুল বাশার। সে বেচারার চুল কি রকম থাকে মনে করতে পারলাম না, তার নাম দিয়ে বানানো সেলুন কেমন হবে? কিন্তু এ কথা আর বাড়ানো গেল না, তার আগেই বউয়ের ঝাড়ির সহযোগে আমি জেনে গেলাম, এই হাবিব হাবিবুল নয়, আরো হাবিব আছে।
তো গেলাম চুল কাটাতে। ওদের ঝকমকি চেহারা দেখেই বুঝে গেছি, লম্বা সময় আমাকে নাপিতের ছুরির নিচে মাথা পেতে রাখতে হবে। দীর্ঘশ্বাস গোপন রেখে অবশেষে বসলাম চেয়ারে। আর তারপরে শুনলাম সেই অমোঘ প্রশ্ন, কিভাবে কাটাবেন?
আমি আমতা আমতা করে কিছু বলবার আগেই দেখি আমার বউ এসে হাজির। উনি আধা-গম্ভীর আধা-হাসি মুখে যেই নির্দেশনা দিলেন, তাতে আমার আক্কেলগুড়ুম! কোথায় কিভাবে কেমন কাট হবে, তার উপসংহার টানা হলো এভাবে, ' মানে, স্বদেশ সিনেমায় শাহরুখ খানের যেমন কাট ছিলো, সেরকম আর কি!'

আমি লজ্জায় চেয়ারের সাথে মিশে গেলাম প্রায়। কিন্তু আমার বউ দেখি একেবারে নির্লিপ্ত, এমনকি ওই নাপিত সাহেবও। বুঝলাম, এইরকম উচ্চাভিলাসী নির্দেশ তারা গরবিনী হবু-বউদের কাছ থেকে নিয়মিতই পান।
চুল কাটা শুরু হলো। এত ধীর তার গতি আর এত মোলায়েম স্পর্শ যে অচিরেই আমি ঝিমুনিতে আক্রান্ত হলাম। লম্বা সময় বাদে যখন একটা প্রায় সফল ঘুম শেষ করে এনেছি, তখন জানলাম আমার চুল কাটাও শেষ। নাপিত আর হবু বউয়ের মুখের বিস্তৃত হাসি দেখেই বুঝলাম ব্যাপারটা তাদের একদম মন মত হয়েছে। তাই হোক, আমার এত মাথাব্যাথা নেই, শেষ হলেই আমি খুশি।
আয়নার দিকে আমার কেমন জানি একটু সন্দেহ হলো। না, ঠিকই আছে, পুরোনো সিনেমার ভিলেন থেকে আমি রাতারাতি শাহরুখ খান হয়ে যাই নি, তবে কোথাও কি যেন গোলমাল আছে। ঠিক ধরতে পারছি না।
ভালো করে তাকাতেই হঠাৎ টের পেলাম, কি সাঙ্ঘাতিক, ব্যাটা আমার সিঁথি বদলে দিয়েছে!! ডানের বদলে বাম দিকে জ্বলজ্বল করছে সিঁথি!
আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। এটা কোন কথা? আরে একবার আমাকে জিজ্ঞেসতো করবি?
আমি কড়া গলায় জানালাম, কেন এরকম হলো? নাপিত সাহেব মিনমিন করে কি যেন বললেন, আমার কানে গেলো না। আমি রাগে ফুঁসছি। বউ অবশ্য খুশি, চুলের নকশা তার পছন্দ হয়েছে, সে-ই আমাকে টেনে নিয়ে এলো।

লিফটে করে নীচে নামা পর্যন্ত দাঁত মুখ খিচে অপেক্ষা করলাম। সিএনজি ট্যাক্সি ডাকতে ডাকতে যেটুকু সময় লাগে, ওটায় চড়ে বসে আর দেরি করলাম না। 'ধ্যুত্তোর নিকুচি করি' - এই বলে দুহাতের আঙুল ঘ্যাচ ঘ্যাচ করে চালিয়ে প্রায় ঘন্টাখানেকের শিল্পের বারোটা বাজিয়ে দিলাম। দশ সেকেন্ডের চেষ্টায়ই আমার চির অনুগত চুল কথা শুনলো, সিঁথি ডানদিকে চলে এলো নিমেষেই!
পাশে বসা আমার হবু বউ আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে, তার চোখে কিং খানকে হারানোর বেদনা!
'আমি নিজেও খুব দুঃখিত'- মুখে এরকম একটা ভাব এনে তাকে বোঝাতে বোঝাতে চললাম। আর খানিক বাদে বাদেই আড়চোখে ট্যাক্সির রিয়ার ভিউ মিররের দিকে তাকিয়ে সেই চিরচেনা ডান দিকে সিঁথিওয়ালা আমাকে দেখতে পেয়ে মনে মনে বলছিলাম, আহ, কি শান্তি!

মঙ্গলবার, নভেম্বর ০৬, ২০০৭

এখানে একা নাকি?



একলা নারীরা পৃথিবীর কোথাও নিরাপদ নয়।
হোক সেটা ঢাকা, কি মেলবোর্ণ।

অথবা হোক সেটা সত্যিকারের রমণী, অথবা তার ছবি, এমনকি কাঠের বুকে খোদাই করা কোন নারী-মূর্তি!

এবারের ঈদের দিন তোলা ছবি। মূল শহর থেকে অনেক দূরের একটা বন আর গাছ-গাছালি ঘেরা পিকনিক স্পটে ঘুরতে গিয়েছিলাম।
সেখানের নির্জন একটা জায়গায় এই টয়লেট সাইন খুঁজে পেলাম। পাশের পুরুষ মূর্তির তীব্র চাহনিকে উপেক্ষা করেই বেচারীর ওপর অত্যাচার চালানো হয়েছে।

আমি অবশ্য অবাক হয়েছি পুরুষ মুর্তিটির গায়ে একটাও আচড়ের দাগ না দেখে! ব্যাটা নির্ঘাৎ কাপুরুষ, সঙ্গিনীকে একবারও নিশ্চয় বাঁচাতে যায় নি!
সেলুকাস!

রবিবার, নভেম্বর ০৪, ২০০৭

খাবি দাবি কলকলাবি

পেট দেখে ইদানীং আমাকে পেটুক বলে চেনা গেলেও, ছেলেবেলায় কিন্তু আমি এরকম ছিলাম না। এরকম, মানে যে পেটুক ছিলাম না, ব্যাপারটা তা নয়। সেটা ছিলাম ঠিকই, তবে পেটের আকৃতি তখনো দ্রষ্টব্য কিছু হয়ে ওঠে নি আমার।

বাসায় আমার যন্ত্রণায় বিস্কুট চানাচুর ঠিক জায়গায় রাখবার উপায় ছিলো না। নানা জায়গায় লুকিয়ে রাখতে হতো। তবে কিছুতেই আমাকে দমিয়ে রাখা যেত না। আমি খুঁজে টুজে বের করে, তাদের সবচেয়ে সঠিক জায়গায়, মানে আমার পেটের ভেতরে নির্দ্বিধায় চালান করে দিতাম। মাঝে মাঝে দু'এক পদের বিস্কুট যদিওবা লুকিয়ে রাখতে পারতো, কিন্তু আমিও তক্কে তক্কে থাকতাম। মেহমান বাসায় এলেই আমি খুশিতে বাগডুম। এ বারতো লুকোনো বিস্কুট বের করতে হবেই! এবং তাই হতো। মেহমানদের দেবার জন্যে লুকোনো ভান্ডার থেকে বের করা হতো সেসব। আর আমি শুধু ঘড়ি দেখতাম কখন তারা বিদায় নেবে। এবং যখন সত্যিই ওরা চলে যেত, বিস্কুট চানাচুর আবারো লুকোবার আগেই আক্ষরিক অর্থেই ঝাপিয়ে পড়তাম সেসবের উপরে।

এই খাদ্যপ্রীতি যে কেবল নিজের বাসায় বলবৎ ছিলো তা নয়। পরিচিত আত্মীয়দের বাসায় যাবার ব্যাপারেও আমি বাছ-বিচার চালাতাম। কোন বাসায় গেলে কোন মানের বিস্কুট খেতে দিবে, মনে মনে সে বিষয়ে আমার জরিপ চালানো হয়ে গিয়েছিলো বহু আগেই। তাই বেড়াতে যাওয়ার কথা শুনলে আমি আগে সেটা মিলিয়ে নিতাম, পূর্ব ইতিহাস সন্তোষজনক হলেই কেবল 'যাবো' বলে মত দিতাম। নইলে, আমাকে ধরে বেঁধেও কেউ ওখানে নিয়ে যেতে পারতো না!

সেই সময় সুপার বিস্কুট নামের একপ্রকার বিস্কুটের খুব প্রচলন ছিলো। আকারে ছোট, গোল গোল, স্বাদে মাঝামাঝি, সর্বোপরি দাম কম এবং প্লেটে রাখলে একসাথে 'অনেক' বিস্কুটের একটা দৃষ্টিঘটিত আবেদন ছিল তার, কিন্তু আমার খেতে একদমই ভাল লাগতো না।
তো ঘটনা হচ্ছে, আমাদের আত্মীয় পরিধির একটা বাসায় এই বিস্কুটের খুব চল ছিলো। ছোট ছিলাম বিধায় নানুর সাথে তাঁর আঙুল ধরে আমাকে আত্মীয়দের বাসায় বিচরণ করতে হতো। নানা স্বাদের নানা বিস্কুটের অমোঘ আকর্ষণে আমার সেসব বাসায় যেতে খারাপ লাগতো না অবশ্যই। কিন্তু সেই সুপার বিস্কুট-অলা বাসার প্রতি আমার খানিকটা বিরাগ ছিলো। একদিন বা দুদিন নয়, এরকম বেশ কয়েকদিন হলো যে ওখানে গেলাম আর আমাকে খেতে দেয়া হলো সুপার বিস্কুট। আমি সেগুলোর ওপরে বিষদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বসে থাকি। সেই আত্মীয়দের নিদারুন নির্মমতায় আমি অবাক আর পীড়িত হই, খানিকটা ভাল মানের বিস্কিটও এরা আনতে পারে না!

তেমনি একদিন, সেই সুপার বিস্কুট-অলা বাসায় অনেকক্ষণ কাটিয়ে দেবার পর, আমার মন ততক্ষণে তিতিবিরক্ত। বেশ কয়েকবার নানুর হাত ধরে ঝাঁকুনি দেয়ার পরে বিদায় নিবো যখন, তখন সে বাড়ির লোকজন বিদায় সম্ভাষন জানালো আমাদের। পিচ্চি ছিলাম বিধায়, কেউ একজন আমার থুতনিতে আদর করে বললো, আবার এসো আমাদের বাসায়।
এই কথা শুনে আমার মনের ভেতর জমা অভিমান খানিকটা উস্কে উঠলো। আমি কি ভেবে সরোষে বলে উঠলাম, নাহ, আপনাদের বাসায় আর আসবো না।
নানু অবাক। এবং ওই বাসার বাকি সবাইও। জিজ্ঞেস করলো, কেন কেন?
আমি তৎক্ষনাৎ বোম ফাটালাম, কেন আসবো? এলেই খালি সুপার বিস্কুট খেতে দ্যান! ভাল বিস্কুট দিতে পারেন না?

পরবর্তী সময়ে কি হয়েছিল জানি না। অপ্রস্তুত ভঙিতে খানিকটা হাসাহাসির কথা মনে পড়ে। কিন্তু আমার সেই অগ্নুৎপাত সেই বাড়ির বহুদিনের সুপার বিস্কুটীয় ঐতিহ্য ভাঙতে পেরেছিলো কিনা এতদিন পরে আজ আর সে কথা মনে নেই।

অবশেষে...

তাই হচ্ছে। একদম পার পেয়ে যাচ্ছে না বোধহয় ব্যাটারা।
মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডাররা একসাথে হয়েছেন। দেশের সবচেয়ে জরুরি মুহুর্তে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, এখন আবার সেই সময় এসেছে।
ডিসেম্বরের ৩ তারিখে মিটিং ডাকা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে।
সব মিলিয়ে দীর্ঘ প্রস্তুতির ব্যাপার।
সবকিছু ভালোয় ভালোয় হলেই হলো।