বৃহস্পতিবার, জুলাই ১২, ২০১৮

শাহাদুজ্জামান-এর উপন্যাস 'একজন কমলালেবু'-

কিছু বিষাদ হলো পাখি। সম্ভবত প্রতিটি বাঙালি কিশোরের প্রথম ঈশ্বর দর্শন হয় জীবনানন্দের কবিতা পড়ে। 
বছর কুড়ি বা তারও বেশি আগে, কোন এক মেঘলা মফস্বলের চুপচাপ দুপুরে, প্রায় হঠাতই হাতে আসা নিউজপ্রিন্টের দুর্বল কাগজে ছাপা একটা বইয়ের ভেতর আমি প্রথম চোখ মেলে দেখি, সেখানে অলস গেঁয়োর মত এক টুকরো ভোরের রোদ মাথা পেতে শুয়ে আছে ধানের উপরে। একটা ইগনরেন্ট দানবের মত অবহেলাভরে সেই যে জীবনানন্দ আমাকে ছুঁয়ে দিলেন, সেই ঘোর আমার আজও কাটেনি, মনে প্রাণে চাই, কখনও যেন না কাটে। আকাশের ওপারে আকাশ ভেসে বেড়ায় যার হাতে, হৃদয়ের আদিগন্ত জুড়ে ঝুলে থাকে যে এক বিপন্ন বিস্ময়, এই নোংরা পৃথিবীকে অবলীলায় যিনি মায়াবী পারের দেশ বলে ঘোষণা দিতে পারেন, তাঁর চেয়ে অপার্থিব চোখ কারও নেই, জানি, তাঁর চেয়ে বেশি পার্থিব আর কোন মানুষের হবার সম্ভাবনা নেই, তাও জানি।

শাহাদুজ্জামানের লেখা ‘একজন কমলালেবু’ যেন একটা নিঃসঙ্গ সেতারের বাজনা। খুব ভালো লেগেছে বইটি পড়ে। একটা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তিনি জীবনানন্দকে বইয়ের পৃষ্ঠায় বিছিয়ে দেবার চেষ্টা করেছেন, তবু এটি পড়তে গিয়ে সারাক্ষণ বুকের ভেতরে একটা কষ্ট দম চেপে আটকে ছিল ঠিক গলার নিচটায়। কিছু কিছু সিনেমা দেখি আমরা, কিছু বই পড়ি, যেখানে নায়কের দুঃখ দুর্দশা আমাদের মন ভিজিয়ে দেয়, আমরা আন্দোলিত হই, কিন্তু সেই সাথে মনের ভেতরে এ-ও জানি যে এটা সাময়িক, খুব শীঘ্রই তার দেখা হয়ে যাবে কোন রূপবতী নায়িকার সাথে, অথবা পেয়ে যাবে কোন মোটা বেতনের চাকরি। এই সুখময় যবনিকার সম্ভাবনা আমাদেরকে নিষ্কৃতি দেয় সেই মন খারাপ থেকে। কিন্তু, একজন কমলালেবু-তে সেটার কোন উপায় নেই। একটা হতাভাগা জীবনানন্দের কাহিনী আমরা সেখানে পড়ি, যার শেষমেশ সিনেমার নায়ক হয়ে ওঠা হয় না। প্রতি পৃষ্ঠা ওলটাতে হয় এটা জেনেই যে, এই কষ্টানুভুতি থেকে কোন নিস্তার নেই, কখনও মিলবে না। 
নানা ভাবে জীবনানন্দকে জানা যায় এখানে। তাঁর প্রথম কবিতা, বরিশালের জীবন, সমসাময়িক শিল্পাঙ্গনের মানুষদের অবহেলা...। তাঁর নগণ্য সংখ্যক বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করি নানা সময়ে। কিন্তু সর্বোপরি, খুব কষ্ট হয় সেই মানুষটার জন্যে। কবিতারা কেমন ভুতের আছর হয়ে নেমেছিল তাঁর ওপরে। সেই যন্ত্রণা মাথায় নিয়ে একটা পুরো জীবন তিনি কাটিয়ে দিলেন। পরের এক শতকে অগণিত মানুষের মনের প্রভুত্ব রইবে যার হাতে, সেই মানুষটি তবু মন পেলেন না একজন শোভনার। কিছু কবিতাহত মানুষের সবচেয়ে আপনজন যিনি, তিনি তবু আপন হয়ে উঠতে পারলেন না একজন লাবণ্যর। 
অনেকগুলো কবিতার প্রেক্ষাপট জানা হলো বইটির মাধ্যমে। আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে। কবিতার পাশে সেগুলোকে বসিয়ে তাকাই যখন, কবির প্রতি মায়া বেড়ে যায় আরও। কবির জীবনকে খণ্ড খণ্ড দৃশ্যাবলীর সমন্বয়ে একটা চলচ্চিত্রের মত করে দেখার চেষ্টা যেন। শাহাদুজ্জামান সফল হয়েছেন তাতে। এর চেয়ে তথ্যবহুল জীবনী হয়তো পাওয়া যাবে খুঁজলে, কিন্তু এই বইটিতে লেখকের আন্তরিকতাটুকু অনন্য। 
‘একজন কমলালেবু’ বইটি পড়া শেষ হলে আমরা দেখি অসীম প্রতিভাবান কিন্তু আদ্যোপান্ত এক ব্যর্থ ও হতাশ মানুষকে। সুখ নামের জটিল হিসাবকে যিনি মিলিয়ে উঠতে পারেননি। যার কলম থেকে ঝরনাধারার মত ঝরে ঝরে পড়ে ভালোবাসা, কিন্তু কী রুঢ় একটা ভালবাসাহীন জীবন তিনি যাপন করে চলে গেলেন একটা অথর্ব অভিমান নিয়ে। 
তবু পৃথিবীর প্যারাডক্স এই, প্রিয় জীবনানন্দ, আমি তবু আজীবন আপনার লেখা আমার প্রিয়তম কবিতাটিকেই করে নিবো অবারিত আলোর উৎস।  
“ এখন রজনীগন্ধা-প্রথম-নতুন-/ একটি নক্ষত্র শুধু বিকেলের সমস্ত আকাশে;/ অন্ধকার ভালো বলে শান্ত পৃথিবীর/ আলো নিভে আসে।
অনেক কাজের পরে এইখানে থেমে থাকা ভালো;/ রজনীগন্ধার ফুলে মৌমাছির কাছে;/ কেউ নেই, কিছু নেই, তবু মুখোমুখি / এক আশাতীত ফুল আছে।” 
( শব্দ কৃতজ্ঞতাঃ মেঘদল, শাহাদুজ্জামান এবং জীবনানন্দ)