সোমবার, ফেব্রুয়ারী ২৭, ২০১২

মেহেদী হক এর বই - কার্টুন আঁকিবার ক, খ, গ এবং ক্ষ


দেশে যাবার আগে আগে মেহেদী হক-কে জানালাম, দেশে আসছি, আপনার প্রকাশিত ‘কার্টুন আঁকিবার ক, খ, গ এবং ক্ষ’ বইটি সংগ্রহ করতে চাই। উপায় কী? তিনি জানালেন আপাতত কোন দোকানে পাওয়া যাচ্ছে না। কাঠপেন্সিল মানে প্রকাশক, উন্মাদ পত্রিকার অফিসে অথবা খোদ লেখকের কাছ থেকেই সেটা সংগ্রহ করতে হবে। আমি বললাম, তা-ই সই। লেখা শেষ হবার আগেই ফুটনোট হিসেবে আমি এখানেই জানাতে চাই, মেহেদী হক-এর এ বইটি আমার জানামতে, বাংলাদেশের প্রথম কার্টুন আঁকা শেখার বই।

মেহেদী হক হচ্ছেন আমাদের এই প্রজন্মের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল কার্টুনিস্টদের একজন। নিয়মিত আঁকছেন সাপ্তাহিক বুধবার, নিউ এইজ এবং কার্টুন পত্রিকা উন্মাদে। যদিও একাডেমিক যোগ্যতায় তিনি নগর ও অঞ্চল বিষয়ক প্রকৌশলী, কিন্তু আসলে তিনি একজন পুরোদস্তুর আঁকিয়ে।

কার্টুন বলতে ছোটবেলায় টিভিতে প্রচারিত এনিমেশানগুলোকেই বুঝতাম। সেসময় পড়া কমিকসগুলোও ছিলো আমাদের কাছে কার্টুন বই। আরেকটু বড় হলে, র’নবী-র টোকাই দিয়ে পরিচিত হয়েছি সত্যিকারের কার্টুনের সাথে। তারপরে কার্টুন দুনিয়ার একক কান্ডারী ছিল উন্মাদ পত্রিকা। আর এই মুহুর্তেতো বাংলাদেশে কার্টুনের বেশ জয়জয়কার। জাতীয় পত্রিকার সাপ্লিমেন্টগুলোয় মূলত কার্টুনই থাকে বেশি, এবং প্রথম পাতা-র ‘রাজনৈতিক কার্টুন’-এর ধারণাটিও প্রায় সব কটি জাতীয় পত্রিকায়ই বেশ জনপ্রিয়।

মিডিয়ার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নই বলে সঠিক পরিসংখ্যান আমার জানা নেই। কিন্তু আমার ধারণা, বাংলাদেশের অনেক তরুণ তরুণীই এখন কার্টুনের দিকে ঝুঁকছেন। এখন, যারা স্বভাবজাত কার্টুনিস্ট নন, বরং সেটা শিখে আয়ত্ব করতে চান, তাদের জন্যে বাংলাদেশে আসলে কার্টুন শেখাবার কোন প্রতিষ্ঠান নেই। মেহেদী হক-এর কারণেই জানতে পারলাম উন্মাদ-ই নাকি বছর কয়েক ধরে কার্টুন শেখার একটা ওয়ার্কশপ চালাচ্ছে। সুতরাং, আপাতত সেটিকেই বলা যায় হবু-কার্টুনিস্টদের জন্যে সবেধন নীলমণি। আর সেই সাথে নীলমণি হিসেবে যুক্ত হলো মেহেদী হক-এর এই বইটিও।

কুরিয়ারে করে বইটি হাতে পাওয়ার পরেই গোগ্রাসে পড়ে ফেললাম। যদিও এটি আসলে ঠিক পড়ার বই নয়, পড়তে পড়তে অনুশীলনের বই।

বইটির প্রচ্ছদ চমৎকার। হবু-কার্টুনিস্টরা দেখামাত্রই নিজেকে এই খালি চেয়ারটিতে কল্পনা করে নিতে উৎসাহী হবেন। সন্দেহ নেই।


একজন কার্টুনিস্টের রসবোধ সাধারণ মানুষদের তুলনায় খানিকটা বেশি হবে বলেই আশা করা যায়, মেহেদী হক সেই আশা মিটিয়েছেন শতভাগ। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে আহসান হাবীবকে, অতঃপর নিচে টীকা-র মাধ্যমে মেহেদী লিখেছেন, “ আশা করি উন্মাদ ম্যাগাজিনের চাকুরী এইবেলা আরো পোক্ত হলো।”  এটুকু দেখে আমার মুখের হাসি আকর্ণ বিস্তৃত হলো, এবং তারপরে সেটা সেখানেই পাকাপাকি হলো যতক্ষণ না আঁকিয়ের লেখা ‘ভূমিকার টুমিকা” পড়ে শেষ করলাম। :)

উৎসর্গ পাতায় আমার জন্যে একটা ছবিও এঁকে দিয়েছেন তিনি, দেখে আপ্লুত হলাম।

বইটি মূলত দু’ভাগে ভাগ করা। একদম নবীনদের জন্যে “ক, খ, গ” অংশ। আর এডভান্সড লেভেলারদের জন্যে “ক্ষ” অংশ।

নবীনদের জন্যে তৈরি করা অংশটায় খুব চমৎকারভাবে ধাপে ধাপে কার্টুন কী করে আঁকতে হয়, তা শেখানো হয়েছে। পেন্সিল বা বলপেন নির্ভর সহজাত আঁকিয়েরা যখন কার্টুন আঁকবেন বলে মনস্থির করেন, তখন প্রথমেই যে সংশয়ে ভোগেন তা হলো ‘কী দিয়ে আঁকব”? মেহেদী ঠিক এই শিরোনামেই একটা চ্যাপ্টারে সেটা সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন।

তারপরের ধাপগুলো হচ্ছে বেসিক শেইপ, মানে চরিত্রের মাথা কেমন হবে, গোল লম্বা নাকি চারকোণা, অতঃপর চেহারা, মানে চোখ নাক মুখ। একের পর দুর্দান্ত সব ছবি ও তার সাথে সাথে মজার সব বর্ণনার মাধ্যমে সেসব তুলে এনেছেন মেহেদী।

আমি সূচীপত্রের একটা ছবি তুলে দিই বরং। আগ্রহীরা তাহলে এখনই একটা ধারণা পেয়ে যাবেন বইটা হাতে নিলে তারা কী কী শিখতে পারবেন।

নাক মুখ এবং মাথা বানানো শেখা হয়ে গেলে কার্টুনিং এর পরের ধাপ হচ্ছে সেগুলোকে একটা মানুষের ধড়ে বসিয়ে দেয়া। এই কাজটার শুরু হয় কাঠি মানুষদের দিয়ে। বইটিতে কাঠি-মানুষ এঁকে কার্টুন-মানবের বেসিক বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। তারপরে এসেছে সেই কার্টুনকে নানা রকম একশানে দেখানো, যেমন দৌড়, হাঁটা বা অন্য কোন শারিরীক ভঙ্গি।

বইটির আরও কিছু চমৎকার দিক হচ্ছে আলো ও ছায়ার ব্যাখ্যা। কার্টুন নিয়ে আরেকটু এগুতে চান যারা তাদের জন্যে ডায়লগ বাবল ও লেটারিং বিষয়ক খুঁটিনাটি।

ব্যাক্তিগত ভাবে আমার সবচেয়ে পছন্দ হয়েছে ড্রাপারি আর ফোরশর্টেনিং চ্যাপ্টার দুটো। যেখানে খুবই সহজ ভঙ্গিতে বলা হয়েছে জামা-কাপড়ের ভাঁজ কীভাবে আঁকতে হয় এবং কাগজের সমতলে কী করে সামনে-পেছনের অনুভুতি ফুটিয়ে তুলতে হয়।

আরেকটি অনুচ্ছেদের কথাও বিশেষভাবে বলতেই হয়, যেখানে দেশী-বিদেশী চেহারা কীভাবে আঁকে আর তাঁদের মূল বৈশিষ্ঠ্য বা পার্থক্যের নির্দেশনা দেয়া। আমার ধারণা, বিশেষ করে এই চ্যাপ্টারটি আমাদের দেশীয় কার্টুনিস্টদের খুবই উপকারে আসবে।

নবীনদের অংশের পরে এডভান্সড অংশ অর্থ্যাৎ ক্ষ-তে আরেকটু গভীরে আলোচনা করা হয়েছে মানবদেহের এনাটমি, এবং স্কেল আর অনুপাতের মত জটিল বিষয়গুলো, অবশ্যই অতি সহজ ভাষায়।

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ার পরে আমি বলবো, যে কোন বয়েসী বাংলাভাষী হবু-কার্টুনিস্টদের জন্যে এটি একটি অবশ্যপাঠ্য বই। ইংরেজিতে এরকম বই অনেক রয়েছে, কিন্তু বাংলায় এবং এত মজার ভঙ্গিতে কার্টুন শিখতে পারার সুযোগ মিস করা ঠিক নয়। আমি এই বইটি নিজের জন্যে কিনে নিয়ে এসেছি, এবং আরেকটা  উপহার দিয়ে এসেছি আমার দশ বছর বয়েসী ভাগ্নেকে।

ভাগ্নের জন্যে দেয়া বইটি আবার স্বয়ং মেহেদী হক এর হাত থেকে পাওয়া। সেই পিচ্চির জন্মদিন ছিলো পরদিনই, কুরিয়ারে পাঠালে একদিন দেরি হয়ে যাবে পৌঁছুতে, এ কারণে আমাকে রীতিমতন বিস্মিত করে দিয়ে তিনি বই নিয়ে নিজেই চলে এসেন বাসায়!

বইটি এই বই মেলায় পাওয়া যাচ্ছে উন্মাদ পত্রিকার স্টলে। চমৎকার ছাপা ও বাঁধাইয়ের বইটির গায়ের মূল্য ২৫০ টাকা। মেলায় বোধহয় কমিশন বাদে দাম দাঁড়াবে ২০০ টাকা। বই সংক্রান্ত এবং তাঁরচেয়ে বড় কথা কার্টুন সংক্রান্ত যে কোন রকম যোগাযোগ করা যাবে মেহেদী হকের ব্লগস্পটের ঠিকানায়

টীকা- একঃ কার্টুন শেখার জন্যে বাংলা ভাষার প্রথম এই চমৎকার বইটির এই দুর্বল রিভিউ লেখা হয়েছে মেহেদী হকের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে। তিনি মাইন্ড খাইলেও আমার কিস্যু করার নাই, আমি পাঠক-স্বাধীনতায় বিশ্বাসী।

টীকা- দুইঃ বইয়ের স্ক্যান করা ছবিগুলোও এখানে দেয়া হয়েছে আঁকিয়ে মহাশয়ের বিনানুমতিক্রমে। অবশ্য এই ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যাকফুটে আছি, কপিরাইট মামলার হুমকি দেয়া হলে সাথে সাথে সেগুলো সরিয়ে নেয়া হবে, iPromise.

টীকা- তিনঃ বইয়ের ভেতরের প্রথম পাতায় মেহেদী হকের নিজের একটা ক্যারিকেচার দেয়া আছে। বইটি দিয়ে আমার বাসা থেকে চলে যাবার পর আমার বউ অবাক স্বরে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ছেলেটা দেখতে এত সুন্দর কিন্তু নিজের ক্যারিকেচার এমন পঁচা করে এঁকেছে কেন?
সুতরাং আগ্রহী বালিকাদের জানাই নির্দ্বিধায় এই বইটি কিনতে পারেন, কারন বইটির আঁকিয়ে-লেখক সার্টিফায়েড সুদর্শন। :)