বুধবার, ফেব্রুয়ারী ০৩, ২০১০

দি নিউ ঢাকা অপেরা- ১


সকালে ঘুম ভাঙলে পত্রিকাটা হাতে নিয়ে ঠিক করে ফেললাম আজই যাবো বইমেলায়।
যখন ছোট ছিলাম, একবার এক বন্ধুর সাথে কী নিয়ে যেন মন কষাকষি হলো। তারপর দীর্ঘ দিনের আড়ি, কেউ কারো সাথে কথা বলি না, দেখা হলেও এড়িয়ে চলি। লম্বা সময় বাদে যখন আবার কথা বলা শুরু করলাম, দেখি এতদিনের অনভ্যাসের কারণে কেবলই অস্বস্তি আর দ্বিধা।
প্রায় ছয় বছর বাদে এবারে যখন বইমেলায় ঢুকছিলাম, ঠিক সেরকম একটা অনুভূতি হচ্ছিলো মনে। টিএসসির কাছে এসে সিএনজি ছেড়ে দিতে হলো, রাস্তা বন্ধ, এখান থেকে হেঁটে যেতে হবে। তো হাঁটতে হাঁটতে দূর থেকে মেলার ফটক চোখে পড়তেই মনে হলো, দীর্ঘদিন বাদে পুরনো প্রেয়সীদের কারো সাথে যেন দেখা করতে চলেছি। মনের মধ্যে সেরকমই একটা সংকোচ!
কিন্তু আশ্চর্য হলো, মেলায় ঢোকা মাত্রই সে সংকোচ কেটে গেলো একেবারে। নিরাপত্তাকর্মীদের পাশ কাটিয়ে যখন বাংলা একাডেমিতে ঢুকে গেলাম, মনে হলো কে বলেছে ছয় বছর, আমি ঠিক গতকালই এই মেলা ঘুরে গেছি।
বইমেলার চেহারা বদলে গেছে অনেক। অনেক বেশি পরিকল্পিত মনে হলো সবকিছু, সে জন্যেই পরিপাটী ভাবটা প্রবল। বাংলা একাডেমির মূল মেলার বাইরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও একাডেমীর সীমানা প্রাচীরের গা ঘেঁষে কিছু স্টল বরাদ্দ করা হয়েছে। এই ব্যাপারটা নতুন লাগলো আমার কাছে, আগে দেখিনি। কিন্তু মন্দ লাগলো না, স্থান সঙ্কুলান না হলে এরকমই বিকল্প উপায় বের করতে হবে।
মেলার মাত্রই ২য় দিন, সে তুলনায় লোকসমাগম প্রবল। এটা দেখেও ভাল লাগলো। তবে এখনো বোধহয় সবাই বই কিনতে শুরু করেনি।
আমি আর তিথি মেলায় ঢুকেই দাঁড়িয়ে গেলাম খুব প্রিয় সেবা প্রকাশনীর স্টলে। বইমেলায় বই কেনার শুরুটা হলো এখান থেকেই। আগেই কথা হয়েছিলো নজরুল (ইসলাম) ভাইয়ের সঙ্গে। উনি মেলায় ঢুকতেই দেখা হলো। লোকজন ভালই, তবু মেলা প্রাঙ্গনে এখনো ধুলোবালি উড়তে শুরু করেনি তেমন। আমি ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম নানা স্টল। ঐতিহ্যের স্টলে গিয়ে পছন্দের কিছু বই পেয়ে গেলাম। মূলত অনুবাদ। চটপট কিনে ফেললাম কিছু বই।
এবারে ভেবেছি অনেক বই কিনে সাথে করে নিয়ে যাবো। তাই একদিনে সব বই কেনা সম্ভব হবে না আমাদের পক্ষে, চাপ পড়ে যাবে। এজন্যে যখুনি যাবো বইমেলায়, কিছু কিছু করে কিনে ফেলবো ভেবেছি।
ঐতিহ্যের স্টলের পাশেই দেখা হলো জাহাজী তীরন্দাজ (আনিস হক) ভাইয়ের সঙ্গে। আরও ছিলেন শেখ জলিল ও আবু রেজা। আনিস ভাই ওনার বইয়ের প্রকাশনা উৎসবের নিমন্ত্রণ পত্র দিলেন আমাদের। সেখান থেকে সবাই মিলে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম শুদ্ধস্বরের স্টলে। এবারও দেখি শুদ্ধস্বরের কপালে বারান্দা জুটেছে! আড্ডার পুরনো জায়গা ফিরে পেয়ে নজরুল ভাই দেখলাম খুব খুশি হয়ে উঠলেন। আহমেদুর রশীদ টুটুল ভাইকে দেখি ক্যামেরা হাতে নিয়ে মুগ্ধ নয়নে নিজের স্টলের ছবি তুলছেন। তিথির ক্যামেরাও সচল ছিলো মেলার শুরু থেকেই!
উম্মাদের স্টলে আহসান হাবীবকে বসে থাকতে দেখলাম। দেশ টিভির ক্যামেরা ওনাকে দেখেই সে স্টলের সামনে খুঁটি গাড়লো।
ঘুরতে ঘুরতে চারুলিপির স্টলে আসতেই মনে পড়লো, তীরন্দাজ ভাই একটু আগেই মনে করিয়ে দিয়েছিলেন এখান থেকে গত বছর ওনার অনুবাদ সংকলন বেরিয়েছিলো "অন্য শরীর' নাম দিয়ে। একটু খুঁজতেই পেয়ে গেলাম বইটা। কিনে ফেললাম এক কপি, একটু পরেই লেখকের অটোগ্রাফও নেয়া যাবে এই ভেবে মজা লাগলো।
তিথি একটা বই কিনতে চাইলো, মুহম্মদ জাফর ইকবালের ভুত সমগ্র। আমিও ব্যাপক উৎসাহ দিলাম। কিন্তু বই হাতে নিয়ে সূচীপত্র খুলে দেখি পুরনো বইয়েরই কালেকশান এটা, তাই আর কেনা হলো না। জয়নুল আবেদীন এর দুর্ভিক্ষের সময়কার আঁকা ছবিগুলো একসাথে করে ছাপিয়েছে দেখলাম একটা স্টলে। কামরুল হাসানের অনেক ছবিও। খুব ভাল প্রিন্ট, ঝকঝকে যাকে বলে, চমৎকার কাগজ এবং দারুণ বাঁধাই বইগুলোর। কিন্তু দাম আশ্চর্যজনকভাবে কম! আমার দু'হাতে জায়গা ছিলো না তেমন, তাই কিনতে পারলাম না, তবে পরেরবার যখন যাবো কিনবো অবশ্যই।
এবারে দেখি আনিসুল হক আর সুমন্ত আসলাম একেবারে ফাটিয়ে ফেলেছেন। একেকজনের প্রায় আট-দশটি করে বই আসছে মেলায়। এই দুই লেখককে 'উর্বরাশক্তির প্রতীক' উপাধীতে ভূষিত করা যায় কিনা ভাবছিলাম। স্পন্সর পেতে অসুবিধা হবে বলে মনে হয় না। নিরালা বল সাবানকে অনুরোধ করে দেখা যেতে পারে। ওদের একটা বিজ্ঞাপনে আছে, "কম খরচে বেশি কাচে কোন সাবান কোন সাবান?" আমরা স্লোগানটা একটু বদলে নিতে পারি, "কম সময়ে বেশি লেখে কোন লেখক কোন লেখক?"
একটা স্টলে গিয়ে দেখি জুলফিকার নিউটনের কিছু মোটা মোটা বই সাজিয়ে রাখা। আমার হঠাৎই মনে পড়লো, এই লোকের বিরুদ্ধেই না জালিয়াতির অভিযোগ এসেছিলো গতবছর? কার কার লেখা যেন নির্দ্ধিধায় মেরে দিয়ে নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন এই লেখক। সে বইয়ের ভুমিকা লিখেছেন আবার অধ্যাপক কবীর চৌধুরি! কোথায় পড়েছিলাম রিপোর্টটা কিছুতেই মনে করতে পারলাম না। বইমেলা কর্তৃপক্ষ কি জানেন এই কাহিনী? তা না হলে জানানো দরকার।
তাম্রলিপির স্টল বের করলাম খুঁজে। অটিজম নিয়ে লেখা নুশেরা তাজরীনের একটা বই বের হবে এবার এখান থেকে। সে বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন আমাদের সচল আলমগীর ভাই। খুঁজে বের করলাম "পাঠসূত্র'ও। হিমু ভাই, মাশীদ আপু, নজমুল আলবাব ভাই এবং আমার বইটার পরিবেশক এবারে পাঠসূত্রই। মেলায় ওদের স্টল নাম্বার ৭৩-৭৪। নজরুল মঞ্চের ঠিক পাশেই পড়েছে সেটা।
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিলো ডাকসুর ক্যাফে। কয়েকজন বন্ধু অপেক্ষা করছিলো সেখানে আমাদের জন্যে। তাই বেরুবার তাড়াও ছিলো। তার আগে তীরন্দাজ ভাইয়ের অটোগ্রাফ নিতে আবারও গেলাম শুদ্ধস্বরে। কিন্তু ওনাকে পেলাম না সেখানে। অবশ্য গিয়ে দেখি সেখানে লীলেন ভাই বসে আছেন, আর খুব মনোযোগে ওনার প্রকাশিতব্য বইয়ের প্রুফ দেখছেন। আমি গিয়ে লম্বা সালাম দিলাম। উনি পরিচিতের হাসি দিয়ে সেটার উত্তর দিলেন।
এই কৌশলটা আমি জানি। কেউ খুব আগ্রহ নিয়ে কথা বলতে এলে না চিনতে পারাটা খুব অস্বস্তিকর, এটা এড়ানোর জন্যে মুখে একটা পরিচিতের হাসি ঝুলিয়ে কথা বলতে হয়। এই কাজটা আমিও করি প্রায়শই। লীলেন ভাই একই কাজ করেছেন দেখে আমি হেসে ফেললাম। তারপর চেপে ধরলাম ওনাকে, "খুব তো ভাব নিলেন চেনেন আমাকে, বলেন দেখি আমি কে?'
লীলেন ভাই অবশ্য দু'সেকেন্ডের বেশি সময় নিলেন না, বুঝে গেলেন আমার পরিচয়। টুটুল ভাই জানালেন, এটা আসলে বিয়ের গুণ। বিয়ের পর লীলেন ভাইয়ের এমনকি চশমার কাঁচও বদলাতে হয়েছে একবার, মানে কিনা, চোখের পাওয়ার বেড়েছে!
বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলাম আমি আর তিথি। অনেক ছোটবেলায় বাবার সাথে যখন আসতাম মেলায়, মনে পড়ে, একাডেমির ফটক থেকে একদম হাইকোর্টের মোড় পর্যন্ত বৈশাখী মেলার মত দোকান বসতো নানা জিনিসের। লোকে বই কিনতে এলে ফিরবার সময় সাথে করে ডাল-ঘুঁটুনীও কিনে নিয়ে যেতে পারতো। এখন আর সেরকম হাঙ্গামা নেই। এক দিক দিয়ে ভালই সেটা।
টিএসসি পর্যন্ত হেঁটে যেতে যেতে কিছু ভ্রাম্যমান খাবার দোকান চোখে পড়লো। পিঠা, ভুট্টা এবং চিংড়ির মাথা। লোকে আগ্রহ করে খাচ্ছে সেসব। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশ ঘেঁষে হেঁটে বেরিয়ে যাবার আগে আরেকবার পেছন ফিরে দেখলাম বইমেলাকে। প্রেয়সীর লাজ ভেঙে গেছে এতক্ষণে। ছয় বছর পরে নয়, হয়তো কালই আবার দেখা হবে আমাদের, এই ভেবে আমি আর বইমেলা দু'জনেই যেন পুলক অনুভব করলাম। হাসি

কোন মন্তব্য নেই: