শুক্রবার, আগস্ট ০৭, ২০০৯

সাপুড়ে লেখক, মাহমুদুল হক?

মাহমুদুল হকের "কালো বরফ" পড়তে পড়তে, সম্ভবত, বার তিনেক আমাকে পাতা উল্টে প্রথম প্রকাশের তারিখটা দেখে নিতে হয়েছে। ১৯৯২ সালে বেরিয়েছিলো এই বই। ঠিক সতের বছর আগে। কিন্তু তারচেয়েও বড় ব্যাপার হলো, এটির রচনাকাল আরও পেছনে, অগাস্ট ১৯৭৭! তিরিশ কিংবা তারও বেশি বছর বাদে, আমার নিজের চেয়েও বেশি বয়েসী এই বইটা হাতে নিয়ে আমি অবাক হয়ে ভাবছি, মাহমুদুল হক কেমন করে এত বছর আগেই এরকম একটা চির-আধুনিক উপন্যাস লিখে গেলেন!

চারপাশের পাওয়া বইগুলোকে চিরকালই আমি উঁইপোকার চেয়েও বেশি যত্নে আর আদরে গিলে নিয়েছি। লেখক বা বইয়ের সংখ্যা হিসেব করলে সেটা অ-নে-ক ল-ম-বা একটা লিস্টি হয়ে দাঁড়াবে কোন সন্দেহ নেই। এবং, কে জানে, মনের গভীরে কোথাও এই নিয়ে হয়তো কোন আত্মতৃপ্তিও কাজ করে আমার মধ্যে। কিন্তু সেটি যে আসলে অনেকটা বোকার স্বর্গের মতই ব্যাপার, এটা টের পেলাম সম্প্রতি "প্রতিদিন একটি রুমাল" আর "কালো বরফ" পড়ার পরে।

লেখায় জাদু-টাদুর কথা শুনেছি অনেক। কালো বরফের প্রতিটা পাতায় আমি মনে হলো সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। উত্তম পুরুষে লেখা একটানা উপন্যাস। আবার ঠিক একটানা নয়। একটা জীবনেরই দুটি সময়ের কথা পরপর অথবা পাশাপাশি বলে যাওয়া, অবলীলায়। এরকমটা অবশ্য অনেক দেখেছি। এই মুহুর্তেই মনে পড়ছে দূরবীন এর কথা, শীর্ষেন্দুর, আমার খুবই পছন্দের একটা লেখা। কিন্তু সেখানে একটা আয়োজন ছিল। একটা মানুষের জীবনের গল্প ফুটিয়ে তুলবার জন্যে যে বিপুল বিস্তারের দরকার, যতখানি আড়ম্বরের দাবীদার সেটা, শীর্ষেন্দু সেসবে একেবারেই অকৃপণ। কালো বরফে তার একদম উল্টো। কোন আয়োজন নেই, যেন, আমি বলে যাচ্ছি, তুমি শুনলে শুনো না শুনলে নেই, এরকম একটা ড্যাম কেয়ার ভাব।

একটু আগে বলেছিলাম উত্তম পুরুষে লেখা, আসলে পুরোপুরি তা নয়। শৈশবের অংশটুকু উত্তম পুরুষে, কিন্তু সাথে সাথেই বড় হয়ে যাবার অংশটুকু লেখকের বয়ানে বলা। কিন্তু কোথাও বেসুরো লাগেনি। বেসুরো, এই শব্দ ব্যবহারের কারণ, প্রতিটা চমৎকার গল্প বা উপন্যাসই আমার কাছে খুব যত্ন নিয়ে গাওয়া গানের মত মনে হয়। ঠিক সুরে, তালে মিলিয়ে মিশিয়ে একটা চমৎকার সঙ্গীত। কালো বরফও তাই।

প্রচ্ছদ আকর্ষণীয় নয়, রঙের বাহুল্য চোখে লাগে। আমাদের এখনকার বইগুলোর মত ব্যাক কাভারে ছবিসুদ্ধ লেখক পরিচিতি নেই। কিন্তু বাইরের সৌন্দর্যের পুরো ঘাটতি পুষিয়ে দিয়েছে বইটার ভেতরকার সৌন্দর্যটুকু।

হক সাহেব শুনেছি ব্যক্তিজীবনে রত্ন বা পাথর নিয়ে কাজ করতেন। ওনার লেখা পড়ে আমার সন্দেহ হচ্ছে, উনি গোপনে গোপনে সাপুড়ে ছিলেন না তো? তা নইলে এরম অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তির খোঁজ উনি কেমন করে পেলেন! লেখা পড়ে যাই, কিন্তু লেখা তো নয় যেন সাপের চোখে চোখ ফেলে বশ হয়ে গেছি!
তো পড়ে টড়ে, সবমিলিয়ে, নিজের প্রতি আমার গভীর অনুকম্পা হলো। এরকম দুর্দান্ত লেখা পড়তে আমার জীবনের সাতাশটা বছর খরচ করে ফেললাম, দুর!
আমায় দিয়ে আসলে কিসসু হবে না।

1 টি মন্তব্য:

বাঁধন হারা বলেছেন...

তো পড়ে টড়ে, সবমিলিয়ে, নিজের প্রতি আমার গভীর অনুকম্পা হলো। এরকম দুর্দান্ত লেখা পড়তে আমার জীবনের সাতাশটা বছর খরচ করে ফেললাম, দুর!
আমায় দিয়ে আসলে কিসসু হবে না।


বিনয়টা বেশি হয়ে গেলো না?? আপনি তো ভাই দারুণ লিখেন!