Wednesday, October 29, 2008
বনফুলের গল্পসমগ্র-
কিন্তু তিনি ব্যস্ত মানষ। মোটের ওপরে, তেমন করিয়া আর সময় করিয়া উঠিতে পারিলেন না। তখন ভাবিলেন, প্লটগুলান এই রূপেই গল্প হিসেবে ছাড়িয়া দিলে কিরূপ হয়? তো তিনি তাহাই করিলেন। এবং, নিজের অজান্তেই তিনি সৃষ্টি করিলেন গল্পের এক নতুন ধারা। গল্পিকা, গল্প-কণিকা বা আদিরূপ ছোটগল্প ঘুরিয়া অদ্যকার কলিযুগে সকলে যাহাকে অণুগল্প হিসাবে চেনে।
*
একটু হাসফাঁস লাগলো এইটুকু লিখতেই। তবে ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং। চলিত ভাষায় লিখতে গেলে সম্ভবত একটু বর্ণনার প্রয়োজন পড়ে বেশি, সাধুতে সেটা অল্প কথায় সেরে ফেলা যায়!
বলে রাখা ভাল, উপরের চিত্রটি পুরোপুরিই আমার কল্পনা। বাস্তবে এমনটাই ঘটেছিলো কিনা জানা নাই।
যাকগে, কথা সেটা না। ডাক্তার মশায়ের লেখা গল্পগুলো পড়ছিলাম কদিন ধরে, সেই নিয়েই কিছুক্ষণ আলাপ পাড়বো বলে বসলাম আজ।
ডাক্তার মশায়ের নাম ছিলো বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। কিন্তু ভদ্রলোক তাঁর গল্পের মতই নামেরও অণু-করণ করে ফেলেছিলেন। বাংলা সাহিত্যের পাঠকমাত্রই তাঁকে বনফুল নামে চেনে।
অল্প-বিস্তর কিছু গল্প আগেই পড়া ছিলো, এইবারে হাতে পেলাম পুরো গল্পসমগ্র! এবং গত কদিন ধরে বেশ চেটে-পুটে পড়লাম সেটা।
সবচেয়ে যেটা মজা লেগেছে, বইটার নাম "বনফুলের গল্প সমগ্র"। সোজা সাপ্টা "গল্প"ই, আগে পিছে কোন ছোট বা অণু নেই। এমনকি বইয়ের শেষের যুক্ত নানাজনের আলোচনায় বনফুলের গল্পের আকার অনুযায়ী এদের গল্পিকা বা গল্প-কণিকা বলে যে মত আছে, নামকরণে সেটা পেলাম না। অবশ্য, একটা কারণ হতে পারে, এই সংকলনে বনফুলের বেশ কিছু দীর্ঘ্য, মানে কেবল বনফুলের অনুপাতেই নয়, সত্যি সত্যিই লম্বায় বেশ কিছু দীর্ঘ্য গল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শুধুই গল্প সমগ্র বলার সেটাও একটা কারণ হতে পারে।
তবে কথা সত্য, বনফুলের বড় গল্প আছে জানতে পারাটা আমার জন্যে একটা আবিষ্কারই বটে।
বরাবরের মতই সবার আগে আমার নজর কাড়লো এর ভূমিকাটুকু। এবং মজা হলো টেনেটুনে তিন প্যারার এই ছোট্ট ভূমিকাটুকুতেই বনফুলের রসিক মনের বেশ সুন্দর পরিচয় পাওয়া যায়। আমি শুধু প্রথম প্যারাটুকু তুলে দিচ্ছি এখানে-
" আমার গল্প যাঁহারা ভালবাসেন তাঁহাদের কাছে আমার লেখা সম্বন্ধে ভূমিকা নিষ্প্রয়োজন। যাঁহারা ভালবাসেন না তাঁহাদের কাছে আরও নিষ্প্রয়োজন। যাঁহারা আমার লেখার সহিত পরিচিত নহেন তাঁহারা গল্পগুলি পড়িলেই আমার স্বরূপ জানিতে পারিবেন। তাঁহাদের উদ্দেশ্যেও আমার বিশেষ কোন নিবেদন নাই। "
এই না হলে বনফুল!
তা সত্যিই, তাঁর স্বরূপ জানা গেছে বেশ।
এই সাইজের গল্পয় যেটা হয়, গল্পের শেষ হতে হবে অবশ্যই একটা চমকের সাথে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা হয় গল্পের শেষ লাইনটুকু। প্রথম বেশ কিছু গল্প পড়ার পরে মনের ভেতর এমন একটা অনুভূতি হলো আমার, যে, পরবর্তীতে যে গল্পটাই শুরু করতে যাই, আপনাতেই তার শেষ লাইনটুকুর জন্যে অপেক্ষা করি। কারণ, জানি যে ঐ লাইনটাতে এতক্ষণের সব ছবি উল্টে-পাল্টে যাবে।
কদিন আগেই আমরা অণুগল্পের একটা সংকলন করলাম সচলায়তন থেকে। সেই সময়ে অণুগল্প কী বা কেমন, এই নিয়ে বিস্তর আলাপ হয়েছিলো। একেবারে চুড়ান্ত কোন সংজ্ঞা শেষ অবদি পাওয়া যায়নি বলেই মনে পড়ছে, তবে তারপরেও একটা রূপরেখা আন্দাজ করা গিয়েছিলো।
বনফুলের গল্পগুলো পড়তে গিয়ে টের পেলাম, অণুগল্পের বর্তমান ধারা বা ধারণা থেকে সেসব একেবারেই আলাদা।
আমরা যেটা বুঝেছিলাম, এই আকৃতির গল্পের ক্ষেত্রে পুরো কোন ছবি তুলে আনা যাবে না, বরং একটা জীবনের ছোট একটা অংশের উপর তাৎক্ষণিক আলো ফেলার মত করে গল্প বর্ণিত হবে। তো এই বইটা পড়ে মনে হলো, অণুগল্পের গুরুমশায় এসবের ধার ধারেন নি। মাঝে মাঝে দু থেকে তিন লাইনের ভেতরই একটা জীবনকাল তিনি বর্ণনা করে ফেলেছেন!
অবশ্য বড় গল্পগুলোয় তিনি অনেক বর্ণনা টেনে এনেছেন, তবে তার মধ্যেও কোথায় যেন অল্প কথায় সেরে ফেলার মত একটা সুর সারাক্ষণই বাজছিলো।
গল্পগুলো ভাবায় বেশ। এরকম নয় যে পড়লাম, আকারে ছোট, তাই চট করে ভুলে গেলাম। উহুঁ, তার উপায় নেই। বেশ খানিকক্ষণ মনের ভেতরে টুংটাং করে বাজে এসব গল্প।
আরেকটা ব্যাপার খেয়াল করলাম, চমক আনতে গিয়ে প্রায়শই এমনভাবে গল্পগুলোর সমাপ্তি ঘটছে, যেটা হয়তো পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। চট করে ভুলে যেতে না পারার এটাও একটা কারণ হতে পারে।
বনফুলের এই সমগ্রতে বেশ কিছু স্যাটায়ারও খুঁজে পাওয়া গেলো। এবং, বলতেই হয়, স্যাটায়ারে তাঁর দক্ষতা রীতিমতন ঈর্ষনীয় ছিলো।
তবে, বিশেষ করে একদম ছোটগল্পগুলো পড়ে আমার সত্যিই মনে হচ্ছিলো, যেন এগুলো তাঁর খেরোখাতায় টুকে রাখা কোন গল্পের প্লট। মানে অনেকেই যেমনটা করেন, গল্পের আইডিয়া মাথায় এলে নোটবুকে লিখে রাখেন দুএকটা শব্দ বা লাইন, বা গল্পের একটা মানচিত্র, অনেকটা যেন সেরকমই বনফুলের গল্পেরা। তবে, এ কথা অবশ্য স্বীকার্য, খেরোখাতায় টুকে রাখা প্লটের মত অসম্পূর্ণ নয় মোটেই তাঁর গল্পেরা। বরং একদম শতভাগ পরিপূর্ণ।
হার্ড কাভারে বাঁধাই করা প্রায় ৪৬৫ পৃষ্ঠার এ বই, কলকাতার গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড থেকে প্রকাশিত। প্রথম প্রকাশের তারিখ দেখাচ্ছে পৌষ ১৩৮৭। মূল্য সেই আমলেই একশত টাকা।
গল্পের আকৃতিগুলো এতই লোভনীয় যে আমার বেশ কবার ইচ্ছে হচ্ছিলো বেশ কিছু গল্প এখানে কম্পোজ করে তুলে দিই। কিন্তু এই মুহুর্তে তা সম্ভব নয়। আপাতত একটা গল্পের কিয়দংশ আপনাদের সাথে শেয়ার করা যাক । গল্পের নাম- বিধাতা।
------
বাঘের বড় উপদ্রব। মানুষ অস্থির হইয়া উঠিল। গরু বাছুর, শেষে মানুষ পর্যন্ত বাঘের কবলে মারা পড়িতে লাগিলো। সকলে তখন লাঠি সড়কি বর্শা বাহির করিয়া বাঘটাকে মারিল। একটা বাঘ গেল- কিন্তু আরেকটা আসিল। শেষে মানুষ বিধাতার নিকট আবেদন করিল-
"ভগবান, বাঘের হাত হইতে আমাদের বাঁচাও।"
বিধাতা কহিলেন- আচ্ছা।
কিছু পরেই বাঘরা আসিয়া বিধাতার দরবারে নালিশ জানাইলো- " আমরা মানুষের জ্বালায় অস্থির হইয়াছি। বন হইতে বনান্তরে পলাইয়া ফিরিতেছি। কিন্তু শিকারী কিছুতেই আমাদের শান্তিতে থাকিতে দেয় না। ইহার একটা ব্যবস্থা করুন। "
বিধাতা কহিলেন, - " আচ্ছা।" (.....)
সুশীল পরীক্ষা দিবে। সে রোজ বিধাতাকে বলে, "ঠাকুর, পাশ করিয়ে দাও।"
আজ সে বলিল, "ঠাকুর, যদি স্কলারশিপ পাইয়ে দিতে পার, পাঁচ টাকা খরচ করে হরির লুট দেব--"
বিধাতা কহিলেন, - "আচ্ছা"
হরেন পুরকায়স্থ ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান হইতে চায়। কালী পুরোহিতের মারফত সে বিধাতাকে ধরিয়া বসিল- এগারোটা ভোট আমার চাই। কালী পুরোহিত মোটা রকম দক্ষিণা খাইয়া ভুল সংস্কৃত মন্ত্রের চোটে বিধাতাকে অস্থির করিয়া তুলিল। ভোটং দেহি-- ভোটং দেহি--
বিধাতা কহিলেন, আচ্ছা, আচ্ছা--।( ....)
কৃষক দুই হাত তুলিয়া কহিল, "দেবতা, জল দাও --"
বিধাতা কহিলেন, আচ্ছা। (......)
দার্শনিক কহিলেন- "হে বিধাতা, তোমাকে বুঝিতে চাই-"
বিধাতা কহিলেন, - "আচ্ছা"
চীন দেশ হইতে চীৎকার আসিল, "জাপানীদের হাত হইতে বাঁচাও প্রভূ"।
বিধাতা কহিলেন, - "আচ্ছা"
একটু ফাঁক পড়িতেই বিধাতা পার্শ্বোপবিষ্ট ব্রহ্মাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, " আপনার বাসায় খাঁটি সর্ষের তেল আছে?"
ব্রহ্মা কহিলেন, "আছে, কেন বলুনতো?"
বিধাতা- আমার একটু দরকার। দেবেন কি?
ব্রহ্মা (পঞ্চমুখে) " অবশ্য, অবশ্য।"
ব্রহ্মার বাসা হইতে ভাল সরিষার তৈল আসিল। বিধাতা তৎক্ষণাৎ তাহা নাকে দিয়া গাঢ় নিদ্রায় অভিভূত হইয়া পড়িলেন।
আজও ঘুম ভাঙে নাই।
| কেমন লাগলো: |
Tuesday, October 21, 2008
আশ্চর্য তীর্থযাত্রীরা - শেষ পর্ব
শহরগুলোর একটির সাথেও আগেকার স্মৃতির কোন যোগসূত্র খুঁজে পেলাম না। কোন একটা অদ্ভুত উল্টো প্রক্রিয়ায় বর্তমান ইউরোপের আর সব শহরের মতই তারা বিস্ময়কর হয়ে উঠেছিলো। সত্যিকারের স্মৃতিরা কেমন যেন
ভৌতিক হয়ে গিয়েছে, আর তার বদলে মিথ্যে স্মৃতিরা এত বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে যে তারাই বাস্তবতাকে প্রতিস্থাপিত করেছে। এর মানে দাঁড়ালো, আমি তাহলে বিভ্রম আর স্মৃতিকাতরতার মাঝের বিভেদরেখাকে আলাদা করতে পারিনি। যদিও এমন করতে পারাটাই হতো ঠিকঠাক সমাধান। অবশেষে আমি ঠিক তাই খুঁজে পেলাম, বইটি শেষ করার জন্যে আমার যা দরকার ছিলো এবং পার হতে থাকা বছরগুলো আমাকে একমাত্র যা দিতে পারতোঃ সময়ের একটি পটভূমি।
দীর্ঘ দীর্ঘ বাক্য সব। একটার শেষের পরে অপরটার শুরুর মধ্যেকার যোগাযোগ বুঝে ওঠার জন্যে, মাঝে মাঝেই আমার এমন হয়েছে যে পুরো বাক্যটা বেশ ক"বার পড়তে হয়েছে। বাংলা করার পরে আমি আবার পড়ে দেখছিলাম, সেই একই সমস্যা এখনো হচ্ছে কি না। টের পেলাম যে তা এখনো হচ্ছে, তখন ইংরেজিটা মাথা থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দিয়ে বাংলার উপরে বেশ খানিকক্ষণ ঘষা মাজা চালালাম। বাক্যের গতিপথ মসৃণ হয়ে এলেই তবে থেমেছি।
আমি সেই কার্যকরী সফর সেরে ফিরে এসে প্রায় ঘোরের মধ্য দিয়ে আট মাস ধরে সব কটি গল্প আবার শুরু থেকে লিখলাম, এবং যেহেতু আমার মনে হচ্ছিলো আমার বিশ বছর আগের অভিজ্ঞতার কোন কিছুই এখন আর বাস্তবে নেই, তাই আমার কখনোই এ কথা নিজেকে মনে করিয়ে দিতে হয়নি যে জীবনের শেষ আর কল্পনার শুরু আসলে কোত্থেকে। তারপরে আমার লেখা এমন তরতর করে এগুলো যে মাঝে মাঝে আমার মনে হচ্ছিলো আমি যেন গল্প বলার নির্ভেজাল আনন্দের জন্যেই লিখছিলাম কেবল, যার তুলনা হতে পারে একমাত্র নির্ভার হয়ে যাবার মানবীয় অনুভুতির সাথেই। আমি সবগুলো গল্পের উপর একই সাথে কাজ করছিলাম এবং ইচ্ছেমত একটা থেকে আরেকটায় ক্রমাগত যাওয়া-আসা করছিলাম, এর ফলে আমি বিস্তৃত একটা দৃশ্যপট আমার সামনে পেলাম যা আমাকে পরপর অনেকগুলো গল্প শুরু করার ক্লান্তি থেকে বাঁচালো। এবং সেই সাথে বর্ণনার বাহুল্য বা তীব্র বৈপরীত্য ধরে ফেলতে সাহায্য করলো। আমার বিশ্বাস, এভাবেই আমি এই বইটি লিখে ফেলতে পেরেছি, ঠিক যেরকমটা আমি সবসময়েই লিখতে চেয়েছি।
কি সব খটমটে কথাবার্তা, মার্কেজের ওপরে যদি আমি খানিকটা ক্ষেপে টেপেই যাই, খুব কি অন্যায় হবে? আপনারা কী বলেন?
অবশেষে, এদিকে ওদিকে ছুটে বেড়ানো আর অনিশ্চিত বিচ্যুতির ধাক্কা কাটিয়ে এই বইটি পাতে তুলবার যোগ্য হয়ে উঠলো। প্রথম দুটি বাদে বাকি সবগুলো গল্পই একই সময়ে শেষ হয়েছিলো, এবং প্রতিটি গল্পের সাথেই তাদের শুরুর তারিখ লেখা আছে। এমনকি বইয়ের গল্পগুলোও আমার নোটখাতায় যেভাবে আছে, ঠিক সেই ক্রমানুসারেই সাজানো হয়েছে।
আমি সব সময়েই মনে করি যে, প্রত্যেক গল্পের সর্বশেষ রূপটাই তার ঠিক আগের অবস্থার চেয়ে শ্রেয়তর। তাহলে কেউ কী করে জানবে যে কোন রূপটি চূড়ান্ত? ঠিক যেভাবে রাঁধুনী জেনে যায় তার স্যুপ কখন প্রস্তুত, এটা তেমনই একটা গোপন পেশাগত কৌশল যা কোন নিয়ম বা কারণ মেনে চলে না, বরং সহজাত প্রবৃত্তির জাদুবলে জেনে ফেলা যায়। যাহোক, পরে অনুতাপ করতে হবে এই আশংকায় আমি আমার কোন বইই আর পড়ে দেখি না, তেমনি এই গল্পগুলোও পরবর্তীতে আর পড়িনি। নতুন পাঠকেরাই ভাল জানবে এদের নিয়ে কি করা উচিৎ। যদি আশ্চর্য এই তীর্থযাত্রীদের শেষমেষ ময়লার ঝুড়িতেই আশ্রয় নিতে হয়, সৌভাগ্যক্রমে সেটিও তাদের জন্যে ঘরে ফেরার আনন্দই বয়ে আনবে।
গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ
কার্টাহেনা দে ইনডিয়াজ
এপ্রিল, ১৯৯২।
তো শেষ হলো এই পথ চলা, অবশেষে। এবারের অংশটুকু লিখে আমি প্রায় সপ্তাখানেক ফেলে রেখেছি। প্রতিদিন একবার করে এসে একটা দুটা শব্দ বদলে দিতাম। যেটাকে সবচেয়ে ঠিক মনে হতো, মনে হতো এইটুকু পরিবর্তনে সৌন্দর্যব্রৃদ্ধি ঘটবে, কিন্তু লেখার অঙ্গহানি ঘটবে না কোনমতেই। এই সময়টায় আমি মূল ইংরেজিটা পড়া থেকে বিরত থেকেছি। বার বার বাংলাটুকু পড়ে পড়ে একধরণের কোমলতা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছি। নিজের কাছে একটা তাড়া ছিলো দ্রুত একটা সমাপ্তিতে পৌঁছার, তবু সেটা করিনি।
এই তীর্থযাত্রীদের গল্প বলতে এসে যখন শেষ দাড়ি টানলাম, আমি নিজেঅ সম্ভবত তীর্থে পৌঁছবার আনন্দই পেলাম। এবং অনুবাদে এই লেখাটা পড়তে গিয়ে আমার আরও মনে হলো, ইংরেজি পড়বার সময় এই লেখার অর্থটুকু বা বক্তব্য বুঝেছিলাম ঠিকই, কিন্তু আত্মীকরণ করা যাকে বলে সেটা ঘটলো এবারই, মানে পুরোপুরি বাংলায় পড়ার সময়।
একসাথে তিন পা হাঁটলে নাকি বন্ধু হয়ে যায়। তো ভাবছিলাম, আপনি আমি আর গ্যাবিতো মার্কেজ, এই যে এ কয়টা দিন ধরে গল্প করতে করতে এত লম্বা পথ হেঁটে এলাম, আমরাও তো বন্ধু হয়ে গেলাম! ব্যাপারটা বেশ আনন্দের। তাই না?
-
মু. নূরুল হাসান
২০/১০/২০০৯
-------------
পুনশ্চঃ
কেউ পুরো লেখাটা একসাথে পড়তে চাইলে-
অখন্ড সংস্করণ।
কৃতজ্ঞতা যাদের কাছেঃ
১। গ্যাবিতো মার্কেজ এবং আমার এলাকার স্থানীয় লাইব্রেরি
২। অভিধান ডট অরগ
৩। নজরুল (ইসলাম) ভাই, তাঁর অসাধারণ টাইপিং দক্ষতা এবং ভীষণ সুন্দর মন।
৪। আলী আহমেদের বাংলা অনুবাদ
৫। সচলায়তনের সব পাঠক, যারা আমার আলসেমীকে একদমই মাথায় চড়তে দেননি।
Friday, October 10, 2008
আশ্চর্য তীর্থযাত্রীরা ০৩
এখানে আমি বিরাট কারচুপি করলাম আবারও। বারবারই এই নতুন দ্বন্ধের সাথে আমার পরিচয় ঘটছে। পড়ে যা বুঝছি, মাথায় যেটা থাকছে, অনুবাদিত বাংলায় সেটা আসছে না। আরও অনেক ভাবা দরকার আমার বুঝতে পারছি, কিন্তু ধৈর্য্যে কুলাচ্ছে না। এটাকে চূড়ান্ত করবার আগে অবশ্যই আমার এ ব্যাপারগুলো নিয়ে আবার বসতে হবে। অথবা না-ও বসতে পারি। যেমন আছে তেমনই থেকে যেতে পারে।
আমার নিজের প্রতিক্রিয়া আমাকে বিস্মিত করলোঃ যে বিষয়গুলো আমি প্রায় চার বছর ধরে ভুলে বসে আছি সেগুলোই আমার সম্মানের রক্ষার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। যে কোন মূল্যেই তাদের পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে উদ্যোগ নিলাম, এবং লেখালেখির মতই কষ্টসাধ্য শ্রম দিয়ে আমি প্রায় ত্রিশটি গল্পের বিষয়গুলোকে আবারো লিখতে সমর্থ হলাম। মনে করে করে লিখবার এই প্রক্রিয়াটি অনেকটা পরিশোধন প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করছিল। এ কারণেই যে গল্পগুলো উদ্ধার করা অসম্ভব মনে হচ্ছিলো, আমি তাদের নির্দয়ভাবে বাদ দিয়ে দিয়েছি এবং শেষ মেষ আমার হাতে গল্প বাকি রইলো আর আঠারোটি। এবার আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলাম যে কোন বিরতি ছাড়াই সবগুলো গল্প আমি লিখে ফেলবো, কিন্তু শিগগিরই আমি ওদের প্রতি আবারো উৎসাহ হারিয়ে ফেললাম। এবং নতুন লেখকদের আমি সাধারণত যে উপদেশ দিই, নিজে করলাম তার ঠিক উল্টোটা, আমি সেগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম না। তার বদলে যদি কখনো কাজে লাগে, এই ভেবে আমি তাদের ফাইলবন্দী করে রাখলাম।
১৯৭৯ সালে আমি যখন Chronicles of a Death Foretold লিখতে শুরু করি, তখন নিশ্চিত হলাম যে দুই বইয়ের মাঝের সময়টাতে আমি লেখার অভ্যাস হারিয়ে ফেলি, এবং আবার নতুন করে শুরু করাটা ক্রমশই আমার জন্যে কঠিনতর হতে থাকে। এ কারণেই ১৯৮০ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৮৪ এর মার্চ মাস পর্যন্ত আমি প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন দেশের পত্রিকার জন্যে একটি করে মন্তব্য-প্রতিবেদন লিখবো বলে ঠিক করলাম, অনেকটা লেখার অভ্যাসটাকে জিইয়ে রাখার জন্যেই। সে সময় আবার আমার হঠাৎই মনে হলো নোটখাতার এই বিষয়গুলো পুরোপুরি সাহিত্য-ধাঁচের নয়, এবং এদের গল্পের চেয়ে সংবাদপত্রের নিবন্ধ হিসেবেই বেশি মানাবে। সুতরাং নোটবইয়ের বিষয়বস্তু দিয়ে পাঁচটি মন্তব্য-প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরে আমি আবারও মত বদলালাম, মনে হলো তারচেয়ে ভাল হবে চলচ্চিত্র হিসেবেই। ঠিক এভাবেই পাঁচটি চলচ্চিত্র এবং একটি টেলিভিশন ধারাবাহিক তৈরি হয়েছিলো।
এই পর্যন্ত অনুবাদ করে ফেলার পর আমার হাতে এই লেখাটারই আরেকটা বাংলা অনুবাদ চলে এলো নজরুল ভাইয়ের কল্যাণে। আলী আহমেদের করা এই অনুবাদটার খোঁজ জানার পরে নজরুল ভাইয়ের কাছে চাইতেই উনি সাঙ্ঘাতিক একটা কাজ করলেন, পুরো অনুবাদটা আমাকে কম্পোজ করে পাঠিয়ে দিলেন! আমি রীতিমতন বিস্ময়াভিভূত!
আরেকটা অনুবাদের উপস্থিতি আমাকে বেশ খানিকটা অলস বানিয়ে ফেললো, ভাবছিলাম আর নাই বা করি। কিন্তু আবার মনে হচ্ছিলো, একেবারে অসমাপ্ত রাখাটাও ঠিক হবে না। শুরু যখন করেইছি, শেষ করে ফেলা যাক।
আলী আহমেদের অনুবাদটা পড়া শুরু করলাম। দু প্যারা পড়ার পড়েই বেশ সাবধান হয়ে গেলাম। ঠিক করলাম, আমার যেটুকু শেষ হয়েছে, কেবল সেটুকু পর্যন্তই আলী আহমেদের অনুবাদটি পড়বো, তার বেশি নয়। তবে পড়তে গিয়ে আমার জন্যে আসলে বেশ ভালই হলো, বেশ কিছু অংশে আমার অল্প-বিস্তর খটকা দুর হয়ে গেলো। আমার মনে হলো, পুরোটা অনুবাদের কাজ শেষ করে যদি আরেকবার আমার লেখাটাকে ঘষামাজা করে দাঁড় করাতে চাই, তাহলে আলী আহমেদের অনুবাদটি আমার বেশ কাজে আসবে।
আগে মাথায় আসেনি এরকমটা হবে, তবে শেষে তাই হলো যে চলচ্চিত্র আর সাংবাদিকতার কাজ গল্পগুলো নিয়ে আমার ধারণা কিছুটা পাল্টে দিলো। এবং যখন এদের চুড়ান্ত রূপ দিলাম, তখন চিত্রনাট্য লেখার সময়ে পরিচালকদের দেয়া আইডিয়াগুলো থেকে আমার নিজের আইডিয়াগুলোকে খুবই সতর্কতার সাথে আলাদা করে নিলাম। বাস্তবিক, পাঁচজন ভিন্ন ভিন্ন পরিচালকের সাথে কাজ করতে গিয়ে গল্পগুলো লিখে ফেলা নিয়ে আমি আলাদা একটি পদ্ধতি পেয়ে গেলামঃ অবসর পেলেই আমি একটা গল্প লিখতে শুরু করতাম, ক্লান্ত হয়ে পড়লে বা হঠাৎ আর কোন প্রকল্পে ব্যস্ত হয়ে পড়লে তখুনি তা থামিয়ে দিতাম, এবং তারপরে অন্য আরেকটা গল্প শুরু করে দিতাম। এক বছরের কিছু কম সময়ের মধ্যে আঠারোটির মধ্যে ছয়টি গল্পই ময়লার ঝুড়িতে জায়গা করে নিলো, তাদের মধ্যে একটি আবার ছিলো আমার নিজের শেষকৃত্যের গল্প নিয়ে, কারণ স্বপ্নের উদ্দাম আনন্দটুকু আমি কিছুতেই লেখায় তুলে আনতে পারছিলাম না। যাই হোক, বাকি গল্পগুলো দীর্ঘ যাত্রার জন্যে তৈরি হয়ে গেলো।
এই ছোট্ট অনুবাদের কাজটি করতে গিয়ে আমি আনমনেই নিজের জন্যে একটা, যাকে বলে, কার্যপ্রণালী ঠিক করে ফেলেছিলাম। মানে হেন করবো, কিন্তু তেন করবো না। বা এটা এড়িয়ে চলবো, কিন্তু ওটা ঠিকাছে।
তো, শেষ প্যারাটায় আমি নিজের বানানো কার্যপ্রণালী বেশ কিছু জায়গায় অমান্য করলাম। শেষের দুটি লাইন প্রথমে আক্ষরিক অনুবাদের পরে আমার সেগুলোকে ভিনগ্রহী ভাষা বলে মনে হচ্ছিলো। মানে, আলাদা করে শব্দগুলো বাংলাই, কিন্তু সব মিলিয়ে সেগুলো আসলে কোন অর্থ দাঁড়া করছে না। তাই বাক্যগুলোকে অর্থবহ করার জন্যে, আমি প্রথমে আক্ষরিক অনুবাদ করে ফেলে, ইংরেজী মূল বাক্যটাকে পুরোপুরি ভুলে গিয়ে বাংলা বাক্যটাকে নিয়েই কিছুক্ষণ লোফালুফি চালালাম, শব্দ এদিক ওদিক করে বা প্রতিশব্দ বসিয়ে শেষমেষ অর্থবহ করা গেলো।
একই সাথে আরেকটা কাজ করলাম, এই লোফালুফি পদ্ধতিটাকে আমার অদৃশ্য কার্যপ্রণালীর নতুন একটা পয়েন্ট হিসাবে যুক্ত করে দিলাম।
এই বইয়ের গল্পগুলোই ওই বাকি বারোটি গল্প। আরও দুবছর ধরে অল্প অল্প ঘষা-মাজার পরে গত সেপ্টেম্বরে এগুলো ছাপার জন্যে তৈরি হয়ে গেলো। এবং যদি চুড়ান্ত মুহুর্তে মনে জন্ম নেয়া একটি সন্দেহ আমাকে যন্ত্রণা না দিতো, তাহলে ওখানেই তাদের ময়লার ঝুড়িতে যাওয়া-আসার সীমাহীন অভিযাত্রার সমাপ্তি ঘটতো। যেহেতু গল্পগুলোয় আমি মূলত স্মৃতি থেকে ইউরোপিয়ান শহরগুলোর বর্ণনা দিয়েছি, আমার একটু যাচাই করে নেবার ইচ্ছে হলো যে বিশ বছর পরে স্মৃতি নির্ভুল ছিলো কি না। সুতরাং অতিসত্বর আমি বার্সেলোনা, জেনেভা, রোম এবং প্যারিসের সাথে আগের পরিচয় ঝালাইয়ের উদ্দেশ্যে জায়গাগুলো ঘুরে দেখে এলাম।
এই প্যারাটা লিখবার পরে বিরাট একটা ঝামেলা হয়ে গেলো। বাংলায় এটুকু পড়ার পরে নতুন একটা চিন্তা মাথায় এলো, মার্কেজ পুরো লেখাটায় মূলত গল্পগুলোর গল্প হয়ে ওঠার যাত্রাটুকু বর্ণনা করেছেন। শুরুতে গন্তব্য বিবেচনায় এটাকে তীর্থযাত্রা ভেবে নিতেই ভাল লাগছিলো, কিন্তু এখন আবার মনে হচ্ছে, যদি যাত্রাপথের বর্ণনাই অভীষ্ট হয়, তাহলে এদের অভিযাত্রী বলাটাই ভাল হবে কি না?
নাহ, এখনো বুঝছি না, পচুর গিয়ানজাম মনে হচ্ছে!
( ক্রমশঃ)
Monday, October 06, 2008
আশ্চর্য তীর্থযাত্রীরা -০২
এবারে একদম ঘেঁটে গেলো, খুবই দুর্বল হয়ে গেল এই বাংলাটা। পুরোটা পড়ে ফেলবার পরে আবার অবশ্যই এই লাইনটার কাছে একবার ফিরে আসতে হবে বলে মনে হচ্ছে।
আমি জানি না কেন, কিন্তু আমি সেই দৃষ্টান্তমূলক স্বপ্নটিকে আমার নিজস্ব সত্তার বিবেকীয় পরীক্ষা হিসেবেই ব্যাখ্যা করলাম, এবং আমার মনে হচ্ছিলো ইউরোপে ল্যাটিন আমেরিকানদের সাথে যে আজব ব্যাপারগুলি ঘটে সেসব নিয়ে লেখার জন্যে এটা একটা উৎকৃষ্ট সময়।
নাহ, এবারেও হলো না পুরোপুরি। মূল কথাটা বুঝতে পারছি, কিন্তু লেখায় সেটা আনতে পারছি না কিছুতেই। আরেকটা কথা, এটা এভাবে বাংলা করে করে পড়তে গিয়ে মনে হলো, বাংলা শব্দভান্ডার আমার ভষণ কম! এরকম অনুবাদ জাতীয় খেলাধূলা সম্ভবত প্রায়শই করা উচিত, শব্দভান্ডার বাড়াবার প্রয়োজনে।
এটা আমার জন্যে বেশ উৎসাহব্যাঞ্জক ছিলো, কারণ আমি মাত্রই আমার সবচেয়ে কঠিন এবং রোমাঞ্চকর লেখা The Autumn of The Patriarch শেষ করেছি, এবং আমি জানতাম না তারপরে আমার কি করা উচিৎ।
দু বছর ধরে গল্পের বিষয়বস্তু হিসেবে ভাবা যায়, এরকম যা কিছু ঘটছিলো আমার সাথে আমি সেসব টুকে রাখছিলাম, কিন্তু আমি জানতাম না সেসব নিয়ে আমি কি করবো। যে রাত থেকে লিখতে শুরু করেছিলাম, বাড়িতে তখন আমার নিজের কোন নোটখাতা না থাকায় আমার বাচ্চারা তাদের খাতা আমাকে ধার দিয়েছিল লিখবার জন্যে। এবং প্রায়শই ভ্রমণে গেলে তারাই তাদের ইশকুলব্যাগে সেই খাতা বয়ে বেড়াত, সেটা হারিয়ে যাবে এই ভয়ে। আমি সব মিলিয়ে চৌষট্টিটি গল্পের আইডিয়া জমিয়েছিলাম এবং প্রতিটাই এত পুঙখানুপুঙখ বর্ণনা সহ যে, আমার কেবল সেগুলো লিখে ফেলাটাই বাকি ছিলো!
১৯৭৪ সালে, আমি যখন বার্সেলোনা থেকে মেক্সিকোয় ফিরে এলাম, এটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে এলো যে শুরুতে যেমন এই খাতাটিকে একটি উপন্যাস হিসেবে মনে হচ্ছিলো, আসলে এটি তা ছিলো না। বরঞ্চ এটিকে একটি ছোট গল্প সংগ্রহ বলা চলে, যেগুলো মূলত জার্নালিস্টিক বাস্তবতার উপরে ভিত্তি করে লেখা, কিন্তু কাব্যের বিচক্ষণ কৌশল দিয়ে তাদের নশ্বরতা থেকে উদ্ধার করা সম্ভব। ইতিমধ্যেই আমার তিনটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়েছে, যদিও তাদের কোনটিই পুরোপুরি একসাথে মাথায় আসেনি বা লেখাও হয়নি। বরং ঘটেছে তার উল্টোটাই, প্রতিটি গল্পই আলাদা আর অনিয়মিত ভাবে তৈরি। তাই এটা অবশ্যই আমার জন্যে বেশ রোমাঞ্চকর অভিযান হয়ে উঠবে যদি আমি এই চৌষট্টিটি গল্প এক বসায় লিখে ফেলতে পারি, একটা নিজস্ব ঐক্যবদ্ধ সুর আর রীতিতে, যেন পাঠকদের স্মৃতিতে তারা অবিচ্ছেদ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
আমি ১৯৭৬-এ প্রথম দুটি গল্প লিখে ফেললাম- "the trail of your blood in the snow" আর " miss Forbes's summer of happiness"- এবং খুব তাড়াতাড়িই তারা কয়েকটি দেশের বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকায় প্রকাশিত হলো। আমি কোন বিরতি ছাড়াই লিখে চলেছিলাম, কিন্তু আমার তৃতীয় গল্পটি লিখবার সময়, যেটি কিনা আমার শেষকৃত্য নিয়ে লেখা, আমি ভীষণ ক্লান্তি বোধ করলাম, এমনকি কোন উপন্যাস লেখার চেয়েওবেশি ক্লান্ত। চতুর্থ গল্পটি লেখার সময়ও একই ব্যাপার হলো। সত্যি কথা বলতে কি, সেগুলোকে শেষ করার মত শক্তি পাচ্ছিলাম না। এখন আমি জানি কেন সেটা হয়েছিলোঃ ছোটগল্প লেখা শুরু করার শ্রম একটি উপন্যাস শুরুর মতই তীক্ষ্ণ, যেখানে প্রায় সব কিছুই প্রথম প্যারাগ্রাফে বলে দিতে হয়, এটার গঠন, সুর, ভঙ্গী, ছন্দ, দৈর্ঘ্য এবং কখনো কখনো কোন একটা চরিত্রের ব্যাক্তিত্বও বর্ণনা করতে হয়। বাকি থাকে কেবলই লেখার আনন্দ, সেই নির্জন আর অন্তরঙ্গআনন্দ যা কেউ কেবল কল্পনাই করতে পারে। এবং বাকি জীবনটা যদি কারো উপন্যাস কাঁটাছেড়া করতে করতে না শেষ হয়, সেটা কেবল সম্ভব যদি শুরুর উদ্যমটুকু উপন্যাস শেষ করার মুহুর্ত পর্যন্ত ধরে রাখা যায়। কিন্তু একটা গল্পের কোন শুরু নেই, শেষ নেই।
একটানা অনেকটুকু পড়ে ফেলা গেলো আবারো। আর পড়তে গিয়ে এবারে সত্যিই মনে হয় ইংলিশ-টু-বাংলা ট্রান্সলেশান পড়ছি। ব্যাপারটা আমি খেয়াল করেছি। বাংলা আর ইংরেজির বাক্যগুলোর গঠন মূলত আলাদা। এখন বাক্য ধরে ধরে অনুবাদ করতে গেলে এই ইংরেজি ভাবটুকু থেকেই যায়, এড়াবার উপায় নাই। কিন্তু যদি এই ফরম্যাট ভেঙ্গে ফেলি, অর্থ্যাৎ যদি বাংলা বাক্যের গঠন অনুযায়ী অনুবাদ করি, তাহলে খাঁটি বাংলা ভাব আসবে ঠিকই, কিন্তু তাতে গল্পকারের লেখার ভঙ্গীটা অটুট থাকবে কি না সেটা একটা বিরাট চিন্তার বিষয়।
এটা কখনো কাজ করে, কখনো করে না। যদি না-ই করে, তবে আমার নিজের ও অন্যদের অভিজ্ঞতা বলে, সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর উপায় হচ্ছে অন্য কোন দিক থেকে গল্পটা শুরু করা, অথবা গল্পটা ময়লা ফেলার ঝুড়িতে ছুড়ে ফেলে দেয়া। কেউ একজন, আমি জানি না কে, এই স্বস্তিদায়ক মন্তব্য করেছিলেন, " ভালো লেখকেরা তাদের প্রকাশিত লেখার চেয়ে বেশি অভিনন্দিত হয় সেসব লেখার জন্যে, যেগুলো তারা ছিঁড়ে ফেলে।" এটা সত্যি যে আমি লেখার প্রথম খসড়া বা নোট ছিঁড়ে ফেলে দিতাম না, তবে মাঝে মাঝে তার চেয়েও খারাপটা করতাম, লেখাটাকে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে দিতাম।
একটা নির্ভুল অনুবাদের ইচ্ছে থেকে এই কাজ শুরু করিনি আমি, আমার বরং ইচ্ছে হচ্ছিলো এই চমৎকার লেখাটাকে কোনভাবে বাংলায় লিখে রাখতে, যেন হুট করে অনেকদিন পরে যদি কখনো এই লেখাটাকে পড়তে ইচ্ছে করে, তখন যেন হাতের কাছে পাই লেখাটা। কিন্তু অনুবাদে অভ্যাস না থাকায় আমি বোধহয় খানিকটা হাঁপিয়ে উঠেছি। এদিকে আবার খুব দ্রুতই শেষ করার অস্থিরতা পেয়ে বসেছে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে দিল্লী বহুত দুর- এখনো!
নিজে মরতে চাইলে মরুন, দয়া করে অন্যদের মারবেন না-

ঊনিশ বছর বয়েসী এই ছেলেটির নাম পুনিত। ভারতীয় ছেলে, ছাত্র হিসেবে পড়তে এসেছে অস্ট্রেলিয়ায়। অনুতাপে ভরা এই কমবয়েসী মুখখানা দেখে অনেকেরই মনে মায়া জাগছে জানি, কিন্তু আমার জাগছে না, বদলে কেবলই তীব্র রাগ হচ্ছে ভেতরে।
এই ছেলেটি দুদিন আগে গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ে, ফলাফল- একজন পথচারী ওখানেই নিহত, অন্যজন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে।
আমি জানি, দুর্ঘটনা দুর্ঘটনাই, কারও হাত নেই সেখানে। কিন্তু দুর্ঘটনার পেছনে যদি থেকে থাকে কারো দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, কি বলবেন তখন?
পুনিত নামের এই ছেলেটি সেদিন রাতে তার কলিগদের সাথে পার্টি শেষ করে গাড়ি চালিয়ে ফিরছিলো শহরে। পার্টিতে চার বোতল স্কচ আর কোলা পান করে সে। ফিরবার পথেই দুর্ঘটনায় পড়ে, গাড়ি নিয়ে সোজা ধাক্কা দেয় রাস্তার পাশের গাছে, তারপরে ট্রাফিক লাইটে, অতঃপর পাশের হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মানুষের ওপরে পড়ে তার গাড়ি। তাদের একজন নিহত হলেও পুনিত প্রাণে বেঁচে গেছে।
পুলিশের জেরায় পুনিত শুনিয়েছে এক অদ্ভুত কাহিনি। সে বলেছে, গাড়ি চালানোর সময় তার চোখ ব্যথা করছিলো, খানিকক্ষণ চোখ বুজেও (!!) ছিল সে, চোখ খুলতেই দেখে গাড়ির সামনে কোথা থেকে একটা বিড়াল এসে পড়েছে, সেটাকে বাঁচিয়ে পাশ কাটাতে যেতেই ঘটে দুর্ঘটনা।
এই কথার সত্য মিথ্যা জানা যায়নি।
পুলিশ তার রক্ত পরীক্ষা করে তাতে এলকোহলের মাত্রা পেয়েছে দশমিক ১৬৫। যেখানে আইনী সীমা মাত্র দশমিক শূন্য পাঁচ। প্রায় তিনগুণ। পুলিশি তদন্তে আরো জানা গেছে, সর্বোচ্চ ৬০কিমি/ঘন্টা স্পিড জোনে পুনিত তখন গাড়ি চালাচ্ছিলো ১৫০ কিমি/ঘন্টায়!
মনের ভেতর থেকে একটা তীব্র গালিই শুধু বেরিয়ে আসছে কেবল- ব্যাটা আহাম্মক!
*
যে ছেলেটি মারা গেছে তার নাম ডিন হফস্টি। গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলো সে, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে এসেছিলো নিজ শহর থেকে মেলবোর্নে। এসে, লাশ হয়ে ফিরে গেল বাবা-মায়ের কাছে।
ডিনের বাবা-মায়ের দুঃখভরা কথামালা ছাপা হয়েছে পত্রিকার পাতায়। তার আত্নীয়েরা বলছে, ভীষণই প্রাণবন্ত ছিলো ডিন, ও ছিলো লার্জার দ্যান লাইফ।
*
পুনিতেরও পেছনের গল্প আছে একটা আমি জানি। সে গল্প শুনলে হয়তো আমার মনেও খানিকটা দয়া হবে তার জন্যে, মনে হবে, আহা বেচারা।
কিন্তু আমি কিছুতেই সেই গল্প শুনতে চাই না, তার প্রতি মায়া জন্মানোর কোন ইচ্ছে আমার নেই।
পুনিত নিজেও খুব অনুতপ্ত, বলছে, বাবা-মাকে মুখ দেখাতে পারবে না।
বলছে, নিহত মানুষটির পরিবারের কাছে সে ক্ষমাপ্রার্থী।
বলেছে, আর কখনই সে গাড়ি চালাবে না।
কিন্তু এ সবের আর কোনই কি মানে আছে আর এখন? একটা মানুষের জীবন শেষ করে দিয়ে তার এই যে উপলব্ধি, এর কি-ই বা মূল্য আছে ডিনের বাবা-মার কাছে?
নেই, কোন মূল্য নেই, কচুটিও নেই। আমি জানি। বুকের মানিককে উপড়ে মেরে ফেলে, এইসব মধুবর্ষী কথাবার্তায় আর মধু খুঁজে পাওয়া যায় না, কেবলই বিষের মতন লাগে।
*
ডিনের বাবা-মার জন্যে এই অখ্যাত বাংলাদেশী ছদ্মনামী ব্লগারের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা রইলো। তিনবছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে হারানোর বেদনায় বুক ভেঙেছিলো আমারও, আপনাদের কষ্ট আমি সম্ভবত বুঝতে পারি।
*
আর সবাইকে বলি, মদ খান গলা ডুবিয়ে, আমাদের আপত্তি নেই। মাতলামি করুন, আমরা গেলাস ঠুকে বা না ঠুকেই শুভেচ্ছা জানাবো- চিয়ার্স।
কিন্তু মাতাল হয়ে দয়া করে গাড়ি চালাবেন না।
দুর্ঘটনা, দুর্ঘটনাই থাকুক, সেটাকে কাছে ডেকে না আনলেই আমরা খুশি হবো।
খুব ইচ্ছে হলে নিজে গিয়ে লাফিয়ে মরুনগে কোন দশতলা দালান থেকে, কিন্তু দয়া করে, মাতাল হয়ে গাড়ি চালিয়ে আমাদের মারবেন না।
ছবিঃ দি অস্ট্রেলিয়ান/ হেরাল্ড সান ।
Saturday, October 04, 2008
আশ্চর্য তীর্থযাত্রীরা -০১
পিলগ্রিমসের দুইটা মানে করা যায়। এক হলো পর্যটক, বা অভিযাত্রীও বলা যায়। অন্যটা হলো তীর্থযাত্রী। আমি ভাবছিলাম, এই বইয়ের বাংলানুবাদ কেউ যদি করতে চায়, কোন মানেটা বেছে নেবে?
ঠিক এই নামে বইয়ে কোন গল্প থাকলে খানিকটা সুবিধা হতো। তখন গল্পের গল্প বা ভাবগতিক দেখে বুঝে নেয়া যেত, অভিযাত্রা নাকি তীর্থযাত্রা, কোনটা আসল উদ্দেশ্য।
আমি অবশ্য ভেবে নিলাম, তীর্থযাত্রা-ই ভাল শোনাবে। কল্পনাটা এরকম যে, গল্পগুলো নানান চরিত্র, তাদের বর্ণনা এবং এইসব বিবরণের প্রয়োজনে একগাদা বাক্যের সমষ্টি- এই পুরো ব্যাপারটা শেষ-মেষ যেখানে যেতে চাইছে, সেটা হলো- একটা গল্প হয়ে ওঠা। অনেকটা তীর্থ-দর্শনের প্রতিজ্ঞা নিয়েই যেন গল্পগুলোর এগিয়ে যাওয়া। এইরকম ভাবনা মাথায় এনে আমি নিজের মনেই রায় দিলাম- স্ট্রেইন্জ পিলগ্রিমসের ঠিকঠাক বাংলা করতে বললে, আমি এটাই বলবো- আশ্চর্য তীর্থযাত্রীরা।
বইয়ের গল্পগুলো পড়তে গিয়ে ভাল-মন্দ দুইই লাগছিলো। তবে সে সব নিয়ে আলাপ করা আমার উদ্দেশ্য নয় এখন। ঘটনা হলো, বইয়ের শুরুতে লেখক কর্তৃক লিখিত ভূমিকাটুকু পড়ে চমৎকার লেগেছিলো, এবং পড়তে পড়তেই ভাবছিলাম এটাকে বাংলা করে ফেললে কেমন হয়?
কেমন যে হয়, সেটা আসলেই চিন্তার বিষয়। অনুবাদ কখনো করিনি, অবশ্যই ইশকুলের ব্যাকরণ পরীক্ষার খাতা বাদে। আর, মার্কেজের লেখা বা এ জাতীয় ভাবগম্ভীর লেখা-পত্র নিয়ে এই দুঃসাহস দেখাতে গেলে আমার অল্পবিদ্যা ফাঁস হয়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা আছে। পিস অব কেইক-কে আমি সত্যিই পিঠার টুকরো লিখে বসতে পারি। এইসব ভেবে টেবে বুঝে নিলাম, অনুবাদ আসলে আমাকে দিয়ে হবে না মনে হয়, যেটা হবে, তা হলো, এই যে পড়লাম, এই পড়া নিয়েই খানিক্ষণ বসে বসে গ্যাজানো আর কি!
যা বলছিলাম, এই বইটির মোট বারোটি গল্পের অন্তত তিনটি আমার কাছে চমৎকার লেগেছে, দুইটি একেবারেই ভাল লাগেনি আর বাকি সাতটি মোটামুটি। এইরকম নানান স্বাদ পাবার পেছনের কারণগুলি নিয়ে লিখতে পারলে খুব ভাল হতো, আলস্য কাটিয়ে কখনো যদি সময় পাই, লিখে ফেলবো বলে আশা করি, তবে আপাতত সেই প্রসংগ থাক, ভূমিকায় ফিরে আসি।
লেখক ভূমিকারও একটা শিরোনাম দিয়েছেন, এবং সেটাও বেশ কৌতুহলদ্দীপক। শিরোনাম হলো- কেন বারোটি, কেন গল্প, আর কেনই বা তীর্থযাত্রী?
এই শিরোনাম নিয়ে ভাবতে গিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়লাম। সম্ভবত এই প্রথম আবিষ্কার করলাম, বাংলা আর ইংরেজি এই দুই ভিন্ন ভাষায় বহুবচনের আচরণ বেশ আলাদা। ঠিকঠাক অর্থ বুঝে নেয়া যায়, কিন্তু লিখতে গেলে বেশ ভাবনায় ফেলে দেয়। যেমন - গল্পের বইয়ের নাম আমি "আশ্চর্য তীর্থযাত্রীরা" ভেবে নিয়েছি, পিলগ্রিমস এর বঙ্গানুবাদ হিসেবে, কিন্তু ভূমিকার শিরোনামে ওই একই পিলগ্রিমস-এর বিপরীতে তীর্থযাত্রীরা লিখতে মনে সায় দিলো না। এখানে মনে হলো, বহুবচনের বদলে একবচন ব্যবহার করাই ভাল হবে। তাই ঠিক করলাম, শিরোনামের বাংলা এভাবেই পড়বো- কেন বারোটি, কেন গল্প, কেনই বা তীর্থযাত্রী?
ভূমিকার শুরুতে লেখক সরল কিছু বক্তব্য দিয়েছেন। আমাদের পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের রীতি অনুযায়ী ব্যাপারটা কি এরকম "নামকরণের স্বার্থকতা" জাতীয় কিছু দাঁড়ায়? হয়তোবা। শুরুটুকু এরকম-
এই বইয়ের বারোটি গল্প লেখা হয়েছে গত আঠারো বছর ধরে। বর্তমান অবস্থায় পৌঁছবার আগে এদের পাঁচটি ছিলো জার্নালিস্টিক নোট ও চিত্রনাট্য, এবং একটি ছিলো টেলিভিশনের ধারাবাহিক। বছর পনের আগে একটি সাক্ষাৎকার রেকর্ডের সময় আমি আরেকটি গল্পের বর্ণনা দিয়েছিলাম, পরে যেটি আমার বন্ধু অনুলিখন করে ছাপিয়েছিলো, এবং এবারে আমি সেটিকে তার বর্ণনা অনুসারেই পুনর্লিখন করেছি। এই পুরো প্রক্রিয়াটাই আমার জন্যে একটা আশ্চর্য সৃজনশীল অভিজ্ঞতা, যেটা ব্যাখ্যা করা দরকার। দরকার একারণেই যে, আজকের শিশু-কিশোররা যারা লেখক হতে চায়, তারা বড় হয়ে জানতে পারবে লেখার অভ্যাসে কতখানি অতৃপ্তি ভর করে থাকে আর কতখানি ঘষা-মাজার প্রয়োজন হয় তাতে।
এইটুকু পর্যন্ত বাংলা করতে গিয়ে বেশ কয়েকবার সীমালংঘন করে ফেললাম। মার্কেজ প্রায়শই দীর্ঘ বাক্য ব্যবহার করেন, গল্পেতো বটেই, এমনকি ভূমিকাতেও তার ব্যাতিক্রম নয়। সেই দীর্ঘ বাক্যের সঠিক অনুভুতি বাংলায় আনতে গিয়ে আমি একটা বাক্যের মাঝখানে একটা দাড়ি বসিয়েছি, এবং ইংরেজিতে যেখানে পাশাপাশি দুটি শব্দ বসিয়েই একটা বিষয়কে বর্ননা করা হয়েছে, আমি সেখানে আলাদা ভাবে দুটি শব্দের তরজমা করে একটা দীর্ঘ বাক্যে রূপান্তর ঘটিয়েছি। এইরকম রকম কারিগরি অনুবাদে জায়েজ আছে কিনা কে জানে। যাকগে, আরেকটু এগুই, দেখা যাক কি হয়।
প্রথম গল্পটির পরিকল্পনা আমার মাথায় আসে সত্তরের দশকের শুরুতে, একটা প্রদীপ্ত স্বপ্নের ফলাফল হিসেবে, যেটি আমি দেখেছিলাম বার্সেলোনায় পাঁচ বছর থাকার পর।
এই লাইন নিয়ে একটু গোলমালে পড়েছিলাম। প্রথমবার পড়ছিলাম এভাবে যে, গল্পের পরিকল্পনা মাথায় আসে বার্সেলোনায় পাঁচ বছর থাকার পর একটা স্বপ্নের ফল হিসেবে। কিন্তু এভাবে পড়তে গিয়ে দেখি, গল্প আর স্বপ্নের মধ্যবর্তী দুরত্ব অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে, যেটা ভাবটাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তখন এদের দুরত্ব কমিয়ে আনলাম, একটার বদলে দুটি কমা দিলাম, এবং এইবার এই বাক্যের চেহারা আমার বেশ পছন্দ হলো।
আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম যে আমি আমার নিজের শেষকৃত্যে অংশ নিচ্ছি, গম্ভীর শোকাবহের পোষাকে বন্ধুদের সাথে হেঁটে বেড়াচ্ছি কিন্তু খানিকটা যেন উৎসবের মেজাজে। একত্র হতে পেরে আমাদের সবাইকেই খুব খুশী দেখাচ্ছিলো। এবং অন্য যে কারো চেয়ে বেশী খুশী ছিলাম আমিই, কারণ মৃত্যু আমাকে আমার ল্যাটিন আমেরিকার বন্ধুদের সাথে মিলিত হবার সুযোগ করে দিয়েছিলো, আমার সবচেয়ে পুরনো আর সবচেয়ে ভালো বন্ধুরা, যাদের আমি বহুদিন ধরে দেখি না। অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলে সবাই যখন বিদায় নিচ্ছিলো, আমিও চলে যেতে উদ্যত হলাম, কিন্তু তখন তাদের একজন আমাকে চূড়ান্তভাবে বুঝিয়ে দিলো যে আমার আনন্দ-অনুষ্ঠান ওখানেই শেষ। সে আমাকে বললো, " তুমিই একমাত্র ব্যক্তি যে এখান থেকে যেতে পারবে না।" আর কেবল তখুনি আমি বুঝতে পারলাম যে মরে যাওয়া মানে আর কখনোই বন্ধুদের সাথে একত্র হতে না পারা।
এই প্যারাটা বেশ তরতরিয়ে এগুলো দেখা যাচ্ছে, যদিও এবারই প্রথম আমি কমা দেবার পরিবর্তে মূল লাইন থেকে একটা কমা তুলে দিয়েছি। এবং এবারই প্রথম আমার খানিকটা সন্দেহ হলো, আমি কি এই লেখাটার অর্থ ঠিকঠাক ধরতে পারছি?
(ক্রমশঃ )