শুক্রবার, আগস্ট ১৫, ২০০৮

ঝুম্পার সাথে দেখা-

আগে থেকে কোন রকম প্ল্যানিং ছিলো না, অন্য কি একটা বই খুঁজতে গিয়ে এখানকার লোকাল লাইব্রেরীর কোন একটা শেলফে একদম হঠাৎই চোখে পড়লো বইটা। ইনটারপ্রেটার অব মেলাডিজ। বইটার নাম শুনেছি আগে, কিন্তু আমার তখন অন্য লেখকের বই শেষ করার চিন্তা মাথায়, তাই নিবো না ঠিক করে দরকারী বইটা সাথে নিয়ে লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে পার্কিং-এ পৌঁছে যাই, তারপর হঠাৎ কি মনে করে আবার ওখান থেকে ফিরে এসে বইটা ইস্যু করে ফেলি।

ঝুম্পার সাথে শেষ মেষ আমার দেখা হলো এইরকম আচমকাই, নেহায়েত অনিচ্ছায়, অনেকটা দুইটা কিনলে একটা ফাউয়ের স্টাইলে দোকান থেকে তুলে নেয়ার মত।

তো, এই পরিচয়টা নিবিঢ় হতে খুব বেশি সময় লাগলো না। একটু অবশ্য লাগলো। আমি শুরুতেই বইটা পড়লাম না। অন্য যে বইটা পড়ছিলাম, ওটা বেশ দীর্ঘ একটা উপন্যাস। পড়তে পড়তে ক্লান্তি চলে এলে আমি মাঝে মাঝেই অন্য লেখায় ডুব দেই। এরকম অনেকবার হয়েছে যে একসাথে আমি দুই বা তিনটে বইও পড়া শুরু করেছি, এবং প্রায় একই সাথে সবগুলো পড়া শেষ করেছি। আমার তাতে কোন সমস্যা হয় না। অনেক উল্টা পাল্টাও করি। মাঝে একবার ইলিয়াসের নেশায় পেয়েছিলো, তো পড়তে পড়তে মাথা মাঝে মাঝে ভোঁ ভোঁ করতো, তখন হাল্কা কি পড়া যায় ভাবতে ভাবতে টেনে নিয়েছিলাম সিডনি শেলডন। কাজ হয়েছে এই যে ইলিয়াস মাথায় জমে গেছে, সিডনির বইটা শেষ করেছি অবশেষে, তবে ভদ্রলোকের সাথে আর কখনো আমার সাক্ষাৎ হবে কি না সেরকম একটা সন্দেহ আমার রয়েই গেছে।

তো, ঝুম্পার ব্যপারটা এরকমও হতে পারতো। খানিকটা রিস্ক তো ছিলোই। যে বিশাল বইটা পড়ছিলাম, পড়তে গিয়ে থামতে হচ্ছিলো প্রচুর। এরকম আগেও থেমেছি বহুবার হুমায়ুন আজাদ পড়ার সময়। বেশ যন্ত্রণা পেতে হতো আজাদ পড়তে গেলে। আমি চিরকালই দেখেছি আজাদ পাঠে কোন আরাম নেই, তবে আনন্দ আছে, আবার সেই আনন্দটা যন্ত্রণাদায়ক আনন্দ, খানিকটা পারভার্টেড আনন্দও বলা যায়।

কথা সেটা না, বলছিলাম ঝুম্পার কথা। তো, পড়ার ক্লান্তি কাটাতে ঝুম্পা লাহিড়িকে টেনে নিলাম, নিয়ে বুঝলাম ভুল করিনি।

ইন্টারপ্রেটার অব মেলাডিজ সব মিলিয়ে নয়টি গল্পের একটা সংকলন। বিভিন্ন সময়ে নিউ ইয়র্ক ও তার বাইরের নানা পত্রিকায় গল্পগুলো ছাপা। ঝুম্পার বাংগালি ব্যাকগ্রাউন্ড শুনেও বোধকরি আমি আরেকটু আগ্রহী হয়েছি।

বইয়ের প্রথম গল্পের নাম "এ টেম্পোরারি ম্যাটার"। একটা ছোট নোটিশ দিয়ে গল্পের শুরু, নোটিশের বক্তব্য অনেকটা এরকম- অত্র এলাকায় আগামী পাঁচদিন সন্ধ্যার পরে ঘন্টা দুয়েকের জন্যে বিদ্যুত থাকবে না। ব্যাপারটা সাময়িক, পাঁচদিন পরে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।

এখানে, মেলবোর্নে, মাঝে মাঝেই এরকম সব নোটিশ পাওয়া যায় পোস্ট বাক্স হাতালেই, রাস্তার কাজ হবে বা পানির কাজ বা হাবিজাবি আর কিছু, সিটি কাউন্সিল থেকে জানায় আমার সমস্যার জন্যে তারা অনেক দুঃখিত, বা এরকমই সব।

তো, এইরকম একটা নোটিশ নিয়ে গল্পটা কতদুর এগোয়, এটা দেখতে গিয়ে আমি বেশ চমকে গেলাম। ঝুম্পা অনেকটা সুড়ঙ্গের মত করে একটা বাড়িতে আমাকে টেনে নিয়ে গেলো, যেন ঠিক সামনে থেকে ডেকে ডেকে, যেন হারিকেন হাতে করে পথ দেখিয়ে।
এক জোড়া ভারতীয় দম্পতির পাঁচদিনের জীবন নিয়ে সেই কাহিনি, যেখানে তারা অতীত নিয়ে ব্যাথাতুর হয়, ভবিষ্যতের ভাবনায় চমকে ওঠে পরস্পরকে ভালবাসে বা ঘৃণা করে।

এই গল্পটা পড়ার পরে আমি এইবার বইটা নেড়ে চেড়ে দেখলাম। বইয়ের ফ্ল্যাপে অনেক সমালোচকদের ভাল ভাল কথা লেখা আছে, বইয়ের প্রচ্ছদে কালো হরফে লেখা আছে বেস্ট সেলার। এইসব কথাগুলোকে অবশ্য আমি খুব একটা বিশ্বাস করি না, প্রায় সব বইয়েই ভাল ভাল কথা লেখা থাকে, সব বইই কেমন করে জানি বেস্ট সেলার হয়ে যায়।

দ্বিতীয় গল্পটা আরও একটা চমক আমার জন্যে। গল্পের নাম- হোয়েন মি.পীরজাদা কেইম টু ডাইন। চমকাবার কারণ- এই গল্পের পটভূমি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ, তবে ঢাকা নয়। নিউইয়র্কে পড়াতে বা পড়তে যাওয়া কোন এক বাংলাদেশির গল্প এটা, যার নাম পীরজাদা। যুদ্ধের পুরোটা সময় এই ভদ্রলোক পরবাসে বসে কি এক অস্থিরতায় দিন কাটিয়েছেন, তারই গল্প এটা। আমার খুবই ভাল লাগল গল্পটা। সরাসরি যুদ্ধের তেমন কোন বর্ণনা নেই, তবু এটা একরকম আমাদের যুদ্ধেরই গল্প।

বাকি গল্পগুলোর প্রতিটিই বেশ চমৎকার। এ রিয়েল দারওয়ান- যেমন। এই গল্পটার ভঙ্গি অনেকটা রূপকথার গল্পের মতন। একদম শুরুটুকু পড়েই শেষটুকু জেনে গিয়েছিলাম যে কী হবে, তবু ঝুম্পার কাছ থেকে শোনার লোভেই পুরোটা পড়ে গেছি। অথবা "সেক্সি"- ছোট্ট এক বাচ্চার চোখে নিজেকে দেখার চেষ্টা। "মিসেস সেন'স", প্রবাসে থাকেন ভদ্রমহিলা, কিন্তু কিছুতেই গাড়ি চালানোটাকে বাগে আনতে পারছেন না, এই অদ্ভুত মনোদৈহিক টানাপোড়েন। বাকি গল্পগুলোও বেশ।

আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে- যে গল্পটার নামে বইটার নাম- সেই ইন্টারপ্রেটার অব মেলাডিজ গল্পটাই।
ভারতে বেড়াতে যায় এক দম্পতি, তাদের ট্যুর গাইডের পার্ট-টাইম জব হচ্ছে স্থানীয় এক ডাক্তারের সহকারী হিসেবে কাজ করা। ডাক্তার লোকাল ভাষা বুঝে না, রোগীরা তাই এসে তার কাছে রোগের বর্ণনা দেয়, আর ট্যুর-গাইড সেটাকে ইন্টারপ্রেট করে বলে ডাক্তারকে। এই অদ্ভুত দোভাষীর চাকরির কথা আমি কখনো শুনিনি। এটা জানাটা একটা আবিষ্কারই বটে। তারপরে গল্পের বুনোটে আরও বেশি জমে গেছি।

সব পড়ে টড়ে ভীষণই ভাল লাগলো। খুব ঝুট ঝামেলা নেই বর্ণনায়। চরিত্রের ভিড় ভাট্টা নেই। এমন করে গল্প বলে ঝুম্পা যেন আমাদের ঠিক পাশের বাড়ির মানুষদের গল্পই বলছে, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে নামতে যাদের সাথে প্রায় প্রতিদিনই দেখা হয় আমাদের। এবং গল্প বলায় কোন জমাটি মেজাজ নেই। আসরে বলার মত করে গল্প বলা নয় সেটা। বরং- ব্যস্ততায় ছুটে যাবার ফাঁকে পরিচিতের সাথে যখন দেখা হয়, তখন দম ফেলার ফাঁকে হাত ধরে চট করে কুশল জিজ্ঞেস করার মত করে গল্প বলে যাওয়া- এমনই নির্লোভ নিপাট বর্ণনা।

সম্ভবত এই প্রথম বইয়ের মলাটে লেখা কোন একজন সমালোচকের একটা কথা আমার পছন্দ হলো। তিনি বলেছেন, ঝুম্পার গল্পগুলো এমনই যে পড়া শেষ করে ঠিক পাশের লোকটাকেই ধরে হাতে বইটা ধরিয়ে দিয়ে বলতে ইচ্ছে হবে, পড়ো এটা!

কথাটা ভীষণই সত্য। ঘরের লোককে ইতিমধ্যেই জোর করে পড়িয়েছি। এবার আশপাশে তাকিয়ে দেখি সবচে কাছে আছে সচলায়তন। এবার তাহলে আপনাদের পালা।
পড়ে ফেলুন দেখি বইটা।

কোন মন্তব্য নেই: