মঙ্গলবার, জুলাই ০৮, ২০০৮

মন, হাওয়ায় পেয়েছি তোর নাম-

বড় হয়ে যাওয়াটা সবসময়ে ভাল কিছু নয়। বড় হতে হতে যেটা হয়, শৈশব আর কৈশোরের জমানো সব ঐশ্বর্যগুলো টপাটপ হারিয়ে যেতে থাকে। আমার প্রায়শই এই বলে ভ্রম হয় যে, রাজা সলোমনের চেয়ে আমি কোন দিক দিয়ে কম ঐশ্বর্যবান ছিলাম না। কখনও গোনাগুনতির সুযোগ পাইনি, মাথায়ও আসেনি যে হিসেব রাখতে হবে বা এরকম, কিন্তু যদি গুনে রাখতাম, কোন একটা পাতার শুরু থেকে শুরু করে, আমার অজস্র জমানো বা কুড়িয়ে পাওয়া ধন-সম্পদগুলোর প্রতিটির নামধাম লিষ্টি করলে, হয়তো, প্রায় মাইলখানেক লম্বা কোন তালিকা হয়ে যেত।
খেলতে খেলতে কালো রঙ্গের একটা কাঠি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম একবার। ড্রাম পেটানোর জন্যে যেগুলো ব্যবহৃত হয় অনেকটা সেরকমই। কেমন করে যে এলো ওটা আমাদের বাড়িতে, তা ভেবে দেখার সময় হয়নি, কিন্তু ঐ লাঠি হাতে নিয়েই আমি হয়ে গেলাম জাদুকর জুয়েল আইচ। ওটা হয়ে গেল আমার জাদুর লাঠি। সারাদিনমান সেটাকে হাফপ্যান্টের কোমরে গুঁজে আমি ঘুরে বেড়াতাম, আর সুযোগ পেলেই সকলের চোখের আড়ালে মনের সুখে জাদু করে বেড়াতাম। আম্মার আলমারিটাকে ছুঁয়ে দিলেই সেটা হয়ে যায় যেন হীরে-মণিভরা সিন্দুক। অথবা আমাদের টিভিটাকে ছুঁয়ে দিলে তার ভেতরে দিয়ে দেখা যেত তেপান্তরের ঐ পারের কোন রাজকন্যার ঘুমিয়ে থাকা মুখ। সেই মুখ দেখে আমি আকুল, এদিকে আম্মা হয়তো খেতে ডাকছে, কিন্তু আমি তখন সেই জাদুর লাঠিকেই জীয়ন-মরণের কাঠি বানিয়ে সেই রাজকন্যার ঘুম ভাঙাতে ব্যস্ত।

আব্বা একবার কিনে দিল একটা দুরবীন। তারপরে আমাকে আর পায় কে? আমি তখন যুদ্ধরত কোন তুখোড় সেনাপতি। অথবা কখনও মতিউর কখনও ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর। আমাদের ঘরের পাশ থেকে উঁকি দিয়ে, কখনওবা বাড়ির দেয়ালের উপরে চেপে দুরবীন চোখে দেখে চলেছি দুরবর্তী পাকসেনাদের গতিবিধি। তারপর সেই দুরবীনই কানে লাগিয়ে শুনে চলেছি তাদের গোপন যুদ্ধপরিকল্পনা! এই যুদ্ধ-খেলার অন্যতম সঙ্গী হয়ে গেলো, কদিন পরেই, উপহার পাওয়া পিস্তল। সে সময় উঠানের পেঁপেঁ গাছটার আড়াল থেকে পাকসেনাদের উদ্দেশ্যে গুলি আর গ্রেনেডের বৃষ্টি ছুঁড়ে দিতাম।

কোন কোন রাতে, বাড়ির সামনের বিশাল দিঘীর এপাড়ে বসে ওপাশের পানিতে আলোছায়ার নাচন দেখতে থাকতাম আমি। সিমেন্টে বাঁধানো ঘাটে পিঠ দিয়ে আকাশে খুঁজে বেড়াতাম হান্টারের কুকুরটাকে। ততদিনে সাই-ফাই হজম হয়ে গেছে, ছুটে চলা দুয়েকটা তারাকে ভিনগ্রহীদের পাঠানো সিগন্যাল ভেবে নিয়ে কতদিন বিছানায় পাশ ফিরে শুয়েছি। পেঁপেঁ গাছের তিতকুটে পাতাগুলোকে চার-চারটে দিন পানিতে ভিজিয়ে রেখে দিয়েছি, পঞ্চম দিন সেটা থেকে টুথপেস্ট বানাবার আশায়। শার্লক হোমস পড়ে ছবি এঁকে এঁকে নিজেই একটা বর্ণমালা দাঁড় করিয়ে ফেললাম একদিন। তারপর সেটার মূল কপিটাকে পলিথিনে জড়িয়ে আমাদের পেয়ারা গাছটার সব থেকে উঁচু ডালে বেঁধে রেখে দিয়েছিলাম। লম্বা দিন নিজের বানানো ঐ বর্ণমালা দিয়ে খাতায় পাতায় হিজিবিজি লিখে গেছি অনেক।
"ডানপিটে" নাম দিয়ে নিজেই হাতে লেখা একটা পত্রিকা বের করেছিলাম ফোর এ পড়বার সময়। সেটার আমিই আঁকিয়ে, আমিই লেখিয়ে। কবিতা লিখতাম, কার্টুন বা ফিনলে চায়ের বিজ্ঞাপন, সবই ছিলো দারুণ উত্তেজনার।
লুকোনো রত্নভান্ডারের তাকে তাকে, এরকম হাজারো ঐশ্বর্য জমিয়ে চললাম আমি। বড় হতে হতে টের পাই, নতুন ঐশ্বর্যের ভিড়ে সেগুলোকে আর খুঁজে পাই না আর, হারিয়েই ফেললাম কি? ধুর!

ক্রমশ হারানোর তালিকাও বাড়তে থাকে। সেই পেঁপেঁ গাছ, জাদুর কাঠি, হরেক রকমের রঙ পেন্সিল, আমার ছোট্ট কবিতার ডায়রিটা- ছেলেবেলার সবগুলো রঙধনু স্মৃতির সাথে সাথে কোথায় যে হারিয়ে গেল সব।

আজ বড়বেলায় এসে হিসেবের খাতা খুলে অঙ্ক কষি। কুড়িয়ে পাওয়ার ঘরে দেখি ঝিলমিল করতে থাকে অনেকগুলো নাম, আর যেখানে তাদের দেখা পেয়েছি, সেই সচলায়তন।

আর বেশি বড় হতে চাই না আর, হারাতেও চাই না কিছু। রাজা সলোমনকে দান করে দিতে পারি আমার বাদবাকি সব ঐশ্বর্য, তবু শুধু এইটুকুই আমার হাতে থাকুক, সবসময়।

1 টি মন্তব্য:

Taohidul Hassan বলেছেন...

সুন্দর লিখেছেন....ধন্যবাদ।