শনিবার, এপ্রিল ২৬, ২০০৮

অসুখের দিনলিপি ( হাওয়াই মিঠাই ৭)

কদিন আগেই ঘাড়ের ব্যথায় কাতর হয়ে দু’দিন ধরে বাসায় শুয়ে বসে দিন কাটাচ্ছিলাম। অনেকদিন ছুটি নেয়া হচ্ছিলো না জগৎ-সংসার থেকে, মহামতি ঘাড়-ব্যথা আমাকে তাই বাধ্যতামূলক ছুটির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো, আর আমি বসে বসে পুরনো অসুখের দিনগুলোর কথা জাবর কাটছিলাম।

কলেজ-হোস্টেলে থাকবার সময় অসুখ বিসুখ বাধিয়ে ফেলাটা দস্তুরমতন সুখকর ছিলো। বেশ কয়েকদিনের জন্যে পিটি-প্যারেড-গেমস থেকে মুক্তি, এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে? সেই সক্কাল ভোরে বিছানা-বালিশকে অনাগত বউয়ের মতই জড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করতো তখন, মনে-প্রাণে জপতে থাকতাম "এ বাঁধন যাবে না ছিঁড়ে," তবু হায় বেরসিক বাঁশীর ডাকে সেই ঘুম ভেঙে উঠে কলেজ মাঠে চক্কর লাগাতে হতো। যন্ত্রণার একশেষ!
ক্লাস সেভেনের শেষের দিকে পক্স বাঁধিয়ে একবার এইরকম লম্বা আরামে ছিলাম। আরেকবার দুনিয়ার সবার উপর বিরক্তিতে না খেয়ে খেয়ে হিমোগ্লোবিন কমিয়ে ফেলেছিলাম অনেক, শেষে ড্রাকুলা হয়ে ক্লাসমেটদের কাছ থেকে রক্ত খেয়ে বেঁচে গিয়েছিলাম। অনেকদিন তখন সিএমএইচে থাকতে হয়েছিলো, সেটাও একটা অভিজ্ঞতাই বটে, কিন্তু সে আলাপ পরে। আজ বলবো অন্য এক দিনের কথা।

কোন এক গরমের সকাল ছিলো সে দিন। ঘন্টা দেড়েকের দুর্বিষহ পিটি শেষে গোসল করে আমার রুমে ফিরেছি, আমার বিছানা ছিলো জানালার পাশেই। রাতে জানলা লাগিয়ে ঘুমিয়েছিলাম, এখন সকালের নাশতা খেতে যাবো, দেরি হয়ে গেলে শাস্তিও খেতে হবে ডেজার্ট হিসেবে, তাই তাড়াহুড়োয় খুলতে গিয়ে দেখি জানলাটা এঁটে বসে আছে টাইট হয়ে, কোনমতেই খুলছে না। রাগের মাথায় কাঁচের উপর দিলাম এক ঘুষি। তাতে কাজ হলো ঠিকই, জানালা খুললো, কিন্তু সেই সাথে কাঁচ গেলো ভেঙে, আর অবধারিতভাবে আমার হাতও কেটে গেলো! আমার রুমমেটরা হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, আমার হাত থেকে গলগল করে রক্ত বেরুচ্ছে, এক্ষুণি হাসপাতালে দৌড়াতে হবে, আর আমি তখনো টাওয়েল পড়া। কোনমতে হাফপ্যান্ট গলিয়ে হাত চেপে ধরে দে ছুট! এক ছুটে সোজা ক্যাম্পাসের ভেতরের হাসপাতালে!

হাসপাতালে তখন ছিলেন সঞ্জুদা। ভাল নাম সঞ্জয়, আমাদের মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট। উনি আমার হাতের রক্ত দেখে দিলেন এক চিৎকার। সঞ্জুদা হিন্দু ছিলেন, তবু কেন জানি উত্তেজিত হয়ে গেলেই উনি আল্লাহ আল্লাহ করতেন। আমাকে নিয়ে গেলেন পাশের কেবিনে। ডেটল লাগিয়ে রক্ত মুছছেন, আমি ব্যথায় কঁকিয়ে উঠি, আর তখন উনি আমার চেয়েও জোরে চেঁচিয়ে ওঠেন ‘আল্লা আল্লা আল্লা’ করে, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমার চিৎকার যায় থেমে!
এদিকে অনেক মুছেও রক্ত থামছে না দেখে উনি সিদ্ধান্ত নিলেন, উপায় নেই, স্টিচ দিতে হবে। আমি শুনে ঢোঁক গিললাম, জীবনেও এর আগে সেলাই টেলাই করতে হয় নি।

উনি খানিক খুঁজে টুজে বাঁকানো একটা ভয়ংকর দর্শন সুঁই নিয়ে হাজির, সেইটা দেখে অবধারিতভাবে মাছ ধরার বড়শির কথা মনে পড়ে যায়। আমি তা-ই দেখে কাতলা মাছের মত খাবি খেতে লাগলাম!

তখন হাসপাতালে আরও ভর্তি ছিলেন আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়র মুহী ভাই, আমার চিৎকার শুনে তিনিও ততক্ষণে চলে এসেছেন।

আমি ভাবলাম, সেলাই যেহেতু করবে, নিশ্চয়ই আগে এনেস্থেশিয়া দিয়ে নিবে।

কিন্তু কীয়ের কি, সঞ্জুদা মুহী ভাইরে বললেন, ‘মুহী, এক কাজ করো, শক্ত কইরা ওর হাতটা চাইপা ধরো!’ আমি বলি, খাইসে আমারে। সঞ্জুদারে মনে হলো যেন ছুরি হাতে উদ্যত কুরবানীর হুজুর! সেই সাথে উনার মুখের সার্বক্ষণিক আল্লা আল্লা কুরবানীর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হয়ে বাজা শুরু করলো।

তো মুহী ভাই শক্ত করে হাত চেপে ধরলেন। সঞ্জুদা সেই বিকটদর্শন সুঁই নিয়ে আমার হাতের চামড়ায় দিলেন খোঁচা! ব্যথায় আমি দিলাম চিৎকার, আর উনি আমার চেয়েও জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন, আল্লা আল্লা আল্লা! কি মুশকিল! জুৎমতন চেঁচাতেও পারি না!

দ্বিতীয় বার সুঁই ফোঁটাতে গিয়ে ওনার বেশ কসরত করতে হলো, বিরক্ত মুখ করে সঞ্জুদা বললেন, ‘মিয়া, তোমার হাতের চামড়া এতো শক্ত ক্যান!’ আমি তো হাঁ। বলে কি এই লোক!
শেষমেষ বহু কায়দা করে উনি সেই শক্ত চামড়া ভেদ করে সুঁই ফোটালেন, আর তারপরেই দিলেন জিভে কামড়। বললেন, ‘সর্বনাশ!’ আমি ভয়ার্ত চোখে ব্যথা ভুলে তার দিকে তাকালাম, ‘কি হইছে?’ উনি হতাশ হয়ে মাথা দুইপাশে নাড়াতে নাড়াতে বললেন, ‘ ভুল হয়া গ্যাছে, ভুল জায়গায় ফুটা করে ফেলছি, বের করে আবার নতুন করে করতে হবে!’

আমি তখন পাথর! কয় কি! রাগে দুঃখে বাংলা সিনেমার জসীমের মতন এক চিৎকার দিলাম, ‘ইয়াআআআআ সঞ্জুদা! ডিশুম!’
নাহ, ডিশুমটা বাস্তবে না। কিন্তু মুহী ভাই সে দিন আমার হাত না ধরে থাকলে সেটা যে বাস্তবেও হয়ে যেত, কোন সন্দেহ নাই!

শেষমেষ উনি তিনটা সেলাই দিয়ে থেমেছিলেন।
এই লেখা টাইপ করতে করতে বার বার চোখ চলে যাচ্ছে হাতের কাঁটা দাগটার উপরে, আর সেদিনের কথা মনে করে কেবলই হেসে ফেলছি!

কি একটা আজব সময়ই না কাটিয়ে এসেছি তখন।

কোন মন্তব্য নেই: