সোমবার, ফেব্রুয়ারী ১৮, ২০০৮

হাওয়াই মিঠাই ২

অস্ট্রেলিয়ার প্রধান মন্ত্রী কেভিন রাড একটা ইতিহাস তৈরি করে ফেললেন।

ব্যাপারটার বর্ণনা আরও অনেক সুন্দর ভাবে দেয়া যায় নিশ্চয়- পত্রিকায় যেমন লিখেছে- অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে একটি সোনালী পাতা যোগ হলো- বা এরকম কিছু। কিন্তু আমি এত কিছু বুঝি না, আমার কাছে মনে হয়েছে- আলাদা পাতা-টাতা নয়, এই ব্যপারটা নিজেই একটা ইতিহাস।

পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে কেভিন রাড- এই দেশের আদিবাসীদের উপর গত ২২০ বছর ধরে যে অন্যায় ও অত্যাচার হয়েছে, তার জন্যে সোজাসুজি দুঃখ প্রকাশ করেছেন, এবং ক্ষমা চেয়েছেন। বিশেষ করে তাদের কাছে, যাদেরকে বহু বছর আগে নিজেদের বাবা-মা-পরিবারের কাছ থেকে জোর করে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিলো, এ দেশে যাদেরকে 'স্টোলেন জেনারেশান' নামে ডাকা হয়।
আদিবাসীদের ইতিহাস বোধকরি পৃথিবীর কোথাওই আলাদা কিছু নয়। হোক সেটা আমেরিকা, ভারত, বাংলাদেশ অথবা অস্ট্রেলিয়া!

সাদা মানুষেরা এই দেশে বসতি বানাবার জন্যে নির্মূ্লের কাছাকাছি নিয়ে গেছে এখানকার এবঅরিজিনদের। মাল্টিকালচারাল দেশগুলোতে যা হয়, এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। এ দেশের শিশুরা তাই বড় হয় সাদা এবং এবঅরিজিন হিসেবেই। কেভিন রাডের ক্ষমা প্রার্থনা- হয়ত তাদের সাদা-কালো না হয়ে- শুধু অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে বড় হবার একটা সুযোগ করে দিবে।

বড় শহরগুলোর রাস্তায়, রেস্তোরায় আর খেলার মাঠে বিগ স্ক্রীণে সরাসরি সম্প্রচার হয়েছে কেভিনের বক্তৃতা। ক্যানবেরায় পার্লামেন্ট হাউজের বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন শত শত এবঅরিজিন, বক্তৃতার এক পর্যায়ে যখন কেভিন উচ্চারণ করলেন 'আই এপোলোজাইজ', অনেকেই আবেগে কেঁদে ফেলেন।
আদিবাসী নেতা প্যাট ডডসনের কথাটা চমৎকার লেগেছে আমার কাছে, " ক্ষমা চাইতে সাহস লাগে, ক্ষমা করতেও সাহসী হতে হয়, গন্তব্য জানা নেই, সেরকম স্বপ্নময় একটা যাত্রা শুরু করতেও অনেক বেশি সাহসের প্রয়োজন হয়।'

বেশ কিছুদিনের প্রস্তুতির পরে গত ১৩ তারিখে কেভিন পার্লামেন্টে তাঁর বক্তব্য রাখেন। ব্যপারটা খুব মসৃণ ছিল এমন নয়। নিজের দল, মানে লিবারেল পার্টির বেশ ক'জন সংসদ সদস্য কেভিনের পক্ষে ছিলেন না। শুরুতে একেবারেই সমর্থন পান নি বিরোধী দলের নেতা নেলসনের কাছ থেকেও। এই ভদ্রলোক বেশ গোঁয়ার আছেন বুঝা গেল, সেদিনের অনুষ্ঠানেও উনি 'যা কিছু হয়েছিলো ভালোর জন্যেই' জাতীয় কিছু মন্তব্য করে বসেছিলেন স্টোলেন জেনারেশানের মানুষদের নিয়ে। তার ফলও মিলেছে সাথে সাথেই, সবাই দুয়ো ধ্বনি ছুঁড়েছে তার উদ্দেশ্যে। তবে শেষমেষ কেভিনের আহবানে সাড়া দিয়েছেন ভদ্রলোক।
প্রাক্তন চারজন প্রধানমন্ত্রী এসেছিলেন সেদিন পার্লামেন্টে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন না..., কে বলুনতো?- জনাব জন হাওয়ার্ড।
দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চাইবার পুরো ব্যাপারটাকে ভেটো দিয়েছেন তিনি।

রাডের একটা কথা খুব ভাল লেগেছে। বলেছেন, আবেগ কখনো ইতিহাস তৈরি করে না, আমাদের কাজের মাধ্যমেই সেই ইতিহাস তৈরি হয়।
তা যে হয়, সেটা অন্তত ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগ নিয়ে ও তা বাস্তবায়ন করে রাড বুঝিয়ে দিয়েছেন।
এবার দেখা যাক, যাদের জন্যে এত আয়োজন, সত্যি সত্যিই তারা এর ফলে উপকৃত হতে পারে কি না!

কোন মন্তব্য নেই: