শুক্রবার, অক্টোবর ১৯, ২০০৭

প্রিয় সেগুন বাগান

খুব সিরিয়াসলি সত্যজিৎ রায় হতে চাইবার আগে আমি তারচেয়ে সিরিয়াসলি হতে চেয়েছি ম্যাকগাইভার কিংবা মিঠুন চক্রবর্তী। এই দুইয়ের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বন্ধুদের নিয়ে গোয়েন্দা দল বানিয়ে আমি প্রায় হয়েই গিয়েছিলাম কিশোর পাশা। গোয়েন্দা রাজু খুব বেশিদিন আমার সহচর ছিলো না। কাকাবাবু বা ফেলুদা পড়েছি, তবে হতে চাই নি কোনদিন। এখন এই আধাযুবক বয়সেও ছেলেবেলার যে হিরোর আবেদন একটুও কমেনি আমার কাছে, সেই দুর্দান্ত ছোকরার নাম 'মাসুদ রানা'। হু, ইনি তিনিই, যে 'টানে সবাইকে, কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না।'
এইরকম স্বার্থপর একটা বর্ণনাই বোধকরি আমাদের মাসুদ রানার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিলো। আরো অনেক কারণও ছিলো। সদ্য কিশোর তখন আমরা, এরকম একটা সময়ে প্রতিবার বিপদে পড়া বাংলাদেশকে বাঁচাতে, অথবা কোন বন্ধুরাষ্ট্রকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে যখন কাঁচা পাকা ভুরুর মেজর জেনারেল রাহাত খান অফিসে ডেকে পাঠাতেন মাসুদ রানা-কে, আমরা সেই সময় আরো একটি চমৎকার স্পাই থ্রিলারের আশায় বসের সামনে বসা মাসুদ রানার কানের পাশে সমানে ফিসফিস করে বলে যেতাম, 'রাজি হয়ে যা ব্যাটা, রাজি হয়ে যা।'
সোহানা চৌধুরির আদুরে ভালোবাসার লোভ ছিলো হামেশাই। সেই সাথে প্রতি পর্বে নতুন কোন স্বর্ণকেশিনীর সাথে সাক্ষাৎ হওয়াটাতো অনিবার্য। এইরকম গল্প গুলোই তখন আমাদের কাছে সোনামাখা স্বপ্ন হয়ে দেখা দিতো।

এইবার দেশে গিয়ে নিজেকে সাংসারিক সকল বাঁধনে জড়ানোর ব্যবস্থা করার ফাঁকে ফাঁকেও বেশ মনে হচ্ছিলো এই 'কোনদিন বাঁধনে না জড়ানো' যুবকের কথা। আমার ফেলে আসা পুরনো বইগুলোর ভীড় থেকে টেনে বের করি মাসুদ রানা সিরিজের আমার খুব পছন্দের একটি বই 'মুক্ত বিহংগ'। এই গল্পের আর দুটি প্রধান চরিত্রও আমার ভীষন পছন্দের ছিলো, মাইকেল সেভারস আর এনি উইসপার।

ঠাকুমার ঝুলি দিয়ে হাতে খড়ি হবার পর, আমার পুরো ছেলেবেলাটাই কেটেছে সেবা প্রকাশনীর বই পড়ে।
অনেকেরই দেখি সেবা প্রকাশনীর বইগুলো নিয়ে নাক উঁচু একটা ভাব রয়েছে। খুব প্রিয় আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদও একবার এরকম কিছু বলেছিলেন, সেবা প্রকাশনীর সস্তা বইগুলো পড়ে নাকি আমাদের ছেলেমেয়েরা গোল্লায় যাচ্ছে। এটা পড়ে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। আমি নিজের ও আমার বন্ধুদের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, সেবা প্রকাশনীর ঐ সস্তা ও অগভীর থ্রিলার বইগুলোই আমাদের দেশের কিশোরদের বই-পড়ুয়া হিসেবে বড় হতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে। একেকটা স্বপ্নের রাজ্যের দরোজা খুলে দিত সেইসব অবাস্তব ফিকশানগুলোই। আমি নিজের কথা বলতে পারি, ঐ বয়সে সেবা'র বই না হলে পড়বার অভ্যাসটাই হয়তো ঠিকমতন গড়ে উঠতো না। আর সেটা না হলে বিশ্বসাহিত্যের অন্য সব বইগুলোও আমার ধরা ছোয়ার বাইরে থেকে যেত নিশ্চিত। তাই সুরুচির পতাকাধারীদের ভুরু বেঁকে গেলে যাক, আমার রুচির ফিল্টারে বিশাল বিশাল ফাঁক। তা দিয়ে পটেমকিন জাহাজ যেমন করে বেরিয়ে যায়, তেমনি যায় ক্যাসিনো রয়্যালও। আবার সে ভাবেই গোর্কী আর কাজীদা সেখানে পাশাপাশি চলেন।

রকিব হাসান নিজেই তখন আবু সাঈদ নামে লিখতেন গোয়েন্দা রাজু। জাফর চৌধুরিও কি ওনারই ছদ্মনাম ছিলো? মনে নেই সেটা, তবে রেজা-সুজার সেই রোমহর্ষক সিরিজও পড়তাম ভালই। কুয়াশা সিরিজ মোটামুটি লাগতো, আর তিন গোয়েন্দা ছিলো অসাধারণ। তারপর বয়সের দাবী অনুযায়ীই হাতে চলে এল গরমাগরম মাসুদ রানা। শেখ আব্দুল হাকিম আর খন্দকার মাজহারুল করিমের রোমান্টিক বইগুলোও লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম। কিশোর ও রহস্যপত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক ছিলাম অনেকদিন।

ক্লাশের তাড়াহুড়া না থাকলে দুপুরের দিকে ঘুম ভাঙ্গে আমার। আজ কেমন করে জানি খানিকটা ব্যতিক্রম হলো, কাক নেই, তাই তার ডাকও শোনা যায় না এখানে, তবে আমার জন্যে সেটা কাক-ডাকা ভোরই আসলে। কি ভেবে আধ-পড়া ইলিয়াস আর মানিক বন্দ্যো-র মাঝখান থেকে টেনে নিলাম মুক্ত বিহংগটাকেই। বহুদিন পরে আবার একটা সকাল বেশ ঝলমলে হয়ে গেল। ছাপোষা জীবনে অভ্যস্ত আমার হঠাৎ করেই ইচ্ছে হলো আফ্রিকার গহীন জঙ্গলের মাঝ দিয়ে চারটে ট্যাংকের বিশাল বহরকে চালিয়ে নিয়ে যেতে।
এই কৈশোরিক আনন্দে ভরা চপল সুন্দর সকালটুকুর জন্যে তাই কৃতজ্ঞতা জানাই কাজী আনোয়ার হোসেন ও তার সেগুন বাগান প্রকাশনীকে। অনেক ধন্যবাদ আপনাদের কাজীদা, এক স্বপ্নবাজ কিশোরের ছেলেবেলাকে বাঁধনে জড়িয়ে নেবার জন্যে।

২টি মন্তব্য:

দৃপ্ত বলেছেন...

ধন্যবাদ কনফু। মনের গভীরে ভালোবাসা নিয়ে হারিয়ে যাওয়া সেগুনবাগান প্রকাশনীর বেশ কিছু স্মৃতি তুলে এনেছেন।

'মাসুদ রানা' আমারও প্রিয় সিরিজ ছিল। অষ্টম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ। মাঝখানে পড়া প্রায় দুই শতাধিক বই আর তার মাঝে লুকিয়ে থাকা অনেকটা সময়। [মাইকেল সেভারসকে যেমন ভুলি নাই, তেমনি মনে আছে রডরিককে।]

আমারও ধারণা রকিবদাই জাফর চৌধুরী ছিলেন।:)

আমার বাসার থেকে অদূরেই সেবা। বছরে এক-দুইবার হঠাৎ করে চলে যাই। ওদের ক্যাটালগ উল্টাই। বইয়ের গন্ধ নেবার জন্যেই হয়তো বেশ কিছুক্ষণ থাকতে ইচ্ছা করে। কিছু বইও কিনে ফেলি। কিন্তু, বেশিরভাগ সময়েই বইগুলো শেষ করতে পারি না।

konfusias বলেছেন...

ঠিক বলেছেন দৃপ্ত, সেবায় যাওয়াটা আমার জন্যেও একটা অভিজ্ঞতাই বটে। মন ভাল হয়ে যায় এখনো ভাবলেই।
শুধু জাফর চৌধুরি নয়, যতদুর জানি আবু সাঈদ, মানে গোয়েন্দা রাজুরও লেখক আসলে তিনিই।

সেবার কাছে ঋণী নয় এরকম পাঠক আমাদের দেশে খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না।