রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০০৭

ডাম্পিং: যদি সুখী হতে চান-

ডাম্প অথবা ডাম্পিং শব্দটা আগেও জানা ছিল বটে, তবে ঠিকঠাক চেনা ছিলো না।
পুরোনো কাপড় চোপড় জমে গেলে বাসা থেকে খানিকদুরে সরকারের বেঁধে দেয়া জায়গায় গিয়ে ফেলে দিয়ে আসি। এই দেশে ইহাকেই ডাম্পিং বলে। তালিকায় আরো থাকে পুরোনো টেলিভিশান, ফ্রীজ, মাইক্রোওয়েভ, বাইসাইকেল থেকে শুরু করে আরো নানান হাবিজাবি। মোটের ওপর, যে কোন অবাঞ্চিত যন্ত্রণা থেকে সহজেই মুক্তি দেয় এই ডাম্পিং।

এই তালিকার সর্বশেষ সংযোজন দেখে অনেকটা চমকে উঠেছিলাম অল্প কিছুদিন আগে। ঘটনা বেশ গুরুতর।
মা দিবসের ভোরবেলায় মেলবোর্ণ হাসপাতালের বাইরে কোন এক মা তার সদ্যোজাত শিশুকে বাক্সের ভেতরে কাপড়ে মুড়ে ফেলে রেখে চলে যান। বাংলাদেশের সুনাগরিক হিসেবে এই সব সহজলভ্য খবরে চমকানোটা আমাদের জন্যে রীতিমতন লজ্জার বিষয়। তবু যে চমকালাম, তার কারণ পত্রিকার ভাষা। সরল ইংরেজীতে তারা হেডলাইন করেছে, " বেবী ডাম্পড অন মাদার্স ডে"
ও হরি, জলজ্যান্ত মানুষের বাচ্চাও যে 'ডাম্প' করা যায়, এটা জানা ছিলো না!

এই লেখাটা এখন পর্যন্ত হাল্কা চালে লিখে যেতে পারছি, তার কারণ, এই ঘটনার শেষটা মধুরেণ সমাপয়েত।
নিজের আগ্রহেই পরের কিছুদিন পত্রিকা ঘেঁটেছি, ক্যাথেরিন নামের এই ছোট্ট মেয়েটার কপালে কি আছে দেখবার জন্যে। দেখেছি আর অবাক হয়েছি, এবং খুশীও। সবাইই খোঁজ রাখছিলো বাচ্চাটার। পত্রিকা রেডিও টিভি সবখানেই নিয়মিত ক্যাথেরিনের অজানা মা-কে অনুরোধ করা হচ্ছিলো যেন তার মেয়েকে ফিরিয়ে নেন তিনি।
কোন একজন মাল্টিমিলিওনিয়ার ক্যাথেরিনের আঠারো বছর বয়েস পর্যন্ত সব খরচ দিবেন বলে অঙ্গীকার করলেন। আরেকজন বললেন, ফিরিয়ে নিলে শান্তিতে বসবাসের জন্যে মা আর মেয়েকে একটা বাড়ি কিনে দিবেন তিনি
এইসবের গুণেই কিনা জানি না, তবে শেষমেষ ক্যাথেরিনের আসল মা আড়াল থেকে যোগাযোগ করেছিলো।
পত্রিকায় এলো গোপন অবস্থান থেকে কন্সালটেন্টের সাথে সদ্য-মা হওয়া মেয়েটির কথোপকথন। পড়লাম, এক ফাঁকে কনসাল্টেন্ট জিজ্ঞেস করলেন, ''তুমি নিজে ভালো আছো তো? মাত্রই বাচ্চার জন্ম দিয়েছ, তোমার নিজেরও তো মেডিক্যাল কেয়ারে থাকা প্রয়োজন।'' এই পড়ে আমি ভীষণ অবাক হলাম। ভাগ্যিস, এই মহিলা আমাদের দেশে জন্মায় নি!
ডাম্পড হওয়া বাচ্চাটি মায়ের কাছেই ফিরেছে কিনা জানি না, তবে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল শেষ মেষ, দেখে আমারও ভাল লেগেছিলো।
-----------------

যেটা বুঝলাম, আমাদের আধুনিক জীবনে সুখী হওয়ার বেশ কার্যকরী ফর্মূলা এই ডাম্পিং।
পান-বিড়ি-তামুক কোনটাই এখন আর খাই না আমি, 'জীবন থেকে জটিলতা কমাই'- এমনটাই বলতাম আগে। এখন থেকে ভাবছি বলবো, ওগুলো কবেই ডাম্পড করে দিয়েছি!
চট্টগ্রামের ভূমিধ্বসে তিন অংকের মানুষ মারা গেলো, ছবি আর নিউজ দেখে নার্ভে চাপ পড়তো, সহ্য হতো না।
পরে লম্বা সময় দেশের পত্রিকা পড়ি নি, ইচ্ছে করেই কদিনের জন্যে ডাম্প করে গেছিলাম সেসব খবর।
এই যে ডাম্পিং নিয়ে মজা করে এত এত বাক্য লিখলাম, পুরোটা সময় ভুলে থেকেছি আমাদের দেশের ডাস্টবিনগুলোতে ফেলে দেয়া মানব-শিশুদের কথা। বাবা মা'র কাছে অনাকাংক্ষিত তারা, তাই কপালে লেখা ছিলো ডাম্পড হওয়া।
মরে গিয়ে যারা বেঁচে যেত, সৌভাগ্যবান তারা, যারা বেঁচে থাকতো তারপরেও, তাদের কি হতো?
ভৈরবের সেই ক্লিনিকের কথাও ভুলে থেকেছি ইচ্ছে করেই, যেখানে মায়ের পেটের ভেতরে মেরে ফেলা হতো শিশুদের, গর্ভপাতের রেট বেশি ক্লিনিকে, সেই অল্প বেশী কিছু টাকা কামানোর লোভে। কি হবে এসব মনে রেখে?

বুঝতে পারছি আমার মন নিজে থেকেই সভ্য ও সুশীল হয়ে উঠছে দিন দিন। সুখী হবার ফর্মূলা জেনে গেছে সে। শিখে গেছে কেমন করে বেছে বেছে ভালো আর হ্যাপি-এণ্ডিং খবরগুলোকে মনে রাখতে হয়, আর আমাদের দেশের অসুখী খবরগুলোকে তলিয়ে দিতে হয় মনের অতল গহবরে।
অজি বাংলায় যাকে বলে কি না- ডাম্পিং!

------

৪টি মন্তব্য:

deepanjali বলেছেন...

Your blog is nice. I think you should add your blog at BlogAdda and let more people discover your blog. It's a great place for Indian bloggers to be in and I am sure it would do wonders for your blog.

দৃপ্ত বলেছেন...

আপনার পুরো নাম তাহলে মু নূরুল হাসান? :) আজকে এই লেখাটা পড়লাম "ছুটির দিনে"।

এখানে

নিঘাত সুলতানা তিথি বলেছেন...

দৃপ্ত,
এর আগের সংখ্যার "ছুটির দিনে"ও ইনার "আর্থ আওয়ারঃ প্রিয় পৃথিবীর জন্যে একটি ঘন্টা" লেখাটা ছেপেছিলো, দেখো নাই মনে হয়। :-)

konfusias বলেছেন...

দৃপ্ত,
আপনার স্মৃতিশক্তির তারিফ করতে হয়। পড়ে এসে কষ্ট করে জানিয়েছেন, অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।