শুক্রবার, আগস্ট ৩১, ২০০৭

ফাজিল সংক্রান্ত আলাপ সালাপ

এ কথা প্রমাণিত সত্য যে, আমাদের দেশের জনপ্রিয় লেখকদের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে ভীমরতি দেখা যায়। তারা আবঝাব যা খুশি মনের মাধুরী মিশিয়ে লিখে যেতে থাকেন, লিখে টিখে আয়েশের ঢেকুর তুলে ভাবেন, পাঠক নেহাতই বোকাসোকা শ্রেণীর প্রাণী, যা-ই খাওয়াবেন, তাই খাবে। ভাবনাটা অবশ্য ভুল নয়। বোকাসোকা না হলেও আমার মতন অনেক সর্বভূক শ্রেণীর পাঠক যারা সব ধরণের লেখাই পড়েন, তাদেরকে ঐ সমস্ত আবঝাবও খেতে হয়।
তবে, কথা হচ্ছে, খেলেই যে সেটা পেটে চলে গেল, ব্যাপারটা তা নয়, কিছু কিছু আবার বমি হিসেবে ফেরতও চলে আসে!
ঠিক সম্প্রতি আমাকে এ ধরণের বিবমিষায় পেয়ে বসেছিল, যখন আমি 'লেখক আনিসুল হক'-এর 'ফাজিল' নামক বইটি পড়ছিলাম।
আনিসুল হক-এর নাটকগুলো আমার কাছে বেশ ভালো লাগে, বিশেষ করে ফারুকীর বানানো যেগুলো। মনে আছে, পরিচালকের নাম দেখে দেখে বাংলা নাটক দেখার অভ্যাস আমার প্রথম গড়ে ওঠে 'প্রতি চুনিয়া' নাটকটি দেখার পরে। কাহিনী ও নির্মাণ, দুটোই এত চমৎকার ছিল যে এ জুটির ভক্ত হয়ে গেছিলাম।
ফাজিল নামক বইটি পড়া শুরুর আগেও খানিকটা সুখস্মৃতি ছিল, আনিসুল হক- এর আরেকটি বই পড়েছিলাম অনেক আগে, তোর জন্যে প্রিয়তা, ঐ বইটা পড়ে মনে আছে, গড়িয়ে পড়া দু'এক ফোঁটা কান্না লুকোবার জন্যে আমাকে বেশ কসরত করতে হয়েছিলো।

বলতে দুঃখ হচ্ছে, ফাজিল বইটি পড়ার পরে প্রতি চুনিয়া অথবা তোর জন্যে প্রিয়তা-র সম্পর্কিত সকল আনন্দকে পূর্বজন্মের স্মৃতি বলে ভ্রম হচ্ছে।

কয়েকটি ছোটগল্পের সংকলন ফাজিল। প্রথম গল্পের নামেই বইয়ের নামকরণ। আগ্রহ নিয়ে পড়া শুরু করেছিলাম, যখন দেখি একটি পত্রিকা অফিসের গল্প সেটা। সংলাপে ভরপুর। এবং লাইনের পর লাইন দেখে কেন যেন সন্দেহ হলো, ভবিষ্যতে এটিকে নাট্যরূপ দিবার কোন গভীর ইচ্ছা বোধহয় লেখকের মনে বাসা বেঁধেছিলো। কাহিনীতে কোন চমক নেই। পড়তে গিয়ে মনে হলো, এটা সম্ভবত একটা হাসির গল্প, এবং আন্তরিক চেষ্টা সত্ত্বেও দুঃখ এই যে আমি একবারো হাসতে পারি নি। বরং শেষ করবার পরে মনে হলো এরকম বিরক্তিকর গল্প আমি বহুদিন পড়ি নি।

পরের গল্পের নাম মুক্তি। এবং পুরো গল্পে ভালো লাগার মতন একটিই বিষয় সেটি হল এই নামটি। মুক্তিযুদ্ধকে আশ্রয় করে লেখা এর চেয়ে দূর্বল গল্প আমি আর কখনো পড়েছি কি না মনে করতে পারছি না। প্রার্থণা করি, আমাদের লেখকেরা বিষয় বাছাইয়ের আগে যেন দয়া করে নিজের সামর্থ্য যাচাই করে নেন।
এই দুটো ব্যর্থ গল্প পড়ার পরেও কি ভেবে যে তৃতীয় গল্পটা পড়া শুরু করেছিলাম জানি না। কিন্তু অচিরেই আমাকে থেমে যেতে হলো। একটা প্যারা কোট না করলে নিজের প্রতি অন্যায় করা হবে।
" বাক বাকুম শব্দে আঙিনাটা সরগরম। একটা মুরগি কট কট কটাস বলে ডেকে উঠলো। মনে হয়, ডিম পাড়লো এখনই। মুরগি ডিম পাড়লে নিজেই ডাকে, আর মানুষ বাচ্চা দিলে বাচ্চা কাঁদে আর ছেলের বাবা আযান দেয়। "
এই প্যারা পড়ার পরে আর এগুতে পারলামনা। ফাজিল বইটি পড়ার এইখানেই সমাপ্তি টানলাম।

অনেক বড় লেখকদেরই শেষ বয়সের ছাইপাশ দেখে 'লেখকদেরও অবসর নেয়া উচিৎ কি না' এরকম একটি বিতর্ক মাঝে সাঝেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। আনিসুল হক এখনও তরুন, তার জন্যে অবসর একটু কঠিনই হয়ে যাবে, কিন্তু লেখা থেকে বেশ কিছুদিনের জন্যে লম্বা বিশ্রামের প্রেসক্রিপশানটা তিনি নিজেই ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখতে পারেন।
অন্তত আমরা মানে বেচারা পাঠকেরা কিছুদিনের জন্যে বদহজমের যাতনা থেকে রক্ষা পাই!

শনিবার, আগস্ট ২৫, ২০০৭

আমি আগের ঠিকানায় নেই-

কুনোব্যাঙ আর আমি আগের জন্মে নির্ঘাৎ মামাতো ভাই ছিলাম।
আমার ঘরকুনো স্বভাবটা যারা জানে, তারা সেটা একবাক্যে স্বীকার করবে। একটা ঘর পেলে তার কোনাকানিতে জীবন কাটিয়ে দিতে পারি আমি, কিন্তু কি আশ্চর্য, কোন খুঁজে নেবার ঘরটাকেই পালটাতে হয় আমাকে বারবার।
সম্প্রতি আমার আবারো ঠিকানা পাল্টেছে। এবারের পালটানো, আগেরগুলোর মত বিষাদময় নয়। তেপান্তরের চেয়েও লম্বা সাগর পাড়ি দিয়ে বউ এসেছে আমার কাছে। দুই রূমের ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে বাসা বেঁধেছি আমরা। প্রতিদিন দু'হাত ভরে সংসারের যাবতীয় সামগ্রী কিনে বাড়ি ফিরি, ভাবি এই বোধহয় শেষ, আর কিছুই কেনা বাকি নেই। পরদিন আবার বাজারে যাই, দুয়ে দুয়ে চার হাত ভরে যায়, তবু পরের দিনের স্বপ্ন কেনা বাকি থেকে যায়।

বাড়ির সাথে সাথে, আধুনিক নাগরিকের মতন পাল্টেছে আমার ফোন নাম্বার। আর..., আর পাল্টেছে, আইপি এড্রেস। এটুকু পাল্টাতে অবশ্য একটু সময় লেগে গেল। আজকে বাসায় নেট-এর সংযোগ লাগার সাথে সাথেই টের পেলাম, আমার এই নতুন ঘরেও একটা ছোট্ট সুন্দর কোনা রয়েছে।
পূর্বজন্মের সেই মামাতো ভাইয়ের মতন আজ থেকে আমিও তবে ঘরকুনো হয়ে যাবো!