বুধবার, জুন ২০, ২০০৭

দন্ত-কাহিনি


মিষ্টিপ্রীতি আছে তীব্র রকমের। জিভ সামলাতে পারি না দেখলে,হাতও না। অবশ্য সামলানোর ইচ্ছেও মনের মধ্যে তেমন একটা জোরালো নয়।দেশে থাকার সময় ইচ্ছেমতন খেতাম। কুমিল্লা গেলেই মাতৃভান্ডারের রসমালাই আর জলযোগের স্পঞ্জ নিয়ে বসে যেতাম বন্ধুরা গোল হয়ে, আয়েশ করে খেতাম। আমরা অবশ্য খাওয়া বলতাম না, বলতাম সাধনা করা।

তো যা হয়, পরবাসী হবার পরে সেই সাধনায় ব্যাঘাত ঘটলো। এখানে এসে টিন কেটে মিষ্টি খেতে জুত পাই না। তাই বলে খাওয়া কমেছে সেটাও ঠিক নয়। পেলেই খাই, এরকম অবস্থা। শুটকো পটকা অবস্থা থেকে দেহের হাল এখন এমন হয়েছে যে লোকে ইদানীং আমাকে দেখিয়ে উদাহরণ দেয়, 'আমি ভাই ঠিক আপনার মতন মোটা ছিলাম ক'দিন আগেও, ইদানীং শুকিয়েছি।'' নিজের পাশে বসে থাকা মর্তমান হিমালয়সম বউকে রেখে আমাকে দিয়ে মোটা মানুষের উদাহরণ কেন টানা, ভদ্রতার খাতিরে আমি এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাই। সে যাকগে। এই দুঃখের গল্প আরেকদিন।

তো যা বলছিলাম। মিষ্টি খাই, সাথে বেশি পাই না এই দুঃখে জাত-বেজাতের চকোলেটও সাবাড় করি নিয়মিত। এই করে করে দাঁতের তেরটা বেজে গেছে আমার। আজ সকালে মাজতে গিয়ে দেখি কমপক্ষে তিনটা দাঁতের গোড়া ফাঁকা হয়ে গেছে, একটার অর্ধেক নেই। এভাবে চলতে থাকলে মধ্য তিরিশেই ফোকলা বুড়ো হয়ে যাব কি না সেই দুশ্চিন্তায় পড়েছি।

দন্ত-সেবায় মনোযোগী হতে হবে মনে হচ্ছে আরো। মাজন বদলাই নিয়মিত, সাথে চলে সবচেয়ে দামী পেস্ট। বন্ধুরা বুদ্ধি দিয়েছিলো ব্যাটারিওয়ালা অটোমেটিক মাজন ব্যবহার করতে। কিন্তু মুখের ভেতর জিভ বাদে আর কোন কিছু স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে কিলবিল করে নড়ছে, ভাবতেই গা-টা কেমন শিউরে উঠলো! তাই সেটা নাকচ করে দিলাম।

দাঁতের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল পুরনো গল্প।
সে অনেককাল আগের কথা। ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। কার্জন হলের গ্যালারিতে ক্লাস করি। একবার ক্লাশের ফাঁকে সবাই বসে আড্ডা দিচ্ছি। সবাই কিছু না কিছু খাচ্ছে, আমি খাচ্ছিলাম পেয়ারা। আমার নীচের পাটির ঠিক মাঝখানের দাঁত দুটো একটু আজিব কিছিমের। বাকি সবার থেকে আলাদা হয়ে এরা খানিকটা বাঁকা হয়ে বেড়ে উঠেছে। দেখতে অনেকটা ইংরেজী অক্ষর 'এম' বা 'ডব্লিউ'র মতো দেখায়। তো, সেদিন পেয়ারা খেতে খেতে আমি হঠাৎ তাকিয়ে দেখি, প্রতিবার কামড় দিলেই পেয়ারার গায়ে সুন্দর করে 'ডব্লিউ' ভেসে উঠছে! কি চমৎকার দৃশ্য। আমি নিজেই মুগ্ধ হয়ে যাই। পাশে বসে ছিল একজন সহপাঠিনী, এলিজা নাম। সহজ সরল বলে খ্যাতি ছিল মেয়েটির। ওকে আগ্রহ নিয়ে দেখিয়ে বললাম, 'দেখ দেখ এলিজা, আমি কামড় দিলেই কেমন 'ডব্লিউ'র মতো হয়ে যায়। দেখেছিস!''

ও চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলো ভালো করে। তারপরে কি বুঝলো কে জানে, মুখ চোখ লাল হয়ে গেল ওর, আর আমাকে বলে উঠলো, 'ছি ছি কনফু, তুই এতো অসভ্য! ছি!''

পেয়ারা হাতে আমি বেকুব হয়ে গেলাম! লে বাবা! আমি আবার কি অসভ্যতা করলাম!
যত্ন সহকারে আমি তো পেয়ারাই কামড়েছিলাম শুধু, আর কিছু তো নয়!



1 টি মন্তব্য:

ইরতেজা বলেছেন...

আমিও টিন কেটে মিষ্টি খেতে মজা পাই না। মাঝে মাঝে সখ করে কিনি। আপনি ঢাকা ভার্সিটিতে পড়তেন। জানতাম না।