শুক্রবার, মে ১৯, ২০০৬

মানুষ হিশেবে আমার অপরাধসমূহ


১৷
বইয়ের প্রচ্ছদে হিশেব- বানান এভাবেই দেয়া আছে৷ লেখকের নাম যখন হুমায়ুন আজাদ, এ বানান তখন আর অবাক করেনা আমাকে৷ হুমায়ুন আহমেদ আর হুমায়ুন আজাদ দু'জন ভিন্ন মানুষ৷ প্রথমবার নাম শুনে অনেকেই দু'জনকে গুলিয়ে ফেলেন, সে জন্যেই এটা বললাম৷
আমার পড়া হুমায়ুন আজাদের প্রথম বই - "সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে'৷ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে লেখা বই৷ সব রকম সম্পর্ক৷ বাবা-মা'র সাথে, ভাই বা বোনের সাথে, স্বামী-স্ত্রী বা পুত্র-কন্যাদের সাথে৷ সে বইয়ের মূল চরিত্র ছিলেন একজন প্রকৌশলী, যিনি সড়ক বানান, আর ব্রীজ৷ মানে সেতু৷ ব্রীজ বানাতে বানাতে একসময় মানুষের সম্পর্কগুলোকেও তিনি ব্রীজ বলে ভাবা শুরু করেন৷ একসময় দেখা যায়, এ সম্পর্কগুলো তার বানানো ব্রীজগুলোর মতই কী অসহায়ভাবে ভেঙ্গে পড়ছে!
বই পড়ে যে কখোনো যন্ত্রনা পাওয়া যায়, হুমায়ুন আজাদের বই পড়ার আগে আমার এই ধারনাই ছিলো না৷ অসম্ভব যন্ত্রনা দেয় তাঁর বই,অথবা বলা ভাল- পীড়া দেয়৷ নিজেকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়৷ চারপাশের সোজা সরল জগতের ধারনা এক লহমায় উড়িয়ে দিয়ে তিনি যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখান, কেমন করে আমাদের চারপাশের সব কিছু ভেঙ্গে পড়ছে৷
মানুষ হিসেবে আমার অপরাধসমূহ- স্বীকারোক্তিমূলক বই৷ তাঁর প্রায় সব বইয়ের চরিত্ররাই নিজের সাথে নিজে প্রচুর কথা বলে, নিজেকে হাসায়, নিজেকে বুঝায়৷ নিজেকে অভিশাপ দেয়৷ এই বইয়েও তিনি একজন মানুষকে দিয়ে তাঁর অপরাধের স্বীকারোক্তি করিয়েছেন৷ খানিকটা অবাক হয়েছি যখন দেখলাম "অপরাধী' হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন একজন আপাত:স্ত্ সরকারী আমলা-কে৷ আমাদের দেশের সরকারী বড় আমলাদের অসততা কিংবদন্তীতূল্য, কিন্তু তাঁর গল্পের নায়ক, যার নাম আনিস, একজন স্ত্ সরকারী আমলা৷ পুরো বইটা আনিসের মুখ দিয়ে বলানো নিজের গল্প৷ তার অপরাধ ও অপরাধবোধের বর্ণনা৷ হুমায়ুন আজাদের বর্ণনাভঙ্গি একান্তই তাঁর নিজস্ব৷ অন্য কারো সাথে মেলে না তা৷
বইয়ের শুরুতে আনিসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেলোয়ার ও তার বউ ডলি-র কথা আছে৷ "" বিয়ের মঞএ দেলোয়ারের বউকে দেখে আমি একটু কেঁপে উঠি,সামান্য একটু কাঁপন;- আমার চোখ তার বউয়ের চিবুকের ওপর গিয়ে পড়েছিল, একটি কাঁধের ওপর গিয়ে পড়েছিল; তা আমাকে কম্পিত করে, কিছুটা ঈর্ষারও জন্ম দেয়; এব ংআমি ভয় পাই৷''
দেলোয়ার ও ডলি একদিন আনিসকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়৷ ফেরিঘাটের কাছে আসতেই আনিস নেমে পড়ে গাড়ি থেকে, কারন, "" একসময় আমার মনে হয় গাড়ি সুগন্ধে নয়, মাংসের গন্ধে ভরে উঠছে, সোনালি মাংসের ভেতর থেকে গন্ধ উঠে আসছে; তখন গাড়ি থেকে বেরিয়ে লাফিয়ে পড়তে আমার ইচ্ছে হয়৷'' আনিস নেমে যাবার পর ডলিকেও নেমে যেতে বলে দেলোয়ার, এব ংডলি নেমে যাবার পর ফেরিতে গাড়ি ওঠানোর সময় পেছন থেকে ট্রাকের ধাক্কায় পানিতে পড়ে যায় দেলোয়ারের গাড়ি৷ দেলোয়ার মারা যায়৷
মূলত এখান থেকেই আনিসের অপরাধবোধের শুরু৷

২৷
কিংবা হয়ত এখান থেকে নয়৷
আরো আগে দেলোয়ার যেবার আনিসকে নিয়ে ব্রোথেলে গিয়েছিল, দু'জন দু'দিকে চলে যাবার পর, খানিক সময় কাটিয়ে আবার ওরা একসাথে হলে, দেলোয়ার জিজ্ঞেস করেছিল আনিস কিছু ""করেছে কি-না?'' আনিস করেছিল৷ কিন্তু দেলোয়র জানাল সে কিছু করে নি, সে শুধু দেখতে এসেছিল, করতে নয়৷ তখনো আনিসের ভীষন অপরাধবোধ হয়েছিল৷ "" নিজেকে আমার খুব খারাপ মনে হয়৷ আমার আর ভালোদের সাথে মেশা ঠিক হবে না৷ যে মেয়েটিকে দেখে আমি কেঁপে উঠি, যাকে আমার খুব ভাল মনে হয়, তার দিকে আমি আর তাকাবো না৷ সে তার মামার সাথে বেবিতে যাক, তার দুলাভাইয়ের সাথে বেবিতে যাক, আমি আর কষ্ট পাবো না৷ - - - দেলোয়ারকে দেখলেই, তারপর, আমার মনে অপরাধবোধ জেগে উঠতো৷ - - আমি অনেক কিছুই ছোঁয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম; ফুল, আমার কাছে পবিত্র মনে হতো, তাই আমি আর কোন ফুল ছুঁইনি; আমার ভয় হতো ছুঁলেই পবিত্র ফুলটি অপবিত্র হয়ে যাবে৷''

দেলোয়ার মৃত্যু আনিসকে এই অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দিয়েছিল৷ আর এই মুক্তি তাকে নতুন অপরাধবোধে জড়িয়ে নিয়েছিল৷

৩৷
দেলোয়ারের বাবা-মা আনিসকে জিজ্ঞেস করে কেন দেলোয়ারকে গাড়িতে রেখে ওরা দু'জন নেমে গিয়েছিল৷ ওরা কি জানত দেলোয়ার পানিতে পড়ে যাবে? আনিস বলেছিল ও লজ্জিত নেমে যাবার জন্যে৷ কিন্তু তার আসলে লজ্জা পাবার কোন কারন ছিল না৷ যদিও দেলোয়ার বাবা- মা ওদের দু'জনকে সন্দেহ করেছিলেন৷
ডলির বাবা-মা আনিসকে দেখেন ডলির ত্রাণকর্তা হিসেবে৷ এব ংএকসময় আনিস আর ডলির বিয়ে হয়৷ কিন্তু বিয়ের পরেও আনিস দেলোয়ারের কথা মনে করে শুধু৷ প্রতি মূহুর্তে ওর মনে হতে থাকে, ডলি যেন দেলোয়ারেরই বউ, ওর নিজের নয়৷
এদিকে ডলি সন্তান নিতে চায়, কিন্তু আনিস চায় না৷ "" হয়তো আমি মানুষ নই, মানুষ হলে মানুষ জন্ম দিতে হয়; কিন্তু আমি সত্যিই বুঝে উঠতে পারি না মানুষ জন্ম দিয়ে কী সুখ? - - - মানুষকে কি আমি ঘেন্না করি? কখনো ভেবে দেখি নি৷ মানুষ প্রজাতিটি টিকিয়ে রাখার একটা দায়িত্ব আছে আমার? রক্তে আমি তেমন কোন সংকেত পাই নি৷ ডলি হয়তো পাচ্ছে৷ প্রকৃতি আর সভ্যতা হয়তো তার রক্তে বেজে চলছে, তাকে নির্দেশ দিয়ে চলছে মানুষ বানানোর৷ - - - আমার ইচ্ছে করে না৷ মানুষ তৈরি করার কথা ভেবে আমি কোন সুখ পাই না৷''

একসময় ডলি ছেড়ে যায় আনিসকে৷ আনিস আরো গভীরভাবে নিজের জীবন কাটাতে থাকে৷
তার একসময়কার বন্ধু,স্কুলে পরীক্ষায় খারাপ করা বন্ধু, ওর থেকে সব কিছুতে যে পিছিয়ে থাকতো, যার সাথে তার একমাত্র স্মৃতি হলো কোন এক বস্তিতে দেয়ালের ফুটো দিয়ে মেয়েদের গোসলের দৃশ্য দেখা, সে বন্ধু নানা কাজের আব্দার নিয়ে আসে তার কাছে, বিনিময়ে অনেক টাকর লোভ৷ আনিস সেই বন্ধুকে নিরাশ করে৷ না, কোন অপরাধবোধ থেকে নয়, অথবা তার সততা প্রমাণের জন্যে নয়৷ শুধু মাত্র নিজের ইচ্ছের বশবর্তী হয়েই৷
কিন্তু এদিকে সে অন্য অনেক আমলার, বিশেষত তার চেয়ে সিনিয়র অনেকের অনেক অন্যায় আব্দার মেনে নিতে বাধ্য হয়৷ অনেকের স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করে৷ কিন্তু কোথাও সে শান্তি খুঁজে পায় না৷ জীবনের প্রতিটি কাজে সে অপরাধবোধ করতে থাকে৷
আনিসের বয়স বেড়ে চলে৷ তার বয়স যখন চুয়ান্ন, তখন সে তার বাড়ির কাজের লোকের বালিকা মেয়েটিকে মুগ্ধ করে নিজের স্বভাব দিয়ে৷ সেই মুগ্ধ বালিকা নিজের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিজের সব কিছু আনিসের কাছে সমর্পন করে৷ সেটুকু গ্রহন করে আনিস, কোন এক সময় তার মনে হয়, হয়ত এটুকুর জন্যেই জীবন কাটিয়ে দেয়া, হয়ত এটুকুর জন্যেই এত অপেক্ষা৷ কিন্তু পরমূহুর্তেই সে প্রচন্ড অপরাধবোধ করে৷

স্বগত সংলাপের মতন এ বইটি শেষ হয় এভাবে:
" --- অফিসে গিয়ে আমি এক পেয়ালা কফি খাই, কফিটা খেতে আমার অনেক সময় লাগে, সময় লাগাতে আমার ভাল লাগে, কাউকে ঘরে ঢুকতে নিষেধ করে দেই, কোন টেলিফোন ধরি না৷ আমি পদত্যাগ পত্র লিখি, মাত্র একটি বাক্য; সহকারীর হাতে দিয়ে বেরিয়ে পড়ি৷ বাইরে এসে রিকশা নিই, রিকশাঅলা জানতে চায় কোথায় যাব, আমি শুধু বলি, "চালাও'৷ আমার ইচ্ছে করে শহর ছেড়ে যেতে, এখনই ছেড়ে যেতে, আর না ফিরতে৷ শহরকে আমার অচেনা মনে হয়, চিনতে ইচ্ছে করে না৷ রিকশাঅলাকে আমি শহরের বাইরে যেতে বলি, সে একটি খেতের পাশে এসে জানতে চায় আমি নামবো কি না৷ আমার ভালো লাগে, আমার নামতে ইচ্ছে করে, আমি নামি, হাঁটতে থাকি, হেঁটে হেঁতে অনেক দূর যেতে ইচ্ছে করে, অনেক দূরে, আমি হাঁটতে থাকি; আমি হাঁটি,আমি হাঁটতে থাকি, শহর ছেড়ে অনেক দূরে যেতে থাকি, আমি হাঁটতে থাকি৷ '

বইটি পড়তে পড়তে অনেকবার থামতে হয়েছে আমাকে৷ একটানা পড়তে পারি নি কখনৈ৷ একটানা পড়ে যাবার যন্ত্রণাটুকু সবসময় আমার জন্যে সহনশীল ছিল না আসলে৷ এ জন্যে খানিক পর পর নিজেকে বিশ্রাম দিয়েছি৷ সেই বিশ্রামের কথা লেখক জানতেন কি না, অথবা ভেবেছিলেন কিনা জানি না, কিন্তু, ঐ সময়টুকুই আসলে পাঠককে নিজের অপরাধগুলোকে ভেবে দেখার সুযোগ করে দেয়৷ মানুষ "হিশেবে' নিজের অপরাধগুলোর মুখোমুখি করে দেয়, বড় প্রচন্ডভাবে৷
-------*-----

এটা লিখেছিলাম - গুরুচন্ডালি-র টইপত্তরের জন্যে।
একসাথে থাকার জন্যে এখানে তুলে দিলাম।

কোন মন্তব্য নেই: