বুধবার, মে ৩১, ২০০৬

করি বাংলায় চিৎকার


করি বাংলায় চিকার

...... অতঃপর বছর গড়িয়ে যায় গড়াতেই থাকে বছরের পর বছর শহীদের রক্তে ভেজা জায়গা ধুয়ে-মুছে আমরা সেখানে মিনার বানাই হৃদপিন্ডের মধ্য থেকে ভালবাসার লাল সুর্যটাকে খুলে এনে শক্ত নাইলনের দড়ি দিয়ে বেঁধে দেই মিনারের গায়ে প্রতিবছর- ফুলে ফুলে সাজাই তাকে মধ্যরাতে খালি পায়ে এসে গান গেয়ে যাই কি সুমধুর সেই গান- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি - গাইতে গাইতে গলা বেয়ে অশ্রু ঝরে পরে আহা, সেই অশ্রু যদি মাখিয়ে দিতে পারতাম ভাইয়েদের বুলেট-বিদ্ধ বুকের ক্ষতে!
একুশের সংকলনের পাতা উল্টাই আজ অজস্র শ্রদ্ধাঞ্জলি সেখানে মুখের ভাষা ফিরিয়ে দেয়া সেই বীর শহীদদের জন্যে দেখে-পড়ে-শুনে ভাল লাগে ভাল লাগা বাড়িয়ে যাই আমি পাতা উল্টে চোখে পড়ে - একুশের গল্প জহির রায়হানের কোন এক হবু ডাক্তার একুশের মিছিলে তার বন্ধুকে হারায় পুলিশের গুলিতে কপালের ঠিক মাঝখানটায় গুলি লাগে বন্ধুর লাশ তুলে নিয়ে যায় সেনাবাহিনির লোকেরা প্রায় বছর তিনেক বাদে তারই রুমমেট এনাটমি পড়ার জন্যে কঙ্কাল নিয়ে আসে বাক্স খুলে সবাই দেখে প্রয়াত বন্ধুর মতন এর কপালেও একটা মসৃন ফুটো, ডান পায়ের হাড়টা তেমনি এক ইঞ্চি ছোট বাম পায়ের চেয়ে
পড়তে পড়তে শিউরে উঠি আমি বুকের মধ্যে টের পাই ব্যথার কাঁপন মাথা ব্যথা করতে থাকে আমার- বিশেষ করে যেন কপালের মাঝখানটা!
ব্যথা পোহাতে পোহাতে গল্প রেখে ইতিহাস খুলি অবাক বিস্ময়ে জানি- সেই দুপুরে গুলি লেগেছিল রফিকের খুলিতেও ( রফিক, যে কিনা আমার ভাই) আমার ভাইকে চেনা যায় নি সেদিন কেউ কেউ ওকে সালাহউদ্দীন (আমার আরেক ভাই) বলে ভুল করেছিল আচ্ছা, সালাহউদ্দীন কি আজো দুঃখ করে, কেন সে রফিক হতে পারল না!
রফিকের মৃত্যুসংবাদ থেকে চোখ সরিয়ে নিই যেমন করে প্রতিদিন সকালে মুখ মুছে দুরে ঠেলে দিই ভেজা টাওয়েল একুশের কাহিনিতে অনাবশ্যক আগ্রহ টের পেয়ে আমার ভুরুরা কুঁচকে ওঠে এটা তো ফেব্রুয়ারি নয়-, তবে?’’ মে মাসের আলোকোজ্জ্বল এই বিকেলে কেনই বা তবে ফেব্রুয়ারির ধোঁয়াটে দুপুরকে টেনে আনা!
ভীষনই অপ্রয়োজনীয় ওরা, ঠেলে সরিয়ে আমি হেঁটে যাই সামনেসামনে আর উপরেউপরে, যেখানে তিনতলা বাড়ির চিলেকোঠায়- ঝাঁঝালো ধোঁয়ায় ডুবে যেতে যেতে আমার লেখক-বন্ধু সাদা কাগজের বুকে কল্পনা এঁকে যায়- কোন এক উর্দুভাষি পাকিস্তানীর কথা- বউ কথা কও’’ নামের এক বাঙ্গালি পাখির ডাক শুনে যার কিনা প্রতিরাতে ঘুম ভেঙ্গে যেত সেই ৫২-র রাতগুলোয়
স্বপ্নের মত দিন পকেটে পুরে আমি ফিরে আসি আবার রফিকের কাছে ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা হাতে তুলে নিয়ে বইয়ের পাতায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি সালামের বুক (সালাম, আমার ভাই) ঠিক কতখানি বড় ছিল তোমার হৃদয়, ভাই? কি ছুঁয়েছিলে তুমি, পরশপাথর?
খুঁজতে থাকি খুঁজতে থাকি খুড়তে খুড়তে খুঁজে বেড়াই সেই পরশমণিকে খুঁজে পেলে ছুঁয়ে নিতাম, ছুঁইয়ে নিতাম সবাইকে ছোট্ট এ জীবনের অনেকগুলো শান্ত মিছিলের মধ্যভাগে হেঁটে চলা এই আমি আজ সামনে আসতে চাই- বুক পেতে চুমু খেয়ে দেখতে চাই শত্রুর বুলেট
আমি জানি, মিছিলের সামনে এসে দাঁড়ানোর মতন মানুষের আজ বড়ই প্রয়োজন আমার জন্মভুমির


***************
একুশ স্মরণে বাংলালাইভ ডট কম -এর ঢাকার চিঠি-র জন্যে লেখা ।

শুক্রবার, মে ২৬, ২০০৬

কঙ্কাবতী-


আমায় এমন পাগল করে ,
আকাশ থেকে মধ্যরাতে নামলে কেন ?
নামলে যদি মধ্যরাতেই ,
চোখের দেখা না ফুরোতেই -
থামলে কেন ?

নামতে তোমায় কে বলেছে -
মেঘে মেঘে মেঘ গলেছে ,
অন্ধকারে ......।

------ নির্মলেন্দু গুন ( মধ্যরাতের ক্ষনস্থায়ী বৃষ্টির প্রতি ) ।



... কনকনে ঠান্ডা এখানে , মেলবোর্নে ৷ আর, ঢাকায় নাকি তুমুল বৃষ্টি এখন ৷ হাইটেকের কল্যানে sms এ ভর করে সেই বৃষ্টির ছাঁট আমার মোবাইলে এসে পড়ে ৷ চিঠি এসেছে , বাড়ানো হাতে হাত রেখে বৃষ্টিতে ভেজার আহবান ৷
হায় বরষা , তোমাতে আমাতে এখন সাত সমুদ্র তের নদীর ফারাক ! মেঘেদের কাছে অনুযোগ করে বার্তা পাঠায় কেবল অভিমানী কঙ্কাবতী , কিন্তু হায় , আমি যে ডালিমকুমার নই !!
কনকনে ঠান্ডা এখানে , তবু ও , বৃষ্টি ঝরে যায় ঢাকায় , মোবাইলের ঝাপসা স্ক্রীনে , আর আমার কঙ্কাবতীর মনে ৷

শুক্রবার, মে ১৯, ২০০৬

মানুষ হিশেবে আমার অপরাধসমূহ


১৷
বইয়ের প্রচ্ছদে হিশেব- বানান এভাবেই দেয়া আছে৷ লেখকের নাম যখন হুমায়ুন আজাদ, এ বানান তখন আর অবাক করেনা আমাকে৷ হুমায়ুন আহমেদ আর হুমায়ুন আজাদ দু'জন ভিন্ন মানুষ৷ প্রথমবার নাম শুনে অনেকেই দু'জনকে গুলিয়ে ফেলেন, সে জন্যেই এটা বললাম৷
আমার পড়া হুমায়ুন আজাদের প্রথম বই - "সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে'৷ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে লেখা বই৷ সব রকম সম্পর্ক৷ বাবা-মা'র সাথে, ভাই বা বোনের সাথে, স্বামী-স্ত্রী বা পুত্র-কন্যাদের সাথে৷ সে বইয়ের মূল চরিত্র ছিলেন একজন প্রকৌশলী, যিনি সড়ক বানান, আর ব্রীজ৷ মানে সেতু৷ ব্রীজ বানাতে বানাতে একসময় মানুষের সম্পর্কগুলোকেও তিনি ব্রীজ বলে ভাবা শুরু করেন৷ একসময় দেখা যায়, এ সম্পর্কগুলো তার বানানো ব্রীজগুলোর মতই কী অসহায়ভাবে ভেঙ্গে পড়ছে!
বই পড়ে যে কখোনো যন্ত্রনা পাওয়া যায়, হুমায়ুন আজাদের বই পড়ার আগে আমার এই ধারনাই ছিলো না৷ অসম্ভব যন্ত্রনা দেয় তাঁর বই,অথবা বলা ভাল- পীড়া দেয়৷ নিজেকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়৷ চারপাশের সোজা সরল জগতের ধারনা এক লহমায় উড়িয়ে দিয়ে তিনি যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখান, কেমন করে আমাদের চারপাশের সব কিছু ভেঙ্গে পড়ছে৷
মানুষ হিসেবে আমার অপরাধসমূহ- স্বীকারোক্তিমূলক বই৷ তাঁর প্রায় সব বইয়ের চরিত্ররাই নিজের সাথে নিজে প্রচুর কথা বলে, নিজেকে হাসায়, নিজেকে বুঝায়৷ নিজেকে অভিশাপ দেয়৷ এই বইয়েও তিনি একজন মানুষকে দিয়ে তাঁর অপরাধের স্বীকারোক্তি করিয়েছেন৷ খানিকটা অবাক হয়েছি যখন দেখলাম "অপরাধী' হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন একজন আপাত:স্ত্ সরকারী আমলা-কে৷ আমাদের দেশের সরকারী বড় আমলাদের অসততা কিংবদন্তীতূল্য, কিন্তু তাঁর গল্পের নায়ক, যার নাম আনিস, একজন স্ত্ সরকারী আমলা৷ পুরো বইটা আনিসের মুখ দিয়ে বলানো নিজের গল্প৷ তার অপরাধ ও অপরাধবোধের বর্ণনা৷ হুমায়ুন আজাদের বর্ণনাভঙ্গি একান্তই তাঁর নিজস্ব৷ অন্য কারো সাথে মেলে না তা৷
বইয়ের শুরুতে আনিসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেলোয়ার ও তার বউ ডলি-র কথা আছে৷ "" বিয়ের মঞএ দেলোয়ারের বউকে দেখে আমি একটু কেঁপে উঠি,সামান্য একটু কাঁপন;- আমার চোখ তার বউয়ের চিবুকের ওপর গিয়ে পড়েছিল, একটি কাঁধের ওপর গিয়ে পড়েছিল; তা আমাকে কম্পিত করে, কিছুটা ঈর্ষারও জন্ম দেয়; এব ংআমি ভয় পাই৷''
দেলোয়ার ও ডলি একদিন আনিসকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়৷ ফেরিঘাটের কাছে আসতেই আনিস নেমে পড়ে গাড়ি থেকে, কারন, "" একসময় আমার মনে হয় গাড়ি সুগন্ধে নয়, মাংসের গন্ধে ভরে উঠছে, সোনালি মাংসের ভেতর থেকে গন্ধ উঠে আসছে; তখন গাড়ি থেকে বেরিয়ে লাফিয়ে পড়তে আমার ইচ্ছে হয়৷'' আনিস নেমে যাবার পর ডলিকেও নেমে যেতে বলে দেলোয়ার, এব ংডলি নেমে যাবার পর ফেরিতে গাড়ি ওঠানোর সময় পেছন থেকে ট্রাকের ধাক্কায় পানিতে পড়ে যায় দেলোয়ারের গাড়ি৷ দেলোয়ার মারা যায়৷
মূলত এখান থেকেই আনিসের অপরাধবোধের শুরু৷

২৷
কিংবা হয়ত এখান থেকে নয়৷
আরো আগে দেলোয়ার যেবার আনিসকে নিয়ে ব্রোথেলে গিয়েছিল, দু'জন দু'দিকে চলে যাবার পর, খানিক সময় কাটিয়ে আবার ওরা একসাথে হলে, দেলোয়ার জিজ্ঞেস করেছিল আনিস কিছু ""করেছে কি-না?'' আনিস করেছিল৷ কিন্তু দেলোয়র জানাল সে কিছু করে নি, সে শুধু দেখতে এসেছিল, করতে নয়৷ তখনো আনিসের ভীষন অপরাধবোধ হয়েছিল৷ "" নিজেকে আমার খুব খারাপ মনে হয়৷ আমার আর ভালোদের সাথে মেশা ঠিক হবে না৷ যে মেয়েটিকে দেখে আমি কেঁপে উঠি, যাকে আমার খুব ভাল মনে হয়, তার দিকে আমি আর তাকাবো না৷ সে তার মামার সাথে বেবিতে যাক, তার দুলাভাইয়ের সাথে বেবিতে যাক, আমি আর কষ্ট পাবো না৷ - - - দেলোয়ারকে দেখলেই, তারপর, আমার মনে অপরাধবোধ জেগে উঠতো৷ - - আমি অনেক কিছুই ছোঁয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম; ফুল, আমার কাছে পবিত্র মনে হতো, তাই আমি আর কোন ফুল ছুঁইনি; আমার ভয় হতো ছুঁলেই পবিত্র ফুলটি অপবিত্র হয়ে যাবে৷''

দেলোয়ার মৃত্যু আনিসকে এই অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দিয়েছিল৷ আর এই মুক্তি তাকে নতুন অপরাধবোধে জড়িয়ে নিয়েছিল৷

৩৷
দেলোয়ারের বাবা-মা আনিসকে জিজ্ঞেস করে কেন দেলোয়ারকে গাড়িতে রেখে ওরা দু'জন নেমে গিয়েছিল৷ ওরা কি জানত দেলোয়ার পানিতে পড়ে যাবে? আনিস বলেছিল ও লজ্জিত নেমে যাবার জন্যে৷ কিন্তু তার আসলে লজ্জা পাবার কোন কারন ছিল না৷ যদিও দেলোয়ার বাবা- মা ওদের দু'জনকে সন্দেহ করেছিলেন৷
ডলির বাবা-মা আনিসকে দেখেন ডলির ত্রাণকর্তা হিসেবে৷ এব ংএকসময় আনিস আর ডলির বিয়ে হয়৷ কিন্তু বিয়ের পরেও আনিস দেলোয়ারের কথা মনে করে শুধু৷ প্রতি মূহুর্তে ওর মনে হতে থাকে, ডলি যেন দেলোয়ারেরই বউ, ওর নিজের নয়৷
এদিকে ডলি সন্তান নিতে চায়, কিন্তু আনিস চায় না৷ "" হয়তো আমি মানুষ নই, মানুষ হলে মানুষ জন্ম দিতে হয়; কিন্তু আমি সত্যিই বুঝে উঠতে পারি না মানুষ জন্ম দিয়ে কী সুখ? - - - মানুষকে কি আমি ঘেন্না করি? কখনো ভেবে দেখি নি৷ মানুষ প্রজাতিটি টিকিয়ে রাখার একটা দায়িত্ব আছে আমার? রক্তে আমি তেমন কোন সংকেত পাই নি৷ ডলি হয়তো পাচ্ছে৷ প্রকৃতি আর সভ্যতা হয়তো তার রক্তে বেজে চলছে, তাকে নির্দেশ দিয়ে চলছে মানুষ বানানোর৷ - - - আমার ইচ্ছে করে না৷ মানুষ তৈরি করার কথা ভেবে আমি কোন সুখ পাই না৷''

একসময় ডলি ছেড়ে যায় আনিসকে৷ আনিস আরো গভীরভাবে নিজের জীবন কাটাতে থাকে৷
তার একসময়কার বন্ধু,স্কুলে পরীক্ষায় খারাপ করা বন্ধু, ওর থেকে সব কিছুতে যে পিছিয়ে থাকতো, যার সাথে তার একমাত্র স্মৃতি হলো কোন এক বস্তিতে দেয়ালের ফুটো দিয়ে মেয়েদের গোসলের দৃশ্য দেখা, সে বন্ধু নানা কাজের আব্দার নিয়ে আসে তার কাছে, বিনিময়ে অনেক টাকর লোভ৷ আনিস সেই বন্ধুকে নিরাশ করে৷ না, কোন অপরাধবোধ থেকে নয়, অথবা তার সততা প্রমাণের জন্যে নয়৷ শুধু মাত্র নিজের ইচ্ছের বশবর্তী হয়েই৷
কিন্তু এদিকে সে অন্য অনেক আমলার, বিশেষত তার চেয়ে সিনিয়র অনেকের অনেক অন্যায় আব্দার মেনে নিতে বাধ্য হয়৷ অনেকের স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করে৷ কিন্তু কোথাও সে শান্তি খুঁজে পায় না৷ জীবনের প্রতিটি কাজে সে অপরাধবোধ করতে থাকে৷
আনিসের বয়স বেড়ে চলে৷ তার বয়স যখন চুয়ান্ন, তখন সে তার বাড়ির কাজের লোকের বালিকা মেয়েটিকে মুগ্ধ করে নিজের স্বভাব দিয়ে৷ সেই মুগ্ধ বালিকা নিজের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিজের সব কিছু আনিসের কাছে সমর্পন করে৷ সেটুকু গ্রহন করে আনিস, কোন এক সময় তার মনে হয়, হয়ত এটুকুর জন্যেই জীবন কাটিয়ে দেয়া, হয়ত এটুকুর জন্যেই এত অপেক্ষা৷ কিন্তু পরমূহুর্তেই সে প্রচন্ড অপরাধবোধ করে৷

স্বগত সংলাপের মতন এ বইটি শেষ হয় এভাবে:
" --- অফিসে গিয়ে আমি এক পেয়ালা কফি খাই, কফিটা খেতে আমার অনেক সময় লাগে, সময় লাগাতে আমার ভাল লাগে, কাউকে ঘরে ঢুকতে নিষেধ করে দেই, কোন টেলিফোন ধরি না৷ আমি পদত্যাগ পত্র লিখি, মাত্র একটি বাক্য; সহকারীর হাতে দিয়ে বেরিয়ে পড়ি৷ বাইরে এসে রিকশা নিই, রিকশাঅলা জানতে চায় কোথায় যাব, আমি শুধু বলি, "চালাও'৷ আমার ইচ্ছে করে শহর ছেড়ে যেতে, এখনই ছেড়ে যেতে, আর না ফিরতে৷ শহরকে আমার অচেনা মনে হয়, চিনতে ইচ্ছে করে না৷ রিকশাঅলাকে আমি শহরের বাইরে যেতে বলি, সে একটি খেতের পাশে এসে জানতে চায় আমি নামবো কি না৷ আমার ভালো লাগে, আমার নামতে ইচ্ছে করে, আমি নামি, হাঁটতে থাকি, হেঁটে হেঁতে অনেক দূর যেতে ইচ্ছে করে, অনেক দূরে, আমি হাঁটতে থাকি; আমি হাঁটি,আমি হাঁটতে থাকি, শহর ছেড়ে অনেক দূরে যেতে থাকি, আমি হাঁটতে থাকি৷ '

বইটি পড়তে পড়তে অনেকবার থামতে হয়েছে আমাকে৷ একটানা পড়তে পারি নি কখনৈ৷ একটানা পড়ে যাবার যন্ত্রণাটুকু সবসময় আমার জন্যে সহনশীল ছিল না আসলে৷ এ জন্যে খানিক পর পর নিজেকে বিশ্রাম দিয়েছি৷ সেই বিশ্রামের কথা লেখক জানতেন কি না, অথবা ভেবেছিলেন কিনা জানি না, কিন্তু, ঐ সময়টুকুই আসলে পাঠককে নিজের অপরাধগুলোকে ভেবে দেখার সুযোগ করে দেয়৷ মানুষ "হিশেবে' নিজের অপরাধগুলোর মুখোমুখি করে দেয়, বড় প্রচন্ডভাবে৷
-------*-----

এটা লিখেছিলাম - গুরুচন্ডালি-র টইপত্তরের জন্যে।
একসাথে থাকার জন্যে এখানে তুলে দিলাম।

বুধবার, মে ১০, ২০০৬

আমি ও কনফুসিয়াস -



কনফুসিয়াস বলিয়াছিলেন, "মানুষ তাঁর স্বপ্নের সমান বড়। "
এই বাক্যখানি যে অন্তরে গভীরভাবে বিশ্বাস করিবে, তাহার পক্ষে সময়ের অপচয় অমার্জনীয় অপরাধ, স্বপ্নের সমান বড় বলিলেই তাহা হওয়া যায় না। বড় হইবার জন্যে প্রয়োজন সাধনা ও পরিশ্রমের।
হে বত্‌স্য, মনে রাইখো, পৃথিবীতে সময়ই একমাত্র বস্তু যাহা চলিয়া গেলে আর তাহাকে ফিরাইয়া আনা যায় না। প্রতিটা মুহুর্তেই মরণ ঘটে সময়ের আবার সেই মূহুর্তেই জন্মলাভ করে নতুন আরেকখানি সময়। পূর্বেরখানা চিরদিনের জন্য গত হইয়া যায়।
হে বত্‌স্য; হেলায় কাটানো প্রতিখানি সময়ের মৃত্যুর সঙ্গে, মনে রাইখো, মৃত্যু ঘটিতেছে তোমার স্বপ্নেরও। তাই, তোমার স্বপ্নের কথা স্মরণ কর- অলীক মরীচিকায় পরিণত হইবার আগেই তাহাকে রক্ষা কর। এবং তাহার জন্যে প্রয়োজনীয় অধ্যবসায়ে মনোযোগী হও।


******************
এটা লিখেছিলাম ক্লাশ নাইনে পড়বার সময়। কনফুসিয়াসের কথাটা আমার ভীষন পছন্দের। সেই ভাল লাগাটা এভাবেই প্রকাশ পেয়েছিল।
অবশ্য লেখাটা পড়ে এখন নিজেই দীর্ঘশ্বাস ফেলি, কি তেলই না ছিল বাপ!

মঙ্গলবার, মে ০৯, ২০০৬

পূর্ণ সাধ আর অপূর্ণ ইচ্ছা -



পাখি হইতে চাই নাই কখনো৷ এমনকি সুপারম্যানও না৷
তবে ডেভিড কপারফিল্ডের একটা জাদু দেখেছিলাম৷ মঞ্চ থেকে বেরিয়ে দর্শকদের মাথার উপর দিয়ে খানিকক্ষন উড়ে বেড়িয়েছিলেন৷
এইটা দেখে
... , না না, জাদুকর না, উড়তে সাধ হয়েছিলো ভীষন৷ একদম- মানুষের মতন- উড়তে- -৷

ছোট্ট থাকতে একটা পাহাড়ের কথা কল্পনা করতাম৷ অনেক উঁচু! সেইটার উপরে থাকবে একটা ঘর৷ প্রত্যেকদিন সকালে সেই ঘর থেকে বের হইলে - সক্কালবেলার সূর্য দেখতে পারতাম যেন, আর
... মেঘ৷ মাথার চারপাশে- শরীরের চারপাশে খালি মেঘ৷ হাত বাড়াইলেই যেন ছুঁইতে পারি মেঘেদের - এরম করে- অথবা মেঘেরা হাত বাড়াইলে যেন ছুঁতে পারে আমাকে!

একটাও পূরণ হয় নাই৷ এরোপ্লেনের পেটের মধ্যে বসে উড়েছি, আর জানালা দিয়া দেখেছি সূর্য আর মেঘ
... ৷ আমাদের মধ্যে কোন ছোঁয়াছুঁয়ি হয় নাই৷ :-((

অনেক সাধ আছিলো- বড় হয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত লিখব৷

কিন্তু তা-ই বা হইলো কই?

সোমবার, মে ০৮, ২০০৬

ইউনিকোড বিষয়ক দুই-পাঁচ ফান্ডা-

নীচের প্রায়-প্রবন্ধটা আমার লেখা নয়। ঈশানদা'র লেখা। ইউনিকোড বিষয়ে প্রাথমিক ধারণার জন্যে এটা কাজে লাগতে পারে ভেবে এখানে তুলে দিলাম।

---------------------------------------------------
এক৷ কম্পু কি বোঝে?

কম্পু শুধু নম্বর বোঝে৷ অক্ষর বোঝেনা৷ শব্দ বোঝেনা৷ এ বি সি ডি কম্পু বোঝেনা, ক খ গ বোঝেনা৷ প্রতিটি অক্ষরের জন্য আছে এক একটি সংখ্যা৷ যথা,
A মানে ৬৫৷ a মানে ৯৭৷ এইরকম প্রতিটি অক্ষরের জন্য আছে এক এক খানা নম্বর৷

দুই৷ টেক্সট ফাইলে কি থাকে

অতএব টেক্সট ফাইলে কোনো অক্ষর থাকেনা৷ জাস্ট নম্বর লেখা থাকে, বিভিন্ন কায়দায়, যাকে এনকোডিং বলে৷ ধরা যাক একখানা প্লেন টেক্সট ফাইলে যদি
aa লিখে সেভ করা হয়, তাহলে সেই ফাইলে জাস্ট দুটো সংখ্যা লেখা থাকবে: ৯৭ এবং ৯৭৷ পরপর৷ ব্যস৷ আর কিচ্ছু না৷

তিন৷ তাহলে লেখা পড়ি কি করে?

এই খানেই আসে ফন্টের গপ্পো৷ ফন্ট ফাইল হল এমন একখানি ফাইল যেখানে নম্বর এবং তার গ্রাফিক্যাল রিপ্রেসেন্টেশনের একখানা ম্যাপিং থাকে৷ সোজা বাংলায়, নম্বরের ছবি আঁকা থাকে৷ যে, এই হল ৯৭ নম্বরের ছবি৷ আর ইনি হলেন ৯৮৷অর্থাত্ ইনি
b এর মতো দেখতে৷

এবার, ঐ
aa লেখা ফাইল খুলে নোটপ্যাড কি করে, পরপর নম্বর গুলো পড়ে নেয়৷ তারপর ফন্ট ফাইলে গিয়ে দেখে নম্বরগুলোর ছবি কেমন৷ ছবি পেলে এঁকে দেয়, না পেলে চৌকো বাক্স দেখায়৷

চার৷ স্ট্যান্ডার্ড৷

এখানে বোঝা যাচ্ছে, যে, এই ফন্ট ফাইলে নম্বর বনাম ছবির যে ম্যাপিং তার একটা ইউনিভার্সাল স্ট্যান্ডার্ড থাকা দরকার৷ অর্থাত্ ৯৭ মানে
a হলে, সবাইকেই সেটা মেনে চলতে হবে৷ নইলে ঘোর বিপদ৷ কেউ যদি ৯৭ মানে b ধরে নেয়, তাহলে আমাদের aa লেখা ফাইল তার মেশিনে খুললে bb দেখাবে৷

পাঁচ৷ ইউনিকোড এবং স্ট্যান্ডার্ড

আমরা যারা বাংলায় এটা-সেটা করি, তারা জানি যে স্ট্যান্ডার্ডের অভাবে কি কি হয়৷ বিভিন্ন সাইট থেকে বাংলা কপি পেস্ট করতে পারিনা, এক সফটওয়্যারে লিখি তো আরেক সফটওয়্যারে হিজি বিজি দেখায়, কারণ ফন্টের ব্যাপারে কেউ কোনো স্ট্যান্ডার্ড ফলো করেনা৷

এখন ইউনিকোড হল সেই স্ট্যান্ডার্ড, যেটা বাংলায় সকলের মেনে চলার কথা৷ সারা পৃথিবীর প্রায় সমস্ত ভাষার প্রতিটা অক্ষরের জন্য এই স্ট্যান্ডার্ডে নম্বর বরাদ্দ করা হয়েছে৷ সেই ভাষার লিস্টিতে বাংলাও আছে৷ ইউনিকোদ সকলে মেনে চললে যা-যার ঝামেলা হয় বাংলা লিখতে, সেটা আর থাকার কথা না৷
---------------------------------------
এ বিষয়ে আর কিছু ক্যাচাল পড়তে চাইলে ক্লিক করুন এইখানে

সহজ করে আর কিছু যোগ করতেই হল, কারন অনেকেই জানতে চাচ্ছেন ইউনিকোড দিয়ে আসলে কি হাতিটা বা ঘোড়াটা হবে?
পয়েন্ট করে বলি।
১। আপনি ইয়াহু বা অন্য সব মেসেঞ্জারে বাংলায় চ্যাট করতে পারবেন।
২। যে কোনো সাইটে- বাংলায় মন্তব্য লিখতে পারবেন।
৩। গুগল এখন বাংলা সাপোর্ট দিচ্ছে, সুতরাং- ওখানে কেউ যদি বাংলা লিখে সার্চ করে, তবে ইউনিকোড -এ লেখা সব সাইট গুগল দেখাতে পারবে।
৪। কম্পিউটারে যে কোনো একটি ইউনিকোড ফন্ট থাকলেই হল, যে কেউ আপনার সাইট পড়তে পারবে।

এর মধ্যে আমি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিবো গুগলের ব্যাপারটা। কারন মানুষ সাইট বানায়-ই সবার কাছে পৌছানর জন্যে। আর এ ক্ষেত্রে সবচে' বেশি সাহায্য করে গুগল । আপনার লেখা সাইট-টি হয়ত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক হলো, গুগলে কেউ বাংলায় ' মুক্তিযুদ্ধ' লিখলেই আপনার সাইট-টি তিনি পেয়ে যাবেন সামনে। এবং পুরো ব্যাপারটি-ই হবে কেবল এবং কেবল যদি আপনি আপনার সাইট-টি ইউনিকোড- এ বানান।
আরো বেশি মানুষের কাছে বাংলা পৌছাতে হলে আমাদের উচিৎ সবাইকে ইউনিকোড বাংলায় সাইট বানাতে উৎসাহি করা।

মঙ্গলবার, মে ০২, ২০০৬

বস, শুভ জন্মদিন !


আজ আমার বস এর জন্মবার্ষিকী ।
বস, জন্মদিনের অনেক শুভেচ্ছা আপনাকে।

শুভ
জন্মদিন!